আরকাম ইবনে আবিল আরকাম

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

আরকাম ইবনু আবি'ল আরকাম (৫৯৭-৬৭৫ খ্রিঃ) ছিলেন মুহাম্মদ স. এর একজন সাহাবা। তার বাড়িতে ইসলামের প্রথম দিককার মুসলমানগণ বিভিন্ন পরামর্শ ও মিটিং এর জন্য জমায়েত হতো।[১]

জীবনী[সম্পাদনা]

তিনি কুরাইশ বংশের মাখজুম গোত্রের সদস্য ছিলেন। তার পিতা আবুল আরকাম নামে পরিচিত ছিলেন যার আসল নাম আবদে মানাফ ইবনে আসাদ ইবনে উমর ইবনে মাখজুম এবং তার মা ছিলেন বনু খুজাআ গোত্রের উমাইমা বিনতে আল হারিস।[২][৩] তার দাদা আবু জুনদুব আসাদ ইবনে আবদুল্লাহ তার যুগে মক্কার একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন।

তিনি বনু আসাদ এর হিন্দ বিনতে আবদুল্লাহকে বিয়ে করেন। তাদের সন্তান হচ্ছে উমাইয়া এবং মরিয়াম। কিছু উৎসের দাবী অনুযায়ী তিনি উবায়দুল্লাহ, উসমান এবং সাফিয়ার পিতা ছিলেন। উবায়দুল্লাহর বংশধরেরা সবাই মারা যায়। তাই উসমানের বংশধরদের মাধ্যমে আল আরকামের বংশধারা টিকে থাকা।[৪]

ইসলাম গ্রহণ[সম্পাদনা]

আল-আরকাম আবু বকরের দাওয়াতে ইসলাম গ্রহণ করা অষ্টম ব্যক্তি।"[৫] তবে কেও কেও তিনি বলেন ১১ তম অথবা ১২ তম ব্যক্তি। এছাড়াও ইসলামপূর্ব যুগে মুহাম্মাদের নেতৃত্বে মক্কায় ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে যে কল্যাণ সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, আরকাম ছিলেন তার অন্যতম সদস্য।

হযরত আরকাম যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন মুহাম্মাদ সহ সকল মুসলমানের অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক ছিলো। মক্কার পৌত্তলিক শক্তি চাচ্ছিল, শক্তি অর্জনের পূর্বেই এ আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে। ইসলাম গ্রহণের পর হযরত আরকামের বাড়ীটি ইসলামের গোপন ঘাঁটিতে পরিণত হয়। ইসলামের দাওয়াত ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এ বাড়িটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

হায়াতুস সাহাবা গ্রন্থের বর্ণনামতে, মুসলমানদের সংখ্যা যখন ৩৮ জনে উন্নীত হলো, আবু বকর ও অন্যরা তখন মুহাম্মাদকে চাপ দিলেন প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য। তাদের দাবীর মুখে মুহাম্মাদ রাজী হলেন। তারা আরকামের বাড়ী থেকে বেরিয়ে মসজিদে হারামে বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে পড়লেন।

হিজরত[সম্পাদনা]

নবুওয়াতের ১৩ তম বছরে হিজরতের আদেশ হলে অন্যান্য সাহাবীদের সাথে আরকাম মদিনায় পৌঁছেন। আবু তালহা ইবনে সাহলের সাথে তার ভ্রাতৃ-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য মুহাম্মাদ তাকে মদিনার বনু যুরাইক মহল্লায় এক খণ্ড ভূমি দান করেন।[৬]

আরকামের মূল পেশা ছিল ব্যবসা বাণিজ্য। হিজরতের পর তিনি মদিনায় স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। মক্কার তার ঐতিহাসিক বাড়িটি তিনি সন্তান-সন্ততিদের জন্য ওয়াক‌ফ করে যান। দীর্ঘদিন যাবৎ মক্কার এ বাড়ীটি ভ্রমণকারীদের দর্শনস্থল হিসাবে বিবেচিত হতো।

যুদ্ধে অংশগ্রহণ[সম্পাদনা]

তিনি ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধে অংশ নেন এবং আল-মারজুবান নামের তলোয়ার লাভ করেন।[৭] এছাড়াও তিনি উহুদ, খন্দক, খাইবারসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে অংশগ্রহণ করে বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দেন।[৮] মুহাম্মাদ তাকে যাকাত আদায়কারী হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

তিনি ৫৫ হিজরি সন ও ৬৭৫ খ্রিষ্টাব্দে ৮৩ বছর বয়সে মুয়াবিয়ার আমলে মারা যান।[৬] তিনি মৃত্যুর পূর্বে অসিয়ত করে যান, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস তার জানাযার নামায পড়াবেন। কিন্তু সাদ মদিনা থেকে একটু দূরে ‘আকীক’ নামক স্থানে ছিলেন। তার উপস্থিত হতে একটু বিলম্ব হলে মদিনার তৎকালীন ওয়ালী মারওয়ান ইবন হিকাম বিরক্ত হয়ে নিজেই জানাজা পড়াতে গেলে আরকামের পুত্র উবাইদুল্লাহ ইবনে আরকাম অনুমতি দিলেন না। ফলে উবায়দুল্লাহ এর সাথে মারওয়ানের বিতর্ক সৃষ্টি হয়, বনু মাখযুম গোত্রও উবাইদুল্লাহর সমর্থনে এগিয়ে আসে। বাকবিতণ্ডা চলছে, এমন সময় সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস এসে উপস্থিত হলেন। তিনি জানাযার নামায পড়ালেন এবং লাশ মদীনার জান্নাতুল বাকী গোরস্থানে দাফন করা হলো।

আল আরকামের গৃহ[সম্পাদনা]

মক্লায় কুরাইশ পৌত্তলিকদের অত্যাচারের মাত্রা দিন দিন বাড়তে থাকে। মুসলমানগণ শান্তিতে উপসনা করতে পারছিলো না। আস সাফা পর্বতের পূর্বে আল আরকামের বাড়ি জমায়েতের জন্যে নিরাপদ ছিলো। সেখানে তারা মিলিত হয়ে মুহাম্মদ স. এর কাছে ইমান ইসলামের শিক্ষা নিতো। বাড়ির সামনের পথ খুবই সরু হওয়ায় বাড়ির ভেতরে গোপনে প্রবেশ এবং বের হওয়া যেতো। বাড়ির ভেতর থেকে পথের উপর নজর রাখা যেতো।[৯] ইসলাম প্রচারের ৫ম বছরে আরকামের গৃহ ইসলামের ঘর নামে পরিচিতি পায়। এটিই প্রথম ইসলামী মাদ্রাসা (ইসলামী বিদ্যালয়) হিসেবে স্বীকৃত।[১০] যেখানে মুহাম্মদ স. ছিলেন শিক্ষক এবং আরবের প্রথম মুসলমানেরা ছিলেন শিক্ষার্থী।

নতুন ইসলাম গ্রহণকারীদের আল-আরকামের গৃহে আনা হতো। প্রচারের ষষ্ঠ বছরে (৬১৫-৬১৬ খ্রিষ্টাব্দ) দুজন ক্ষমতাশালী কুরাইশ মুহাম্মাদ স. এর চাচা হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব এভং উমর ইবনুল খাত্তাব ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন।[১১] উমারের ইসলাম গ্রহণে মুসলমানের সংখ্যা ৪০ উত্তীর্ণ হয়। এ দলটি সারাবিশ্বে ইসলাম প্রসারের উদ্যোগ নেয়।[১২]

বাড়ির ইতিহাস[সম্পাদনা]

আল আরকাম তার পুত্রকে এই শর্তে বাড়িটি দেন যে সে এটা বিক্রি করবেনা। আরকামের এ বাড়িটি ছিল সাফা পাহাড়ের পাদদেশে। সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে তাওয়াফ করার সময় ঠিক বাড়িটির দরজার সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে হতো। আব্বাসী খলিফা মানসুরের সময় ১৪০ হিজরি পর্যন্ত বাড়ীটি অবিকৃত অবস্থায় ছিল। কিন্তু এ বছরই মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে হাসান মদিনায় আব্বাসী শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। আরকামের পৌত্র আবদুল্লাহ ইবন উসমানও ছিলেন এ বিদ্রোহের একজন সমর্থক ও সহযোগী। এ কারণে খলিফা আল মানসুরের নির্দেশে মদিনার তৎকালীন ওয়ালী তাকে গ্রেফতার করেন। খলীফা মানসুর তার বিশ্বস্ত সহকারী শিহাব উদ্দিন ইবনে আবদে বরকে পাঠালেন আবদুল্লাহর নিকট এই বাড়িটি ক্রয়ের প্রস্তাব দিয়ে।

আবদুল্লাহ প্রথমত বিক্রী করতে অস্বীকার করেছিলেন; কিন্তু কয়েদ থেকে মুক্তির শর্তে এবং উচ্চ মূল্যের লোভে শেষ পর্যন্ত বিক্রী করতে সম্মত হন।[১৩] আল মানসুর ১৭,০০০ দিনারের বিনিময়ে এ ঐতিহাসিক বাড়িটির মালিকানা লাভ করেন। বাড়ীটির অন্য শরীকরা প্রথমত রাজী না হলেও আস্তে আস্তে তারাও রাজী হয়ে যান। খলীফা মানুসরের পর খলীফা মাহদী এ বাড়ীটি তাঁর প্রিয়তমা দাসী খায়যুরানকে দান করেন। তিনি বাড়িটির পুরনো কাঠামো ভেঙ্গে সম্পূর্ণ নতুন অট্টালিকা তৈরী করেন। এবং বাড়িটি এখন দারুল খায়জুরান নামে পরিচিত।[১৩] বর্তমানে এটা কাবার বিপরীত পাশে অবস্থিত এবং একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।[১৪]

চরিত্র বর্ণনা[সম্পাদনা]

তাকওয়া, দ্বীনদারী, দুনিয়াবী ভোগ-বিলাসের প্রতি অনীহা ও সততা ছিল আরকামের চরিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ইবাদাত ও শববিদারীর প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আকর্ষণ। ব্যবসা বানিজ্যে পারদর্শী এ ব্যক্তি ছিলেন সুপরিচিত সৎ ও দক্ষ ব্যবসায়ী।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "যে সাহাবির বাড়ি ছিল নবীজির প্রাথমিক কার্যালয় | কালের কণ্ঠ"Kalerkantho। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৭-১৮ 
  2. Muhammad ibn Saad, Tabaqat vol. 3. Translated by Bewley, A. (2013). The Companions of Badr, p. 185. London: Ta-Ha Publishers.
  3. "Research-Interest"www.pmu.edu.sa। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৭-১৮ 
  4. Ibn Saad/Bewley, p. 185.
  5. মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক, সিরাত রাসুল আল্লাহ। অনুবাদঃ গুইল্লাউমে , আ. (1955). দ্যা লাইফ অভ মুহাম্মদ, p. 116. অক্সফোর্ড: Oxford University Press.
  6. Ibn Saad/Bewley, p. 187.
  7. ইবনু ইসহাক/গুইল্লাউমে , pp. 307-308.
  8. ইবনে সাআদ/বিউলে, পৃষ্ঠা- 187.
  9. "The Prophet and the Muslims in Dar al-Arqam"। Questions on Islam ।  । সংগ্রহের তারিখ 2012-07-11  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)
  10. "ইসলামের প্রথম মাদরাসা দারুল আরকাম"Daily Nayadiganta। ১৯৭০-০১-০১। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৭-১৮ 
  11. Ibn Saad/Bewley, pp. 3, 206.
  12. "The honorable Companion, Al-Arqam ibn Abil-Arqam, may Allaah be pleased with him - Islam web - English"। Islam web । 2006-03-27 । সংগ্রহের তারিখ 2012-07-11  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)
  13. Ibn Saad/Bewley, p. 186.
  14. "আল-আরকাম ইবন আবিল আরকাম (রাঃ)"ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া। ২০১৫-১০-০৩। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৭-১৮