দক্ষিণ হিসপানিয়া

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
১৯৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইবেরীয় উপদ্বীপের রোমের অধীন অংশের দুটি প্রশাসনিক প্রদেশ - উত্তর হিসপানিয়া (Hispania Citerior) ও দক্ষিণ হিসপানিয়া (Hispania Ulterior)

দক্ষিণ হিসপানিয়া বা দূরবর্তী হিসপানিয়া (লাতিন - Hispania Ulterior; হিসপানিয়া উলতেরিওর, স্পেনীয় - Hispania la lejana ; ইসপানিয়া লা লেখানা) হল বর্তমান স্পেনের দক্ষিণ অঞ্চলে ভূমধ্যসাগরঅতলান্ত মহাসাগর তীরবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত একটি রোমান প্রদেশ। দ্বিতীয় পুনিক যুদ্ধে কার্থেজীয়দের কাছ থেকে ইবেরীয় উপদ্বীপের কর্তৃত্ব রোমান প্রজাতন্ত্রের হাতে আসে। তারপর খ্রিস্টপূর্ব ১৯৭ অব্দে রোমানরা পিরেনিজ পর্বতের দক্ষিণে উপদ্বীপের তাদের নিজেদের কর্তৃত্বাধীন অঞ্চলকে প্রশাসনিকভাবে দু'টি প্রদেশে ভাগ করে। এর মধ্যে উত্তরের, অর্থাৎ রোম থেকে অপেক্ষাকৃত নিকট প্রদেশটির নাম দেওয়া হয় "নিকট হিসপানিয়া" বা "উত্তর হিসপানিয়া" ও তার দক্ষিণে রোম থেকে অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী প্রদেশটির নাম দেওয়া হয় দূরবর্তী হিসপানিয়া বা দক্ষিণ হিসপানিয়া। প্রথমে এর অন্তর্ভুক্ত ছিল মূলত দক্ষিণ স্পেনের গুয়াদালকিবির উপত্যকা অঞ্চল, যদিও পরে ইবেরীয় উপদ্বীপের পশ্চিমাংশের এক বিশাল অংশ এর অন্তর্ভুক্ত হয়। এর প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল করদুবা, বর্তমান স্পেনের করদোবা শহর।[১][২]

নামের উৎপত্তি[সম্পাদনা]

ইবেরীয় উপদ্বীপকে লাতিনে হিসপানিয়া নামে অভিহিত করা হত। কবি কুইন্টাস এনিয়াসের লেখাতেও আমরা শব্দটির উল্লেখ পাই; অর্থাৎ, খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দ নাগাদ শব্দটি ইতিমধ্যেই চালু ছিল। সম্ভবত শব্দটির উৎস ছিল ফিনিশীয় শব্দ ই-শাফান (אי שפן); অর্থ - "হাইরাক্সদের উপকূল"। সম্ভবত এই অঞ্চলের প্রচূর খরগোশকে ফিনিশীয় নাবিকরা হাইরাক্স প্রজাতির মেঠো ইঁদুর বলে ভুল করে এই নাম দিয়েছিল। অন্যদিকে উলতেরিওর শব্দটি হল লাতিন বিশেষণ উলতের (ulter) এর কমপারাটিভ রূপ, যার অর্থ ছাড়িয়ে[৩] বা আরও দূরের[৪]। অর্থাৎ, হিসপানিয়া উলতেরিওর পুরো নামটির আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় হিসপানিয়া ছাড়িয়ে

ইতিহাস[সম্পাদনা]

করদোবায় গুয়াদালকিবির নদীর উপরে পুরনো রোমান সেতু পুয়েন্তে রোমানো দে করদোবা

প্রথম পুনিক যুদ্ধে (২৬৪ - ২৪১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) সিসিলি, সার্দিনিয়াকর্সিকা দ্বীপের অধিকার কার্থেজের হাতছাড়া হয়। এরপর থেকে তারা ইবেরীয় উপদ্বীপের দক্ষিণ দিকে নিজেদের প্রভাববৃদ্ধিতে উদ্যোগী হয়ে ওঠে। কিন্তু দ্বিতীয় পুনিক যুদ্ধে (২১৮ - ২০১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) লড়াই ইবেরীয় উপদ্বীপেও ছড়িয়ে পড়লে রোমান সেনা উপদ্বীপের উপকূলীয় এলাকায় পদার্পণ করে। ২০৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইলিপার যুদ্ধে রোমানরা জয়ী হলে ইবেরীয় উপদ্বীপের কর্তৃত্ব তাদের করায়ত্ত্ব হয়।[৫]

এরপর ১৯৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমানরা উপদ্বীপে তাদের নতুন বিজিত এলাকাকে ঐ অঞ্চলে যুদ্ধ পরিচালনার উদ্দেশ্যে উপস্থিত তাদের দু'টি বাহিনীর অবস্থান অনুযায়ী দুটি প্রশাসনিক এলাকায় ভাগ করে - উত্তর বা নিকট হিসপানিয়া (Hispania Citerior) ও দক্ষিণ বা দূরবর্তী হিসপানিয়া (Hispania Ulterior)।[৬] তবে স্থানীয় কেল্টীয় জনসমষ্টি স্বেচ্ছায় বা বিনাসংগ্রামে রোমানদের শাসন মেনে নেয়নি। বস্তুত যে মুহূর্তে রোমানরা উপদ্বীপের মাটিতে পা রাখে, সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় তাদের প্রতিরোধ। ১৯৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে হিসপানিয়ায় রোমানদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় থেকেই তাদের সাথে স্থানীয় কেল্টীয় জনসমষ্টির এই বিরোধ কিছুদিনের মধ্যেই থেলতিবেরীয় যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করে। যুদ্ধে শেষপর্যন্ত রোমানরা জয়ী হলে ১৭৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্রখ্যাত রোমান রাজনীতিবিদ তিবেরিয়াস সেমপ্রোনিয়াস গ্রাকাসের উদ্যোগে উভয়পক্ষের মধ্যে যে চুক্তি হয়, তার মধ্য দিয়ে বিশেষত লুসো জনগোষ্ঠী রোমের কাছে আত্মসমর্পণ করে ও তাদের অধীনতা মেনে নেয়। এরফলে উপদ্বীপে এক তুলনামূলক শান্তির সময় প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এই তথাকথিত শান্তির সময়েও স্থানীয় মানুষের বিদ্রোহ ও অসন্তোষের ফলে এই প্রদেশে রোমানদের অবস্থান খুব একটা সুনিশ্চিত ছিল না। ১৭৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমান রাজনীতিবিদ ও প্রশাসক মার্কাস কর্নেলিয়াস শিপিও মালুগিনেনসিস সম্মানীয় প্রেটর উপাধি লাভ করেও[৭] ধর্মীয় দায়দায়িত্বের অজুহাত দেখিয়ে এই প্রদেশের প্রশাসনের দায়িত্ব থেকে সেনেটের কাছে যে অব্যাহতি চান, হয়তো তার পিছনে আসল কারণ তাই।[৮] ১৭১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নিকট ও দূরবর্তী (উত্তর ও দক্ষিণ) হিসপানিয়া প্রদেশদু'টিকে প্রশাসনিকভাবে মিলিয়ে একটি বৃহত্তর প্রদেশে পরিণত করা হয়। কিন্তু ১৬৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সেই ব্যবস্থা রদ করে আবার পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া হয়।

এরপর ১৫৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আবার নূতন করে বিদ্রোহ ও অশান্তি মাথা চাড়া দেয়। স্থানীয় উপজাতি লুসিতানোরা বিদ্রোহ করলে প্রথমে রোমানরা তাদের নিষ্ঠুরভাবে দমন করে। কিন্তু তাদের নতুন নির্বাচিত নেতা নেতা ভিরিয়াতোর নেতৃত্বে তারা কিছুদিনের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয় ও স্থানীয় রোমান কর্তৃপক্ষকে আক্রমণ করে। পরপর সংঘর্ষে রোমানরা পরাজিত হলে বিদ্রোহ অন্যান্য স্থানেও ছড়িয়ে পড়ে ও অন্যান্য স্থানীয় অধিবাসীরাও তাতে যোগ দেয়।[৯] দেখতে দেখতে প্রায় সমগ্র উপদ্বীপ ধরেই বিদ্রোহ দমনের উদ্দেশ্যে রোমানদের সামরিক ব্যস্ততা তুঙ্গে ওঠে। আলেক্সান্দ্রিয়ার দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আপিয়ানোসের মতে অবশ্য বিদ্রোহদমনে রোমানদের এই সামরিক তৎপরতার আসল উদ্দেশ্য ছিল যতটা না রোমের স্বার্থরক্ষা, তার থেকে অনেক বেশি ছিল স্থানীয় রোমান প্রশাসক ও সমরনায়কদের ব্যক্তিগত কৃতিত্ব অর্জনের প্রচেষ্টা।[১০] শেষপর্যন্ত ১৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বিশ্বাসঘাতকতায় ভিরিয়াতোর মৃত্যু হলে[১১] রোমানদের প্রচেষ্টা সফল হয়। রোমান কনসাল ডেসিমাস ইউনিয়াস ব্রুটাস গালাইকাসের নেতৃত্বে তারা ১৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ তাদের হারানো এলাকা অনেকটাই পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। যাইহোক, এরপরেও রোমানরা যত তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা বাড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে, উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্থানীয়দের মধ্যে বিদ্রোহও মাঝেমধ্যেই মাথাচাড়া দেয়। শেষপর্যন্ত ১৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিজার অগাস্টাসের সময় কানতাব্রিয়ার যুদ্ধের (২৯ - ১৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) অবসান হলে সমগ্র উপমহাদেশেই রোমানদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।[১২]

বিলোপ[সম্পাদনা]

কানতাব্রিয়ার যুদ্ধ চলাকালীনই ২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সম্রাট অগাস্টাস সমগ্র রোম সাম্রাজ্যের প্রশাসনেই ব্যাপক সাংবিধানিক রদবদল ঘটান।[১৩] সেইসঙ্গে পুরনো প্রদেশগুলিকেও নতুন করে পুনর্বিন্যাস করা হয়। যুদ্ধশেষে সমগ্র ইবেরীয় উপদ্বীপেই রোমের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে সেই প্রশাসনিক বিভাগই স্থায়িত্বলাভ করে। এর ফলে হিসপানিয়া উলতেরিওরকে ভেঙে দু'টি নূতন প্রদেশ সৃষ্টি করা হয়: লুসিতানিয়াবেতিকা। এরমধ্যে লুসিতানিয়ার অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমান পর্তুগাল, এক্সত্রামাদুরা ও কাস্তিয়া ও লেওন'এর অংশবিশেষ; অন্যদিকে বেতিকা মূলত আজকের আন্দালুসিয়াকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল। অপরদিকে উত্তর বা নিকট হিসপানিয়া (হিসপানিয়া থিতেরিওর) আরও বিস্তৃত হয়ে কানতাব্রিয়া ও বাসকো অঞ্চলকেও গ্রাস করে। তবে তার নাম পালটে গিয়ে তা হিসপানিয়া তারাকোনেনসে নামে পরিচিতি লাভ করে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Tilmann Bechert: Die Provinzen des römischen Reiches. Einführung und Überblick. von Zabern, Mainz 1999, ISBN 3-8053-2399-9, S. 65–71.
  2. Franz Braun: Die Entwicklung der spanischen Provinzialgrenzen in römischer Zeit (= Quellen und Forschungen zur alten Geschichte und Geographie. Bd. 17, ISSN 0259-7055). Weidmann, Berlin 1909.
  3. Wikitionary (English)
  4. wikicionario (español)
  5. Grout, James. "The Celtiberian War". Encyclopaedia Romana. সংগৃহীত ৬ জুলাই, ২০১৯।
  6. Infopédia. "Artigo de apoio Infopédia – Romanização da Península Ibérica". Infopédia – Dicionários Porto Editora. (পর্তুগিজ ভাষায়) সংগৃহীত ২৭ জুন, ২০১৯।
  7. Palmer, R. E. A. "The Deconstruction of Mommsen on Festus". Imperium Sine Fine. Ed. Thomas Robert Shannon Broughton. Franz Steiner Verlag, Stuttgart. 1996. P. 90. ISBN 9783515069489.
  8. Harris, W. V. (1989). Guerra e imperialismo en la Roma republicana. 327-70 a. C. (Carmen Santos Fontenla, trad.). Siglo XXI. ISBN 8432306789. (স্পেনীয় ভাষা)
  9. Muñoz, Mauricio Pastor et al. [file:///C:/Users/Manager/Downloads/Dialnet-ViriatoEnElAmbitoUrsonense-3181595%20(1).pdf "VIRIATO EN EL ÁMBITO URSONENSE"]. 2004. AMIGOS DE LOS MUSEOS. P. 40-51. সংগৃহীত ১২ জুলাই, ২০১৯।
  10. Appian. Roman History; Vol I: The Wars in Spain; translated by Horace White (Loeb Classical Library). London: Heinemann, 1912
  11. Eutropius, Abridgement of Roman History, Book IV সংগৃহীত ১২ জুলাই, ২০১৯।
  12. Bosch Gimpera, Aguado Bleye, José Ferrandis. Historia de España. España romana, I. Obra dirigida por Ramón Menéndez Pidal. Editorial Espasa-Calpe S.A., Madrid 1935
  13. Abbott, Frank Frost. A History and Description of Roman Political Institutions. Athenaeum: Boston, 1901. P. 267-8. সংগৃহীত ১৫ জুলাই, ২০১৯।