মীরজাফর

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মীর জাফর
বাংলা, বিহার ও ওড়িশ্যার নবাব
সুজা উল-মুলক (দেশ নায়ক)
হাশিম উদ-দুলহা Hashim ud-Daulah (রাষ্ট্রের তরবারি)
জাফর আলী খান বাহাদুর
মাহাবাত জং (যুদ্ধের নায়ক)
মীর জাফর (বামে) এবং তার পুত্র মীর মিরান (ডান)।
রাজত্বকাল ১৭৫৭ - ১৭৬০ এবং ১৭৬৩- ১৭৬৫
পূর্ণ নাম মীর জাফর আলী খাঁ বাহাদুর
জন্ম ১৬৯১
মৃত্যু জানুয়ারি ১৭, ১৭৬৫ (৭৪ বছর)
সমাধিস্থল জাফরগঞ্জ সমাধিক্ষেত্র, মুর্শিদাবাদ
পূর্বসূরি সিরাজউদ্দৌলা
উত্তরসূরি Mir Qasim (after 1760) and Najimuddin Ali Khan (after 1765)
দাম্পত্যসঙ্গীরা Shah Khanum Sahiba (m. 1727, d. August 1779)
Munny Begum (m. 1746, d. January 10, 1813)
Rahat-un-nisa Begum (Mut'ah wife)
Babbu Begum (d. 1809)
সন্তানাদি

Sadiq Ali Khan Bahadur (Mir Miran)
Najimuddin Ali Khan Bahadur
Najabut Ali Khan Bahadur (Mir Phulwari)
Ashraf Ali Khan Bahadur
Mubaraq Ali Khan Bahadur
Hadi Ali Khan Bahadur
Fatima Begum Sahiba
Misri Begum
Roshan-un-nisa Begum Sahiba (Nishani Begum)

Husaini Begum and 2 more daughters.
রাজবংশ Najafi
পিতা স্যাইয়েদ আহমেদ নাজাফি (মীর্ মিরাক)
ধর্মবিশ্বাস ইসলাম

মীরজাফর, যাঁর সম্পূর্ণ নাম মীর জাফর আলী খান (জন্ম ১৬৯১- মৃত্যু ফেব্রুয়ারি ৫, ১৭৬৫), ইংরেজ প্রভাবিত বাংলার একজন নবাব। তার পিতার নাম সাইদ আহমেদ নাজাফি। তিনি তার বাবা মার দ্বিতীয় সন্তান। তার শাসনামল ভারতে কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার শুরু এবং সমগ্র উপমহাদেশে ব্রিটিশ সম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ভূতপূর্ব নবাব সিরাজ উদ্দৌলা নদীয়ার পলাশীর কাছে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন। মীর জাফর ছিলেন উক্ত যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি। তার অধীনের সৈন্যবাহিনী যুদ্ধে অংশগ্রহন না করার জন্য নবাবকে পরাজয় বরন করতে হয়। ইংরেজদের সাথে মীর জাফরের পূর্বেই এই মর্মে একটি চুক্তি ছিল যে, যুদ্ধে ইংরেজরা জয়ী হলে মীর জাফর হবেন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব। বিনিময়ে মীর জাফর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে পাঁচ লক্ষ পাউন্ড ও কোলকাতায় বসবাসকারী ইউরোপিয়ানদের আড়াই লক্ষ পাউন্ড প্রদান করবেন। [১] ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজ উদ্দৌলা পরাজিত, সিংহাসনচ্যুত ও নিহত হলে মীর জাফর আলী বাংলার নবাব হন। কিন্তু ব্রিটিশদের দাবীকৃত বিপুল অর্থের যোগান দিতে তিনি সমর্থ হননি। ১৭৫৮ সালে রবার্ট ক্লাইভ তার প্রতিনিধি খোজা ওয়াজিদের মাধ্যমে জানতে পারেন যে, মীর জাফর চিনশুরায় ডাচদের সাথে একটি চুক্তি করেছেন। হুগলি নদীতে ডাচ জাহাজের আনাগোনা দেখতে পাওয়া যায়। এসব কিছু চুঁচুড়া যুদ্ধের পটভূমি সৃষ্টি করে। ব্রিটিশ কর্মকর্তা হেনরী ভেন্সিটার্ট মীর জাফরের কাজে সহায়তা করার জন্য তার জামাতা মীর কাশিমকে বাংলার সহকারী সুবাদার নিয়োগ করার জন্য প্রস্তাব করেন। ১৭৬০ সালে কোম্পানি মীর জাফরকে মীর কাশিমের নিকট ক্ষমতা অর্পন করতে বাধ্য করে। মীর কাশিম ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা ব্যক্তি এবং তিনি বাংলাকে স্বাধীনভাবে শাসন করার ইচ্ছা পোষন করতেন। ফলস্রুতিতে ইংরেজদের সাথে তার দ্বন্দ্ব শুরু হয় এবং ১৭৬৩ সালে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে পুনরায় মীর জাফরকে নবাব করা হয়। ক্ষমতাচ্যুত নবাব এই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। বরং তিনি কোম্পানির বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। মীর জাফর ১৭ ই জানুয়ারি ১৭৬৩ সালে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার জাফরগঞ্জ কবরস্থানে তার সমাধি আছে।[২]

বাংলার নবাব[সম্পাদনা]

মীর জাফর ও তার ‍পুত্র মীর মিরান ১৭৫৭ সালে ইউলিয়াম ওয়াটস এর নিকট চুক্তিপত্র প্রদান করছেন।

মীর জাফর আলীবর্দী খানের উত্তর সূরী নবাব সিরাজ উদ্দৌলার প্রতি কপট আনুগত্য দেখাতেন। পলাশীর যুদ্ধে তিনি নবাবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ইংরেজদের পক্ষ অবলম্বন করেন।[৩] কোম্পানির অতিরিক্ত অর্থের চাহিদা পূরনে ব্যার্থ হলে মীর কাশিমকে কিছু দিনের জন্য নবাব করা হয়। মীর কাশিম ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা নবাব। তিনি বাংলার শাসন ক্ষমতায় ইংরেজদের হস্তক্ষেপ মেনে নিতে চাননি। তিনি অযোধ্যার নবাব, এবং মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সাথে একটি সামরিক মৈত্রি চুক্তি করেন। ২২ শে অক্টোবর ১৭৬৪ সালে দুই পক্ষের মধ্যে বক্সারের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুদ্ধে নবাবের সম্মিলিত বাহিনী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যবাহিনীর কাছে পরাজিত হয়। এরপর মীর জাফরকে পুনরায় নবাব হিসাবে ঘোষনা করা হয়।

জীবন বৃত্তান্ত[সম্পাদনা]

প্রাথমিক জীবন[সম্পাদনা]

মীরজাফর প্রথমে আলিবর্দির হয়ে নবাব সরফরাজের বিরুদ্ধে লড়াই করেন এবং খ্যাতি পান। মনসবদার হয়ে তার তনখা হয় মাসে ১০০ টাকা। নবাব আলীবর্দী খানের সৎ বোনের সাথে বিবাহ হয় মীরজাফরের। বর্গীদের সাথে লড়াই করে জয়ী হলে মীরজাফর ক্রমশ বিশ্বাসভাজন হয়ে ওঠেন নবাব পরিবারে। আলিবর্দির মৃত্যুর পর সিরাজদ্দৌলার একজন অমাত্য হয়ে ওঠেন ও প্রধান সেনাপতি হিসেবে কাজ করতে থাকেন। নবাব আলীবর্দ্দী খান তার দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলাকে বাংলার নবাব করায় ক্ষুব্ধ হন মীর জাফর। তাই তিনি প্রধান সেনাপতি হয়েও কখনোই সিরাজউদ্দৌলাকে নবাব হিসেবে মেনে নিতে পারেন নি। সব সময় তিনি চেয়েছেন বাংলার নবাবের পতন। বিশ্বাসঘাতকতা করে তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রবার্ট ক্লাইভ এর সাথে তিনি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন, এবং পলাশীর যুদ্ধে মূলত তাঁর কারণেই ব্রিটিশদের হাতে সিরাজদ্দৌলার পরাজয় ঘটে। এই বিশ্বাসঘাতী ষড়যন্ত্রে ইয়ার লতিফ, জগত শেঠ, রায় দুর্লভ, উঁমিচাদ প্রমুখ সামিল ছিল। এই যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মীরজাফরকে নবাবের মসনদে অধিষ্ঠিত করে।[২]

Nimak haram Deuri (House of Mir Jafar)

ঘটনা মূলক ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে ইংরেজ বেনিয়াদের সঙ্গে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সৈন্যদের লড়াই হয়। এই যুদ্ধে নবাবের পক্ষে স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইয়ে প্রধান সেনাপতি ছিলেন মীরজাফর আলী খান। তার সঙ্গে ছিলেন গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান বকশী মীরমদন আর সেনাপতি দেওয়ান মোহনলাল। তারা দুজনেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে বীর বিক্রমে লড়াই করে পরাজিত হন। আর যুদ্ধের ময়দানে নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে প্রধান সেনাপতি মীরজাফর আলী খান ও তার দোসররা ধূর্ত ইংরেজ বেনিয়া লর্ড ক্লাইভের হাতে বাংলার শাসন ক্ষমতা তুলে দেয়। পরাজিত হন বাংলা, বিহার উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। মুষ্টিমেয় ইংরেজ শাসক বিশ্বাসঘাতকদের সহায়তায় বাংলায় তাদের শাসন ক্ষমতা পোক্ত করে এবং সোয়া দুইশ বছর এদেশ শাসন করে।[২] সেই থেকেই মীরজাফরের নাম বিশ্বাসঘাতকতার রূপক হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। মুর্শিদাবাদে তার বাড়িটি নিমকহারাম দেউড়ি নামে পরিচিত।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Encyclopedia Britannica of India volume III page 382 ISBM 978-81-8131-008-8
  2. রজতকান্ত রায় (১৯৯৪)। পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স। পৃ: ১৩৫। 
  3. Mohammad Shah (২০১২)। "Mir Jafar Ali Khan"। in Sirajul Islam and Ahmed A. Jamal। Banglapedia: National Encyclopedia of Bangladesh (Second সংস্করণ)। Asiatic Society of Bangladesh