অশোক (সম্রাট)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(মহামতি অশোক থেকে পুনর্নির্দেশিত)
অশোক
সম্রাট চক্রবর্তী[১][২]
অমরাবতী হতে প্রাপ্ত সম্রাট অশোকের সম্ভাব্য মূর্তি
রাজত্বকাল খ্রিস্টপূর্ব ২৬৯- খ্রিস্টপূর্ব ২৩২
রাজ্যাভিষেক খ্রিস্টপূর্ব ২৬৯
উপাধি দেবনামপ্রিয়, প্রিয়দর্শী
পূর্বসূরি বিন্দুসার
উত্তরসূরি দশরথ
সঙ্গী অসন্ধিমিত্রা
দেবী
কারুবকী
পদ্মাবতী
তিষ্যরক্ষা
সন্তানাদি মহিন্দ
সংঘমিত্রা
তিবল
কুণাল
চারুমতী
রাজবংশ মৌর্য্য সাম্রাজ্য
পিতা বিন্দুসার
মাতা সুভদ্রাঙ্গী
ধর্মবিশ্বাস বৌদ্ধ ধর্ম

অশোক (সংস্কৃত: अशोक) (৩০৪ খ্রিস্টপূর্ব-২৩২ খ্রিস্টপূর্ব) তৃতীয় মৌর্য্য সম্রাট ছিলেন[৩], যিনি বিন্দুসারের পর ২৭২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিংহাসন লাভ করেন এবং ভারতবর্ষের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই সম্রাট ২৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্য্যন্ত দাক্ষিণাত্যের কিছু অংশ বাদ দিয়ে ভারতবর্ষের অধিকাংশ অঞ্চল শাসন করেন।

জন্ম[সম্পাদনা]

অশোকাবদান গ্রন্থানুসারে, অশোক দ্বিতীয় মৌর্য্য সম্রাট ও তাঁর পত্নী চম্পা শহরের আজীবিক দার্শনিক মতবাদে বিশ্বাসী[৪] ব্রাহ্মণ বংশের নারী সুভদ্রাঙ্গীর পুত্র ছিলেন।[৫] দিব্যাবদান গ্রন্থে অশোকের মাতাকে জনপদকল্যাণী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।[৬][৭]

সিংহাসনলাভ[সম্পাদনা]

দিব্যাবদান গ্রন্থনুসারে অশোক কয়েকজন ষড়যন্ত্রকারী মন্ত্রীদের দ্বারা শুরু করা বিদ্রোহ দমন করেন। বিন্দুসারের রাজত্বকালে অশোক উজ্জয়িনী নগরীর শাসনকর্তা হিসেবে দায়িত্বলাভ করেন।[৭]

২৭২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বিন্দুসারের মৃত্যু হলে উত্তরাধিকারের প্রশ্নে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। বিন্দুসার তাঁর অপর পুত্র সুসীমকে উত্তরাহিকারী হিসেবে চেয়েছিলেন, কিন্তু সুসীমকে উগ্র ও অহঙ্কারী চরিত্রের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে বিন্দুসারের মন্ত্রীরা অশোককে সমর্থন করেন।[৮] রাধাগুপ্ত নামক এক মন্ত্রী অশোকের সিংহাসনলাভের পক্ষে প্রধান সহায়ক হয়ে ওঠেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অশোক শঠতা করে সুসীমকে একটি জ্বলন্ত কয়লা ভর্তি গর্তে ফেলে দিয়ে হত্যা করেন। দীপবংশমহাবংশ গ্রন্থানুসারে, বীতাশোক নামক একজন ভাইকে ছেড়ে অশোক বাকি নিরানব্বইজন ভাইকে হত্যা করেন, কিন্ত এখনো পর্য্যন্ত এই ঘটনার কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ২৬৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পিতার মৃত্যুর তিন বছর পরে অশোক মৌর্য্য সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করেন।

সাম্রাজ্য বিস্তার[সম্পাদনা]

অশোকের রাজত্বকালে মৌর্য্য সাম্রাজ্যের বিস্তার

সিংহাসনে আরোহণ করে অশোক পরবর্তী আট বছর তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করেন। উত্তরে হিন্দুকুশ পর্বতমালা থেকে শুরু করে দাক্ষিণাত্যের কিছু অংশ বাদ দিয়ে সমগ্র ভারতবর্ষ তাঁর করায়ত্ত হয়।[৭] তাঁর রাজত্বকালের অষ্টম বর্ষে তিনি কলিঙ্গ আক্রমণ করেন। এই ভয়াবহ যুদ্ধে প্রায় এক লক্ষ মানুষ নিহত হন এবং দেড় লক্ষ মানুষ নির্বাসিত হন।[৯][১০]

বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা[সম্পাদনা]

বৌদ্ধ গ্রন্থানুসারে, অশোক প্রথম জীবনে একজন বদমেজাজী ও ক্রূর প্রকৃতির ব্যক্তি ছিলেন। কথিত আছে যে, তিনি বন্দীদের ওপর শারীরিক অত্যাচার করার জন্য একটি কক্ষ নির্মাণ করিয়েছিলেন।[১১] তাঁর ক্রূর স্বভাবের জন্য তাঁকে চণ্ড অশোক নামে অভিহিত করা হত। অধ্যাপক চার্লস ড্রেকেমেয়ার অবশ্য বৌদ্ধ প্রবাদগুলিকে অতিশয়োক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তাঁর মতে, কোপণ স্বভাবের অশোক যে বৌদ্ধ ধর্মে প্রভাবিত হয়ে একজন ধার্মিক ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন, সেই বৌদ্ধ ধর্মকে সুমহান হিসেবে দেখানোর উদ্দেশ্যে এই সমস্ত কাহিনীর জন্ম দেওয়া হয়েছিল।[১২]

অশোকের ত্রয়োদশ শিলালিপিতে বর্ণিত হয়েছে যে কলিঙ্গের যুদ্ধে প্রচুর মানুষের মৃত্যু ও তাঁদের আত্মীয় স্বজনদের অপরিসীম কষ্ট লক্ষ্য করে অশোক দুঃখে ও অনুশোচনায় দগ্ধ হন।[১০][১৩][১৪] এই ভয়ানক যুদ্ধের কুফল লক্ষ্য করে যুদ্ধপ্রিয় অশোক একজন শান্তিকামী ও প্রজাদরদী সম্রাট এবং বৌদ্ধ ধর্মের একজন পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হন। অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় শুধুমাত্র মৌর্য্য সাম্রাজ্য নয়, এশিয়ার বিভিন্ন রাজ্যে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারিত হয়।[১৫] তাঁর পুত্র মহিন্দ ও কন্যা সংঘমিত্রা সিংহলে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেন।[১৬]

অশোকাবদান গ্রন্থানুসারে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করার পরেও অশোক হিংসা ত্যাগ করেননি। তিনি পুণ্ড্রবর্ধন অঞ্চলে বসবাসকারী সমস্ত আজীবিক সম্প্রদায়ের মানুষদের হত্যার নির্দেশ দেন, যার ফলে প্রায় ১৮,০০০ মানুষ নিহত হন।[৫][১৭] এছাড়া জৈন ধর্মাবলম্বীদের ওপর তিনি হত্যা করেন বলেও কথিত রয়েছে।[৫][১৭] যদিও ঐতিহাসিকদের মতে, এই ঘটনাগুলির সত্যতা সম্বন্ধে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।[১৮][১৯]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Lars Fogelin (১ এপ্রিল ২০১৫)। An Archaeological History of Indian Buddhism। Oxford University Press। পৃ: 81–। আইএসবিএন 978-0-19-994823-9 
  2. Fred Kleiner (১ জানুয়ারি ২০১৫)। Gardner’s Art through the Ages: A Global History। Cengage Learning। পৃ: 474–। আইএসবিএন 978-1-305-54484-0 
  3. Chandra, Amulya (২০১৫-০৫-১৪)। "Ashoka | biography - emperor of India"। Britannica.com। সংগৃহীত ২০১৫-০৮-০৯ 
  4. Arthur Llewellyn Basham (১৯৫১)। History and doctrines of the Ājīvikas: a vanished Indian religion। foreword by L. D. Barnett (1 সংস্করণ)। London: Luzac। পৃ: 138, 146। সংগৃহীত ৮ এপ্রিল ২০১৩ 
  5. ৫.০ ৫.১ ৫.২ John S. Strong (১৯৮৯)। The Legend of King Aśoka: A Study and Translation of the Aśokāvadāna। Motilal Banarsidass Publ.। পৃ: ২৩২। আইএসবিএন 978-81-208-0616-0। সংগৃহীত ৩০ অক্টোবর ২০১২ 
  6. K. T. S. Sarao (২০০৭)। A text book of the history of Theravāda Buddhism (2 সংস্করণ)। Department of Buddhist Studies, University of Delhi। পৃ: ৮৯। আইএসবিএন 978-81-86700-66-2 
  7. ৭.০ ৭.১ ৭.২ Upinder Singh (২০০৮)। A History of Ancient and Early Medieval India: From the Stone Age to the 12th century। Pearson Education। আইএসবিএন 978-81-317-1677-9 
  8. Gyan Swarup Gupta (১ জানুয়ারি ১৯৯৯)। India: From Indus Valley Civilisation to Mauryas। Concept Publishing Company। পৃ: 268–। আইএসবিএন 978-81-7022-763-2। সংগৃহীত ৩০ অক্টোবর ২০১২ 
  9. Radhakumud Mookerji (1988). Chandragupta Maurya and His Times. Motilal Banarsidass Publ. ISBN 81-208-0405-8.
  10. ১০.০ ১০.১ S. Dhammika, The Edicts of King Ashoka, Kandy, Buddhist Publications Society (1994) ISBN ISBN 955-24-0104-6 (on line)
  11. Pradip Bhattacharya (২০০২)। "The Unknown Ashoka"। Boloji.com। সংগৃহীত ৩০ নভেম্বর ২০১২ 
  12. Charles Drekmeier (১৯৬২)। Kingship and Community in Early India। Stanford University Press। পৃ: 173–। আইএসবিএন 978-0-8047-0114-3। সংগৃহীত ৩০ অক্টোবর ২০১২ 
  13. Smith, Vincent A. (১৯০১)। Asoka - the Buddhist Emperor of IndiaRulers of India series। Oxford at the Clarendon Press। পৃ: ১৩০। 
  14. Kamath, Prabhakar। "How Ashoka the Great Gave Brahmins A Song With Which They Conquered India"। Nirmukta। 
  15. Buckley, Edmund। Universal Religion। The University Association। 
  16. "Ashoka's son took Buddhism outside India"The Times of India 
  17. ১৭.০ ১৭.১ Beni Madhab Barua (৫ মে ২০১০)। The Ajivikas। General Books। পৃ: 68–69। আইএসবিএন 978-1-152-74433-2। সংগৃহীত ৩০ অক্টোবর ২০১২ 
  18. Steven L. Danver (২২ ডিসেম্বর ২০১০)। Popular Controversies in World History: Investigating History's Intriguing Questions: Investigating History's Intriguing Questions। ABC-CLIO। পৃ: ৯৯। আইএসবিএন 978-1-59884-078-0। সংগৃহীত ২৩ মে ২০১৩ 
  19. Le Phuoc (মার্চ ২০১০)। Buddhist Architecture। Grafikol। পৃ: ৩২। আইএসবিএন 978-0-9844043-0-8। সংগৃহীত ২৩ মে ২০১৩ 

আরো পড়ুন[সম্পাদনা]

  • Ahir, D. C. (১৯৯৫)। Aśoka the Great। Delhi: B. R. Publishing। 
  • Bhandarkar, D.R. (১৯৬৯)। Aśoka (4th সংস্করণ)। Calcutta: Calcutta University Press। 
  • Bongard-Levin, G. M. Mauryan India (Stosius Inc/Advent Books Division May 1986) ISBN 0-86590-826-5
  • Chauhan, Gian Chand (2004). Origin and Growth of Feudalism in Early India: From the Mauryas to AD 650. Munshiram Manoharlal, Delhi. ISBN 978-81-215-1028-8
  • Durant, Will (১৯৩৫)। Our Oriental Heritage। New York: Simon and Schuster। 
  • Falk, Harry. Aśokan Sites and Artefacts – A Source-book with Bibliography (Mainz : Philipp von Zabern, [2006]) ISBN 978-3-8053-3712-0
  • Gokhale, Balkrishna Govind (1996). Aśoka Maurya (Twayne Publishers) ISBN 978-0-8290-1735-9
  • Hultzsch, Eugene (1914). The Date of Aśoka, The Journal of the Royal Asiatic Society of Great Britain and Ireland (Oct. 1914), pp. 943–951. Article stable URL.
  • Keay, John. India: A History (Grove Press; 1 Grove Pr edition 10 May 2001) ISBN 0-8021-3797-0
  • Li Rongxi, trans. (1993). The biographical scripture of King Aśoka / transl. from the Chinese of Saṃghapāla, Berkeley, CA: Numata Center for Buddhist Translation and Research, ISBN 0-9625618-4-3.
  • Mookerji, Radhakumud (১৯৬২)। Aśoka (3rd সংস্করণ)। Delhi: Motilal Banarsidas। 
  • Nikam, N. A.; McKeon, Richard (১৯৫৯)। The Edicts of Aśoka। Chicago: University of Chicago Press। 
  • Sastri, K. A. Nilakanta (1967). Age of the Nandas and Mauryas. Reprint: 1996, Motilal Banarsidass, Delhi. ISBN 978-81-208-0466-1
  • Seneviratna, Anuradha (ed.), Gombrich, Richard; Guruge, Ananda (1994). King Aśoka and Buddhism: Historical and Literary studies, Kandy: Sri Lanka; Buddhist Publication Society, 1st edition, ISBN 9552400651
  • Singh, Upinder (2012). "Governing the State and the Self: Political Philosophy and Practice in the Edicts of Aśoka", South Asian Studies, 28:2 (University of Delhi: 2012), pp. 131–145. Article stable URL.
  • Swearer, Donald. Buddhism and Society in Southeast Asia (Chambersburg, Pennsylvania: Anima Books, 1981) ISBN 0-89012-023-4
  • Thapar, Romila. (1973). Aśoka and the decline of the Mauryas. 2nd Edition. Oxford University Press, Reprint, 1980. SBN 19-660379 6.
  • von Hinüber, Oskar. (2010). "Did Hellenistic Kings Send Letters to Aśoka?" Journal of the American Oriental Society, 130:2 (Freiburg: 2010), pp. 261–266.
  • MacPhail, James Merry: "Aśoka", Calcutta: The Associative Press ; London: Oxford University Press 1918 PDF (5.9 MB)
অশোক (সম্রাট)
রাজত্বকাল শিরোনাম
পূর্বসূরী
বিন্দুসার
মৌর্য্য সম্রাট
খ্রিস্টপূর্ব ২৬৯- খ্রিস্টপূর্ব ২৩২
উত্তরসূরী
দশরথ