বাংলাদেশে চা উৎপাদন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
শ্রীমঙ্গলের চা বাগান

বাংলাদেশ হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ চা উৎপাদনকারী দেশ। এর চা শিল্প ব্রিটিশ শাসনামল থেকে চলে আসছে, যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮৪০ সালে চট্টগ্রামে চা ব্যবসা শুরু করে।[১] বর্তমানে, বাংলাদেশে ১৬৬টি বাণিজ্যিক চা এস্টেট রয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কর্মক্ষম চা বাগান।[২][৩] এখানকার এই শিল্প বিশ্বের ৩% চা উৎপাদন করে থাকে, এবং ৪০ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে।[৪]

এখানকার উত্তর এবং পূর্বাঞ্চলীয় জেলা সমূহে চা উৎপাদন হয়ে থাকে; উচ্চভূমি, উষ্ণ জলবায়ু, আদ্র এবং অতি বৃষ্টি প্রবণ এলাকাসমূহ উন্নতমানের চা উৎপাদনের মোক্ষম পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়।[৪]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

চট্টগ্রাম হচ্ছে বাংলাদেশ চা শিল্পের জন্মস্থান।

ঐতিহাসিকভাবে, বঙ্গ চা অশ্ব সড়কের শেষপ্রান্ত ছিল, যা এই উপমহাদেশকে চীনের প্রথম দিককার চা-উৎপাদনকারী অঞ্চল ইউন্নানের সাথে সংযুক্ত করেছিল। অতীশ দীপঙ্করকে প্রথম দিককার একজন বাঙ্গালি চা পানকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।[৫]

বঙ্গ প্রদেশে কালো চায়ের চাষ ব্রিটিশ শাসনামলের সময় শুরু হয়েছিল।[৬] ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা ১৮৪০ সালে এই উপমহাদেশের সর্বপ্রথম চা বাগান বন্দর নগরী চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠা করে, যখন কলকাতা বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে চীনা চায়ের গাছ এনে চট্টগ্রাম ক্লাবের পাশে রোপণ করা হয়।[১][৫] ১৮৪৩ সালে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে প্রথম চা তৈরি এবং পান করা হয়।[১][৫] বাণিজ্যিকভাবে প্রথম চা চাষ শুরু হয় ১৮৫৭ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা বাগানে।[১] সিলেট অঞ্চলের সুরমা নদী উপত্যকা পূর্ব বাংলার চা উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। চা চাষ নিম্ন ত্রিপুরা (বর্তমান কুমিল্লা) এবং উত্তর বঙ্গের পঞ্চগড়েও শুরু হয়। পঞ্চগড় হচ্ছে বাংলাদেশের তৃতীয় চা অঞ্চল এবং সবথেকে চাহিদাপূর্ণ চা এখানে উৎপন্ন হয়।

পঞ্চগড়ের একটি চা বাগান

চা ব্রিটিশ বাংলার একটি উল্লেখযোগ্য রপ্তানিপণ্য ছিল। সুরমা এবং ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার চা চাষিদের কাছ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের রপ্তানিকারকদের কাছে চা পৌঁছিয়ে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে এই শিল্পের জীবনরেখা হিসেবে সেবা দিয়ে গেছে।[৭][৮]

চট্টগ্রাম চা নিলাম ১৯৪৯ সালে ব্রিটিশ এবং অস্ট্রেলিয়ার ব্যবসায়ীরা স্থাপন করে। জেমস ফিনলে এবং ডাঙ্কান ব্রাদার্সের মতো ব্রিটিশ কোম্পানি এক সময় এই শিল্পের আধিপত্য করেছে।[৯] ইস্পাহানী পরিবারও এই শিল্পের এক বিখ্যাত অংশীদার ছিল।[১০]

শিল্প[সম্পাদনা]

সিলেট জেলার একটি চা বাগান।

পাটের পরেই চা হচ্ছে বাংলাদেশের সবথেকে বেশি রপ্তানি হওয়া অর্থকারী ফসল। এই শিল্প থেকে জাতীয় জিডিপির ১% আসে।[১১] চা উৎপাদনকারী জেলাগুলো হচ্ছে- মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম, পঞ্চগড়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং রাঙ্গামাটি[১২]

এক সময়কার বিশ্বের প্রধান একটি চা রপ্তানিকারক দেশ, বাংলাদেশ এখন মাত্র সাধারণ এক রপ্তানিকারক দেশ।[১৩] বাংলাদেশি মধ্যম শ্রেণীর উত্থান এই শিল্পকে লাভজনক দেশীয় বাজারের দিকে আলোকপাত করে ব্যাপকভাবে চালিয়ে নিয়েছে। বর্তমানে এই সেক্টরটি ম ম ইস্পাহানি লিমিটেড, কাজী এন্ড কাজী, ট্রান্সকম গ্রুপ, জেমস ফিনলে বাংলাদেশ, ওরিয়ন গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ এবং ডাঙ্কান ব্রাদার্স বাংলাদেশ লিমিটেডের মতো বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

২০১২ সালে, বাংলাদেশ রেকর্ড পরিমাণ চা উৎপাদন করে, যা প্রায় ৬,৩৮৫ কোটি কিলোগ্রাম ছিল।[১৪] ১৯৪৭ সালে যেখানে ২৮,৭৩৪ হেক্টর ভূমি ছিল, সেখানে বর্তমানে ৫৬,৮৪৬ হেক্টরেরও বেশি ভূমি এই শিল্পের চাষে ব্যবহার করা হচ্ছে।[১][২] বর্তমানে সরকার ক্ষুদ্র পরিসরের চা উৎপাদকদের এই শিল্পের বিকাশে কাজ করতে উদ্যোগ নিয়েছে, বিশেষকরে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে।

বাংলাদেশে চায়ের মূল্য চট্টগ্রামে হওয়া সরকারি নিলামের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। মার্চ ২০১৫-তে, বাংলাদেশের চায়ের আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য ছিল মার্কিন$২.৪০ ডলার।[১৫]

শ্রম[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের চা বাগানে ৩,০০,০০০ অধিক বাগানি কর্মরত আছে। যার ৭৫% নারী।[৩] অনেক শ্রমিকই উপজাতি বাসিন্দা যাদের ব্রিটিশ শাসনামলে মধ্য ভারত থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল।[১৬]

সরকারী প্রতিষ্ঠান[সম্পাদনা]

বাংলাদেশে চায়ের বাণিজ্যের জন্য উৎপাদন, এর সত্যায়ন, এবং রপ্তানিকরণে বাংলাদেশ চা বোর্ড এবং বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।[১৭] বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৫৭ সালে চায়ের গুণগত মান উন্নয়নে কাজ শুরু করে, সর্বোচ্চ মানের উচ্চ ফলনশীল পাতা উৎপাদন এবং বিকাশের লক্ষে জিন উদ্ভাবনের মাধ্যমে।[১৮]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Nasir, Tasnuba (জুন ২০১১)। "Tea Productions, Consumptions and Exports: Bangladesh Perspective" (PDF)International Journal o f Educational Research2 (1): 68–73। আইএসএসএন 0976-4089। সংগ্রহের তারিখ ৩ এপ্রিল ২০১৫ 
  2. Dr. Kazi Muzafar Ahammed। "Investment for Sustainable Development of Bangladesh Tea Industry – An Empirical Study" (PDF)। Bangladesh Economic Association। সংগ্রহের তারিখ ৩ এপ্রিল ২০১৫ 
  3. "Tea Gardens in Bangladesh"bangladesh.com। সংগ্রহের তারিখ ২৪ মার্চ ২০১৫ 
  4. "Tea"scribd.com। সংগ্রহের তারিখ ২৪ মার্চ ২০১৫ 
  5. Home। "Saving the Slips Between Cup and Lips"। Firstnewsmagazine.com। সংগ্রহের তারিখ ৩ এপ্রিল ২০১৫ 
  6. Colleen Taylor Sen (2004). Food Culture in India. Greenwood Publishing Group. p. 26. আইএসবিএন ৯৭৮-০-৩১৩-৩২৪৮৭-১.
  7. Ishrat Alam; Syed Ejaz Hussain (২০১১)। The Varied Facets of History: Essays in Honour of Aniruddha Ray। Primus Books। পৃষ্ঠা 273। আইএসবিএন 978-93-80607-16-0 
  8. Alan Warren (১ ডিসেম্বর ২০১১)। Burma 1942: The Road from Rangoon to Mandalay। A&C Black। পৃষ্ঠা 235। আইএসবিএন 978-1-4411-0673-5 
  9. Tea Industry, Banglapedia
  10. Ispahani Family, Banglapedia
  11. "Tea @ Global Trade Concern – Bangladesh"। Tea.globaltradeconcern.com। সংগ্রহের তারিখ ৩ এপ্রিল ২০১৫ 
  12. "Bangladesh Tea Board"। Teaboard.gov.bd। সংগ্রহের তারিখ ৩ এপ্রিল ২০১৫ 
  13. "Growth of imports shake tea gardens of northern Bangladesh"The Daily Star। ৫ ডিসেম্বর ২০১৪। সংগ্রহের তারিখ ৩ এপ্রিল ২০১৫ 
  14. "Bangladesh records highest tea production in 2012"thedailystar.net। সংগ্রহের তারিখ ২৪ মার্চ ২০১৫ 
  15. "Bangladesh tea prices edge up on strong demand"dhakatribune.com। সংগ্রহের তারিখ ২৪ মার্চ ২০১৫ 
  16. "As tea estates expand in Bangladesh, tribes fear for their future"ucanews.com। ২ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৪ মার্চ ২০১৫ 
  17. Bangladesh Tea Research Institute, Banglapedia
  18. Chen, Liang; Apostolides, Zeno; Chen, Zong-Mao (২০১২)। Global Tea Breeding: Achievements, Challenges and Perspectives। Hangzhou: Zhejiang University Press। পৃষ্ঠা 290।