কৃষ্ণ বিবর

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোল(ইংরেজি: Black Hole; বাংলা বিকল্প নাম: কৃষ্ণ বিবর) মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ও প্রকৃতি বিষয়ক একটি বহুল প্রচলিত ধারণা। এই ধারণা অনুযায়ী কৃষ্ণগহ্বর মহাবিশ্বের এমন একটি বস্তু যা এত ঘন সন্নিবিষ্ট বা অতি ক্ষুদ্র আয়তনে এর ভর এত বেশি যে এর মহাকর্ষীয় শক্তি কোন কিছুকেই তার ভিতর থেকে বের হতে দেয় না, এমনকি তাড়িতচৌম্বক বিকিরণকেও (যেমন: আলো) নয়। প্রকৃতপক্ষে এই স্থানে সাধারণ মহাকর্ষীয় বলের মান এত বেশী হয়ে যায় যে এটি মহাবিশ্বের অন্য সকল বলকে অতিক্রম করে। ফলে এ থেকে কোন কিছুই পালাতে পারে না। অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রথম তৎকালীন মহাকর্ষের ধারণার ভিত্তিতে কৃষ্ণ বিবরের অস্তিত্বের বিষয়টি উত্থাপিত হয়

জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি অনুসারে, কৃষ্ণগহ্বর মহাকাশের এমন একটি বিশেষ স্থান যেখান থেকে কোন কিছু, এমনকি আলো পর্যন্ত বের হয়ে আসতে পারে না। এটা তৈরি হয় খুবই বেশী পরিমাণ ঘনত্ব বিশিষ্ট ভর থেকে। কোন অল্প স্থানে খুব বেশি পরিমাণ ভর একত্র হলে সেটা আর স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতে পারে না। আমরা মহাবিশকে একটি সমতল পৃষ্ঠে কল্পনা করি। মহাবিশ্বকে চিন্তা করুন একটি বিশাল কাপড়ের টুকরো হিসেবে এবং তারপর যদি আপনি কাপড়ের উপর কোন কোন স্থানে কিছু ভারী বস্তু রাখেন তাহলে কি দেখবেন? যেইসব স্থানে ভারি বস্তু রয়েছে সেইসব স্থানের কাপড় একটু নিচু হয়ে গিয়েছে। এই একই বাপারটি ঘটে মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে। যেসব স্থানে ভর অচিন্তনিয় পরিমাণ বেশি সেইসব স্থানে গর্ত হয়ে আছে। এই অসামাণ্য ভর এক স্থানে কুন্ডলিত হয়ে স্থান-কাল বক্রতার সৃষ্টি করে। প্রতিটি গালাক্সির স্থানে স্থানে কম-বেশি কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিতের কথা জানা যায়। সাধারণত বেশীরভাগ গ্যালাক্সিই তার মধ্যস্থ কৃষ্ণ বিবরকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণনয়মান।

ব্লাকহোল শব্দের অর্থ কালো গহবর। একে এই নামকরণ করার পেছনে কারণ হল এটি এর নিজের দিকে আসা সকল আলোক রশ্মিকে শুষে নেয়। কৃষ্ণগহ্বর থেকে কোন আলোক বিন্দুই ফিরে আসতে পারে না ঠিক থার্মোডায়নামিক্সের কৃষ্ণ বস্তুর মতো।

এখন পর্যন্ত ব্লাকহোলের কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি কারণ এ থেকে আলো বিচ্ছুরিত হতে পারে না কিন্ত এর উপস্থিতির প্রমাণ আমরা পরোক্ষভাবে পাই। ব্লাকহোলের অস্তিতের প্রমাণ কোন স্থানের তারা নক্ষত্রের গতি এবং দিক দেখে পাওয়া যায়। মহাকাশবিদগণ ১৬ বছর ধরে আশে-পাশের তারামন্ডলীর গতি-বিধি পর্যবেক্ষণ করে গত ২০০৮ সালে প্রমাণ পেয়েছেন অতিমাত্রার ভর বিশিষ্ট একটি ব্লাকহোলের যার ভর আমাদের সূর্য থেকে ৪ মিলিয়ন গুন বেশি এবং এটি আমাদের আকাশগঙ্গার মাঝখানে অবস্থিত।

Schwarzschild black hole
মহাকর্ষীয় lensing এর সিমুলেশন (larger animation)

কৃষ্ণগহ্বর গবেষণার ইতিহাস[সম্পাদনা]

বিপুল পরিমাণ ভর বিশিষ্ট কোন বস্তু, যার মহাকর্ষের প্রভাবে আলোক তরঙ্গ পর্যন্ত পালাতে পারে না- এ ধারণা সর্বপ্রথম প্রদান করেন ভূতত্ত্ববিদ জন মিচেল (John Michell)। তাঁর লেখা একটি চিঠিতে ১৭৮৩ সালে তিনি রয়েল সোসাইটির সদস্য এবং বিজ্ঞানী হেনরি ক্যাভেন্ডিসকে (Henry Cavendish) এ সম্পর্কে জানান। ১৭৯৬ সালে গণিতবিদ পিয়েরে সিমন ল্যাপলেস একই মতবাদ প্রদান করেন তাঁর Exposition du système du Monde বইয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণে। কিন্তু পরবর্তী সংস্করণগুলোতে এ সম্পর্কিত ধারণা রাখা হয় নি। কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কিত এ ধরনের মতামত ঊনবিংশ শতাব্দিতে প্রকটভাবে উপেক্ষিত হয়। কারণ আলোর মতো ভরহীন তরঙ্গ কিভাবে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে সেটা বোধগম্য ছিল না।

সাধারণ আপেক্ষিকতা[সম্পাদনা]

১৯১৫ সালে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব উন্নিত করেন। এর আগেই আলোর গতিকে মধ্যাকর্ষণ শক্তি প্রভাবিত করতে পারার ব্যাপারটি প্রমাণিত হয়েছিল। কিছু মাস পরে কার্ল শোয়ার্জসচাইল্ড আইনস্টাইন ফিল্ড ইকুয়েশনের একটি সমাধান বের করেন যেটি বিন্দু ভর এবং গোলীয় ভরের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র বর্ণনা করে। এরপর বিজ্ঞানী হেন্ডরিক লরেঞ্জের ছাত্র জোহাননেস ড্রোস্ট স্বাধীনভাবে বিন্দু ভরের ক্ষেত্রে একই সমাধান প্রদান করেন এবং এর ধর্ম সম্পর্কে আরো বিস্তারিত প্রকাশ করেন। এই সমাধানের একটি বিচিত্র আচরণ ছিল।

ঘটনা দিগন্ত[সম্পাদনা]

ঘটনা দিগন্ত হচ্ছে কৃষ্ণগহ্বরের শেষ সীমানা, যেখান থেকে কোনও আলো ফেরত না আসাও এর অপর প্রান্তের কোনও ঘটনা জানা যায় না।