শি জিনপিং

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
শি জিনপিং
Xi Jinping Sept. 19, 2012.jpg
তথ্য
জন্ম: ১৫ জুন, ১৯৫৩ (৫৯ বছর)
পদ: গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের উপ-রাষ্ট্রপতি
রাজনৈতিক দল: কমিউনিস্ট পার্টি অফ চায়না (সিপিসি)
অন্যান্য দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সামরিক পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান, সিপিসির কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের মূখ্য সচিব
দায়িত্বপালনরত অবস্থায় নেতা: হু জিনতাও
উচ্চশিক্ষা: কিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়
জন্মস্থান: বেইজিং, গণপ্রজাতন্ত্রী চীন
স্ত্রী: পেং লিউয়ান

শি জিনপিং (জন্ম: ১৫ জুন, ১৯৫৩) গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের একজন উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব। তিনি বর্তমানে একাধারে চীনের রাষ্ট্রপতি, চীনের রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রীয় সামরিক পরিষদের চেয়ারম্যান, কমিউনিস্ট পার্টি অফ চায়নার মহাসচিব এবং কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সামরিক পরিষদের চেয়ারম্যান।

শি জিনপিং দীর্ঘকাল যাবত সক্রিয় ও প্রয়াত সিপিসি নেতা শি জোংশুনের সন্তান। জিনপিং তার জন্মস্থান ফুজিয়ান প্রদেশে তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা করেন। পরে তিনি পার্শ্ববর্তী চেচিয়াং প্রদেশের দলীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জিনপিং দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে আসেন পরে সাংহাইয়ের দলীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে।

শি জিনপিং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান এবং রাজনৈতিক ও বাজার অর্থনীতির সংস্কার প্রসঙ্গে খোলামেলা নীতির জন্য খ্যাত।[১] বর্তমান দায়িত্বসমূহ ও বিশেষ নীতির কারণে তাকে কমিউনিস্ট পার্টি অফ চায়নার মহাসচিব ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি হু জিনতাও'র সম্ভাব্য উত্তরসূরী হিসেবে ধারণা করা হয় ও দলের পঞ্চম প্রজন্মের অন্যতম নেতা হিসেবে গণ্য করা হয়।[২]

জীবনী[সম্পাদনা]

প্রাথমিক জীবন[সম্পাদনা]

শি জিনপিং ১৫ জুন ১৯৫৩ তারিখে বেইজিংয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈত্রিক নিবাস হেনান প্রদেশের তেংচু জেলার শিয়িং শহরে।[৩] তিনি উত্তর চীনের শানসি প্রদেশে কমিউনিস্ট গেরিলা আন্দোলনের অন্যতম নেতা, পরবর্তীতে চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী শি জোংশুনের দ্বিতীয় সন্তান। জিনপিঙ্গের জন্মগ্রহণের সময়ে জোংশুন কমিউনিস্ট পার্টির প্রপাগান্ডা বিভাগের প্রধান ছিলেন এবং পরে ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। জিনপিঙ্গের ১০ বছর বয়সে তার বাবা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ পর্যায়ে রাজনৈতিক কোন্দলের শিকার হন এবং প্রতিহিংসাবশত বদলির ফলে হেনান প্রদেশের লুইয়াং শহরের একটি কারখানায় নিযুক্ত হন।[৪] ১৯৬৮ সালের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ফলে জোংশুন আবারও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন ও এবার গ্রেপ্তার হন, যখন জিনপিঙ্গের বয়স ১৫। এসময়ে বাবার ছত্রচ্ছায়ার বাইরে আসতে বাধ্য জিনপিং মাও সেতুং-এর ডাউন টু দ্য কান্ট্রিসাইড (গ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা) কর্মসূচীতে অংশ নেন ও ১৯৬৯ সালে শানসি প্রদেশের ইয়ানানে ইয়াঞ্চুয়ান শহরে বসবাস করতে যান। তিনি সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির উৎপাদন বিষয়ক উপদলের প্রধান নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালে তিনি যখন এই কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসেন তখন তার বয়স মাত্র ২২ বছর। কর্মসূচিটিতে যোগ দেয়ার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে জিনপিং এক সাক্ষাৎকারে বলেন[৫],

এটি একটি আবেগময় অভিজ্ঞতা ছিল। অংশ নেয়ার সময়ে আমাদের অন্যরকম এক মনোভাব ছিল। পরে যখন সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে আর বাস্তবায়ন করা গেল না, তখন আমরা বুঝলাম আমরা আসলে একটা ঘোরের মাঝে ছিলাম।

জিনপিং ১৯৭৫ সালে রসায়ন প্রকৌশল অধ্যয়নের জন্য চীনের বিখ্যাত কিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৭৯ সালে উত্তীর্ণ হন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুবার পর তিনি তার বাবার রাজনৈতিক অনুসারী, তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় সামরিক পরিষদের মহাসচিব জেঙ্গ বিয়াওর সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্বে বহাল ছিলেন। শি জিনপিং ১৯৮৫ সালে মার্কিন কৃষিব্যবস্থা বিষয়ে গবেষণারত একটি চীনা প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া অঙ্গরাজ্যের মুস্কাটিন শহর ভ্রমণ করেন।[৬]

উত্থান[সম্পাদনা]

জিনপিং ১৯৭১ সালে কমিউনিস্ট ইউথ লীগে যোগদান করেন এবং ১৯৭৫ সালে সেখান থেকে কমিউনিস্ট পার্টি অফ চায়নায় যোগ দেন। ১৯৮২ সালে দলের একজন সম্পাদক হিসেবে তাকে হাবেই প্রদেশের চেঙ্গডিং জেলায় পাঠানো হয়েছিল। রাজনৈতিক জীবনে জিনপিং চারটি প্রদেশে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন- শাংসি, হাবেই, ফুজিয়ান ও চেচিয়াং।

জিনপিং ফুজিয়ান প্রদেশের ফুৎসু পৌর শহর কমিউনিস্ট পার্টির একাধিক পদে বহাল ছিলেন ও ১৯৯০ সালে ফুৎসু দলীয় বিদ্যালয়ের সভাপতি হন। ১৯৯৯ সালে তিনি ফুজিয়ান প্রদেশের ডেপুটি গভর্নর নিযুক্ত হন, এবং পরের বছর গভর্নর ঘোষিত হন। ফুজিয়ানের গভর্নর থাকাকালীন জিনপিং মুক্ত বাজার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার উদ্যোগ নেন এবং বিনিয়োগের জন্য তাইওয়ানের উদ্যোক্তাদেরকে আমন্ত্রণ করেন।

২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে গভর্নর জিনপিং ও প্রদেশের দলীয় সম্পাদক চেন মিঙ্গয়ি বহুল আলোচিত ইয়ানহুয়া কেলেংকারি প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা দিতে কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ চার নেতা- তৎকালীন রাষ্ট্রপতিমহাসচিব জিয়াং জেমিন, প্রধানমন্ত্রী চু জুংচি, উপ-রাষ্ট্রপতি হু জিনতাও এবং প্রধান শৃংখলা পরিদর্শক ওয়েই জিয়ানসিঙ্গের দ্বারা গঠিত একটি বোর্ডের সামনে উপস্থিত হন।[৭]

২০০২ সালে জিনপিং চেচিয়াং প্রদেশের শীর্ষ একাধিক রাজনৈতিক ও সরকারী পদে নিযুক্ত হন। এ বছরই ভারপ্রাপ্ত গভর্নর থাকা অবস্থায় তিনি অর্থনৈতিকভাবে সফল এই উপকুলীয় প্রদেশটির কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান নিযুক্ত হন।

শি জিনপিং ১৫তম সিপিসি কেন্দ্রীয় কমিটির একজন বিকল্প সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি ১৬তম সিপিসি কেন্দ্রীয় কমিটিরও একজন সদস্য ছিলেন এবং এর মধ্য দিয়ে চীনের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বে তার প্রবেশ ঘটে।

চেচিয়াং প্রদেশ, যেটি অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সফল ও অধুনা চীনের অর্থনৈতিক সাফল্যের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়, সেখানকার শীর্ষ রাজনীতিবিদ হিসেবে জিনপিং সেখানে স্বাস্থ্যকর অর্থনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখার জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। তার দায়িত্বপালনকালে প্রাদেশিক অর্থনীতিতে ১৪ শতাংশেরও বেশি হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। চেচিয়াঙ্গে দায়িত্ব পালনকালে জিনপিং দুর্নীতিবিরোধী কঠোর ও অকপট নেতা হিসেবে একই সাথে জাতীয় গণমাধ্যম ও কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের মনযোগে আসেন।

২০০৬ সালে একটি অর্থ কেলেংকারির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে সাংহাই কমিউনিস্ট পার্টি প্রধান চেন লিয়াঙ্গয়ুকে বহিষ্কার করা হলে তার জায়গায় পরের বছর জিনপিংকে সেখানে পাঠানো হয়। সাংহাইর দলীয় প্রধান, যেটি চীনের রাজনৈতিক কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ হিসেবে বিবেচিত হয়, এখানে শি জিনপিঙ্গের নিয়োগের ফলে তার উপর কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় শীর্ষ পর্যায়ের আস্থার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে। সাংহাইতে দায়িত্ব পালনকালে জিনপিং সকল বিতর্ক এড়িয়ে সতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করেন। জিনপিঙ্গের রাজনৈতিক জীবনের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এত গুরুত্বপূর্ণ সব দায়িত্ব পালন করা অবস্থায় তিনি কখনও কোন রাজনৈতিক বিতর্ক, কেলেঙ্কারি ও কোন্দলের মুখে পড়েননি।

কার্যকরী কমিটিতে যোগদান ও উপ-রাষ্ট্রপতিত্ব[সম্পাদনা]

উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিনপিঙ্গের প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফরে আগস্ট ২০০৮-এ সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ
সেপ্টেম্বর ২০১০-এ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভিয়েদিয়েভের সাথে জিনপিঙ্গের সাক্ষাৎ।

সাংহাই কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক পদে নিয়োগের মধ্য দিয়েই এটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে শি জিনপিং চীনের পঞ্চম প্রজন্মের নেতৃত্বের অংশ হতে যাচ্ছেন। ২০০৭ সালের অক্টোবরে সিপিসির ১৭তম কংগ্রেসে ৯-সদস্য বিশিষ্ট পলিটব্যুরো কার্যকরী কমিটিতে তার অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে এটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে। জিনপিং পলিটব্যুরোতে লি কেকিয়াঙ্গের উপরে স্থান লাভ করেন এবং এর মধ্য দিয়ে এটা অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যায়- শি জিনপিঙ্গই হতে যাচ্ছেন চীনের পরবর্তী প্যারামাউন্ট লিডার বা ‘একচ্ছত্র নেতা’। একই সময়ে জিনপিং কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের প্রধান নিযুক্ত হন। ২০০৮ সালের মার্চে সিপিসির ১১তম জাতীয় গণসম্মেলনে জিনপিং গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের উপ-রাষ্ট্রপতি ঘোষিত হলে ‘একচ্ছত্র নেতা’ হওয়ার ক্ষেত্রে তার সম্ভাবনা আরও জোরদার হয়।[৮] ধারণা করা হয়ে থাকে, জিনপিঙ্গের উজ্জ্বল সম্ভাবনার একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে তার সাথে বর্তমান রাষ্ট্রপতি হু জিনতাও ও উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার পূর্বসূরী জেং কিংহঙ্গের, অর্থাৎ চীনা রাজনীতির বহুমুখী নেতৃত্বের সুসম্পর্ক।

কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ পর্যায়ে আসীন হওয়ার পর থেকে জিনপিং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল হয়েছেন বা দায়িত্ব লাভ করেছেন। তিনি ২০০৮ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের আয়োজক দলের নেতৃত্ব দেন। একই সাথে তিনি হংকংম্যাকাও বিষয়ক দপ্তরেরও দায়িত্বে ছিলেন। তাকে কেন্দ্রীয় দলীয় বিদ্যালয়, যেখান থেকে সিপিসির আদর্শগত শিক্ষা দেয়া হয় এবং ক্যাডাররা প্রশিক্ষণ লাভ করে, এই প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০০৮ সালে সিচুয়ান ভূমিকম্পের পর তিনি উচ্চপদস্থ সরকারী এবং রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব হিসেবে শাংসি ও গানসু প্রদেশ পরিদর্শন করেন। উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিনপিং তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে ২০০৮ সালের মে মাসে মাত্র ৮ দিনের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, মঙ্গোলিয়া, সউদি আরব, কাতারইয়েমেন ভ্রমণ করেন। গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক শেষ হওয়ার পর জিনপিঙ্গের উপর গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ৬০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের মহোৎসব আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।[৯]

এছাড়াও অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রচারিত আছে, শি জিনপিং ৬৫২১ প্রজেক্ট নামে সিপিসির সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি গোপন কমিটির প্রধান ছিলেন, যে কমিটির দায়িত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ চারটি দিবস (গণপ্রজাতন্ত্রের ৬০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, তিব্বত বিদ্রোহের ৫০তম বার্ষিকী, তিয়ানামেন স্কয়ার আন্দোলনের ২০তম বার্ষিকীফালুন গং দমনের ১০ম বার্ষিকী- অনানুষ্ঠানিক প্রজেক্টটি নামকরণ হয়েছে বার্ষিকীগুলোর আদি সংখ্যা থেকে) উপলক্ষে সরকারবিরোধীদের বিরুদ্ধে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।[১০]

চীনের শুরুর দিককার প্রসিদ্ধ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের সন্তানদের যারা রাজনীতিতে এসেছেন, তাদের মধ্যে শি জিনপিংকে সবচেয়ে সার্থক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর চীনবিষয়ক নীতিনির্ধারক ও প্রতিনিধিদের মধ্যে শি জিনপিঙ্গের জনপ্রিয়তা রয়েছে। সিঙ্গাপুরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লী কুয়ান ইউ জিনপিং সম্পর্কে বলেন, “তিনি একজন চিন্তাশীল মানুষ যিনি রাজনৈতিক জীবনে বহু পরীক্ষা ও পর্যায় পার হয়ে এই অবস্থানে এসেছেন”।[১] ইউ আরও বলেন, “আমি তার রাজনৈতিক সত্তাকে নেলসন ম্যান্ডেলার সাথে এদিক থেকে তুলনা করি, যে তিনি আবেগের দিক থেকে একজন স্থিতিশীল মানুষ যিনি নিজের বিচার বিবেচনাকে ব্যাক্তিগত ভোগান্তি বা দুর্ভোগের দ্বারা প্রভাবিত হতে দেন না। এক বাক্যে শি জিনপিং একজন সন্তোষজনক মানুষ।”[১১]

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক অর্থ মন্ত্রী (সেক্রেটারি অফ ট্রেজারি) হেনরি পলসন জিনপিংকে এভাবে বর্ণনা করেন, “এমন একজন মানুষ যিনি জানেন কীভাবে লক্ষ্যে পৌঁছতে হয়”।[১২]

উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিদেশ সফর[সম্পাদনা]

২০০৯ সালে যখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট তুঙ্গে, তখন বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি চীনের উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে শি জিনপিং ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ আমেরিকা সফর করেন। তিনি চীনের কূটনৈতিক তৎপরতাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একাধারে মেক্সিকো, জ্যামাইকা, কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলাব্রাজিল সফর করেন। ভেনিজুয়েলা সফরে তার সাথে হুগো চাভেজের বৈঠক হয়।

১১ ফেব্রুয়ারি তারিখে মেক্সিকো সফরকালে জিনপিং অর্থনৈতিক সঙ্কট নিরসনে চীনের ভূমিকা তুলে ধরতে গিয়ে বলেন,[১৩]

“অর্থনৈতিক সঙ্কট নিরসনে চীনের ভূমিকা ছিল সমগ্র মানবজাতির প্রতি এর অবদানগুলোর মাঝে অন্যতম, যার ফলে বিশ্বব্যাপী ১৩০ কোটি মানুষের ক্ষুধা নিবারণ সম্ভব হয়েছে”।

চীনের বৈদেশিক ও অর্থনৈতিক নীতিমালায় বৈদেশিক হস্তক্ষেপের নিন্দা, যেটি সাধারণত চীনের রাজনীতিতে একটি স্পর্শকাতর বিষয়, এ প্রসঙ্গে জিনপিং সরাসরি মন্তব্য করে বলেন,[১৪][১৫]

“কিছু নিষ্কর্মা বিদেশী আছে, যাদের পেট সব সময়ে ভরা থাকে, তারা আর কোন কাজ না পেয়ে শুধু চীনের উপর দায় চাপিয়ে দেয়। এক্ষেত্রে বক্তব্য হচ্ছে- প্রথমত, চীন বিশ্বে বিপ্লব রপ্তানি করছে না; দ্বিতীয়ত, চীন বিশ্বে ক্ষুধা আর দারিদ্র্যও রপ্তানি করছে না; তৃতীয়ত, তোমাদের মাথাব্যথার কারণ সৃষ্টি করার কোন উদ্দেশ্যও চীনের নেই। এরপর আমরা আর কী বলতে পারি?”

তাৎক্ষণিকভাবে এই বক্তব্যটি শুধু স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত হলেও পরে একে কেন্দ্র করে চীনের ইন্টারনেট মহলে আলোচনার ঝড় উঠে।[১৬]

দক্ষিণ আমেরিকামধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও শি জিনপিং আরও কিছু দেশ সফর করেছেন। রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকাররা মন্তব্য করেন, এগুলো মূলত চীনের আগামী ‘একচ্ছত্র নেতা’ হিসেবে শি জিনপিংয়ের কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার প্রচেষ্টার অংশ।

২০০৯ সালের অক্টোবরে পাঁচদিনের আন্তর্জাতিক সফরে জিনপিং বেলজিয়াম, জার্মানি, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরিরোমানিয়া সফর করেন।[১৭] ঐ বছরেরই ডিসেম্বরে এক সপ্তাহ সময়ের মধ্যে তিনি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, কম্বোডিয়ামায়ানমার সফর করেন।[১৮]

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিনপিং যুক্তরাষ্ট্র, আয়ারল্যান্ডতুরস্ক সফর করেন। যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময়ে তিনি হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামারভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সাথে বৈঠিক করেন।[১৯] জো বাইডেনের ২০১১ সালের চীন সফরের সূত্রে তার সাথে জিনপিংয়ের পূর্ব ঘনিষ্ঠতা ছিল।[২০] জিনপিং যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় ক্যালিফোর্নিয়া যান। তিনি আইওয়া রাজ্যের মুস্কাটিন শহরেও যান, যেখানে তিনি ১৯৮৫ সালে একটি কৃষি পরিদর্শন দলের সদস্য হিসেবে এসেছিলেন। তিনি তার তখনকার আতিথ্যদানকারী পরিবারগুলোর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ[সম্পাদনা]

শি জিনপিং ২০০৯ ও ২০১১ সালে টাইম ম্যাগাজিন ঘোষিত বিশ্বের ১০০ জন সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষের তালিকায় ছিলেন।[২১] ২০১০ সালে তিনি ব্রিটিশ ম্যাগাজিন নিউ স্টেটসম্যান ঘোষিত ৫০ জন সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষের তালিকায় চতুর্থ স্থানে ছিলেন।[২২]

আশা করা হয়েছিল ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে সিপিসির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্ব পরিবর্তনে শি জিনপিং সামরিক পরিষদে গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ করবেন। কিন্তু তার বদলে অপর এক নেতাকে কেন্দ্রীয় সামরিক পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হলে জিনপিংয়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করেন। চীন বিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষক চেং লি মন্তব্য করেন, সামরিক পরিষদে জিনপিংয়ের এই স্থান না পাওয়া প্রমাণ দেয় যে সিপিসির শীর্ষ নেতারা তাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণে আরও বেশি চুলচেরা বিশ্লেষণ চালাচ্ছে।[২৩] অবশ্য ইতোমধ্যেই জিনপিং সংশয়ের ঊর্ধে আশাবাদের চেয়েও বেশি ক্ষমতাধর একাধিক পদে আসীন ছিলেন। এছাড়াও ২০১০ সালের অক্টোবরে জিনপিংকে সিপিসির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়, ১৯৯৯ সালে যে পদটিতে আসীন ছিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি হু জিনতাও[২৪][২৫][২৬][২৭]

২০১০ সালের শেষ নাগাদ এটা মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যায় যে শি জিনপিং ২০১২২০১৩ সালে যথাক্রমে সিপিসির মহাসচিব ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের রাষ্ট্রপতি হিসেবে হু জিনতাওর স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন।[২৮][২৯]

ব্যক্তিগত জীবন[সম্পাদনা]

শি ১৯৮০ সালে কে লিংলিংকে বিয়ে করেন। তিন বছর পর তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। ১৯৮৭ সালে জিনপিং বিখ্যাত লোকগায়িকা পেং লিউয়ানকে বিয়ে করেন। উল্লেখ্য বিয়ের সময় পেং লিউয়ান চীনে তার স্বামী শি জিনপিঙ্গের চেয়ে অনেক বেশি বিখ্যাত ও পরিচিত মুখ ছিলেন। স্বামী ও স্ত্রীর ভিন্নধারার জীবনের জন্য দীর্ঘ সময়ে তাদেরকে আলাদা থাকতে হয়। শি মিংসে নামে তাদের একটি কন্যা আছে।[৩০] মিংসে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশুনা শুরু করেন।[৩১]

শি জিনপিং রসায়ন প্রকৌশলরাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছেন।[৩২]

স্ত্রী পেং লিউয়ান জিনপিংকে একজন কঠোর পরিশ্রমী, পরিমিত ও সাধাসিধে মানুষ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, “তিনি যতক্ষণ বাড়িতে থাকেন, তখন তার উপস্থিতি কখনওই জানান দেয় না যে একজন এত বড় মাপের রাজনৈতিক নেতা বাড়িতে অবস্থান করছেন। আমার কাছে তিনি শুধুই আমার স্বামী”।[৩৩]

শি জিনপিঙ্গের সাথে ব্যাক্তিগত পর্যায়ে পরিচয় আছে, এমন ব্যাক্তিদের উদ্ধ্বৃত করে ২০১১ সালে ওয়াশিংটন পোস্ট একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে, যাতে জিনপিংকে একজন উদ্যোগী, আন্তরিক, সতর্ক, পরিশ্রমী, সাধাসিধে ও মুখচোরা মানুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আরও বলা হয়, তিনি একজন বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ যিনি সহজে কোন সমস্যা সমাধান করতে পারেন এবং কখনও উচ্চপদের ভাবগাম্ভীর্যে আবদ্ধ থাকেন না।[৩৪] জানা যায়, শি জিনপিং স্টিভেন স্পিলবার্গের সেভিং প্রাইভেট রায়ান[৩৫]মার্টিন স্করসিসের দ্য ডিপার্টেডের ভক্ত। আবার একই সাথে তিনি চীনের স্বাধীন নির্মাতা জিয়া ঝাংকেরও এখনও অনুরাগী।[৩৬]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ Ansfield, Jonathan (22 December 2007)। "Xi Jinping: China’s New Boss And The ‘L’ Word"Newsweek। সংগৃহীত 20 October 2010 
  2. "deckblatt-ca-data sup-form.pdf" (PDF)। সংগৃহীত 20 October 2010 
  3. zh:习仲勋
  4. Bouée, Charles-Edouard, China's Management Revolution: Spirit, Land, Energy, (Palgrave Macmillan, 15 Dec 2010), p. 93; via Googlebooks. Retrieved 15 February 2012.
  5. Watts, Jonathan (26 October 2007)। "Most corrupt officials are from poor families but Chinese royals have a spirit that is not dominated by money"The Guardian (London)। সংগৃহীত 11 June 2008 
  6. China's Vice-President revisits youth with a trip to the Midwest to meet farming family he stayed with on exchange trip Associated Press, 15 February 2012
  7. Xiao Yu, Fujian leaders face Beijing top brass, South China Morning Post, 2000 Feb 18
  8. "Hu Jintao reelected Chinese president", Xinhua (China Daily), 15 March 2008.
  9. "Vice-President Xi Jinping to Visit DPRK, Mongolia, Saudi Arabia, Qatar and Yemen"। Mfa.gov.cn। 5 June 2008। সংগৃহীত 20 October 2010 
  10. Michael Wines. 'China's Leaders See a Calendar Full of Anniversaries, and Trouble'. The New York Times, 9 March 2009.
  11. "China's Nelson Mandela"Time। 19 November 2007। 
  12. Tang, Eugene (15 March 2008)। "China Appoints Xi Vice President, Heir Apparent to Hu. Retrieved June 11, 2008"। Bloomberg। সংগৃহীত 20 October 2010 
  13. Original: সরলীকৃত চীনা: 在国际金融风暴中,中国能基本解决13亿人口吃饭的问题,已经是对全人类最伟大的贡献; ঐতিহ্যবাহী চীনা: 在國際金融風暴中,中國能基本解決13億人口吃飯的問題,已經是對全人類最偉大的貢獻
  14. Original: সরলীকৃত চীনা: 有些吃饱没事干的外国人,对我们的事情指手画脚。中国一不输出革命,二不输出饥饿和贫困,三不折腾你们,还有什么好说的?; ঐতিহ্যবাহী চীনা: 有些吃飽沒事干的外國人,對我們的事情指手畫腳。中國一不輸出革命,二不輸出飢餓和貧困,三不折騰你們,還有什麽好說的?
  15. "AsiaOne.com: Chinese VP blasts meddlesome foreigners"। News.asiaone.com। 14 February 2009। সংগৃহীত 20 October 2010 
  16. 記者賴錦宏 (2009.02.18)। "(চীনা)[[বিষয়শ্রেণী:চীনা ভাষার বহিঃসংযোগের সাথে নিবন্ধসমূহ]][[Category:চীনা ভাষা বাহ্যিক লিঙ্কসহ নিবন্ধ]]:習近平出訪罵老外 外交部捏冷汗 Translation:Xi Jinping scored at foreigners, Ministry of foreign affairs had cold sweat"। 聯合報। সংগৃহীত 27 February 2009  ইউআরএল শিরোনামে উইকিলিঙ্ক এমবেড করা (সাহায্য)[অকার্যকর সংযোগ]
  17. "Vice President Xi Jinping to visit Belgium, Germany, Bulgaria, Hungary and Romania and attend Europalia Chinese Art Festival and China's Guest-of-Honor Activities in Frankfurt Book Fair"। Mfa.gov.cn। 10 October 2009। সংগৃহীত 20 October 2010 
  18. Raman, B., "China's Cousin-Cousin Relations with Myanmar" # 3566, South Asia Analysis Group, 25 December 2009. Retrieved 14 February 2012.
  19. Reuters.
  20. Chinese Vice President Xi Jinping heads back to his favourite U.S. town 27 years after he first stayed there Daily Mail Online, 16 February 2012
  21. "The 2009 Time 100"Time। 30 April 2009। 
  22. "4. Xi Jinping – 50 People Who Matter 2010"New Statesman। UK। সংগৃহীত 4 October 2010 
  23. Garnaut, John (21 September 2009)। "Chinese puzzle: who is Hu's heir?"The Age (Melbourne)। 
  24. Demick, Barbara (19 October 2010)। "Xi Jinping on track to become China's next president"Los Angeles Times। সংগৃহীত 19 October 2010 
  25. Sainsbury, Michael (19 October 2010)। "China vice-president Xi Jinping one step from the top job"The Australian। সংগৃহীত 19 October 2010 
  26. Tsang, Steve (18 October 2010)। "China's succession 'arrangement'"। BBC News। সংগৃহীত 19 October 2010 
  27. Fang, Yang (18 October 2010)। "Xi Jinping appointed vice-chairman of Central Military Commission"। Xinhua News Agency.। সংগৃহীত 19 October 2010 
  28. "The 2011 TIME 100 – Xi Jinping: Heir Apparent (04.21.2011)"TIME (US)। 21 April 2011। সংগৃহীত 21 August 2011 
  29. Page, Jeremy (22 August 2011)। "China Previews Rising Leadership (August 21, 2011)"Wall Street Journal (US)। সংগৃহীত 21 August 2011 
  30. "习近平 彭丽媛:携手19年 家有小女习明泽(translation:Xi Jinping and Peng Liyuan: tied the knot for 19 years, had bred a daughter named Xi Mingze)" ((চীনা) ভাষায়)। Xinhua News Agency। 
  31. Liu, Melinda (18 January 2011)। "Can't we just be friends?"Newsweek। সংগৃহীত 19 January 2011 
  32. http://www.taipeitimes.com/News/taiwan/archives/2012/02/17/2003525696
  33. । BBC News http://news.bbc.co.uk/2/shared/spl/hi/in_depth/china_politics/leadership/html/6.stm  |title= অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য)
  34. Richburg, Keith B. (15 August 2011)। "Xi Jinping, likely China’s next leader, called pragmatic, low-key"The Washington Post 
  35. Buckley, Chris, "China leader-in-waiting carries heavy political baggage to U.S.", Reuters, 8 February 2012. Retrieved 14 February 2012.
  36. Branigan, Tania (13 February 2012)। "The Guardian profile: Xi Jinping"The Guardian। UK। সংগৃহীত 14 February 2012