নেপোলিয়ন বোনাপার্ট

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
"নাপোলেওঁ বোনাপার্ত" এখানে পুননির্দেশ করা হয়েছে। অন্য ব্যবহারের জন্য, দেখুন নাপোলেওঁ বোনাপার্ত (দ্ব্যর্থতা নিরসন)
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট
Full length portrait of Napoleon in his forties, in high-ranking white and dark blue military dress uniform. He stands amid rich 18th century furniture laden with papers, and gazes at the viewer. His hair is Brutus style, cropped close but with a short fringe in front, and his right hand is tucked in his waistcoat.
ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল গ্যালারি অফ আর্ট এ সংরক্ষিত ১৮১২ সালের একটি চিত্রকর্ম। চিত্রকর্মটিতে নেপোলিয়নকে তার স্টাডিতে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। চিত্রকর্মটি জ্যাকুইস-লুইস ডেভিড এঁকেছেন।
ফরাসী সম্রাট
রাজত্ব ১৮ মে ১৮০৪ – ১১ এপ্রিল ১৮১৪
২০ মার্চ ১৮১৫ – ২২ জুন ১৮১৫
রাজ সিংহাসনারোহণ ২ ডিসেম্বর ১৮০৪
পূর্বসূরী None (himself as First Consul of the French First Republic; previous ruling monarch was Louis XVI)
উত্তরসূরী Louis XVIII (de jure in 1814)
ইতালীয় সম্রাট
রাজত্ব ১৭ মার্চ ১৮০৫ – ১১ এপ্রিল ১৮১৪
রাজ সিংহাসনারোহণ ২৬ মে ১৮০৫
পূর্বসূরী None (himself as President of the Italian Republic; previous ruling monarch was Emperor Charles V)
উত্তরসূরী None (kingdom disbanded, next king of Italy was Victor Emmanuel II)
জন্ম (১৭৬৯-০৮-১৫)১৫ আগস্ট ১৭৬৯
Ajaccio, Corsica, France
মৃত্যু ৫ মে ১৮২১(১৮২১-০৫-০৫) (৫১ বছর)
Longwood, Saint Helena, British Empire
সমাধি Les Invalides, Paris, France
দাম্পত্য সঙ্গী Joséphine de Beauharnais
Marie Louise of Austria
সন্তান দ্বিতীয় নেপোলিয়ন
পূর্ণ নাম
Napoleon Bonaparte
রাজবংশ House of Bonaparte
পিতা Carlo Buonaparte
মাতা Letizia Ramolino
ধর্ম Roman Catholicism (see Napoleon and religions)
স্বাক্ষর
২৩ বছরের নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, কর্সিকান রিপাবলিকান স্বেচ্ছাসেবকদের একটি ব্যাটালিয়নের লেফটেন্যান্ট কর্নেল

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (ফরাসি: Napoléon Bonaparte, উচ্চারণ নাপোলেওঁ বোনাপার্ত), (জন্ম:১৫ই আগস্ট, ১৭৬৯; এজাক্সিউ, করসিকা, মৃত্যু:৫ই মে, ১৮২১; সেন্ট হেলেনা) ছিলেন ফরাসি বিপ্লবের সময়কার একজন জেনারেল। তিনি ফরাসি প্রজাতন্ত্রের প্রথম কনসল ( First Consul ) ছিলেন। তিনি নেপোলিয়ন ১ নামে ১১ নভেম্বর, ১৭৯৯ থেকে ৬ এপ্রিল ১৮১৪ পর্যন্ত ফ্রান্সের সম্রাট ছিলেন এবং পুনরায় ১৮১৫ সালের ২০ মার্চ থেকে ২২ জুন পর্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য ফ্রান্সের সম্রাট ছিলেন। তিনি ইতালির রাজাও ছিলেন। এছাড়া তিনি সুইস কনফেডারেশনের মধ্যস্থাকারী এবং কনফেডারেশন অফ রাইনের রক্ষকও ছিলেন।

তাঁর নেতৃত্বে ফরাসি সেনাবাহিনী এক দশকের বেশি সময় ধরে সকল ইউরোপীয় শক্তির সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং তিনি ইউরোপের অধিকাংশ অঞ্চল তাঁর আয়ত্তে নিয়ে আসেন। ১৮১২ সালে সংগঠিত বিপর্যয়কারী রাশিয়া আগ্রাসন একটি যুগঃসন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। রাশিয়া আগ্রাসন এবং ১৮১৩ সালে লিপজিগে পরাজয়ের পর ষষ্ঠ কোয়ালিশন ফ্রান্সে আগ্রাসন চালায় এবং এর ফলস্বরূপ নেপোলিয়ন ১৮১৪ এর এপ্রিলে পশ্চাৎপসারণ করতে বাধ্য হন। কিছুদিন পরেই নেপোলিয়ন একটি অভিযান চালান যা হান্ড্রেড ডেস নামে পরিচিত। কিন্তু নেপোলিয়ন ১৮১৫ সালের ১৮ জুন ওয়াটারলুতে পরাজিত হন। নেপোলিয়ন তাঁর জীবনের বাকী ছয় বছর ব্রিটিশদের তত্ত্বাবধানে আটলান্টিক মহাসাগরের দ্বীপ সেন্ট হেলেনাতে কাটান।

নেপোলিয়নে সেনাবাহিনীতে কিছু পরিবর্তন সাধন করেন। তিনি মিশরে মুখোমুখি সংঘর্ষের উপযোগী সেনাবাহিনী নিয়োগ ছাড়াও যুদ্ধজাহাজের কামান নিয়ন্ত্রনের জন্য গোলন্দাজ বাহিনী স্থাপন করেন এবং সকল বিভাগে আদর্শ সেনাবাহিনী গড়ে তু্লেন। তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে সেরা ধারণাগুলো বেছে নিয়ে অসাধারণ একোটি বাহিনী প্রস্তুত করেন যেটি তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু যুদ্ধে জয় এনে দেয়। সেনাবাহিনীতে তাঁর উদ্ভাবন সমূহ বর্তমানে প্রায় সকল সেনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তিনি সারা বিশ্বে সর্বকালের অন্যতম সেরা সেনাপতি হিসেবে সুপরিচিত। নেপোলিয়ন কোড প্রতিষ্ঠাও তাঁর অন্যতম সেরা কীর্তি।

তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যদের এবং বন্ধুদের তাঁর অর্জিত বিভিন্ন রাষ্ট্রের শাসক এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করেন। যদিও তাদের শাসন নেপোলিয়নের পতন ঠেকাতে পারেনি, নেপোলিয়নের এক ভাতিজা,  তৃতীয় নেপোলিয়ন ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ফ্রান্স শাসন করেন।

প্রথম জীবন[সম্পাদনা]

নেপোলিয়ন দ্য বোনাপার্ট ১৭৬৯ সালের ১৫ আগস্ট ফ্রান্সের করসিকার এজাক্সিউ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের মাত্র একবছর আগে দ্বীপটি জেনোয়া প্রজাতন্ত্র কর্তৃক ফ্রান্সকে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি নেপোলিয়ন বোনাপার্ট নামেই অধিক পরিচিতি লাভ করেন। বোনাপার্ট পরিবার মূলত লুনিজিয়ানায় বসতি স্থাপনকারী লোম্বার্ড বংশোদ্ভূত তুস্‌কান গোত্রের অন্তর্ভুক্ত, যারা ইতালির একটি অভিজাত সম্প্রদায় হিসেবে বিবেচিত হতেন। পরিবারটি ফ্লোরেন্সে গমন করে এবং দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এদের মধ্যে অধিক গ্রহনযোগ্য, বোনাপার্ট-সারজানা, ফ্রান্স ত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং ১৬শ শতাব্দীতে তৎকালীন জেনোয়া প্রজাতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত দ্বীপ করসিকাতে আগমন করেন।

তাঁর পিতা, কার্লো বোনাপার্ট ১৭৪৬ সালে জেনোয়া প্রজাতন্ত্রে জন্মগ্রহণ করেন। নেপোলিয়নের মা, মারিয়া লেটিজিয়া রামোলিনো তাঁর বাল্যকালে গভীর প্রভাব ফেলেন।

নেপোলিয়নের বড়ভাই ছিলেন জোসেফ বোনাপার্ট। নেপোলিয়ন ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর অনুজরা ছিলেন- লুসিয়েন বোনাপার্ট, এলিসা বোনাপার্ট, লুই বোনাপার্ট, পউলিন বোনাপার্ট, ক্যারোলিন বোনাপার্ট এবং জেরোমি বোনাপার্ট

পারিবারিক কারণে নেপোলিয়ন ছোটবেলা থেকেই অন্যান্য সাধারণ কর্সিকানদের তুলনায় শিক্ষার্জনে অধিক সুবিধা লাভ করেছিলেন। ১৭৭৯ সালের ১৫ মে, নেপোলিয়নের বয়স যখন মাত্র নয়, তখন তাঁকে ট্রয়েস্রের নিকটবর্তী ছোট্ট শহর Brienne-le-Château -e অবস্থিত একটি ফরাসি মিলিটারী স্কুলে ভর্তি করানো হয়। বিদ্যালয়ে ভর্তির আগে তাঁকে ফরাসি ভাষা শিখতে হয়েছিল। কিন্তু নেপোলিয়ান সারাজীবনই ইতালিয়ান টানে কথা বলেছেন এবং তিনি কখনো ঠিকমত বানান করা শিখতে পারেন নি। প্রচলিত আছে যে, নেপোলিয়নের প্রথম দেখা হয় শ্যাম্পেন প্রস্তুতকারক Jean-Remy Moët-এর সাথে। এই দুজনের বন্ধুত্ব শ্যাম্পেন এবং শ্যাম্পেন প্রস্তুতকারক এলাকার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। ব্রিয়েনের ডিগ্রী পাওয়ার পর নেপোলিয়ন ১৭৮৪ সালে প্যারিসের এলিট École Royale Militaire-এ ভর্তি হন। সেখানে তিনি মাত্র এক বছরেই দুই বছরের কোর্স সমাপ্ত করেন। একজন পরীক্ষক তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন- " বিমূর্ত বিজ্ঞানের জন্য নিবেদিত প্রাণ, অন্যান্য বিষয়ে কিছুটা আগ্রহশীল; গণিত এবং ভূগোলে ভালো জ্ঞান রয়েছে। তিনি প্রথমে ন্যাভাল বিশয়ে আগ্রহশীল থাকলেও École Militaire-তে আর্টিলারী নিয়ে পড়াশোনা করেন।

সেনাজীবনের সূচনা[সম্পাদনা]

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ঘোড়ার চুল দিয়ে টুথব্রাশ করতেন

১৭৮৫ সালে ডিগ্রী লাভ করে নেপোলিয়ন সেকেন্ড লেফট্যানেন্ট পদে ভূষিত হন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ষোল। ১৭৮৯ সালের বিপ্লবের পূর্ব পর্যন্ত নেপোলিয়ন ভ্যালেন্স এবং এক্সনে সেনারক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী অধিকাংশ বছর তিনি করসিকাতে অতিবাহিত করেন। তখন সেখানে রাজবংশীয়-বিদ্রোহী-সাধারণ কর্সিকানদের মধ্যে ত্রিমুখী দ্বন্দ্ব চলছিল। নেপোলিয়ন জ্যাকোবিনের ফ্যাকশনকে সমর্থন করেন এবং লেফট্যানেন্ট কর্ণেল পদে ভূষিত হন। রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদী নেতা প্যাস্কোয়েল প্যাইলির ক্রমবর্ধমান সহিংসতার কারণে বোনাপার্ট এবং তাঁর পরিবার ১৭৯৩ এর জুনে ফ্রান্সে যেতে বাধ্য হন। তাঁর কর্সিকান সহচরীদের সহযোগিতায় নেপোলিয়ন গোলন্দাজ সেনাপতি নির্বাচিত হন এবং টাউলন দখল করেন। টাউলনের উত্থান হয়েছিল প্রজাতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ফলে এবং এটি ব্রিটিশরা দখল করে নিয়েছিল। তিনি বিচক্ষণ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি l'Eguillete কেন্দ্রে সশস্ত্র বাহিনী নিয়োগ করেন, যা পোতাশ্রয়ে ব্রিটিশ জাহাজের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায় এবং তারা পোতাশ্রয় ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। পরবর্তী একটি সফল আক্রমণে নেপোলিয়ন উরুতে আঘাতপ্রাপ্ত হন কিন্তু অসাধারণ কৃতিত্ব তাঁকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের পদ এনে দেয়। তাঁর সাফল্য কমিটি অফ পাবলিক সেফটির দৃষ্টিগোচর হয় এবং তিনি বিদ্রোহী নেতা ম্যাক্সিমিলিয়েন রবেসপিয়েরের অনুজ অগাস্টিন রবেস্পিয়েরের একান্ত সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এর ফলস্বরূপ, বড় রবেস্পিয়েরের পতনের পর ১৭৯৪ সালের ৬ আগস্ট কারাগার বন্দী হন কিন্তু দুই সপ্তাহ পরই নেপোলিয়ন ছাড়া পান।

হুইফ অফ গ্রেপশট[সম্পাদনা]

১৭৯৫ সালের ৩ অক্টোবর রাজপক্ষীয়রা এবং বিদ্রোহের বিরোধীরা জাতীয় কনভেনশনের বিরুদ্ধে একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলে। নেপোলিয়নকে টুইলারিস(Tuileries) প্রাসাদে প্রতিষ্ঠিত কনভেনশনের রক্ষায় গঠিত বাহিনীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি জোয়েচিম মুরাট (Joachim Murat) নামক একজন তরুণ কর্মকর্তাকে নিয়ে গোলন্দাজ বাহিনীর বিভিন্ন অংশকে একত্র করেন। তিনি এই বাহিনীকে আক্রমনকারীদের বিরুদ্ধে নিয়োগ করেন। তিনি পরে একে এভাবে ব্যাখা করেন যে তিনি হুইফ অফ গ্রেপশট-এর মাধ্যমে পথ পরিষ্কার করেছেন। এই সঘর্ষ সমগ্র ফ্রান্সেই বিদ্বেষপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে। এ অসাধারণ বিজয় তাঁকে অনেক খ্যাতি এনে দেয়। তিনি নতুন ডিরেক্টরির নেতা বারাসের (barras) সমর্থন পান। কিছুদিন পরেই তিনি বারাসের প্রাক্তন স্ত্রী জোসেফাইন দ্য ব্যুহ্যারানাইস (Josephine de Beauharnais)। পরবর্তীতে তিনি ১৭৯৬ সালের ৯ মার্চ জোসেফাইনকে বিবাহ করেন।

ইতালিতে সামরিক তৎপরতা (১৭৯৬-৯৭)[সম্পাদনা]

বিয়ের পরেই ১৭৯৬ সালের ২৭ মার্চ নেপোলিয়ন ফরাসি আর্মি অফ ইতালির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি সফলতার সাথে ইতালি আক্রমণ করেন। লোডিতে(Lodi) তিনি দি লিট্‌ল করপোরাল(le petit caporal) উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি তাঁর প্রায় সমস্ত সৈন্যকে খুব ভালোভাবে চিনতেন। তা থেকে ধারণা করা যায় সতীর্থদের সাথে তাঁর সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের কথা। তিনি লোম্বার্ডি থেকে অস্ট্রিয়ানদের বিতাড়িত করেন এবং পাপাল প্রদেশের(Papal States) সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন। এর কারণ ছিল, পোপ পিউস ৬(Pope Pius VI) কর্তৃক লুইস ১৬ (Louis XVI) এর কর্মকান্ডের প্রতিরোধ, ফ্রান্স কর্তৃক দুটি ক্ষুদ্র পাপাল ভূখন্ডের দখল। নেপোলিয়ন ইতালি আক্রমণ এবং পোপকে সিংহাসনচ্যুত করার জন্য ডিরেক্টরির আদেশ অগ্রাহ্য করেন। অবশ্য পরের বছরই জেনারেল বার্থিয়ের(General Berthier) ইতালি দখল করে নেন এবং ফেব্রুয়ারির বিশ তারিখ পোপকে বন্দী করেন। সেখানেই শারীরিক অসুস্থতার কারণে পোপ মৃত্যুবরণ করেন। ১৭৯৭ সালের শুরুতেই নেপোলিয়ন তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে অস্ট্রিয়ায় প্রবেশ করেন এবং তাঁর শক্তিকে শান্তির জন্য কাজে লাগান। কিছুদিনের মধ্যেই ফ্রান্স উত্তর ইতালির অধিকাংশই দখল করে নেয়। নীচুদেশসমূহ এবং রাইনল্যান্ডও ফ্রান্সের অধিকারে আসে। কিন্তু তখনো ফ্রান্স ভেনিস অধিকার করতে পারেনি। নেপোলিয়ন এরপর ভেনিসে গমন করেন এবং ভেনিস আত্নসমর্পন করতে বাধ্য হয়। এভাবে এক সহস্র বছরের স্বাধীন ভেনিসের পতন হয়। পরবর্তীতে ১৭৯৭ সালেই নেপোলিয়ন ইতালির ফ্রান্স শাসিত রাজ্যসমূহ নিয়ে সিজালপাইন রিপাবলিক (Cisalpine Republic) গড়ে তুলেন।

নেপোলিয়নের সামরিক তৎপরতাসমূহ তাঁর বাস্তবক্ষেত্রে সামরিক শক্তি প্রয়োগের অসীম জ্ঞানেরই প্রতিফলন ঘটায়। নেপোলিয়নের ভাষায়ঃ

আমি ষাটটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি, কিন্তু আমি এমন কিছু শিখিনি যা আমি শুরুতে জানতাম না।

মিশরে সামরিক তৎপরতা (১৭৯৮-৯৯)[সম্পাদনা]

১৭৯৮ সালের মার্চে বোনাপার্ট মিশর দখলের জন্য সামরিক অভিযান প্রস্তাব করেন। তখন উসমানীয় সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ কখন আক্রমণ করতে হবে সেটা সম্পর্কে নেপোলিয়নের অবিশ্বাস্য রকম কল্পনা শক্তি ছিল। নেপোলইয়ন প্রায়সময় গুপ্তচর নিয়োগ করে শত্রুপক্ষের গোপন খবর রাখতেন এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

১৮২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে নাপলীয়ন ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। তিনি ৫ ই মে তে মৃত্যুবরণ করেনে। তার শেষ শব্দগুলো ছিল "ফ্রান্স, ল'আর্মি, তেতে দ'আর্মি, জোসেফিনে" (অনুবাদ: "ফ্রান্স, সেনাবাহিনী, সেনা প্রধান, জোসেফিনে")[১][২]

ধর্ম[সম্পাদনা]

নেপলিয়ান ১৭৭১ সালের ২১শে জুলা আজাকিকোতে ব্যাপ্টাইজড হন; তিনি একজন ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক হিসেবে বেড়ে ওঠেন কিন্তু যথেষ্ট ধর্মবিশ্বাস তার ছিলনা।[৩] পরিণত বয়সে, তিনি একজন শ্বরবাদী ছিলেন এবং যীশুর তুলনায় মুহাম্মাদের প্রতি অধিক আগ্রহ দেখাতেন।[৪] নেপলিয়ানের উপাস্য ছিল অদৃশ্য ও অধরা ঈশ্বর। তবে,সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যক্ষেত্রে তিনি সংঘবদ্ধ ধর্মীয় শক্তির প্রতি অত্যন্ত অনুরাগী ছিলেন এবং নিজ লক্ষ হাসিলের জন্য তিনি তা প্রয়োগের জন্য যথেষ্ট মনযোগী ছিলেন। নিজের উপর ক্যাথলিক রীতিনীতি ও চমৎকারিত্বের প্রভাব উল্লেখ করেন তিনি।[৩]

নেপলিয়ান জোসেফিন ডি বেহারনেসকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়াই আইনি প্রক্রিয়ায় বিয়ে করেন। মিশর অভিযানের সময়, নেপলিয়ান একজন বিপ্লবী সেনাপ্রধানের জন্য যথেষ্ট ধর্মীয় উদারতা প্রকাশ করেন, ওলামাদের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং ধর্মীয় উদযাপনের নির্দেশ দেন, কিন্তু পোপ ষষ্ঠ পায়াসের মৃত্যুর পর নেপলিয়ানের প্রধান সহকারী এই আচরণকে রাজনৈতিক কৌশল বলে মন্তব্য করেন: "আমরা তাদের ধর্মের প্রতি মিছে আগ্রহ দেখানোর ভান করার মাধ্যমে মিশরীয়দের বোকা বানাচ্ছি। বোনপোর্ট এবং আমি কেহই এই ধর্ম্যা ততটা বিশ্বাস করি না যতটা পায়াস দ্য ডিফাংটের ধর্মে করি।"।[note ১] নিজ স্মৃতিগাঁথায়, বোনপড়তের সচিব বোরিন নেপলিয়ানের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে একই মন্তব্য লেখেন।[৬] তার ধর্মীয় সুযোগগ্রহণের কৌশল তার এই বিখ্যাত উক্তিতে ফুটে উঠেছে: "নিজেকে ক্যাথলিক বানানোর মাধ্যমে আমি ব্রিটানি ও ভ্যান্ডিতে শান্তি এনেছি, নিজেকে ইতালীয় বানানোর মাধ্যমে আমি ইতালিতে সবার মন জয় করেছি। নিজেকে মুসলিম বানিয়ে আমি মিশরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছি। আমি যদি ইহুদিদের শাসক হতাম, তবে আমি সলোমনের মন্দিরকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতাম।"[৭] তবে, জুয়ান কোরের মতে, "সে তুলনায়, নবী মুহাম্মদের জন্য বোনপোর্টের প্রশংসা ছিল খাঁটি।"[৮] এবং সেন্ট হেলেনায় তার বন্দিদশায় তিনি ভলতেয়ারের সমালোচক নাটকর্ম মাহোমেট-এ নবী মুহাম্মাদের নেতিবাচক চিত্রায়নের কঠোর সমালোচনা করেন।[৯]

নেপলিয়ান ১৮০৪ সালের ১-২ ডিসেম্বর প্যারিসের নটরডেমে পোপ সপ্তম পায়াস কর্তৃক "সম্রাট নেপলিয়ান" উপাধি লাভ করেন। ১৮১০ সালে তিনি অস্ট্রিয়ার রাজকন্যা ম্যারি লুইকে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী বিয়ে করেন। ১৮১৩ সালে স্পেনে তার ভাইয়ের শাসনের সময়ে, তিনি স্প্যানিশ ইনকুইজিশন প্রথা বিলুপ্ত করেন। সেন্ট হেলেনায় নির্বাসিত হিসেবে অবস্থানকালে জেনারেল গরগারডের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় নেপলিয়ান মানুষের উৎপত্তির ব্যাপারে নিজের অধিবাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন,[note ২] এবং যীশুর স্বর্গীয়তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন, এই বলে যে, রোমান ক্যাথলিক না হওয়ার কারণে সক্রেটিস, প্লেটো, মুসলিমগণ এবং অ্যাংলিকানরা ধ্বংস হয়ে যাবে এমনটা বিশ্বাস করা খুবই হাস্যকর।[note ৩] ১৮১৭ সালে তিনি গরগার্ডকে আরও বলেন যে "আমি মুহাম্মদীয় ধর্মটাকে সবচেয়ে বেশী পছন্দ করি। এতে অল্প হলেও কিছু জিনিস আছে যা আমাদের ধর্মের থেকে অধিক শক্তিশালী।"[১১] এবং বলেন "সকল ধর্মের মাঝে মুহাম্মদীয় ধর্ম সবচেয়ে উত্তম।"[১২] তবে, মৃত্যুর পূর্বে একজন খ্রিস্টান ধর্মযাজকই তাকে গোসল করিয়েছিলেন।[১৩]

উল্লেখ[সম্পাদনা]

  1. "Nous trompons les Égyptiens par notre simili attachement à leur religion, à laquelle Bonaparte et nous ne croyons pas plus qu'à celle de Pie le défunt."[৫]
  2. "I think the matter that made man was slime, warmed by the sun and vivified by electric fluids. What are animals—an ox, for example—but organized matter? Well, when we see that our physical frame resembles theirs, may we not believe that we are only better organized matter. … The most simple idea consists in worshiping the sun, which gives life to everything. I repeat, I think man was created in an atmosphere warmed by the sun, and that after a certain time this productive power ceased."[১০]
  3. "I do not think Jesus Christ ever existed. I would believe in the Christian religion if it dated from the beginning of the world. That Socrates, Plato, the Mohammedan, and all the English should be damned is too absurd. Jesus was probably put to death, like many other fanatics who proclaimed themselves to be prophets or the expected Messiah. Every year there were many of these men."[১০]
  1. McLynn 1998, পৃ. 655
  2. Roberts, Napoleon (2014) 799-এ801
  3. ৩.০ ৩.১ "L'Empire et le Saint-Siège"। Napoleon.org। সংগৃহীত ১৫ জুন ২০১১ 
  4. Stephen Coote (২০০৫)। Napoleon and the Hundred Days। Perseus। পৃ: ২৮। 
  5. Jacques Bainville, Napoleon I, p.94
  6. "Bonaparte and Islam."। Center for History and New Media at George Mason University। সংগৃহীত ১২ জুলাই ২০১২ 
  7. "Napoleon: Man of Peace"। Napoleon-series.org। ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯। সংগৃহীত ৪ নভেম্বর ২০১১ 
  8. Juan Cole, Napoleon's Egypt: Invading the Middle East, Palgrave Macmillan, 2007, p.29
  9. Memoirs of the Life, Exile, and Conversations of the Emperor Napoleon, volume 2, Emmanuel-Auguste-Dieudonné comte de Las Cases, Redfield, 1855, p.94
  10. ১০.০ ১০.১ Gourgaud 1903, পৃ. 276–277
  11. Gourgaud 1903, পৃ. 274–275
  12. Gourgaud 1903, পৃ. 279–280
  13. Louis Antoine Fauvelet de Bourrienne, Memoirs of Napoleon Bonaparte। Scott, Webster & Geary। ১৮৩৯। পৃ: ৫৮৬। সংগৃহীত ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১১