আহমদ শাহ দুররানি

স্থানাঙ্ক: ৩১°৩৭′১০″ উত্তর ৬৫°৪২′২৫″ পূর্ব / ৩১.৬১৯৪৪° উত্তর ৬৫.৭০৬৯৪° পূর্ব / 31.61944; 65.70694
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
আহমাদ শাহ আব্দালী
আমীর আহমাদ শাহ দুররানি =দূর-ই-দূর্‌রান(সকল মুক্তার সেরা মুক্তা)
Portrait miniature of Ahmad Shah Durrani.jpg
১৭৫৭ সালের আহমাদ শাহর একটি ফরাসি স্ক্রেচ যাতে কোহিনূর হীরা খচিত মুক্তো শোভা পাচ্ছে।
রাজত্ব১৭৪৭-১৭৭২
রাজ্যাভিষেকঅক্টোবর, ১৭৪৭
পূর্বসূরিহুসাইন হুতাক
উত্তরসূরিতিমুর শাহ দুররানি
জন্ম১৭২২
হেরাত, আফগানিস্তান
মৃত্যু১৬ অক্টোবর ১৭৭২(১৭৭২-১০-১৬) (বয়স ৪৯-৫০)
কান্দাহার প্রদেশ, আফগানিস্তান
সমাধি
কান্দাহার, আফগানিস্তান
৩১°৩৭′১০″ উত্তর ৬৫°৪২′২৫″ পূর্ব / ৩১.৬১৯৪৪° উত্তর ৬৫.৭০৬৯৪° পূর্ব / 31.61944; 65.70694
প্রাসাদদুররানি
রাজবংশদুররানি সাম্রাজ্য
পিতামোহাম্মদ জামান খান আব্দালি
মাতাজারঘোনা আলাকোজাই
ধর্মইসলাম (হানাফি সুন্নি)
১৭৪৭ সালে কান্দাহারে আবদালী প্রধানদের দ্বারা আহমদ শাহ দুররানির রাজ্যাভিষেক

আহমাদ শাহ আবদালী (১৭২২ - ১৬ অক্টোবর ১৭৭২) (পশতুন/ফারসি:احمد شاه دراني‎), আহমাদ খান আব্দালী (পশতুন/ফারসি: احمد خان ابدالي) আফগান জাতির সংগঠক। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের নায়ক। আহমাদ শাহ আবদালী সুলতান মাহমুদের পর ভারতে সর্বোচ্চ ২য় অভিযানকারী ব্যাক্তি। যিনি মোট ৯ বার ভারত আক্রমণ করেন। দুররানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও তাকে আধুনিক আফগানিস্তানের জনক বলা হয়ে থাকে।[১][২][৩][৪]

আহমাদ শাহ যুবক বয়সে আফসারিদ রাজ্যের সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং অতিশীঘ্রই তিনি ৪ হাজার আব্দালি পশতুন সৈন্যের কমান্ডার হিসেবে দ্বায়িত্ব পালনের সুযোগ পান।[৫] ১৭৪৭ সালের জুনে পারস্যের নাদের শাহ আফসার মৃত্যুবরণ করলে, আব্দালী কুরাশান-এর আমীর হন। তার পশতুন উপজাতি ও তাদের জোটদের নিয়ে তিনি পূর্ব দিকের মুঘল ও মারাঠা সাম্রাজ্য, পশ্চিম দিকে পারস্যের আফসারিবাদ সাম্রাজ্য ও উত্তর দিকে বুখারার খানাত পর্যন্ত তার সীমানা নির্ধারণ করেন।[৩][৬] কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি কুরাশানদের কাছ থেকে পশ্চিম থেকে পূর্বে কাশ্মির ও উত্তর ভারত এবং আমু দারায়ার কাছ থেকে উত্তর থেকে দক্ষিণে আরব সাগর পর্যন্ত আফগানদের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি করেন। আহমাদ শাহ আব্দালীর সমাধিস্তম্ভ আফগানিস্তানের কান্দাহারে অবস্থিত, শহরের কেন্দ্রস্থলের শ্রাইন অফ দ্য ক্লুয়াক নামে একটি মসজিদের পাশে। মনে করা হয় মুসলমানদের শেষ নবী মুহাম্মদ এর একটি আলখাল্লা এখানে রাখা আছে। আফগানিস্তানের লোকেরা দুররানিকে প্রায়ই আহমাদ শাহ বাবা বলে উল্লেখ করে থাকেন।[২][৭][৮][৯]

সামরিক অভিযান[সম্পাদনা]

সিংহাসনে আরোহণের পর আহ্‌মাদ শাহ্‌'র প্রথম কাজই ছিলো তাইমূরী সাম্রাজ্যভুক্ত ক্ববুলীস্তান(আফগানিস্তান) অধিকার করা! অথচ এটা ছিলো এমন সময় যখন মারাঠারা শক্তিধর হয়ে উঠেছিলো ক্রমান্বয়ে তাইমূরী সাম্রাজ্য গ্রাস করছিলো! পাঞ্জাবে শিখরা তাদের শক্তির জানান দিচ্ছিলো! এমতাবস্থায় বরং প্রয়োজন মারাঠা ও শিখদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা। কিন্তু আহ্‌মাদ শাহ্‌ আবদালী সেটা না করে- তাইমূরী সাম্রাজ্যই আক্রমণ করেন! কারণ? মহামোগল(Great Mughal)দের অঢেল ধন-সম্পদ! নাদির শাহ্‌'র আক্রমণ, অপরিমিত ধন-সম্পদ অধিকার, ক্বোহ্‌-ই-নূর ও ময়ূর সিংহাসন নিয়ে যাওয়ার পরও তাইমূরীদের ধন-সম্পদ ছিলো চোখ ধাঁধানো! আহ্‌মাদ শাহ্‌'র মূল উদ্দেশ্য ছিলো সেই ধন-সম্পত্তি অধিকার করা!

১৭৪৭ ঈসায়ীতে তাইমূরী সাম্রাজ্য আক্রমণ করে গোটা ক্ববুলীস্তান(আফগানিস্তান) অধিকারের পর-

১৭৪৮ সালে লাহোর আক্রমণ করেন। কাপুরুষ সুবাহ্‌দার হায়াতুল্লাহ্‌ খান পলায়ন করলে বিনা যুদ্ধে পাঞ্জাব অধিকার করেন আবদালী। উৎসাহী ও আত্নবিশ্বাসী আবদালী আরও এগিয়ে যান, সিরহিন্দে পৌছে যান আবদালী। তাইমূরী বাহিনী মানুপুরে আফগান বাহিনীর গতিরোধ করে দাঁড়ায়, এই সাহসের কারণ ছিলো বহুদিন পর স্বয়ং কোন বাদশাহ্‌যাদা সাম্রাজ্য রক্ষায় স্বয়ং রণক্ষেত্রে হাজির হয়েছেন। তাইমূরী বাদশাহ্‌যাদা আহ্‌মাদ খান সম্রাট আহ্‌মাদ শাহ্‌ আবদালীর মুখোমুখী হলেন! প্রচন্ড যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলেন আহ্‌মাদ শাহ্‌ আবদালী! কোনক্রমে প্রাণ হাতে করে পালিয়ে এলেন রাজধানী আহ্‌মাদ শাহী(কান্দাহার)তে।

আহ্‌মাদ শাহ্‌ আবদালীর ২য় ভারত অভিযানের পরাজয়-ই আহ্‌মাদ শাহ্‌ আবদালীর মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে তুলে যাদ্দরুণ মুসলিমভূমি হিন্দুস্তানের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান পরিচালনা করেন! আহ্‌মাদ খান বাহাদূর ১৭৪৮ সালেই হিন্দুস্তানের সিংহাসনে আরোহণ করেন। পরলোকগত সম্রাট মুহাম্মাদ শাহ্‌ তাইমূরী সাম্রাজ্যের সোনালী সময় যেমন দেখেছেন- তেমনি দেখেছেন পতন! নাদির শাহ্‌’র কাছে তিনিই পরাজিত হয়ে সব হারিয়েছিলেন। আবার তিনিই মৃত্যুশয্যায় যুবরাজের বীরত্ব ও আরেক হানাদারের পরাজয়ের সুসংবাদ শুনে যান। ক্ববুলীস্তান(আফগানিস্তান) হারানোর সংবাদ পাওয়া মাত্রই যুবরাজ আহ্‌মাদ খান তার সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করছিলেন, যাদ্দরুণ তিনি মানুপুরের প্রান্তরে আহ্‌মাদ শাহ্‌কে পরাজিত করতে সক্ষম হন। কিন্তু এটাই ছিলো তার ১মাত্র বিজয়! কেননা পরবর্তী বছরেই আবদালী প্রায় তার সমস্থ শক্তি নিয়ে হিন্দুস্তান আক্রমণ করেন। এটা ছিলো এমন ১টা সময়- যখন মারাঠাদের মাঝে বালাজী বাজী রাওয়ের মতো উচ্চাভিলাষী যোগ্য পেশ্‌ওয়ার আবির্ভাব হয়েছিলো! শিখরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো এবং বাংলা, অযোধ্যা ও দাক্ষিণাত্যের মতো অঞ্চলের সুবাহ্‌দারেরা প্রায় স্বাধীনভাবে প্রদেশগুলো শাসন করছিলো। আর তাইমূরী সাম্রাজ্যের অভিশাপ জঘন্য মন্ত্রীরা একে অপরের বিরুদ্ধে নোংরা ষড়যন্ত্রের খেলায় মত্ত ছিলো যে- কে প্রধানমন্ত্রী হবে!

বীর সম্রাট আহ্‌মাদ শাহ্‌ এমন এক সময় রাজত্ব করেন যখন দক্ষিণ থেকে মারাঠারা ও পশ্চিম থেকে আফগানেরা হিন্দুস্তানে অভিযানের পর অভিযান পরিচালনা করছিলো! ১৭৫৪ সালে সম্রাট আহ্‌মাদ শাহ্‌’র মৃত্যুর আগেই কাশ্মীরও কোহ্‌রাম আবদালী সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।

নওয়াব সিরাজ-উদ-দাওলাহ্‌’র সম্রাট আলামগীর(২য়) যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন তখন সম্রাটের প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে আছে কেবল রোহিলাখন্ড, দিল্লীআগরা প্রদেশ! ১৭৫৭ ঈঃ ‘ইসলামের ত্রাণকর্তা’ আহ্‌মাদ শাহ্‌ আবদালী এবং বালাজী বাজী রাও দু’জনই তাইমূরী সাম্রাজ্যকে নিজেদের করদ রাজ্য বানানোর জন্য উঠে পরে লাগলেন!

উৎসঃ সিয়ার-উল-মুতাখ্‌খিরীন(৩য় খন্ড)

প্রাথমিক জীবন[সম্পাদনা]

গুপ্তঘাতকের হাতে নাদির শাহ্‌ নিহত হলে তার সেনাপতিরা বাহুবলে তার বিরাট সাম্রাজ্যের একেক অংশ অধিকার করে বসে। তারই ধারাবাহিকতায় আহ্‌মাদ খান আবদালীও ১৭৪৭ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন আফগানিস্তানের প্রতিষ্ঠা করেন। আফগানিস্তানের বাহিরেও তিনি সিস্তান, বাদাখসান ও বাল্‌খ অধিকার করেন ও খোরাসানকে করদ রাজ্যে পরিণত করেন। আহ্‌মাদ খান সিংহাসনে আরোহণের পর আহ্‌মাদ শাহ্‌ উপাধীধারণ করেন এবং এই নামেই তিনি বিখ্যাত। আহ্‌মাদ শাহ্‌'র সিংহাসনে আরোহণের মাত্র ৮ বছর আগেই তার মুনীব নাদির শাহ্‌ ভারত আক্রমণ করেন, তিনিও ছিলেন তখন তার মুনীবের সঙ্গে। আহ্‌মাদ শাহ্‌'র সিংহাসনে আরোহণের সময়ও ভারতীয়দের মনে নাদিরের আক্রমণের ভয় দূরীভুত হয়নি! সে কারণেই আহ্‌মাদ শাহ্‌কে নিয়ে ভারতে এক আতঙ্ক কাজ করছিলো।

পরিচয়[সম্পাদনা]

পারস্যের সিংহ দিগ্বিজয়ী নাদির শাহ্‌, তার অন্যতম প্রিয় সেনাপতিই ছিলেন আবদালী গোত্রের আহ্‌মাদ খান আবদালী। নাদির শাহ্‌-ই তাকে দূর-ই-দূর্‌রান(সকল মুক্তার সেরা মুক্তা) উপাধীতে ভূষিত করেছিলেন। সেই থেকে আহ্‌মাদ খানের অপর নাম দূর-ই-দূররান আহ্‌মাদ খান আবদালী উরফে ‘আহ্‌মাদ খান দূররানী’।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

আহমদ শাহ দররানি ১৬ আক্টোবর, ১৭৭২ সালে কান্দাহার প্রদেশে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে কান্দাহার শহরের কেন্দ্রস্থলে শ্রাইন অফ দ্য ক্লোয়াকে দাফন করা হয়, যেখানে পরবর্তীতে একটি বড় সমাধিস্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

দুররানির কবিত্ব[সম্পাদনা]

আহমদ শাহ কয়েকটি কবিতার চরণ তার স্বজাতীয় ভাষা পশতুতে রচনা করেছিলেন। এছাড়াও তিনি ফরাসি ভাষায় কিছু কবিতা রচনা করেছিলেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হল একটি জাতির প্রতি ভালবাসা:

রক্তের সূত্রে তোমার ভালবাসায় ডুবে আছি,
তোমার জন্য যুবকরা তাদের মাথা দিয়েছে।
তোমার কাছে আমার হৃদয় পায় আরাম,
দূরে গেলে কষ্ট এসে সাপের মতো জড়ায়।
পর্বত-উঁচু আফগান স্বভূমিকে মনে হলে
দিল্লির সিংহাসনও আমি ভুলে যাই।
সারা দুনিয়া ও তুমি_ বেছে নিতে হলে
তোমার নিস্ফলা মরু নিতে দ্বিধা করব না।[১০][১১]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Aḥmad Shah Durrānī"Encyclopædia Britannica Online Version। ২০১০। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৮-২৫ 
  2. "Ahmad Shah and the Durrani Empire"Library of Congress Country Studies on Afghanistan। ১৯৯৭। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৯-২৩ 
  3. Friedrich Engels (১৮৫৭)। "Afghanistan"Andy Blunden। The New American Cyclopaedia, Vol. I। ২০১০-১০-১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৯-২৩ 
  4. Clements, Frank (২০০৩)। Conflict in Afghanistan: a historical encyclopedia। ABC-CLIO। পৃষ্ঠা 81। আইএসবিএন 978-1-85109-402-8। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৯-২৩ 
  5. "The Durrani dynasty"Encyclopædia Britannica Online। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৯-২৩ 
  6. Chayes, Sarah (২০০৬)। The Punishment of Virtue: Inside Afghanistan After the Taliban। Univ. of Queensland Press। পৃষ্ঠা 99। আইএসবিএন 978-1-932705-54-6। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৯-২৩ 
  7. Singh, Ganḍā (১৯৫৯)। Ahmad Shah Durrani: Father of Modern Afghanistan। Asia Publishing House। পৃষ্ঠা 457। আইএসবিএন 978-1-4021-7278-6। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৮-২৫ 
  8. "Ahmad Shah Abdali"Abdullah Qazi। Afghanistan Online। ২০১০-০৮-১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৯-২৩Afghans refer to him as Ahmad Shah Baba (Ahmad Shah, the father). 
  9. Runion, Meredith L. (২০০৭)। The history of Afghanistan। Greenwood Publishing Group। পৃষ্ঠা 71। আইএসবিএন 978-0-313-33798-7। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৯-২৩ 
  10. "Ahmad Shah Durrani (Pashto Poet)"Abdullah Qazi। Afghanistan Online। ২০১০-০৯-০৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৯-২৩ 
  11. "A Profile of Afghanistan – Ahmad Shah Durrani (Pashto Poet)"Kimberly Kim। Mine Action Information Center। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৯-২৩ 

গ্রন্থপঞ্জি[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

রাজত্বকাল শিরোনাম
পূর্বসূরী
হোসেন হোতাকি
আফগানিস্তানের আমির
১৭৪৭–১৭৭২
উত্তরসূরী
তিমুর শাহ দুররানি