পর্তুগালের ইতিহাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

পর্তুগালের ইতিহাস বলতে আমরা যদি শুধুমাত্র পর্তুগাল দেশটির ইতিহাসকে বুঝি তবে তার সূচনা মধ্যযুগের দ্বিতীয়ার্ধে।[১] এর পূর্বে দেশটির সুদীর্ঘ ইতিহাস ইবেরীয় উপদ্বীপের সামগ্রিক ইতিহাসের সাথেই সংশ্লিষ্ট। কিন্তু মধ্যযুগের দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই দেশটির পৃথক জাতিরাষ্ট্র হিসেবে উত্থান ঘটে; ভৌগোলিক আবিষ্কারের যুগে তার আবিষ্কৃত ও অধিকৃত ভূখণ্ডের ক্রমাগত ব্যাপক বিস্তারের ফলে এক বিশাল সাম্রাজ্যের পত্তন হয়[২] ও খ্রিস্টীয় ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে পর্তুগাল বিশ্বের একটি প্রধান শক্তি হিসেবে পরিগণিত হতে থাকে। কিন্তু ১৫৭৮ খ্রিস্টাব্দে আলকাথারকিবিরের যুদ্ধের পর থেকেই তার পতনের সূচনা ঘটে।[৩] তার আন্তর্জাতিক মর্যাদা হ্রাস পায়, সম্পদে ঘাটতি দেখা দেয়, তার সেনাবাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে, নৌবাহিনীরও শক্তিক্ষয় ঘটে এবং শেষপর্যন্ত তা স্পেনীয় আর্মাদার অংশে পরিণত হয়। সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি তার পূর্বতন মর্যাদা পুনরুদ্ধার সম্ভব হলেও ১৭৫৫ সালে এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পে তার রাজধানী শহর ভীষণরকম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।[৪][৫] ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনাপর্বে নেপলিয়নীয় যুদ্ধে এবং ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে তার বৃহত্তম উপনিবেশ ব্রাজিল স্বাধীনতা ঘোষণা করলে[৬] দেশটির অর্থনীতি অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় নিমজ্জিত হয় ও রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস পায়। ১৯১০ সালে এক অভ্যুত্থানে রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ ঘটে ও প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হয়।[৭] কিন্ত দুর্নীতিতে নিমজ্জিত, সামাজিক সংঘর্ষে দীর্ণ একটি দেশে সর্বোপরি গির্জার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এই প্রজাতন্ত্রের পক্ষে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করে দীর্ঘদিন স্থায়িত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটে ও দেশে এক একনায়কতন্ত্রী সরকারের প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই একমায়কতন্ত্রই বজায় থাকে। কিন্তু এইসময় সামরিক বাহিনী বিদ্রোহ করলে একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়। পরের বছর পর্তুগাল আফ্রিকায় তার অবশিষ্ট সমস্ত উপনিবেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৯৮৬ থেকে এই দেশ তৎকালীন ইউরোপীয় ইকনমিক কমিউনিটি, বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য।

পর্তুগাল নামের উৎপত্তি[সম্পাদনা]

পর্তুগাল নামটি এসেছে রোমান ভাষার পর্তুস কালে শব্দগুচ্ছ থেকে। বাস্তবে কালে ছিল দোরু নদীর মোহনায় অবস্থিত একটি প্রাচীন জনবসতির নাম। বর্তমান পর্তুগাল দেশটির উত্তরাংশ দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হয়ে এই নদীটি অতলান্ত মহাসাগরে পড়েছে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে কার্থেজের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় পুনিক যুদ্ধ বা হ্যানিবলীয় যুদ্ধের সময় রোমান সেনা ইবেরীয় উপদ্বীপে প্রবেশ করে প্রথম এই অঞ্চলে পদার্পণ করে। এই সংঘর্ষের সময়েই কালে অঞ্চলটি রোমানদের অধিকারে আসে। এখানে বর্তমান পোর্তু বা ওপোর্তো শহরের কাছে কেল্টীয়দের একটি প্রাচীন বন্দর ছিল। এই প্রাচীন বন্দরটির জন্যই সম্ভবত রোমানরা অঞ্চলটিকে পোর্তুস কালে (অর্থাৎ কালের বন্দর) নামে অভিহিত করে। মধ্যযুগে ভিসিগথরা এই কালে বন্দর ও তার চারপাশের অঞ্চলকে পর্তুকালে বলে অভিহিত করতো। সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে এই পর্তুকালে শব্দটিই অপভ্রংশ হয়ে পর্তুগালেতে পরিণত হয়। এইসময় শব্দটি দ্বারা দোরু নদী ও মিনিও নদীর অন্তর্বর্তী ভূভাগকে বোঝানো হত। এই অঞ্চলটি বর্তমানে স্পেন ও পর্তুগালের সীমান্তবর্তী অঞ্চল।

কিছু ঐতিহাসিকের মতে কালে শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ "কালেস" (Kalles) থেকে, যার অর্থ 'সুন্দর'। আসলে গ্রিকরা দোরু নদীর উপত্যকার সৌন্দর্য্যে আকৃষ্ট হয়েই এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল। ফিনিশীয়দের মুখে শব্দটি পালটে গিয়ে 'কালে'তে পরিণত হয়। শব্দটির এই পরিবর্তিত রূপটিই পরে রোমানরা গ্রহণ করে। আবার অন্যদের মতে, 'কালে' হল কেল্টীয়দের এক দেবীর নাম।[৮] তাঁর নাম থেকেই এই স্থাননামের উৎপত্তি। আবার এই অঞ্চলের প্রাচীন স্থানীয় অধিবাসী গালিথীয়দের ভাষায় 'কালে' বা 'কালা' (Cale বা Cala) শব্দটি বন্দরের একটি প্রতিশব্দ হিসেবেই ব্যবহৃত হত। সেই অর্থেও এই অঞ্চলের স্থাননাম হিসেবে 'কালে' নামটির উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে শব্দটি যে এই অঞ্চলে সুপ্রাচীনকাল থেকেই একটি বন্দরের অস্তিত্ব ছিল তারই সাক্ষবহন করে।[৯]

অপরদিকে ঐ রোমান বিশেষণ পোর্তু শব্দটি এখনও থেকে গেছে ঐ অঞ্চলে দোরু নদীর মোহনায় অবস্থিত বন্দর শহর পোর্তুর নাম হিসেবে। আর নদীর অন্যদিকে অবস্থিত গাইয়া (বিলা নোবা দে গাইয়া) নামক ছোট শহরটি আজও সেই সুপ্রাচীন 'কালে' বসতির নামটিই কিছুটা পরিবর্তিত আকারে বহন করে চলেছে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Ribeiro, Ângelo; Hermano, José (2004). História de Portugal I – a Formação do Território [পর্তুগালের ইতিহাস – দেশের সীমানা গঠন] (পর্তুগিজ ভাষায়). QuidNovi. ISBN 978-989-554-106-5.
  2. Juang, Richard M.; Morrissette, Noelle (2008). Africa and the Americas: Culture, Politics, and History : a Multidisciplinary Encyclopedia. ABC-CLIO. p. 894. ISBN 9781851094417. সংগৃহীত ২৬ মার্চ, ২০১৯।
  3. Livermore, Harold V. (1969). A New History of Portugal. Cambridge University Press. পৃঃ - ১৫৭-৮।
  4. Between History and Periodicity: Printed and Hand-Written News in 18th-Century Portugal
  5. Pereira, A.S. "The Opportunity of a Disaster: The Economic Impact of the 1755 Lisbon Earthquake". Discussion Paper 06/03, Centre for Historical Economics and Related Research at York, York University, 2006.
  6. Levine, Robert M. (2003). The History of Brazil. Palgrave Macmillan. pp. 59–61. ISBN 978-1-4039-6255-3.
  7. Wheeler, Douglas L. (1998). Republican Portugal: A Political History, 1910–1926. University of Wisconsin Press. ISBN 0-299-07450-1. পৃঃ- ৪৮-৬১।
  8. JULIEN, Nadia (2008). Enciclopedia de los mitos. Teia: Swing. p. 21. ISBN 978-84-967-4-6305.
  9. Pezron, Paul (1706). Celtic Linguistics. P. 270. ISBN 978-0-415-20479-8. সংগৃহীত ৭/৪/২০১৯।