পরমাণু

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
হিলিয়াম পরমাণু
Helium atom ground state.
An illustration of the helium atom, depicting the nucleus (pink) and the electron cloud distribution (black). The nucleus (upper right) in helium-4 is in reality spherically symmetric and closely resembles the electron cloud, although for more complicated nuclei this is not always the case. The black bar is one angstrom (১০−10মিটার or 100pm).
শ্রেণীবিভাগ
একটি মৌলিক পদার্থের ক্ষুদ্রতম স্বীকৃত বিভাগ
বৈশিষ্ট্য
ভর সীমা: 1.৬৭×১০−27 থেকে 4.৫২×১০−25কেজি
বৈদ্যুতিক আধান: শূন্য (নিরপেক্ষ), বা আয়ন চার্জ
ব্যাস সীমা: ৬২ pm (He) থেকে ৫২০ pm (Cs) (data page)
উপাদান: ইলেকট্রন এবং প্রোটননিউট্রনের একটি নিবিড় নিউক্লিয়াস

পরমাণু (ইংরেজি: Atom) রাসায়নিক মৌলের ক্ষুদ্রতম অংশ যার স্বাধীন অস্তিত্ব নেই (নিস্ক্রিয় গ্যাসের পরমাণু ব্যতিত), কিন্তু রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সরাসরি অংশ গ্রহণ করতে পারে তাকে পরমাণু বলে।

পরমাণু তত্ত্বের ইতিহাস[সম্পাদনা]

ভারতীয় দার্শনিক কণাদ খ্রীস্টের জন্মের ৬০০ বছর আগে পরমাণুর ধারণা দেন। তিনি বলেন সকল পদার্থই ক্ষুদ্র এবং অবিভাজ্য কণিকা দ্বারা তৈরী।পরমাণু তত্ত্ব গ্রিক দার্শনিকেরা পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করে নয়, বরং দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পদার্থের তত্ত্ব নির্মাণের চেষ্টা করেন। এ ধারার প্রথম দার্শনিক ছিলেন মিলেতুসের লেউকিপ্পুস (খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দী)। তাঁর বিখ্যাত শিষ্য আবদেরার দেমোক্রিতুস আনুমানিক ৪৩০ ক্রিস্টাব্দে সমস্ত পদার্থ যেসব অতিক্ষুদ্র অবিভাজ্য কণা দিয়ে গঠিত তাদের নাম দেন আতোমোস (গ্রিক: atomos), যার আক্ষরিক অর্থ “অবিভাজ্য”। দেমোক্রিতুস বিশ্বাস করতেন পরমাণুগুলি সুষম, শক্ত, অসংকোচনীয় ও এগুলি ধ্বংস করা যায় না। তিনি মনে করতেন পরমাণুর আকার, আকৃতি ও বিন্যাস পদার্থের ধর্ম নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন প্রবাহী পদার্থের পরমাণুগুলি মসৃণ তাই সহজেই একে অপরের ওপর দিয়ে গড়িয়ে যায়। কিন্তু কঠিন পদার্থের পরমাণুগুলি খাঁজকাটা ও অমসৃণ তাই এক অপরের সাথে আটকে থাকে। পরমাণু ছাড়া পদার্থের বাকী অংশ কেবলই শূন্যস্থান। দেমোক্রিতুসের দর্শনে পরমাণু শুধু পদার্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের আত্মা ও ইন্দ্রিয়ের ধারণার সাথেও এটি জড়িত। যেমন তিনি মনে করতেন পদার্থের টক স্বাদ সূঁচালো পরমাণুর কারণে আর সাদা রঙ মসৃণ পরমাণুর কারণে সৃষ্টি হয়। মানুষের আত্মার পরমাণুগুলিকে মনে করা হত খুবই মিহি ধরনের। পরবর্তীতে সামোসের এপিকুরুস (৩৪১-২৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) দেমোক্রিতুসের দর্শন ব্যবহার করে প্রাচীন গ্রিকদের কুসংস্কার দূর করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন মহাবিশ্বের সবকিছুই পরমাণু ও শূন্যস্থান নিয়ে গঠিত, তাই গ্রিক দেবতারাও প্রাকৃতিক নিয়মের ঊর্ধ্বে নন। পরবর্তীতে প্লাতো ও আরিস্তোতল দেমোক্রিতুসের দর্শনের বিরোধিতা করেন। প্লাতো এটা মানতে চাননি যে সৌন্দর্য ও মহত্ব বস্তুবাদী পরমাণুর যান্ত্রিক প্রকাশ। আর আরিস্তোতল শূন্যস্থানের ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন কেননা ভিন্ন ভিন্ন বস্তু একই বেগে শূন্যস্থান অতিক্রম করবে এটা তিনি কল্পনা করতে পারেননি। আরিস্তোতলের এই ধারণা মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান ইউরোপে প্রভাব বিস্তার করে। রোমান ক্যাথোলিক পুরোহিতেরা দেমোক্রিতুসের দর্শনকে বস্তুবাদী ও নাস্তিক চিহ্নিত করে প্রত্যাখ্যান করেন।

পরমাণুর গঠন[সম্পাদনা]

আধুনিক রসায়ন এর ভিত্তি বলে পরিচিত ডাল্টনের পরমাণুবাদে পরমাণুকে অবিভাজ্য ধরা হয়েছে। কিন্তু এ তত্ত্ব এখন অচল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে প্রমাণিত হয় যে, পরমাণুকে আর সূক্ষ কণায় বিভক্ত করা যায়। যেসব সূক্ষ কণিকা দ্বারা পরমাণু গঠিত, তাদেরকে মৌলিক কণিকা বলে। এরা হচ্ছে ইলেকট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রন। এ তিনটি কণিকা বিভিন্ন সংখ্যায় একত্রিত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন পরমাণু সৃষ্টি করে। প্রোটন এবং নিউট্রন একত্রিত হয়ে নিউক্লিয়াস গঠন করে।

ইলেকট্রন[সম্পাদনা]

পরমাণুর ক্ষুদ্রতম কণিকা ইলেকট্রন।১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে স্যার জে. জে. থমসন সর্বপ্রথম ইলেকট্রনের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন। একটি ইলেকট্রনের আসল ভর অতি সামান্য 9.1085×10−28g। ইলেকট্রনের আধান -1.6×10−19কুলম্ব। ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের চারদিকে ঘুর্ণায়মান। ইলেকট্রনকে সাধারণত e প্রতীক দ্বারা প্রকাশ করা হয়ে থাকে।

প্রোটন[সম্পাদনা]

প্রোটন ধণাত্মক আধান বিশিষ্ট কণিকা যা নিউক্লিয়াসের মধ্যে থাকে। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে বিজ্ঞানী আর্নেস্ট রাদারফোর্ড প্রোটনের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন।একটি পরমাণুতে ইলেকট্রনের সমান সংখ্যক প্রোটন থাকে। প্রোটনের ভর 1.673×10−24g যা পারমাণবিক ভর স্কেল অনুসারে 1.007276 amu (এখানে amu হল atomic mass unit)। একটি হাইড্রোজেন পরমাণু থেকে একটি ইলেকট্রন সরিয়ে নিলেই প্রোটন পাওয়া যায় তাই একে H+বলা যেতে পারে। একে সাধারণত p দ্বারা প্রকাশ করা হয়ে থাকে।

নিউট্রন[সম্পাদনা]

ইলেকট্রন ও প্রোটনের ন্যায় নিউট্রনও একটি মৌলিক কণিকা তবে এটি আধানবিহীন ।আধানবিহীন(neutral) হওয়ায় এর এই নাম দেয়া হয়েছে। নিউট্রন নিউক্লিয়াসের মধ্যে অবস্থান করে। ১৯৩২ সালে জেমস চ্যাডউইক নিউট্রন আবিস্কার করেন। এর আসল ভর 1.675×10−24g যা পারমাণববিক ভর স্কেল অনুসারে 1.008665 amu। এর ভর ইলেকট্রনের ভরের প্রায় 1839 গুণের সমান। একে সাধারণত n দ্বারা প্রকাশ করা হয়ে থাকে।

পরমাণুবাদ[সম্পাদনা]

রাদারফোর্ড প্রস্তাবিত পরমাণু মডেল
বোর প্রস্তাবিত পরমাণুর মডেল

ডাল্টনের পরমাণুবাদ[সম্পাদনা]

১৮০৩ সালে [১][২] ইংরেজ পদার্থ ও রসায়ন বিজ্ঞানী জন ডাল্টন পরমাণু সম্পর্কে একটি তত্ত্ব প্রকাশ করেন যা ডাল্টনের পরমাণুবাদ নামে পরিচিত। তাঁর প্রদত্ত পরমাণুবাদ পাঁচটি স্বীকার্যে বিভক্ত। এই স্বীকার্য পাঁচটি হলো–

  1. পদার্থ অতি ক্ষুদ্র কণাসমূহ দ্বারা গঠিত, এই কণাগুলোর নাম পরমাণু।
  2. একই পদার্থের পরমাণুসমূহের আকার, ভর এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য একই রকম হয়, ভিন্ন ভিন্ন পদার্থের পরমাণুসমূহের আকার, ভর এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য ভিন্নরকমের হয়।
  3. পরমাণুসমূহ বিভাজিত, সৃষ্টি বা ধ্বংস হতে পারে না।
  4. সরল পূর্ণসংখ্যক অনুপাতে বিভিন্ন পদর্থের পরমাণু সংযুক্ত হয়ে রাসায়নিক যৌগের সৃষ্টি করে।
  5. রাসায়নিক বিক্রয়াসমূহে পরমাণু সংযোজিত, বিভক্ত বা পুনর্বিন্যাসিত হয়।

১৮ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত ডাল্টনের স্বীকার্যসময়হকে বিজ্ঞানীরা মেনে নিয়েছিলেন। কারণ স্বীকার্যসমূহ অস্বীকার করার মতো যথেষ্ঠ তথ্য তাদের ছিল না। ১৮৯৭ সালে[৩] জে জে থমসন ইলেক্ট্রন আবিষ্কার করেন। এর ফলে ডাল্টনের তৃতীয় স্বীকার্যের অংশবিশেষ (পরমাণু বিভাজিত হতে পারে না) ভুল প্রমাণিত হয়।

থমসন পরমাণু মডেল[সম্পাদনা]

১৮৯৮ সাথে বিজ্ঞানী জে জে থমসন এই মডেল প্রস্তাব করেন। এই মডেল অনুসারে পুডিংয়ের ভিতর কিশমিশ যেমন বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকে পরমাণুতে ঠিক তেমনি নিরবচ্ছিন্নভাবে বন্টিত ধনাত্মক আধানের মধ্যে ইলেক্ট্রন ছড়িয়ে আছে।

রাদারফোর্ডের পরমাণুবাদ[সম্পাদনা]

১৯০৯ সালে বিজ্ঞানী আর্নেস্ট রাদারফোর্ড আলফা কণিকা বিক্ষেপণ পরীক্ষা সম্পাদন করেন। পরীক্ষালব্দ্ধ ফলাফল থেকে ১৯১১ সালে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, পরমাণুর কেন্দ্রে ধনাত্মক আধানযুক্ত অত্যন্ত ভারী একটি মূলবস্তু আছে। একে পরবর্তিতে নাম দেওয়া হয় নিউক্লিয়ার্স। পরমাণুর বাকি অংশ জুড়ে রয়েছে ইলেক্ট্রন আর ইলেক্ট্রনগুলো নিউক্লিয়ার্সকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।

নীল্‌স বোরের পরমাণুবাদ[সম্পাদনা]

১৯১৩ সালে ডেনমার্কের পদার্থবিজ্ঞানী নীলস বোর তাঁর পরমাণু মডেলের জন্য দুটি প্রস্তাব রাখেন যা বোরের স্বীকার্য নামে পরিচিত।

  • স্থায়ী অবস্থা স্বীকার্য (Postulates of Stationary States)
  • কম্পাঙ্ক স্বীকার্য (Postulates of Frequency)

পরমাণুতে ইলেকট্রন বিন্যাস[সম্পাদনা]

কোন পরমাণুর নির্দিষ্ট সংখ্যক ইলেক্ট্রন ঐ পরমাণুর বিভিন্ন শক্তিস্তরের অন্তর্ভুক্ত নির্দিষ্ট উপশক্তিস্তরের বিভিন্ন অরবিটালে নির্দিষ্ট নিয়মে সজ্জিত থাকে, ইলেক্ট্রনের এই সজ্জাকে পরমাণুর ইলেক্ট্রন বিন্যাস বলে। ইলেক্ট্রন বিন্যাস পলির বর্জন নীতি, আউফবাউ নীতি ও হুন্ডের নিয়ম দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়।

পলির বর্জন নীতি[সম্পাদনা]

একটি পরামাণুতে দুটি ইলেক্ট্রনের চারটি কোয়ান্টাম সংখ্যার মান কখনও একই হতে পারে না। অন্ততপক্ষে একটির মান দুটি ইলেক্ট্রনের বেলায় ভিন্ন হতে হয়।

আউফবাউ নীতি[সম্পাদনা]

পরমাণুতে ইলেক্ট্রনসমূহ বিভিন্ন শক্তিস্তর দখলের সময় প্রথমে সবচেয়ে কম শক্তিসম্পন্ন স্তরে অবস্থান গ্রহণ করবে, নিম্ন শক্তিস্তর পূর্ণ হওয়ার পর পরবর্তী অপেক্ষাকৃত উচ্চতর শক্তি সম্পন্ন স্তরে গমন করবে।

হুন্ডের সূত্র[সম্পাদনা]

একই শক্তি সম্পন্ন বিভিন্ন অরবিটালে ইলেক্ট্রনসমূহ এমনভাবে প্রবেশ করে যেন তারা সর্বাধিক পরিমাণে অযুগ্ম বা বিজোড় অবস্থায় থাকতে পারে, এ অযুগ্ম ইলেক্ট্রনসমূহের স্পিন বা ঘূর্ণন একইমুখী হবে। এখানে একই শক্তি সম্পন্ন বিভিন্ন অরবিটাল বলতে ৩টি p অরবিটাল, ৫টি d অরবিটাল ও ৭টি f অরবিটালকে বোঝানো হয়েছে। উল্লেখ্য যে s অর্বিটালের জন্য হুন্ডের সূত্র প্রজোয্য নয়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Dalton's Law। "John Dalton Biography"www.biography.com 
  2. "John Dalton’s Atomic Model"www.universetoday.com 
  3. J.J. Thomson (1897) "Cathode Rays", The Electrician 39, 104

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

  • Francis, Eden (২০০২)। "Atomic Size"। Clackamas Community College। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৭-এ মূল থেকে আর্কাইভ। সংগৃহীত ২০০৭-০১-০৯ 
  • Freudenrich, Craig C.। "How Atoms Work"। How Stuff Works। ৮ জানুয়ারি ২০০৭-এ মূল থেকে আর্কাইভ। সংগৃহীত ২০০৭-০১-০৯ 
  • "The Atom"Free High School Science Texts: Physics। Wikibooks। সংগৃহীত ২০১০-০৭-১০ 
  • Anonymous (২০০৭)। "The atom"। Science aid+। সংগৃহীত ২০১০-০৭-১০ —a guide to the atom for teens.
  • Anonymous (২০০৬-০১-০৩)। "Atoms and Atomic Structure"। BBC। ২ জানুয়ারি ২০০৭-এ মূল থেকে আর্কাইভ। সংগৃহীত ২০০৭-০১-১১ 
  • Various (২০০৬-০১-০৩)। "Physics 2000, Table of Contents"। University of Colorado। ১৪ জানুয়ারি ২০০৮-এ মূল থেকে আর্কাইভ। সংগৃহীত ২০০৮-০১-১১ 
  • Various (২০০৬-০২-০৩)। "What does an atom look like?"। University of Karlsruhe। সংগৃহীত ২০০৮-০৫-১২ 

টেমপ্লেট:Composition