টাঙ্গুয়ার হাওর

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওড়। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ জলাভূমি এবং দর্শনীয় স্থান
সুনামগঞ্জ জেলার টাঙ্গুয়ার হাওড়

টাঙ্গুয়ার হাওর (সিলেটি: ꠐꠣꠋꠉꠥꠀꠞ ꠀꠅꠞ) বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত একটি হাওর। প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এ হাওর বাংলাদেশর দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি ।[১] স্থানীয় লোকজনের কাছে হাওরটি নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল নামেও পরিচিত।[২] এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার স্থান, প্রথমটি সুন্দরবন

টাঙ্গুয়ার হাওর এর প্রকৃতি
টাঙ্গুয়ার হাওর

অবস্থান ও পরিচিতি[সম্পাদনা]

টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশাতাহিরপুর উপজেলার মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। মেঘালয় পাহাড় থেকে ৩০টিরও বেশি ঝরা (ঝরণা) এসে মিশেছে এই হাওরে।[৩] দুই উপজেলার ১৮টি মৌজায় ৫১টি হাওরের সমন্বয়ে ৯,৭২৭ হেক্টর এলাকা নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর জেলার সবচেয়ে বড় জলাভূমি। পানিবহুল মূল হাওর ২৮ বর্গকিলোমিটার এবং বাকি অংশ গ্রামগঞ্জ ও কৃষিজমি।[১] একসময় গাছ-মাছ-পাখি আর প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের আধার ছিল এই হাওর। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে টাঙ্গুয়ার হাওরকে 'প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তখনই অবসান হয় দীর্ঘ ৬০ বছরের ইজারাদারির। ২০০০ খ্রিস্টাব্দে ২০ জানুয়ারি এই হাওরকে 'রামসার স্থান' (Ramsar site) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। হাওর এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, সম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ড সরকারের মধ্যে ২০০১ খ্রিস্টাব্দে ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দের ৯ নভেম্বর থেকে হাওরের নিয়ন্ত্রণ নেয় জেলা প্রশাসন।[৪]

শীত মৌসুমে পানি শুকিয়ে কমে গেলে এখানকার প্রায় ২৪টি বিলের পাড় (স্থানীয় ভাষায় কান্দা) জেগে উঠলে শুধু কান্দা'র ভিতরের অংশেই আদি বিল থাকে, আর শুকিয়ে যাওয়া অংশে স্থানীয় কৃষকেরা রবিশস্য ও বোরো ধানের আবাদ করেন। এসময় এলাকাটি গোচারণভূমি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। বর্ষায় থৈ থৈ পানিতে নিমগ্ন হাওরের জেগে থাকা উঁচু কান্দাগুলোতে আশ্রয় নেয় পরিযায়ী পাখিরা —রোদ পোহায়, জিরিয়ে নেয়। কান্দাগুলো এখন (২০১২) আর দেখা যায় না বলে স্থানীয় এনজিও ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় সেখানে পুঁতে দেয়া হয়েছে বাঁশ বা কাঠের ছোট ছোট বিশ্রাম-দণ্ড।

জীববৈচিত্র্য[সম্পাদনা]

টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্যের মধ্যে অন্যতম হলো বিভিন্ন জাতের পাখি। স্থানীয় বাংলাদেশী জাতের পাখি ছাড়াও শীতকালে, সুদূর সাইবেরিয়া থেকে আগত পরিযায়ী পাখিরও আবাস এই হাওর। এ হাওরে প্রায় ৫১ প্রজাতির পাখি বিচরণ করে।[৫] পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে বিরল প্রজাতির প্যালাসেস ঈগল, বড় আকারের গ্রে কিংস্টর্ক রয়েছে এই হাওড়ে। স্থানীয় জাতের মধ্যে শকুন, পানকৌড়ি, বেগুনি কালেম, ডাহুক, বালিহাঁস, গাঙচিল, বক, সারস[২], কাক, শঙ্খ চিল, পাতি কুট (এই হাওরের ২৮-২৯%)[১] ইত্যাদি পাখির নিয়মিত বিচরণ এই হাওরে। এছাড়া আছে বিপন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখি কুড়ুল (বাংলাদেশে এর নমুনাসংখ্যা ১০০টির মতো)। ২০১১'র পাখিশুমারীতে এই হাওরে চটাইন্নার বিল ও তার খাল, রোয়া বিল, লেচুয়ামারা বিল, রুপাবই বিল, হাতির গাতা বিল, বেরবেরিয়া বিল, বাইল্লার ডুবি, তেকুন্না ও আন্না বিলে প্রায় ৪৭ প্রজাতির জলচর পাখি বা ওয়াটারফাউলের মোট ২৮,৮৭৬টি পাখি গণনা করা হয়। এই শুমারিতে অন্যান্য পাখির পাশাপাশি নজরে আসে কুট, মরিচা ভুতিহাঁস, পিয়ংহাস; সাধারণ ভুতিহাঁস, পান্তামুখী বা শোভেলার, লালচে মাথা ভুতিহাঁস, লালশির, নীলশির, পাতিহাঁস, লেনজা, ডুবুরি, পানকৌড়ি ইত্যাদি পাখিও।[১]

এছাড়াও ৬ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৪ প্রজাতির সাপ, বিরল প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির কচ্ছপ, ৭ প্রজাতির গিরগিটিসহ নানাবিধ প্রাণীর বাস, এই হাওরের জীববৈচিত্র্যকে করেছে ভরপুর।[৫]

অধ্যাপক আলী রেজা খান-এর বর্ণনানুযায়ী এই হাওরে সব মিলিয়ে প্রায় ২৫০ প্রজাতির পাখি, ১৪০ প্রজাতির মাছ, ১২'র বেশি প্রজাতির ব্যাঙ, ১৫০-এর বেশি প্রজাতির সরিসৃপ এবং ১০০০-এরও বেশি প্রজাতির অমেরুদণ্ডী প্রাণীর আবাস রয়েছে। (প্রেক্ষিত: জানুয়ারি ২০১২)[১]

মৎস্যসম্পদ[সম্পাদনা]

টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রায় ২০০ প্রজাতির মাছ রয়েছে।[৫] এ হাওরের বিখ্যাত মাছের মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করা যায় মহাশোলের কথা। মাছটির দুটো প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম যথাক্রমে Tortor এবং Torputitora, টাঙ্গুয়ার হাওরে দুই প্রজাতিই পাওয়া যেত।[৩]

উদ্ভিদবৈচিত্র্য[সম্পাদনা]

টাঙ্গুয়ার হাওরের উদ্ভিদের মধ্যে অন্যতম হলো জলজ উদ্ভিদ। এছাড়া আছে হিজল, করচ, বরুণ, পানিফল, হেলেঞ্চা, বনতুলশী, নলখাগড়া, বল্লুয়া, চাল্লিয়া ইত্যাদি জাতের উদ্ভিদও।[৫]

সংরক্ষণ[সম্পাদনা]

হাওর এলাকার মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, হাওরের সম্পদ সংরক্ষণ, ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ও সুইজারল্যান্ড সরকারের মধ্যে ২০০১ খ্রিস্টাব্দের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।[২] ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে টাঙ্গুয়ার হাওরটি জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আছে। একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পুলিশআনসার সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকে। সেখানে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। তবে স্থানীয় প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে একশ্রেণীর অসাধু লোক চুরি করে মাছ শিকার করে এবং তারা মাঝে মাঝে ধরাও পড়ে।[৩]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. পরিযায়ী পাখির চারণভূমি: নাম যার টাঙ্গুয়ার হাওর, রেজা খান (বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ), সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্র অন্য আলো, দৈনিক প্রথম আলো, ঢাকা থেকে প্রকাশিত; প্রকাশকাল: ১৩ জানুয়ারি ২০১২; সংগ্রহের তারিখ: ১৩ জানুয়ারি ২০১২ খ্রিস্টাব্দ।
  2. ইতিহাস-ঐতিহ্য: "নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল", শাহ দিদারুল আলম; রকমারি, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন; পৃষ্ঠা ৫; ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১১; পরিদর্শনের তারিখ: ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১১।
  3. আশীষ-উর-রহমান (২২ জুলাই ২০১০)। "হাওরে মহাশোল!" (ওয়েব)দৈনিক প্রথম আলো। ঢাকা। সংগ্রহের তারিখ অক্টোবর ৬, ২০১০ 
  4. খলিল রহমান (৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০)। "টাঙ্গুয়ার হাওর ইজারা নয়" (ওয়েব)দৈনিক প্রথম আলো। ঢাকা। সংগ্রহের তারিখ অক্টোবর ৬, ২০১০ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  5. হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী (পাওয়া যায়নি)। "লুটপাটে বিলীন হচ্ছে জীববৈচিত্র্য, প্রয়োজন সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা: বিপন্ন টাঙ্গুয়ার হাওর" (ওয়েব)রিয়েলএস্টেটবিডি। ঢাকা। সংগ্রহের তারিখ অক্টোবর ৬, ২০১০  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]