সালাউদ্দিন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সালাহউদ্দিন আইয়ুবী
মিশর ও সিরিয়ার সুলতান
সালাহউদ্দিনের শৈল্পিক চিত্রকর্ম।
রাজত্বকাল ১১৭৪-১১৯৩
রাজ্যাভিষেক ১১৭৪, কায়রো
পূর্ণ নাম সালাহউদ্দিন ইউসুফ ইবনে আইয়ুব
জন্ম ৫৩২ হিজরি (১১৩৮ খ্রিষ্টাব্দ)
জন্মস্থান তিকরিত, মসুল আমিরাত
মৃত্যু ৪ মার্চ ১১৯৩ (৫৫ বছর)
মৃত্যুস্থান দামেস্ক, সিরিয়া
সমাধিস্থল উমাইয়া মসজিদ, দামেস্ক, সিরিয়া
পূর্বসূরি নুরউদ্দিন জেনগি
উত্তরসূরি আল আফদাল (সিরিয়া)
আল আজিজ উসমান (মিশর)
স্বামী/স্ত্রী সাথে ইসমতউদ্দিন খাতুন
রাজবংশ আইয়ুবী
পিতা নাজমুদ্দিন আইয়ুবী
ধর্মবিশ্বাস সুন্নি মুসলিম আশারি[১][২][৩]

সালাহউদ্দিন ইউসুফ ইবনে আইয়ুব (কুর্দি: سەلاحەدینی ئەییووبی/Selahedînê Eyûbî; আরবি: لاح الدين يوسف بن أيوب‎) (১১৩৭/১১৩৮ – ৪ মার্চ ১১৯৩) ছিলেন মিশরসিরিয়ার প্রথম সুলতান এবং আইয়ুবীয় রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। পাশ্চাত্যে তিনি সালাদিন বলে পরিচিত। তিনি কুর্দি জাতিগোষ্ঠীর লোক ছিলেন।[৪][৫][৬] লেভান্টে ইউরোপীয় ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে তিনি মুসলিম প্রতিরোধের নেতৃত্ব দেন। ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে তার সালতানাতে মিশর, সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া, হেজাজ, ইয়েমেন এবং উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল।

১১৬৩ সালে তার জেনগি বংশীয় ঊর্ধ্বতন নুরউদ্দিন জেনগি তাকে ফাতেমীয় মিশরে প্রেরণ করেন। ক্রুসেডারদের আক্রমণের বিরুদ্ধে সামরিক সাফল্যের মাধ্যমে সালাহউদ্দিন ফাতেমীয় সরকারের উচ্চপদে পৌছান। ফাতেমীয় খলিফা আল আদিদের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ১১৬৯ সালে তার চাচা শিরকুহ মৃত্যুবরণ করলে আল আদিদ সালাহউদ্দিনকে তার উজির নিয়োগ দেন। শিয়া নেতৃত্বাধীন খিলাফতে সুন্নি মুসলিমদের এমন পদ দেয়া বিরল ঘটনা ছিল। উজির থাকাকালে তিনি ফাতেমীয় শাসনের প্রতি বিরূপ ছিলেন। আল আদিদের মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং বাগদাদের আব্বাসীয় খিলাফতের আনুগত্য ঘোষণা করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি ফিলিস্তিনে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালান, ইয়েমেনে সফল বিজয় অভিযানের আদেশ দেন এবং উচ্চ মিশরে ফাতেমীয়পন্থি বিদ্রোহ উৎখাত করেন।

১১৭৪ সালে নুরউদ্দিনের মৃত্যুর অল্পকাল পরে সালাহউদ্দিন সিরিয়া বিজয়ে ব্যক্তিগতভাবে নেতৃত্ব দেন। দামেস্কের শাসকের অনুরোধে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে শহরে প্রবেশ করেন। ১১৭৫ সালের মধ্যভাগে তিনি হামাহোমস জয় করেন। জেনগি নেতারা তার বিরোধী হয়ে পড়ে। সরকারিভাবে তারা সিরিয়ার শাসক ছিল। এরপর শীঘ্রই তিনি জেনগি সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন এবং আব্বাসীয় খলিফা আল মুসতাদি কর্তৃক মিশর ও সিরিয়ার সুলতান ঘোষিত হন। উত্তর সিরিয়া ও জাজিরায় তিনি আরও অভিযান চালান। এসময় হাশাশিনদের দুটি হত্যাচেষ্টা থেকে তিনি বেঁচে যান। ১১৭৭ সালে তিনি মিশরে ফিরে আসেন। ১১৮২ সালে আলেপ্পো জয়ের মাধ্যমে সালাহউদ্দিন সিরিয়া জয় সমাপ্ত করেন। তবে জেনগিদের মসুলের শক্তঘাটি দখলে সমর্থ হননি।

সালাহউদ্দিনের ব্যক্তিগত নেতৃত্বে আইয়ুবী সেনারা ১১৮৭ সালে হাত্তিনের যুদ্ধে ক্রুসেডারদের পরাজিত করে। এর ফলে মুসলিমদের জন্য ক্রুসেডারদের কাছ থেকে ফিলিস্তিন জয় করা সহজ হয়ে যায়। এর ৮৮ বছর আগে ক্রুসেডাররা ফিলিস্তিন দখল করে নেয়। ক্রুসেডার ফিলিস্তিন রাজ্য এরপর কিছুকাল বজায় থাকলেও হাত্তিনের পরাজয় এই অঞ্চলে মুসলিমদের সাথে ক্রুসেডার সংঘাতের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মুসলিম, আরব, তুর্কি ও কুর্দি সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।[৭] ১১৯৩ সালে তিনি দামেস্কে মৃত্যুবরণ করেন। তার অধিকাংশ সম্পদ তিনি তার প্রজাদের দান করে যান। উমাইয়া মসজিদের পাশে তাকে দাফন করা হয়। সেখানে তার মাজার অবস্থিত।

প্রথম জীবন[সম্পাদনা]

সালাহউদ্দিন আইয়ুবী মেসোপটেমিয়াতিকরিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার ব্যক্তিগত নাম ইউসুফ, সালাহউদ্দিন হল লকব যার অর্থ “বিশ্বাসের ন্যায়পরায়ণ”।[৮] তার পরিবার কুর্দি বংশোদ্ভূত[৪] এবং মধ্যযুগীয় আর্মেনিয়ার ডিভিন শহর থেকে আগত।[৯][১০] নুরউদ্দিন জেনগি ছিলেন তার নানা। এসময় তার নিজ রাওয়াদিদ গোত্র আরবিভাষী বিশ্বের অংশ হয়ে যায়।[১১] ১১৩২ সালে মসুলের শাসক ইমাদউদ্দিন জেনগির পরাজিত সেনাবাহিনী পিছু হটার সময় টাইগ্রিসের দিকে বাধাপ্রাপ্ত হয়। এসময় সালাহউদ্দিনের পিতা নাজমুদ্দিন আইয়ুব এখানকার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। তিনি সেনাদের জন্য ফেরির ব্যবস্থা করেন এবং তাদের তিকরিতে আশ্রয় দেন। মুজাহিদউদ্দিন বিহরুজ নামক একজন প্রাক্তন গ্রীক দাস এসময় উত্তর মেসোপটেমিয়ায় সেলজুক পক্ষের সামরিক গভর্নর ছিলেন। তিনি জেনগিদের সাহায্য করার জন্য আইয়ুবের বিরোধী হন। ১১৩৭ সালে আইয়ুবের ভাই আসাদউদ্দিন শিরকুহ বিহরুজের এক বন্ধুকে সম্মান রক্ষার লড়াইয়ে হত্যা করার পর তাকে তিকরিত থেকে বিতাড়িত করেন। বাহাউদ্দিন ইবনে শাদ্দাদের মতে যে রাতে সালাহউদ্দিনের পরিবার তিকরিত ত্যাগ করে সে রাতেই তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১১৩৯ সালে আইয়ুব ও তার পরিবার মসুলে চলে আসেন। এখনে ইমাদউদ্দিন জেনগি তাদের পূর্ব অবদান স্বীকার করে আইয়ুবকে বালবিকের দুর্গের কমান্ডার নিয়োগ দেন। ১১৪৬ সালে ইমাদউদ্দিনের মৃত্যুর পর তার পুত্র নুরউদ্দিন জেনগি আলেপ্পোর অভিভাবক এবং জেনগি রাজবংশের নেতা হন।[১২]

এসময় সালাহউদ্দিন দামেস্কে বসবাস করছিলেন। বলা হয় যে তিনি এই শহরের প্রতি দুর্বল ছিলেন। তবে তার অল্প বয়সের তথ্য বেশি পাওয়া যায় না। শিক্ষা সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “বড়রা যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছেন সেভাবে শিশুদের গড়ে তোলা হয়”। তার একজন জীবনীকার আল ওয়াহরানির মতে সালাহউদ্দিন ইউক্লিড, আলমাজেস্ট, পাটিগণিত ও আইন সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতেন।[১২] কিছু সূত্র মতে ছাত্রাবস্থায় তিনি সামরিক বাহিনীর চেয়ে ধর্মীয় বিষয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন।[১৩] ধর্মীয় বিষয়ে তার আগ্রহে প্রভাব ফেলা আরেকটি বিষয় হল প্রথম ক্রুসেডের সময় খ্রিষ্টানদের কর্তৃক জেরুজালেম অধিকার।[১৩] ইসলাম ছাড়াও বংশবৃত্তান্ত, জীবনী এবং আরবের ইতিহাস ও পাশাপাশি আরব ঘোড়ার রক্তধারা সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল। আবু তামামের রচিত হামাশ তার সম্পূর্ণ জানা ছিল।[১২] তিনি কুর্দি এবং তুর্কি ভাষায় কথা বলতে পারতেন।[১৪]

প্রাথমিক অভিযান[সম্পাদনা]

চাচা আসাদউদ্দিন শিরকুহর তত্ত্বাবধানে সালাহউদ্দিনের সামরিক কর্মজীবন শুরু হয়। শিরকুহ এসময় দামেস্কআলেপ্পোর আমির নুরউদ্দিন জেনগির একজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কমান্ডার ছিলেন। ১১৬৩ সালে ফাতেমীয় খলিফা আল আদিদের উজির শাওয়ার শক্তিশালী বনু রুজাইক গোত্রের দিরগাম নামক ব্যক্তি দ্বারা মিশর থেকে বিতাড়িত হন। তিনি নুরউদ্দিনের কাছে সামরিক সহযোগিতা চাইলে নুরউদ্দিন তা প্রদান করেন। তিনি ১১৬৪ সালে দিরগামের বিরুদ্ধে শাওয়ারের অভিযানে সহায়তার জন্য শিরকুহকে পাঠান। ২৬ বছরের সালাহউদ্দিন এসময় তার সাথে যান।[১৫] শাওয়ার পুনরায় উজির হওয়ার পর তিনি শিরকুহকে মিশর থেকে তার সেনা সরিয়ে নিতে বলেন। কিন্তু শিরকুহ তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন যে নুরউদ্দিনের ইচ্ছা যে তারা মিশরে অবস্থান করবেন। এ অভিযানে সালাহউদ্দিনের ভূমিকা অল্প ছিল।[১৬]

বিলবাইসের পর ক্রুসেডার-মিশরীয় বাহিনী এবং শিরকুহর বাহিনী গাজার পশ্চিমে নীল নদের সন্নিকটে মরু সীমান্তে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। সালাহউদ্দিন এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এতে তিনি জেনগি সেনাবাহিনীর দক্ষিণভাগের নেতৃত্ব দেন। কুর্দিদের একটি দল এসময় বাম পাশের দায়িত্বে ছিল। শিরকুহ ছিলেন মধ্য ভাগের অবস্থানে। প্রথমদিকে ক্রুসেডাররা সাফল্য লাভ করলেও অঞ্চলটি তাদের ঘোড়ার জন্য উপযুক্ত ছিল না। কায়সারিয়ার কমান্ডার হিউ সালাহউদ্দিনের দলকে আক্রমণের সময় গ্রেপ্তার হন। মূল অবস্থানের দক্ষিণ প্রান্তের ছোট উপত্যকায় লড়াইয়ের পর জেনগিদের কেন্দ্রীয় শক্তি আগ্রাসী অবস্থানে চলে আসে। সালাহউদ্দিন পিছন থেকে তাদের সাথে যুক্ত হন।[১৭]

এ যুদ্ধে জেনগিরা বিজয়ী হয়। ইবনে আল আসিরের মতে সালাহউদ্দিন শিরকুহকে লিখিত ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় বিজয়ে সাহায্য করেন। তবে এতে শিরকুহর অধিকাংশ লোক মারা যায় এবং কিছু সূত্র মতে এই যুদ্ধ সামগ্রিক জয় ছিল না। সালাহউদ্দিন ও শিরকুহ আলেক্সান্দ্রিয়ার দিকে যাত্রা করেন। সেখানে তাদের অভ্যর্থনা জানান হয় এবং অর্থ, অস্ত্র প্রদান ও শিবির স্থাপন করতে দেয়া হয়।[১৮] শহর অধিকার করতে এগিয়ে আসা একটি শক্তিশালী ক্রুসেডার-মিশরীয় দলকে প্রতিহত করার জন্য শিরকুহ তার সেনাবাহিনীকে বিভক্ত করেন। তিনি ও তার অধীন সেনারা আলেক্সান্দ্রিয়া থেকে অন্যত্র যাত্রা করেন এবং সালাহউদ্দিন ও তার অধীনস্ত সেনারা শহর রক্ষার জন্য থেকে যান।[১৯]

মিশরে সালাহউদ্দিন[সম্পাদনা]

মিশরের আমির[সম্পাদনা]

মিশরে সালাহউদ্দিনের যুদ্ধ

শিরকুহ মিশরে শাওয়ার ও প্রথম আমালরিকের সাথে ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন। এতে শাওয়ার আমালরিকের সহায়তা চান। বলা হয় যে ১১৬৯ সালে শাওয়ার সালাহউদ্দিন কর্তৃক নিহত হন। এরপরের বছর শিরকুহ মৃত্যুবরণ করেন।[২০] নুরউদ্দিন শিরকুহর জন্য উত্তরাধিকারী বাছাই করেন। কিন্তু আল আদিদ সালাহউদ্দিনকে শাওয়ারের স্থলে উজির নিয়োগ দেন।[২১]

শিয়া খলিফার অধীনে একজন সুন্নিকে উজির মনোনীত করার কারণ নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। ইবনে আল আসিরের দাবি করেছেন যে খলিফার উপদেষ্টারা “সালাহউদ্দিনের চেয়ে ছোট বা দুর্বল কেউ নেই” এবং “একজন আমিরও তার আনুগত্য বা তার অধীনতা মানে না” এমন পরামর্শ দেয়ার কারণে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়। এ মতানুযায়ী কিছু মতবিরোধের পর অধিকাংশ আমির তাকে মেনে নেন। আল আদিদের উপদেষ্টারা সিরিয়া ভিত্তিক জেনগি ধারাকে ভেঙে দেয়ার উদ্দেশ্য পোষণ করছিলেন। আল ওয়াহরানি লিখেছেন যে সালাহউদ্দিনের পরিবারের সুনাম ও তার সামরিক দক্ষতার জন্য তাকে নিয়োগ দেয়া হয়। ইমাদউদ্দিন আল ইসফাহানির লিখেছেন যে শিরকুহর জন্য সংক্ষিপ্তকালের শোকের পর জেনগি আমিররা সালাহউদ্দিনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন এবং তাকে উজির হিসেবে নিয়োগ দেয়ার জন্য খলিফাকে চাপ দেন। যদিও বিদ্রোহী মুসলিম নেতাদের কারণে অবস্থা জটিল ছিল, বেশ কিছু সিরিয়ান শাসক মিশরীয় অভিযানে অবদানের জন্য সালাহউদ্দিনকে সমর্থন করেন।[২২]

আমির হওয়ার পর তিনি প্রভুত ক্ষমতা ও স্বাধীনতা অর্জন করলেও পূর্বের চেয়েও বেশি পরিমাণে আল আদিদ ও নুরউদ্দিনের মধ্যে আনুগত্যের প্রশ্নের সম্মুখীণ হয়। সে বছরের পরবর্তীতে মিশরীয় সেনাদের একটি দল ও তার আমিররা সালাহউদ্দিনকে হত্যার চেষ্টা চালায়। কিন্তু তার প্রধান গোয়েন্দা আলি বিন সাফওয়ানের গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে তা প্রকাশ পেয়ে যায়। ষড়যন্ত্রকারী নাজি, ফাতেমীয় প্রাসাদের বেসামরিক নিয়ন্ত্রণকর্তা মুতামিন আল খিলাফাকে গ্রেপ্তার ও হত্যা করা হয়। এরপরের দিন ফাতেমীয় সেনাবাহিনীর রেজিমেন্টের ৫০,০০০ কালো আফ্রিকান সেনা সালাহউদ্দিনের শাসনের বিরুদ্ধে বেশ কিছু মিশরীয় আমিরের সাথে বিরোধীতা করে এবন বিদ্রোহে করে। ২৩ আগস্ট সালাহউদ্দিন এই উত্থান বিনাশ করেন এবং এরপর কায়রো থেকে কোনো সামরিক হুমকি আসেনি।[২৩]

১১৬৯ সালের শেষের দিকে নুরউদ্দিনের পাঠানো সাহায্যের মাধ্যমে দামিয়াতের কাছে বৃহৎ ক্রুসেডার-বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন। এরপর ১১৭০ সালের বসন্তে নুরউদ্দিন সালাহউদ্দিনের পিতাকে সালাহউদ্দিনের অনুরোধে এবং বাগদাদের খলিফা আল মুসতানজিদের অনুপ্রেরণায় মিশরে পাঠান। আল মুসতানজিদ প্রতিপক্ষ খলিফা আল আদিদকে উৎখাত করতে মনস্থির করেন।[২৪] সালাহউদ্দিন মিশরে তার অবস্থান শক্ত করেন এবং সমর্থন ঘাটি বিস্তৃত করেন। তিনি এই অঞ্চলে তার পরিবারের সদস্যদের উচ্চপদ প্রদান করেন। মালিকি মাজহাবের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে তিনি আদেশ দেন। সেসাথে শাফি মাজহাবের জন্যও প্রতিষ্ঠান তৈরী করা হয়।[২৫]

মিশরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পর সালাহউদ্দিন ১১৭০ সালে দারুম অবরোধের মাধ্যমে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন।[২৬] আমালরিক গাজা থেকে তার টেম্পলার গেরিসন সরিয়ে নেন যাতে দারুম রক্ষা করতে সহায়তা পাওয়া যায়। কিন্তু সালাহউদ্দিন তার সেনাদের সরিয়ে নেন এবং গাজায় এগিয়ে আসেন। শহরের দুর্গের বাইরের অঞ্চল ধ্বংস করে দেয়া হয়। দুর্গে প্রবেশ করতে না চাওয়ায় অধিবাসীদের অধিকাংশকে হত্যা করা হয়।[২৭] সে বছরের ঠিক কবে এলিয়াতের ক্রুসেডার দুর্গ তিনি কবে আক্রমণ ও অধিকার করেন তা স্পষ্ট নয়। এটি আকাবা উপসাগরের একটি দ্বীপের উপর অবস্থিত ছিল। এটি মুসলিম নৌবাহিনীর যাতায়াতে হুমকি ছিল না। কিন্তু ক্ষুদ্র মুসলিম নৌবহরকে তা ব্যতিব্যস্ত করে রাখে ফলে সালাহউদ্দিন এটি দখল করেন।[২৬]

মিশরের সুলতান[সম্পাদনা]

দিরহাম মুদ্রায় উৎকীর্ণ সালাহউদিন, আনুমানিক ১১৯০ সাল

ইমাদউদ্দিনের মতে ১১৭১ সালের জুন মাসে নুরউদ্দিন সালাহউদ্দিনকে মিশরে আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠার কথা বলে চিঠি লেখেন। দুই মাস পর শাফি ফকিহ নাজমুদ্দিন আল খাবুশানির উৎসাহে সালাহউদ্দিন তা সম্পন্ন করেন। ফকিহ নাজমুদ্দিন শিয়া শাসনের বিরোধী ছিলেন। কয়েকজন মিশরীয় আমির এর ফলে নিহত হন। আল আদিদকে বলা হয় যে তাদেরকে বিদ্রোহের কারণে হত্যা করা হয়েছে। এরপর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। একটি সূত্র মতে তাকে বিষপ্রয়োগ করা হয়। অসুস্থ অবস্থায় তিনি তার সাথে দেখা করার জন্য সালাহউদ্দিনকে জানান যাতে তার সন্তানদের দেখাশোনার অনুরোধ করতে পারেন। সালাহউদ্দিন তা প্রত্যাখ্যান করেন এই আশংকায় যে এটি আব্বাসীয়দের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হবে। কিন্তু আল আদিদ কী চাইছিলেন তা জানার পর তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।[২৮] পাঁচ দিন পর ১৩ সেপ্টেম্বর আল আদিদ মৃত্যুবরণ করেন। কায়রোফুসতাতে আব্বাসীয় খলিফার নামে খুতবা পাঠ করা হয় এবং আল মুসতাদিকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।[২৯]

২৫ সেপ্টেম্বর সালাহউদ্দিন জেরুজালেম রাজ্যের মরু দুর্গ কেরাকমন্ট্রিয়ালের উদ্দেশ্যে কায়রো ত্যাগ করেন। সিরিয়ার দিক থেকে এসময় নুরউদ্দিনের আক্রমণ করার কথা ছিল। তার অনুপস্থিতিতে মিশরের ভেতরে ক্রুসেডার নেতারা ভেতর থেকে আক্রমণ করার জন্য বিশ্বাসঘাতকদের মধ্যে সমর্থন বৃদ্ধি করছে এবং বিশেষত ফাতেমীয়রা তার ক্ষমতা খর্ব করে পূর্বাবস্থা ফিরিয়ে আনতে চায় এমন সংবাদ পাওয়ার পর মন্ট্রিয়াল পৌছার পূর্বে সালাহউদ্দিন কায়রোতে ফিরে আসেন। এর ফলে নুরউদ্দিন একা হয়ে পড়েন।[৩০]

১১৭৩ সালের গ্রীষ্মে একটি নুবিয়ান সেনাবাহিনী আসওয়ান অবরোধের জন্য আর্মেনীয় উদ্বাস্তুসহ এগিয়ে আসে। শহরটির আমির সালাহউদ্দিনের সহায়তা চান এবং সালাহউদ্দিনের ভাই তুরান শাহর অধীনে তাদের সাহায্য পাঠানো হয়। এরপর নুবিয়ানরা চলে যায় কিন্তু ১১৭৩ সালে আবার ফিরে আসে তবে আবার তাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়। এসময় মিশরীয় সেনারা আসওয়ান থেকে অগ্রসর হয় এবং নুবিয়ার শহর ইবরিম অধিকার করে। সালাহউদ্দিন তার শিক্ষক ও বন্ধু নুরউদ্দিনকে ৬০,০০০ দিনার, চমৎকার প্রণ্য, কিছু রত্ন, উৎকৃষ্ট জাতের গাধা এবং একটি হাতি উপহার হিসেবে পাঠান। এসব দামেস্কে পাঠানর সময় সালাহউদ্দিন ক্রুসেডার এলাকা আক্রমণের সুযোগ পান। তিনি মরুভূমির দুর্গের উপর আক্রমণ চালাননি। কিন্তু ক্রুসেডার অঞ্চলে বসবাসরত মুসলিম বেদুইনদের সেখান থেকে সরিয়ে আনেন যাতে ফ্রাঙ্করা গাইড থেকে বঞ্চিত হয়।[৩১]

১১৭৩ সালের ৩১ জুলাই সালাহউদ্দিনের পিতা একটি ঘোড়া দুর্ঘটনায় আহত হন। ৯ আগস্ট তিনি মারা যান।[৩২] ১১৭৪ সালে সালাহউদ্দিন তুরান শাহকে ইয়েমেন জয় ও এর এডেন বন্দর আইয়ুবী শাসনের অন্তর্গত করার জন্য পাঠান।

সিরিয়া অধিকার[সম্পাদনা]

দামেস্ক জয়[সম্পাদনা]

১১৭৪ সালের মার্চে নুরউদ্দিন একটি ভূমিকম্পের পর বাগদাদে ফিরে আসেন। অনেক ঐতিহাসিকের মতে এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্প। নুরউদ্দিন শাসক হিসেবে বিপর্যয়ের খবর শোনার পর ফিরে আসেন। তার কিছু শত্রু তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিতে থাকে যার তার ফিরে আসায় প্রভাব ফেলেছে। পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে তার সমস্ত মনোযোগ জনগণের উপর ছিল যার ফলে তিনি বিশ্বাসঘাতক ও হাসান সাহাবর দল যাদেরকে ক্রুসেডাররা সমর্থন করত তাদের কাছ থেকে তার প্রতি হুমকির কথা উপেক্ষা করেন। ১১৭৪ সালের এপ্রিলের শেষের দিকে বিষপ্রয়োগের ফলে গলায় ব্যথা অনুভব করার পর থেকে সমস্যার প্রথম সূত্র পাওয়া যায়। তার চিকিৎসকদের অনেক প্রচেষ্টার পর নুরউদ্দিন ১১৭৪ সালের ১৫ মে মৃত্যুবরণ করেন। কিছু শক্তিশালী অভিজাত ব্যক্তির দল নুরউদ্দিনের ক্ষমতা তার এগারো বছর বয়সী পুত্র আস সালিহ ইসমাইল আল মালিকের উপর অর্পণ করেন। তার মৃত্যুর ফলে সালাহউদ্দিন ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে তার শক্তিশালী মিত্র হারিয়ে ফেলেন। সালিহর কাছে লেখা চিঠিতে তিনি জানান যে তিনি তার শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন এমনকি তারা যদি মুসলিম দাবিও করে যদিনা তিনি ও তার সমর্থকরা নুরউদ্দিনের নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে ক্রুসেডারদের সাথে মিত্রতা থেকে বিরত থাকেন।

নুরউদ্দিনের মৃত্যুর পর সালাহউদ্দিন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন। তিনি মিশর থেকে ক্রুসেডারদের উপর আক্রমণ করতে পারতেন অথবা সিরিয়ায় সালিহর কাছ থেকে আমন্ত্রণ লাভ করার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারতেন। এছাড়াও বিদ্রোহীদের হাতে পড়ার আগেই তিনি সিরিয়াকে তার শাসনের অংশে পরিণত করতে পারতেন। কিন্তু ইতিপূর্বে তার প্রভুর অধীন ছিল অঞ্চলে হামলা করলে তা তার অনুসৃত ইসলামি বিধানের লঙ্ঘন হতে পারে এবং এই ঘটনা তাকে একজন প্রতারক হিসেবে তুলে ধরতে পারে যা ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাধা তৈরি করবে এমন আশংকা করেন। তিনি দেখতে পান যে সিরিয়া অধিকার করার জন্য তাকে হয় সালিহর কাছ থেকে আমন্ত্রণ পেতে হবে বা তাকে সাবধান করতে হবে যে ক্রমবর্ধমান নৈরাজ্য ক্রুসেডারদের তরফ থেকে হামলার আশংকা তৈরী করবে।[৩৩]

সালিহ যখন আগস্টে আলেপ্পোতে চলে যান তখন শহরের আমির ও নুরউদ্দিনের দক্ষ সেনাদের প্রধান গুমুশতিগিন তার উপর অভিভাবকত্ব দাবি করেন। তিনি দামেস্ক থেকে শুরু করে সিরিয়া ও জাজিরাতে তার সকল বিরোধীকে পদচ্যুত করার প্রস্তুতি নেন। এই জরুরি অবস্থায় দামেস্কের আমির মসুলের দ্বিতীয় সাইফউদ্দিন গাজিকে সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠান। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এর ফলে সালাহউদ্দিনের কাছে সাহায্য চাওয়া হয় এবং তিনি তা প্রদান করেন।[৩৪][৩৫] সালাহউদ্দিন ৭০০ বর্শাধারী ঘোড়সওয়ার নিয়ে যাত্রা করেন। কেরাক পার হয়ে তিনি বুসরা পৌছান। তার বর্ণনা অনুযায়ী “এখানে আমির, সৈনিক ও বেদুইনরা তার সাথে যোগ দেয় এবং তাদের অন্তরের অনুভূতি তাদের চেহারায় ফুটে উঠে।“ ২৩ নভেম্বর তিনি দামেস্কে ফিরে আসেন। দামেস্কের দুর্গে প্রবেশের আগ পর্যন্ত তিনি তার পিতার পুরনো বাসগৃহে অবস্থান নেন। চারদিন পর দুর্গ উন্মুক্ত হয়। তিনি এরপর দুর্গে অবস্থান নেন এবং নাগরিক আতিথেয়তা গ্রহণ করেন।[৩৪]

পরবর্তী অভিযান[সম্পাদনা]

উনিশ শতকে অঙ্কিত বিজয়ী সালাহউদ্দিনের ছবি, শিল্পী গুস্তাভ ডোরে

ভাই তুগতিগিনকে দামেস্কের গভর্নর হিসেবে রেখে সালাহউদ্দিন পূর্বে নুরউদ্দিনের অধিকারে থাকা আংশিক স্বাধীন শহরসমূহের দিকে রওনা দেন। তার সেনাবাহিনী হামা সহজে দখল করে নেয়। তবে তারা দুর্গের ক্ষমতার জন্য হোমস আক্রমণ এড়িয়ে যান।[৩৬] সালাহউদ্দিন উত্তরে আলেপ্পোর দিকে যাত্রা করেন। গুমুশতিগিন ক্ষমতাত্যাগে অস্বীকৃতি জানালে ৩০ ডিসেম্বর তা অবরোধ করা হয়।[৩৭] সালাহউদ্দিনের কাছে বন্দী হতে পারে ভেবে সালিহ প্রাসাদের বাইরে এসে অধিবাসীদের কাছে আবেদন জানায় যাতে তারা আত্মসমর্পণ না করে। সালাহউদ্দিনের একজন বর্ণনা লেখকের মতানুযায়ী "জনতা তার কথার জাদুতে চলে আসে।"[৩৮]

সেসময় সিরিয়ায় হাশাশিনদের প্রধান ছিলেন রশিদউদ্দিন সিনান ফাতেমীয় খিলাফত উচ্ছেদ করার কারণে সালাহউদ্দিনের প্রতি বিরূপ ছিলেন। গুমুশতিগিন তাকে অনুরোধ করেন যাতে সালাহউদ্দিনকে তার ক্যাম্পে হত্যা করা হয়।[৩৯] ১১৭৫ সালের ১১ মে তেরজন হাশাশিনের একটি দল সালাহউদ্দিনের ক্যাম্পে সহজে প্রবেশ করে কিন্তু আবু কুবাইসের নসিহউদ্দিন খুমারতেকিন কর্তৃক চিহ্নিত হয়ে পড়ে। সালাহউদ্দিনের একজন সেনাপতির হাতে একজনের মৃত্যু হয় এবং অন্যান্যদের পালানোর সময় হত্যা করা হয়।[৩৮][৪০][৪১] সালাহউদ্দিনের অগ্রগতি প্রতিহত করার জন্য তৃতীয় রেমন্ড নহরুল কবিরের কাছে তার সেনাদের সমবেত করেন। মুসলিম অঞ্চল আক্রমণের জন্য এটি তাদের কাছে উপযুক্ত ছিল। সালাহউদ্দিনের এরপর হোমসের দিকে যাত্রা করেন। কিন্তু শহরের দিকে সাইফউদ্দিনের কাছ থেকে একটি সাহায্যকারী বাহিনী পাঠানো হয়েছে শুনে ফিরে আসেন।[৪২]

ইতিমধ্যে সিরিয়া ও জাজিরায় সালাহউদ্দিনের প্রতিপক্ষরা তার বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা যুদ্ধ শুরু করেন। তারা দাবি করতে থাকে সালাহউদ্দিন তার নিজের অবস্থা (নুরউদ্দিনের অধীনস্ত) ভুলে গেছেন এবং সাবেক প্রভুর সন্তানকে অবরোধ করে তার প্রতি কোনো সম্মান দেখাচ্ছেন না। সালাহউদ্দিন অবরোধ তুলে নিয়ে প্রপাগান্ডা শেষ করার লক্ষ্য স্থির করেন। তিনি দাবি করেন যে তিনি ক্রুসেডারদের কাছ থেকে ইসলামকে রক্ষা করছেন। তার সেনারা হামা ফিরে এসে সেখানকার ক্রুসেডার সেনাদের মুখোমুখি হয়। ক্রুসেডাররা এখান থেকে ফিরে যায়। সালাহউদ্দিন ঘোষণা করেন যে এটি "মানুষের অন্তরের দরজা উন্মুক্তকারী বিজয়"।[৪২] এরপর শীঘ্রই ১১৭৫ সালের মার্চে তিনি হোমস প্রবেশ করেন এবং এর দুর্গ অধিকার করেন।[৪৩]

সালাহউদ্দিনের সাফল্য সাইফউদ্দিনকে সতর্ক করে তোলে। জেনগিদের প্রধান হিসেবে তিনি সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়াকে তার পরিবারের বলে বিবেচনা করতেন এবং সালাহউদ্দিন কর্তৃক তার বংশের অধিকৃত স্থান দখল করায় রাগান্বিত হয়ে পড়েন। সাইফউদ্দিন একটি বড় আকারের সেনাদল গঠন করে আলেপ্পোর দিকে পাঠান। আলেপ্পোর প্রতিরোধকারীরা এর আশংকায় ছিল। মসুল ও আলেপ্পোর যৌথ বাহিনী হামায় সালাহউদ্দিনের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়। প্রথমে সালাহউদ্দিন দামেস্ক প্রদেশের উত্তর দিকের সমস্ত বিজিত এলাকা ত্যাগ করার মাধ্যমে জেনগিদের সন্ধি করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করে এবং তাকে মিশর ফিরে যেতে বলা হয়। সংঘর্ষ অনিবার্য দেখতে পেয়ে সালাহউদ্দিন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন। যুদ্ধে সালাহউদ্দিনের বাহিনী বিজয়ী হয়। এ বিজয়ের ফলে সালিহর উপদেষ্টারা সালাহউদ্দিনকে দামেস্ক, হোমস ও হামা এবং আলেপ্পোর বাইরের কিছু শহরে সালাহউদ্দিনের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে বাধ্য হয়। [৪৪]

জেনগিদের বিরুদ্ধে বিজয়ের পর সালাহউদ্দিন নিজেকে রাজা ঘোষণা করেন। সালিহর নাম জুমার খুতবামুদ্রা থেকে বাদ দেয়া হয়। বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফা সালাহউদ্দিনের ক্ষমতাপ্রাপ্তিকে স্বাগত জানান এবং তাকে মিশর ও সিরিয়ার সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। আইয়ুবীজেনগিদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই হামার যুদ্ধের পর শেষ হয়ে যায়নি। সাইফউদ্দিন ক্ষুদ্র রাজ্য দিয়ারবাকির ও জাজিরা থেকে সেনা সংগ্রহ করার সময় সালাহউদ্দিন মিশর থেকে ব্যাপক সেনা সমাবেশ করেন।[৪৫] তিনি আলেপ্পো থেকে ২৫ কিমি দূরে তিল সুলতানে পৌছান এবং সেখানে সাইফউদ্দিনের সেনাদের সাথে লড়াই হয়। জেনগিরা সালাহউদ্দিনের বাহিনির বাম অংশকে ভেঙে ফেলতে সক্ষম হয়। এসময় সালাহউদ্দিন জেনগিদের প্রধান অংশকে আক্রমণ করেন। জেনগি সেনারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। সাইফউদ্দিনের অধিকাংশ অফিসাররা নিহত বা বন্দী হয়। সাইফউদ্দিন পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। জেনগি সেনা ক্যাম্প, ঘোড়া, মালামাল, তাবু ইত্যাদি আইয়ুবীদের হস্তগত হয়। যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেয়া হয়। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সেনাদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া হয়। তবে সালাহউদ্দিন নিজের জন্য কিছু রাখেননি।[৪৬]

তিনি আল্লেপোর দিএক এগিয়ে যান। যাত্রাপথে তার সেনারা বুজা ও এরপর মানবিজ অধিকার করে। এখান থেকে তারা পশ্চিমে আজাজ দুর্গ অবরোধের জন্য এগিয়ে যায়। কয়েকদিন পর সালাহউদ্দিন তার এক সেনাপতির তাবুতে বিশ্রাম নেয়ার সময় এক হাশাশিন তাকে ছুরি দিয়ে মাথায় আক্রমণ করেন। তার শিরস্ত্রাণের ফলে হামলা সফল হয়নি। তিনি হামলাকারীকে ধরে ফেলেন। আততায়ীকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার জন্য তিনি গুমুশতিগিনকে দায়ী করেন এবং অবরোধে শক্তিবৃদ্ধি করেন।[৪৭]

২১ জুন আজাজ অধিকৃত হয়। গুমুশতিগিনকে মোকাবেলা করার জন্য সালাহউদ্দদিন তার সেনাদেরকে আলেপ্পোর দিকে পাঠান। তার হামলা এবারও প্রতিহত করা হয়। তিনি একটি সন্ধি ও আলেপ্পোর সাথে পারস্পরিক মিত্রতা স্থাপন করা হয়। এতে গুমুশতিগিন ও সালিহকে শহরে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে হয় এবং বিনিময়ে তারা সালাহউদ্দিনকে তার অধিকৃত সকল এলাকায় সার্বভৌম হিসেবে মেনে নেয়। মারদিন ও কাইফার আমিররা সালাহউদ্দিনকে সিরিয়ার রাজা হিসেবে মেনে নেয়।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Spevack, Aaron (2014)। The Archetypal Sunni Scholar: Law, Theology, and Mysticism in the Synthesis of Al-Bajuri। State University of New York Press। পৃ: 44। আইএসবিএন 143845371X 
  2. Lēv, Yaacov (1999)। Saladin in Egypt। Brill। পৃ: 131। আইএসবিএন 9004112219 
  3. Halverson, Jeffry R.; Corman, Steven R.; Goodall Jr., H. L. (2011)। Master Narratives of Islamist Extremism। Palgrave Macmillan। পৃ: 201। আইএসবিএন 0230117236 
  4. ৪.০ ৪.১ A number of contemporary sources make note of this. The biographer Ibn Khallikan writes, "Historians agree in stating that [Saladin's] father and family belonged to Duwin [Dvin]. ... They were Kurds and belonged to the Rawādiya (sic), which is a branch of the great tribe al-Hadāniya": Minorsky (1953), p. 124. The medieval historian Ibn Athir, who is a Kurd and therefore his credibility is questionable, relates a passage from another commander: "... both you and Saladin are Kurds and you will not let power pass into the hands of the Turks": Minorsky (1953), p. 138.
  5. R. Stephen Humphreys, From Saladin to the Mongols: The Ayyubids of Damascus, 1193–1260, (State University of New York Press, 1977), 29; "Among the free-born amirs the Kurds would seem the most dependent on Saladin's success for the progress of their own fortunes. He too was a Kurd, after all ...".
  6. "Encyclopedia of World Biography on Saladin"। সংগৃহীত August 20, 2008 
  7. Moors' Islamic Cultural Home souvenir III, 1970–1976 Islamic Cultural Home, 1978, p. 7.
  8. H. A. R. Gibb, "The Rise of Saladin", in A History of the Crusades, vol. 1: The First Hundred Years, ed. Kenneth M. Setton (University of Wisconsin Press, 1969). p. 563.
  9. Bahā' al-Dīn (2002), p 17.
  10. Ter-Ghevondyan 1965, পৃ. 218
  11. Tabbaa, 1997, p. 31.
  12. ১২.০ ১২.১ ১২.২ Lyons & Jackson 1982, পৃ. 3
  13. ১৩.০ ১৩.১ "Who2 Biography: Saladin, Sultan / Military Leader"। Answers.com। সংগৃহীত August 20, 2008 
  14. Northen, 1998, p. 809.
  15. Lyons & Jackson 1982, পৃ. 6–7
  16. Lyons & Jackson 1982, পৃ. 8
  17. Lyons & Jackson 1982, পৃ. 14
  18. Lyons & Jackson 1982, পৃ. 15
  19. Lyons & Jackson 1982, পৃ. 16
  20. Lyons & Jackson 1982, পৃ. 25
  21. Lyons & Jackson 1982, পৃ. 28
  22. Lyons & Jackson 1982, পৃ. 28–29
  23. Lyons & Jackson 1982, পৃ. 34, 36
  24. Lyons & Jackson 1982, পৃ. 38
  25. Lyons & Jackson 1982, পৃ. 41
  26. ২৬.০ ২৬.১ Lyons & Jackson 1982, পৃ. 43
  27. Pringle, 1993, p.208.
  28. Lyons & Jackson 1982, পৃ. 45
  29. Lyons & Jackson 1982, পৃ. 46–47
  30. টেমপ্লেট:Dastaanimanfaroshonki(urdu)
  31. Lyons & Jackson 1982, পৃ. 60–62
  32. Lyons & Jackson 1982, পৃ. 64
  33. Lyons & Jackson 1982, পৃ. 74–75
  34. ৩৪.০ ৩৪.১ Lane-Poole 1906, পৃ. 136
  35. Lyons & Jackson 1982, পৃ. 81
  36. Lane-Poole 1906, পৃ. 13
  37. Lane-Poole 1906, পৃ. 137
  38. ৩৮.০ ৩৮.১ Lyons & Jackson 1982, পৃ. 87
  39. Lane-Poole 1906, পৃ. 138
  40. Lane-Poole 1906, পৃ. 139
  41. Nicolle 2011, পৃ. 20
  42. ৪২.০ ৪২.১ Lyons & Jackson 1982, পৃ. 88–89
  43. Lane-Poole 1906, পৃ. 140
  44. Lane-Poole 1906, পৃ. 141
  45. Lane-Poole 1906, পৃ. 141–143
  46. Lane-Poole 1906, পৃ. 144
  47. উদ্ধৃতি ত্রুটি: অবৈধ <ref> ট্যাগ; LP7 নামের ref গুলির জন্য কোন টেক্সট প্রদান করা হয়নি