রমনা কালী মন্দির

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
রমনা কালী মন্দির
Ramna Kalibari Dhaka racecourse Dhaka (1967).jpg
১৯৬৭ সালে মন্দিরের সুউচ্চ চূড়া
ধর্ম
অন্তর্ভুক্তিহিন্দুধর্ম
জেলাঢাকা জেলা
ঈশ্বরকালী
উৎসবসমূহকালী পূজা, দুর্গা পূজা, সরস্বতী পূজা
অবস্থান
দেশবাংলাদেশ
স্থাপত্য
প্রতিষ্ঠার তারিখ১৬শ শতাব্দী
উচ্চতা (সর্বোচ্চ)৯৬ ফুট

রমনা কালী মন্দির ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত হিন্দু মন্দিরসমূহের মধ্যে অন্যতম ছিল। [১] এটি রমনা কালীবাড়ি নামেও পরিচিত। এটি প্রায় এক হাজার বছরেরও পুরাতন বলে বিশ্বাস করা হয় কিন্তু ইংরেজ আমলে এই মন্দিরটি আবার নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছিল । বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রমনা পার্কের (যার বর্তমান নাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বহির্ভাগে অবস্থিত।বর্তমানে বাংলার সংস্কৃতিতে এ মন্দিরের উল্লেখ্য ভূমিকা আছে। ভারত সরকারের অর্থায়নে বর্তমানে মন্দিরটি পুনর্নির্মিত হয়েছে। মন্দিরের চূড়ার বর্তমান উচ্চতা ৯৬ ফুট।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

জনশ্রুতি, প্রায় ৫০০ বছর আগে বদরীনাথের যোশীমঠ থেকে গোপালগিরি নামে এক উচ্চমার্গের সন্ন্যাসী প্রথমে ঢাকায় এসে সাধন-ভজনের জন্য উপযুক্ত একটি আখড়া গড়ে তোলেন। সেখানেই আরও ২০০ বছর পরে মূল রমনা কালীমন্দিরটি নির্মাণ করেন আর এক বড় সাধু হরিচরণ গিরি। তবে পরবর্তী সময়ে এই মন্দিরের প্রধান সংস্কারকার্য ভাওয়ালের ভক্তিমতী ও দানশীলা রানি বিলাসমণি দেবীর আমলেই হয়। ১৯৭১ সালের ২৬ ও ২৭ মার্চ। এই দুটো দিন রমনা কালীমন্দিরের পবিত্র ভূমি ঘিরে পাকিস্তানি সেনারা যে বিভীষিকার রাজত্ব তৈরি করেছিল তার করুণ কাহিনি ইতিহাসের পাতায় চিরদিন লেখা থাকবে। এক তীর্থভূমি রাতারাতি পরিণত হয়েছিল বধ্যভূমিতে। রমনা কালীমন্দিরের অধ্যক্ষ স্বামী পরমানন্দ গিরি সহ সেখানে উপস্থিত প্রায় ১০০ জন নারী ও পুরুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল পাক সেনারা। শিশুরাও রেহাই পায়নি। এই হত্যাকাণ্ডের সময় রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম দাউ দাউ করে জ্বলেছিল। রমনা কালীমন্দিরের চূড়া ছিল ১২০ ফুট, যা বহুদূর থেকে দেখা যেত। সেটিও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় ওই বর্বর সেনারা। [২][৩]২০০৬ সালে ভারত সরকারের উদ্যোগে ৭কোটি টাকা ব্যয় করে রমনা কালীমন্দির আবার নতুনভাবে নির্মাণ করা হয়। পুজোর্চ্চনাও শুরু হয়। তারপর ২০২১সালে স্থাপনার কাজ হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০বছর পূর্তিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ তা উদ্বোধন করেন আর রমনা কালীমন্দির ফিরে পায় তার ৫ শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য। [৪][৫]

মূর্তি[সম্পাদনা]

রমনা কালী মন্দিরের কালীমূর্তি

তন্ত্রশাস্ত্রে মা কালীর নানাপ্রকারের মূর্তিভেদ বর্ণনা করা হয়েছে। তার মধ্যে রমনাকালী অন্যতম।পাথরের বেদির ওপর শ্রীশ্রীভদ্রকালীর সুউচ্চ প্রতিমা। চতুর্ভুজা মাতৃমূর্তি। মহাদেবের শয়ান মূর্তির ওপর দণ্ডায়মান। দু’পাশে ডাকিনী-যোগিনী। ভদ্রকালিকা দেবীর কণ্ঠে মুণ্ডমালা। লালজবার মালা। দেবী মা লাল বস্ত্র পরিহিতা। ভদ্রকালিকার একপাশে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও মা সারদামণির ছবি।

স্থাপনাসূমহ[সম্পাদনা]

রমনা কালী মন্দির এ বর্তমানে কালী মূর্তি ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি মন্দির রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো, দুর্গা মন্দির, লোকনাথ মন্দির, রাধা গোবিন্দ মন্দির, মা আনন্দময়ীর মন্দির।

নকশা[সম্পাদনা]

মন্দিরটির স্থাপত্য শৈলী বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে। মন্দিরের সামনে একটি বড় দিঘি ছিল যা উপাসক এবং দর্শনার্থীদের সাঁতার কাটার জন্য একটি জনপ্রিয় স্থান ছিল। মন্দিরটিতে একটি লম্বা শিখর (টাওয়ার) রয়েছে। মন্দিরের পাশেই ছিল মা আনন্দময়ী আশ্রম, সেখানে থাকা ও গোসল করার সুবিধা ছিল।

অনুষ্ঠানমালা[সম্পাদনা]

রমনা কালী মন্দির এর মূল পূজা হলো কালী পূজা।।কালীপুজোয় সুন্দর করে সাজানো হয় গোটা মন্দিরকে। নানা অলংকারে সেজে ওঠেন শ্রীশ্রীভদ্রকালী মাতা।এখানে দুর্গাপুজোও খুব বড় করে হয়। তাছাড়া এখানে সরস্বতী পূজা, বাৎসরিক অনুষ্ঠান সহ নানা ধরনের ধর্মীয় উৎসব এখানে হয়ে থাকে ।বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু ভক্ত আসেন মন্দিরে। ভারত থেকেও ভক্তরা আসেন। সে এক দেখার মতো ব্যাপার। উৎসবমুখর হয়ে ওঠে এই মন্দির।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক ধ্বংস ও গণহত্যা[সম্পাদনা]

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদী/ স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী " অপারেশন সার্চলাইট " শুরু করে। অপারেশনটি একটি গণহত্যা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূত্রপাত করে। অপারেশন সার্চলাইটের বেশিরভাগ লক্ষ্য ছিল তরুণ হিন্দু পুরুষ, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র এবং শিক্ষাবিদরা। অপারেশন সার্চলাইট জগন্নাথ হল ( ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হিন্দু ছাত্রদের জন্য একটি হোস্টেল) এবং রমনা কালী মন্দির সহ বিশিষ্ট হিন্দু ধর্মাবলম্বীদেরকে লক্ষ্য করে।

১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ পাকিস্তানী সেনাবাহিনী রমনা কালী মন্দির কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে এবং এক ঘন্টার মধ্যে ১০০০ জনেরও বেশি লোককে হত্যা করে। মন্দির চত্বরে আশ্রয় নেওয়া বেশ কিছু মুসলমানকেও হত্যা করা হয়।

২০০০ সাল পর্যন্ত, মন্দির ধ্বংসের প্রমাণগুলি বেঁচে থাকা এবং সাক্ষীদের মৌখিক সাক্ষ্যের উপর নির্ভর করেছিল। ২০০০ সালে, বাংলাদেশ সরকার আওয়ামী লীগ, তদন্তের জন্য একটি পাবলিক অনুসন্ধান খোলে। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে চেয়ারম্যান বিচারপতি কে এম সোবহান একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন পেশ করেন।

গণহত্যার শিকার হয়েছে এমন প্রায় ৫০জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং অন্য নিহতদের স্বজনরা হয় মৃত বা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেছে। রমনা কালী মন্দির হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া মানুষের জীবিত আত্মীয়দের জন্য একটি বিশ্বব্যাপী আবেদন করা হয়েছে যাতে তারা তাদের মৃত পরিবারের সদস্যদের নাম ভবিষ্যতের স্মৃতিসৌধে তালিকাভুক্ত করতে অবদান রাখে।

গ্যালারি[সম্পাদনা]

নতুনভাবে নির্মাণ করা রমনা কালী মন্দির
ভদ্র কালী প্রতিমা, রমনা কালী মন্দির।

অবস্থান[সম্পাদনা]

এটির অবস্থান সাবেক ঢাকা রেসকোর্সের পাশে, বর্তমানে যা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত।

পুরো মন্দির কমপ্লেক্সটির আয়তন প্রায় ২.২৫ একর (৯,১০০ মি) এবং এটি রমনা পার্কের দক্ষিণে, বাংলা একাডেমির বিপরীতে অবস্থিত।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "৭১-এ কালীমন্দির গুঁড়িয়ে দেয় পাকিস্তান! সেই ভয়াল স্মৃতি এখনও তাড়া করে"EI Samay। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৭-২৮ 
  2. "৭১-এ কালীমন্দির গুঁড়িয়ে দেয় পাকিস্তান! সেই ভয়াল স্মৃতি এখনও তাড়া করে"EI Samay। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৭-২৮ 
  3. "ঐতিহাসিক 'রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞের অজানা ইতিহাস" (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৭-২৮ 
  4. "গণহত্যার সাক্ষী ঢাকার ইতিহাস বহনকারী রমনা কালী মন্দির"Drishtibhongi দৃষ্টিভঙ্গি (ইংরেজি ভাষায়)। ২০২০-১১-১৫। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৭-২৮ 
  5. "১৯৭১ সালে রমনা কালী মন্দিরের গণহত্যার ভুলে যাওয়া ইতিহাস - অগ্নিবীর"www.agniveerbangla.org। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৭-২৮