বিষয়বস্তুতে চলুন

পরশুরামেশ্বর মন্দির

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরশুরামেশ্বর মন্দির
পরশুরামেশ্বর মন্দির
ধর্ম
অন্তর্ভুক্তিহিন্দুধর্ম
অবস্থান
অবস্থানভুবনেশ্বর
দেশভারত

পরশুরামেশ্বর মন্দির ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের রাজধানী ভুবনেশ্বরে অবস্থিত। এটিকে ৭ম ও ৮ম শতকের মধ্যবর্তী শৈলোদ্ভব যুগের প্রাচীন ওড়িশিয় হিন্দু মন্দিরের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সংরক্ষিত মন্দির হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি হিন্দু দেবতা শিব এর মন্দির যা উড়িষ্যা রাজ্যের প্রাচীন মন্দিরগুলোর একটি। এটি ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে নাগারা স্থাপত্যে নির্মিত বলে মনে করা হয়। মন্দিরটি দশম শতকের পূর্ববর্তী সময়ের সকল বৈশিষ্ট্য বহন করে। এটি পরশুরামেশ্বর জাতীয় মন্দিরগুলোর একটি মন্দির।

পরশুরামেশ্বর মন্দিরে একটি বিমান এবং একটি সমতলীয় প্রার্থনাস্থান রয়েছে। গোলাকার লম্বাটে উঁচু চূড়াটি ৪০.২৫ ফুট উঁচু, যাকে ‘বিমান’ বলা হয়। এটিই প্রথম মন্দির যার বিমান ছাড়াও ‘জগমোহন’ নামের আরেকটি নির্মিতি রয়েছে, যদিও অনেক মন্দির কেবল বিমান থাকে। শিবের মন্দির হলেও এতে শাক্তদের বিভিন্ন ছবি দেখা যায়, যা বিভিন্ন শাক্ত মন্দিরে থাকে। এটি ভুবনেশ্বরের প্রথম মন্দির যাতে সপ্তমাতৃকার(চামুণ্ডা, বারাহী, ইন্দ্রাণী, বৈষ্ণবী, কৌমারী, শিবানী এবং ব্রাহ্মী) প্রতীক রয়েছে। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া মন্দিরটির রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা করে থাকে। আষাঢ় মাসের পরশুরামাষ্টমী এ মন্দিরে উদযাপিত সবচেয়ে বড় উৎসব। উড়িষ্যা রাজ্যের পর্যটকদের কাছে মন্দিরটি একটি বিশেষ আকর্ষণ।[১]

ইতিহাস

[সম্পাদনা]
মন্দিরের শিবলিঙ্গ

পরশুরামেশ্বর মন্দির, পরশুরামেশ্বর জাতীয় মন্দিরগুলোর একটি যেগুলো উড়িষ্যা রাজ্যর প্রাচীনতম মন্দির হিসেবে বিবেচিত।[২][৩][৪] কতিপয় ঐতিহাসিক মনে করেন ৭ম শতকের শেষে শত্রুগুণেশ্বর, ভারতেশ্বর মন্দির এবং লক্ষ্মণেশ্বর মন্দির তৈরির ধারাবাহিকতায় মন্দিরটি ৮ম শতকের শুরুর দিকে নির্মিত হয়েছে। কে. সি. পাণিগ্রাহী এর নির্মাণকাল ৬৫০ খ্রি. বলে মনে করেন।[২] ফার্গুসন মনে করেন ৫০০ অব্দের দিকে এর নির্মাণ শুরু হয়েছিল। [৫] দরজার উপর আটটি গ্রহ থাকায় অনেক বিশেষজ্ঞ এর নির্মাণকাল ৭ম শতকের মাঝামাঝি বলে মনে করেন কেননা পরবর্তীকালের মন্দিরগুলোতে নয়টি গ্রহের ছবি দেখা যায়।[৬]

শৈলোদ্ভবগণ পরশুরামেশ্বর মন্দির নির্মাণ করে। শিব ছিল তাদের গৃহদেবতা।[২] তারা শাক্তমতের প্রতিও ভক্তিশীল ছিলেন, তাই মন্দিরের প্রাচীরে বিভিন্ন শাক্ত চিত্র অঙ্কিত হয়েছে।[২] ১৯০৩ সালে ছাদ ও ভিতরের কিছু অংশ সামান্য পরিবর্তন করে মন্দিরটি সংস্কার করা হয়, তবে এর টিকে থাকা বেশিরভাগ অংশই মূল প্রাচীন নির্মাণ।[৬][৭] পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় অন্যান্য ওড়িশিয় মন্দিরের মত এটিও ১২শ-১৩শ শতকের মুসলিম আক্রমণে তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি।[৮] বর্তমানে মন্দিরটি আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া দ্বারা একটি ‘টিকেটেড মনুমেন্ট’ হিসেবে রক্ষিত ও পরিচালিত হয়ে থাকে।

স্থাপত্য

[সম্পাদনা]
মন্দির প্রাচীরের নকশা

উড়িষ্যার মন্দিরগুলোয় দুটি অংশ থাকে- বিমান এবং জগমোহন। পরশুরামেশ্বর মন্দিরই প্রথম মন্দির যার এই দুটি অংশ রয়েছে। এর আগের মন্দিরগুলোতে জগমোহন অংশটি ছিল না এবং পরবর্তী সময়ের মন্দিরগুলোতে ‘নাটমণ্ডপ’ এবং ‘ভোগমণ্ডপ’ নামে দুটি অতিরিক্ত অংশ যুক্ত হতে দেখা যায়। বিমানটি বর্গাকার, দেয়ালগুলো বিভিন্ন আকৃতির। এর ভিতরের জায়গার পরিমাপ ৯.৮৮ফুট * ৯.৭৫ ফুট এবং বাইরে থেকে ২৯.৩৩ ফুট * ২১ ফুট। উচ্চতা ৪০.২৫ ফুট। অমলক নামের একটি পাথরের গোলাকার চাকতি এর শিখরে অবস্থিত।[৮][৯]

জগমোহন আয়তাকার এবং দুই সারি আনত ছাদ সংবলিত। জগমোহনের মাপ ভিতর থেকে ২৪.৯৪ ফুট* ১৩.৩৩ ফুট এবং বাইরে থেকে ২৯.৩৩ফুট * ২৮.৫৮ ফুট। পাতাজালি ধরনের জানালাগুলো বর্গাকার এবং আয়তাকার। পাথরে বিভিন্ন নৃত্যশিল্পী এবং সঙ্গীতশিল্পীর ছবি খোদাই করা আছে। দরজা আর জানালাগুলো দিয়ে মন্দিরে আলো প্রবেশ করে। বিমান এবং জগমোহনের সংযোগস্থলটি পূর্ণরূপে নির্মিত নয়, তাই অনেকে মনে করেন একটি অংশ অনেক পরে নির্মিত হয়ে থাকতে পারে। তবে প্রাচীন সময়ে এ সংযুক্তি ভবনের সাথে নির্মিত হওয়া অসম্ভব ছিল না। ভারী প্রস্তরখণ্ড মাটিতে প্রোথিত করে মন্দিরটি বানানো হয়েছে। এই মন্দিরটি ভুবনেশ্বরের মুক্তেশ্বর, লিঙ্গরাজ, রাজারাণী এবং কোনারকের সূর্যমন্দিরের মত উল্লম্ব স্থাপনার প্রাধান্যযুক্ত ‘নাগারা’ ধরনের স্থাপত্যে নির্মিত।[১০][১১][১২]

Six armed Mahisamardini Durga image on the tower
ষড়ভুজা মহিষমর্দিনী (দুর্গা) দেবী

মন্দিরে ষড়ভুজা মহিষমর্দিনী (দুর্গা) দেবীর প্রাচীন ছবি দেখতে পাওয়া যায়। খোদিত চিত্রে দেবীর গায়ে কর্ণকুণ্ডল, মালা এবং কঙ্কণ রয়েছে। দেবীর উপরের বামহাতে অসি এবং উপরের ডানহাতে মহিষের মস্তক চেপে রেখেছেন। মধ্য বামহাতে ত্রিশূল এবং নিচের বামহাতে বাণ রয়েছে। মধ্য ডানহাতে ঢাল আর নিচের ডানহাতে ধনুক। শাক্ত কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বৈতাল মন্দিরে দুর্গার অনুরূপ প্রতিচ্ছবি দেখা যায়।[১৩][১৪] শিবের মন্দির হলেও শাক্তমতের অনেক ছবি মন্দিরের দেয়ালে রয়েছে। এটি ভুবনেশ্বরের প্রথম মন্দির যেখানে দুর্গার সপ্তমাতৃকা র ছবি আছে। সপ্তমাতৃকার ছবিগুলো গণেশ এবং বীরভদ্র এর মাঝে অবস্থিত। গণেশ ব্যতীত অন্যান্য ছবিতে সংশ্লিষ্ট বাহন রয়েছে। আট হাতবিশিষ্ট অর্ধনারীশ্বর, গঙ্গা, যমুনা, বিষ্ণু, ইন্দ্র, সূর্য, যম, ময়ূরসহ কার্তিকেয়, রাবণের কৈলাস উত্তোলন, শিব কর্তৃক রাবণ এর দর্পচূর্ণ, শিবের নটরাজ এবং তাণ্ডবমূর্তি প্রভৃতি মন্দিরের প্রাচীরে অঙ্কিত হয়েছে। অন্যান্য ওড়িশিয় মন্দিরের ন্যায় ভিতরের দেয়ালে কোন কাজ না করে মসৃণ রাখা হয়েছে।[১৫] অন্যান্য অংশে বিভিন্ন ফল, ফুল, পাখি এবং প্রাণিদের ছবি আঁকা। বৈতাল দেউল এবং পরশুরামেশ্বর মন্দিরে পাখির পুচ্ছের নকশা বেশি দেখা যায় আর মুক্তেশ্বর মন্দিরে ফুল ও ফুলদানি লক্ষ্য করা যায়।[১৬]

মন্দিরে পাথরের ভাস্কর্য

বিমান ও জগমোহন অংশে শিবানুচর বেতালদের ছবি আছে। এছাড়া বিভিন্ন ভঙ্গিতে নাগনাগিনীদের ছবি দেখা যায়। তীর্থযাত্রা, বিমানের বহু ছবির মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। বিমানের অন্যান্য ছবির মধ্যে শিকারের ছবি উল্লেখযোগ্য যেমন মৃগ শিকারীর সামনে ছুটে পালিয়ে যাচ্ছে এমন ছবি। জগমোহনের সবচেয়ে বাইরের জানালার ফ্রেমে কিছু ক্রীড়ামত্ত বানরের ছবি আছে। বিমানটি পঞ্চরথ মনে হলেও এটি মূলত ত্রিরথ প্রকৃতির (চূড়ার উপরের প্রস্থচ্ছেদে চৌদিকে তিনটি ভাঁজ)। বিমানের চূড়াটি নিচ থেকে শুরু করে তিনটি খাজ নিয়ে ঘনক আকৃতির পরিবর্তে আয়তাকার ভাবে উপরে এসে মিলেছে।

ধর্মীয় গুরুত্ব

[সম্পাদনা]

পরশুরামেশ্বর কথাটি বিষ্ণুর অবতার পরশুরামের দেবতা শিবকে নির্দেশ করে। পরশুরামাষ্টমী এই মন্দিরে উদযাপিত সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান। আষাঢ় মাসের অষ্টমী তিথিতে অনুষ্ঠিত এই উৎসবে পরশুরামেশ্বর মন্দিরে লিঙ্গরাজের প্রতিকৃতি আনা হয় এবং পূজা করা হয়। [১৭]

রাজারাণী মন্দির, বৈতাল দেউল সহ পরশুরামেশ্বর মন্দিরে ৭ম ও ৮ম শতকের ‘দেবদাসী’ প্রথা দেখা যায়। দেবদাসী হল আরাধনায় নিয়োজিতা নারী, যারা সম্পূর্ণ জীবন মন্দিরের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেন এবং সমাজে বিশেষ সম্মান লাভ করেন। তাদের সাধারণত রাজপ্রাসাদে স্থানান্তর করা হত এবং জনসাধারণের কাজের উদ্দেশ্যে নিয়োগ করা হত।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. ↑ Gopal, Madan (১৯৯০)। K.S. Gautam (সম্পাদক)। India through the ages। Publication Division, Ministry of Information and Broadcasting, Government of India। পৃ. ১৭৫।
  2. 1 2 3 4 Pradhan, Dr. Baman Charan (সেপ্টেম্বর ২০০৯)। "Saktism at Bhubaneswar Through Ages" (পিডিএফ)। Orissa Review। Government of Orissa e-Magazine: ১০–১০২। ৯ মার্চ ২০১৪ তারিখে মূল থেকে (PDF) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৩ মার্চ ২০১৩।
  3. ↑ O'Malley 1908, p. 57
  4. ↑ Sturgis, Russell (১৯০১)। A dictionary of architecture and building: biographical, historical, and descriptive, Volume 2। The Macmillan Company। পৃ. ৪৭৩–৪৭৪।
  5. ↑ Fergusson 1876, p. 435
  6. 1 2 "Parsurameswar temple"। Department of Tourism, Government of Orissa। ৬ মে ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৩ মার্চ ২০১৩।
  7. ↑ O'Malley 1908, p. 187
  8. 1 2 Allen, Margaret Prosser (১৯৯১)। Ornament in Indian Architecture। Associated University Press Inc.। পৃ. ২০৫। আইএসবিএন ০-৮৭৪১৩-৩৯৯-৮।
  9. ↑ Bong, Wun Chok (২০০৮)। The Gods' Machines: From Stonehenge to Crop Circles। Frog Books। পৃ. ৪৩৬। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৫৮৩৯৪-২০৭-৯।
  10. ↑ Chopra, Pran Nath (২০০৩)। A Comprehensive History of Ancient India (3 Vol. Set)। Sterling Publishers Pvt. Ltd। পৃ. ২৩৩–২৩৪। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২০৭-২৫০৩-৪।
  11. ↑ Prakash, Om (২০০৫)। Cultural History of India। New Age International। পৃ. v। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২২৪-১৫৮৭-২।
  12. ↑ Lochtefeld, James G. (২০০২)। The Illustrated Encyclopedia of Hinduism: Volume Two। The Rosen Publishing Group। পৃ. ৫০১। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮২৩৯-৩১৮০-৪।
  13. ↑ Patel, C.B. (সেপ্টেম্বর ২০০৮)। "Mahisamardini Durga-Antiquity and Iconography" (পিডিএফ)। Orissa Review। Government of Orissa e-Magazine: ৩। ৯ মার্চ ২০১৪ তারিখে মূল থেকে (PDF) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৩ মার্চ ২০১৩।
  14. ↑ O'Malley 1908, p. 242
  15. ↑ Educational Britannica Educational (২০১০)। The Culture of India। The Rosen Publishing Group। পৃ. ৩০৬। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৬১৫৩০-২০৩-১।
  16. ↑ Ghosh 1950, p. 23
  17. ↑ O'Malley 1908, p. 240

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]