বিষয়বস্তুতে চলুন

ফরিদা পারভীন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(ফরিদা পারভিন থেকে পুনর্নির্দেশিত)
ফরিদা পারভীন
২০১৭ সালে ফরিদা পারভীন
জন্ম(১৯৫৪-১২-৩১)৩১ ডিসেম্বর ১৯৫৪
সিংড়া, নাটোর জেলা, বাংলাদেশ
মৃত্যু১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫(2025-09-13) (বয়স ৭০)
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মহাখালী
সমাধিকুষ্টিয়া কেন্দ্রীয় পৌর গোরস্থান
পেশাসংগীত শিল্পী
কর্মজীবন১৯৬৮-২০২৪
দাম্পত্য সঙ্গী
পুরস্কারএকুশে পদক একুশে পদক (১৯৮৭), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩)

ফরিদা পারভিন (৩১ ডিসেম্বর ১৯৫৪ – ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫) একজন বাংলাদেশী লোকসঙ্গীতশিল্পী ছিলেন। তিনি লালনগীতির জন্য সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। তাকে ‘লালনকন্যা’ ও ‘লালন সম্রাজ্ঞী’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়।[][] সঙ্গীতে তার অবদানের জন্য তিনি ১৯৮৭ সালে একুশে পদক ও ১৯৯৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।[][]

জন্ম ও প্রাথমিক জীবন

[সম্পাদনা]

ফরিদা পারভীন ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার কলম ইউনিয়নের শাঔঁল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ফরিদা পারভীনের বাবা দেলোয়ার হোসেন পেশায় ছিলেন সাধারণ চিকিৎসক। মা রৌফা বেগম।

শিক্ষাজীবন

[সম্পাদনা]

তার প্রাতিষ্ঠানিক স্কুল জীবন কেটেছে বিভিন্ন শহরে। স্কুল জীবনের সূচনা হয়েছিল মাগুরায়। তিনি কুষ্টিয়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার মীর মশাররফ হোসেন বালিকা বিদ্যালয় (বর্তমান সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়) এবং মেহেরপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। কুষ্টিয়ার মীর মশাররফ হোসেন বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৭৪ সালে কুষ্টিয়া সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন এবং কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগ থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৭৬-৭৯ সালে অনার্স পাশ করেন।

তার গানের শিক্ষাজীবনেরও হাতখড়ি মাগুরা জেলায়। মাগুরায় তার গানে হাতেখড়ি দিয়েছিলেন ওস্তাদ কমল চক্রবর্তী। পরবর্তীতে তিনি কুষ্টিয়ার তখনকার গানের ওস্তাদ রবীন্দ্রনাথ রায়, মোতালেব বিশ্বাস এবং ওসমান গণি'র কাছে ক্ল্যাসিক্যাল শেখেন। প্রায় ছয়-সাত বছর তানপুরার সঙ্গে ক্ল্যাসিক্যাল চর্চা করবার পর তিনি নজরুল সঙ্গীত শিখতে শুরু করেন। তার নজরুল সঙ্গীতের প্রথম গুরু হচ্ছেন কুষ্টিয়ার ওস্তাদ আবদুল কাদের। এরপর তিনি মেহেরপুরে মীর মোজাফফর আলী'র কাছেও নজরুল সঙ্গীত শেখেন। স্বরলিপি দিয়ে নজরুলের গান হারমোনিয়ামে ও কন্ঠে তোলার কাজটি তিনি ওস্তাদ মীর মোজাফফর আলী'র কাছেই প্রথম শেখেন। ১৯৬৮ সালে তিনি রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত নজরুল সঙ্গীত শিল্পী নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে লালন সাঁইজির গানের সঙ্গে ফরিদার যোগাযোগ। তখন তিনি কুষ্টিয়াতে থাকতেন। সেখানে তাদের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন গুরু মোকছেদ আলী সাঁই। ১৯৭৩ সালে ফরিদা তার কাছেই 'সত্য বল সুপথে চল' গান শিক্ষার মাধ্যমে লালন সাঁইজির গানের তালিম নেন। পরে মোকছেদ আলী সাঁইয়ের মৃত্যুর পর খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁইয়ের কাছে লালন সঙ্গীতের শিক্ষা গ্রহণ করেন।

সংগীত জীবন

[সম্পাদনা]

ফরিদা পারভীনের কর্মজীবন সঙ্গীতময়। শুধু লালনের গান নয়, তিনি একাধারে গেয়েছেন আধুনিক এবং দেশাত্মবোধক গান। ফরিদা পারভীনের গাওয়া আধুনিক, দেশাত্মবোধক কিংবা লালন সাঁইয়ের গান সমানভাবেই জনপ্রিয়। তার জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে 'এই পদ্মা, এই মেঘনা, এই যমুনা-সুরমা নদীর তটে' 'তোমরা ভুলেই গেছো মল্লিকাদির নাম', 'নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিল গায়ে প্রেমের কী সাধ আছে বলো', 'খাঁচার ভিতর', 'বাড়ির কাছে আরশি নগর' ইত্যাদি।[]

তার অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে:

  • ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে অচিন পাখি' নামে একটি লংপ্লে রেকর্ড বের হয়। স্পন্সার করে 'শ্রোতার আসর' বর্তমানে এসিআই কোম্পানি
  • ডন কোম্পানি থেকে 'লালনগীতি'
  • সারগাম থেকে 'লালনের গান'
  • দোয়েল প্রডাক্টস থেকে 'দেশাত্মবোধক/আধুনিক/লালন' মিলে একটা ক্যাসেট
  • আরশিনগর-এর ব্যানারে লালনের গান 'আমারে কি রাখবেন গুরু চরণে'
  • বেঙ্গল ফাউন্ডেশন থেকে 'সময় গেলে সাধন হবে না'
  • আবুল উলাইয়ার পরিবেশনায় 'আশা পূর্ণ হলো না'
  • 'লাইভ কনসার্ট ইন জাপান' নামে একটা এ্যালবাম বের করছে আবুল উলাইয়া
  • তোমার মতো দয়াল বন্ধু আর পাবো না
  • সমুদ্রের কূলেতে বসে
  • হিট সঙস অব ফরিদা পারভীন : মিলেনিয়াম /বহুদিন হলো ভেংগেছি ঘর
  • লাইভ কনসার্ট ইন ফ্রান্স (বাজারে আসছে)

পুরস্কার ও অর্জন

[সম্পাদনা]

সঙ্গীতে অবদানের জন্য ফরিদা পারভীন ১৯৮৭ সালে একুশে পদক লাভ করেন।[] অন্ধ প্রেম চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দেওয়ার জন্য ১৯৯৩ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ নারী সঙ্গীত শিল্পী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।[] ২০০৮ সালে তিনি ফুকুওয়াকা এশীয় সাংস্কৃতিক পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনি সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসঅনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কার পেয়েছেন।

পারিবারিক জীবন

[সম্পাদনা]

ফরিদা পারভীন প্রখ্যাত গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পী আবু জাফরকে বিয়ে করেন। তিনি চার সন্তানের জননী। তার মেয়ের নাম জিহান ফারিয়া আর তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলের নাম ইমাম নিমেরি উপল, মেজ ছেলের নাম ইমাম নাহিল সুমন এবং ছোট ছেলের নাম ইমাম নোমানি রাব্বি। আবু জাফরের সাথে তার বিচ্ছেদের পরে তিনি ২০০৫ সালে বাংলাদেশের বিখ্যাত বংশীবাদক গাজী আবদুল হাকিমকে বিয়ে করেন।[]

অসুস্থতা ও মৃত্যু

[সম্পাদনা]

ফরিদা পারভীন ২০২৪ সালে কিডনী সংক্রান্ত জটিলতায় আক্রান্ত হন। ৫ জুলাই ২০২৫ সালে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে রাজধানীর আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে তাকে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। তার সুচিকিৎসার জন্য সরকারের তরফ থেকে ১০ লক্ষ দেয়ার প্রস্তাব করা হলে তার সন্তানেরা আপত্তি করেন।[][] তার অবস্থার উন্নতি হলে ১৩ জুলাই তাকে আইসিইউ থেকে কেবিনে নেওয়া হয়[] এবং ২১ জুলাই তিনি বাড়ি ফেরেন।[১০]

২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর নিয়মিত ডায়ালাইসিসের জন্য তিনি মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান, সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে সেই হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।[১১] ১০ সেপ্টেম্বর তার অবস্থার আরো অবনতি ঘটলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।[১২] ১৩ সেপ্টেম্বর তার অবস্থা সংকটাপন্ন হলে হাসপাতাল থেকে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়।[১৩] সেইদিন তিনি রাত ১০টা ১৫ মিনিটে একই হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।[১৪]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. "বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীনের মৃত্যুতে প্রধান উপদেষ্টার শোক"বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৪ আগস্ট ২০২৫
  2. হোসাইন মোহাম্মদ সাগর (৩১ ডিসেম্বর ২০১৯)। "সঙ্গীত জীবনের সুবর্ণ জয়ন্তীতে ফরিদা পারভীনকে সংবর্ধনা"বাংলা নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। সংগ্রহের তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  3. 1 2 "একুশে পদকপ্রাপ্ত সুধীবৃন্দ ও প্রতিষ্ঠান" (পিডিএফ)সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। পৃ. ১৩। ২২ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে মূল থেকে (পিডিএফ) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২২ এপ্রিল ২০১৯
  4. 1 2 "জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্তদের নামের তালিকা (১৯৭৫-২০১২)"fdc.gov.bdবাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন। ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮
  5. "'খুব তাচ্ছিল্যবশতঃ বলেছিলাম, এসব ফকির-ফাকরার গান আমার ভালো লাগে না'"বিবিসি বাংলা। ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  6. "ফরিদা পারভীনকে দেখতে গেলেন সংস্কৃতি সচিব"দৈনিক সমকাল। ৯ জুলাই ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  7. "ফরিদা পারভীনকে দেখতে হাসপাতালে মির্জা ফখরুল"বাংলাদেশ প্রতিদিন। ৯ জুলাই ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  8. "কণ্ঠশিল্পী ফরিদা পারভীন এখন কেমন আছেন"দ্য ডেইলি স্টার। ১৪ জুলাই ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  9. "বাড়ি ফিরলেন ফরিদা পারভীন"প্রথম আলো। ২২ জুলাই ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  10. "ডায়ালাইসিস শেষে অবনতি, এরপর আইসিইউতে ফরিদা পারভীন"প্রথম আলো। ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  11. "ফরিদা পারভীনের অবস্থার অবনতি, লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হলো"প্রথম আলো। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  12. "ফরিদা পারভীনের অবস্থা সংকটাপন্ন, মেডিকেল বোর্ড গঠন"প্রথম আলো। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  13. "সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীন মারা গেছেন"প্রথম আলো। ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]