নৈহাটি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
নৈহাটি
শহর
Jubilee Bridge
নৈহাটি পশ্চিমবঙ্গ-এ অবস্থিত
নৈহাটি
নৈহাটি
পশ্চিমবঙ্গ, ভারতে অবস্থান
স্থানাঙ্ক: ২২°৫৪′ উত্তর ৮৮°২৫′ পূর্ব / ২২.৯° উত্তর ৮৮.৪২° পূর্ব / 22.9; 88.42স্থানাঙ্ক: ২২°৫৪′ উত্তর ৮৮°২৫′ পূর্ব / ২২.৯° উত্তর ৮৮.৪২° পূর্ব / 22.9; 88.42
দেশ  ভারত
রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ
জেলা উত্তর ২৪ পরগণা
উচ্চতা ১৫ মিটার (৪৯ ফুট)
জনসংখ্যা (2001)
 • মোট ২,১৫,৪৩২
ভাষা
 • অফিসিয়াল বাংলা, ইংরেজি
সময় অঞ্চল আইএসটি (ইউটিসি+৫:৩০)

নৈহাটি ( ইংরেজি: Naihati) ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগণা জেলার একটি শহর ও পৌরসভা এলাকা। নৈহাটি পৌরসভা সারা দেশের প্রাচীনতম পৌরসভার একটি, যেটা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৯ সালে।ঐতিহ্যশালী এই শহর বন্দে মাতরম গানের রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মস্থল।এছাড়াও হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, প্রখ্যাত সাহিত্যিক সমরেশ বসু , বিখ্যাত রাসায়ানবিদ দেবাসিশ মুখার্জির মত ব্যক্তি জন্ম নেন।রেলপথ এবং সড়কপথ দ্বারা কলকাতার সঙ্গে যুক্ত। ঘনবসতিপূর্ণ এই শহরে প্রায় দুলক্ষেরও বেশি মানুষ বসবাস করেন।

ভৌগোলিক অবস্থান[সম্পাদনা]

শহরটির অবস্থানের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ হল ২২°৫৪′ উত্তর ৮৮°২৫′ পূর্ব / ২২.৯° উত্তর ৮৮.৪২° পূর্ব / 22.9; 88.42[১] সমুদ্র সমতল হতে এর গড় উচ্চতা হল ১৫ মিটার (৪৯ ফুট)।

আবহাওয়া ও জলবায়ু[সম্পাদনা]

ক্রান্তীয় মণ্ডলে অবস্থিত হওয়ায় এই অঞ্চলের আবহাওয়া গরমকালে উষ্ম ও আর্দ্র ,শীতকালে শুষ্ক।গরমকালে গড় তাপমাত্রা থাকে ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াস।শীতকালে গড় তাপমাত্রা থাকে ৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস।বরষাকালে বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয় বাষ্প সংগ্রহ করে মেঘ বৃষ্টি ঘটায়।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

নৈহাটির অতীত নাম ছিল নবহট্ট। এই শহরের পশ্চিম দিক দিয়ে বয়ে গেছে হুগলী নদী, যার অপর পাড়ে হুগলি জেলার চুঁচুড়া শহর অবস্থিত। উত্তর দিকে হালিশহর, দক্ষিণ দিকে ভাটপাড়া; নৈহাটির পূর্ব দিকে রয়েছে গ্রামাঞ্চল। ঐতিহ্যশালী এই শহর বন্দে মাতরম গানের রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মস্থল। এছাড়া বিখ্যাত মনীষী হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, সাহিত্যিক সমরেশ বসু এবং গায়ক শ্যামল মিত্র এই শহরে বসবাস করেছেন।

উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান[সম্পাদনা]

এখানে বেশ কিছু ছেলেদের এবং মেয়েদের স্কুল আছে ।তাদের মধ্যে বাঙলা মাধ্যাম এর স্কুলগুলি হল নৈহাটি নরেন্দ্র বিদ্যা নিকেতন,নৈহাটি মহেন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়, নৈহাটি কাত্যায়নী উচ্চ বালিকা বিদ্যাল্‌য় নৈহাটি প্রফুল্ল সেন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, বিজয়নগর উচ্চবিদ্যালয় ।হিন্দি মাধ্যাম এর স্কুলগুলি হল গৌরীপুর হিন্দি হাই স্কুল ,বিদ্যয়াবিকাশ হাই স্কুল । ইংরাজী মাধ্যামএর স্কুলের মধ্যে সেন্ট লুকস ডে স্কুল যা আই.এস. সি. ঈ, নিউ দিল্লি বোর্ড দ্বারা অনুমো্দিত ।এখানে অবস্থিত ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র কলেজ (১৯৪৭) আগে যেটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা অনুমোদিত ছিল এখন সেটি ওয়েস্ট বেঙ্গল ষ্টেট উইনিভার্সিটির দ্বারা অনুমোদিত । সকাল, দুপুর এবং বিকালের তিনটি আলাদা আলাদা বিভাগ আছে। বর্তমানে বেশ কিছু কল কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে এই শহরের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়।

যোগাযোগ[সম্পাদনা]

এই শহরের বহু লোক কর্মসূত্রে রোজ কলকাতায় যাতায়াত করেন। ট্রেনে নৈহাটি থেকে কলকাতার শেয়ালদহ পৌছাতে মোটামুটিভাবে এক ঘণ্টা সময় লাগে। নৈহাটি রেলওয়ে স্টেশন একটি জংশন স্টেশন। কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশন থেকে যে রেলপথটি নৈহাটি এসেছে তা নৈহাটির পর দুইভাগে ভাগ হয়েছে। একটি ভাগ গেছে নদীয়া জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর রানাঘাট হয়ে লালগোলা অভিমুখে এবং অপর ভাগটি গেছে হুগলি নদী পেরিয়ে ব্যান্ডেল স্টেশনে। হুগলি নদীর উপর জুবিলি ব্রিজটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু এবং এটি প্রায় একশো বছরেরও বেশি পুরোনো। বর্তমানে এই সেতুর পাশেই একটি নতুন সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। জলপথ পরিবহনে নৈহাটি চুঁচুড়ার সাথে যুক্ত। ব্যারাকপুর - কাঁচরাপাড়া সড়ক ছাড়াও নিকটবর্তী কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে দ্বারা নৈহাটি সরাসরি কলকাতার সাথে সড়কপথে সংযুক্ত।

বাস রাস্তা[সম্পাদনা]

জনসংখ্যার উপাত্ত[সম্পাদনা]

ভারতের ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে নৈহাটি শহরের জনসংখ্যা হল ২১৫,৪৩২ জন;[২] এর মধ্যে পুরুষ ৫৩% এবং নারী ৪৭%।পুরুষের জনসংখ্যার অনুপাতে বেশি।এখানে সাক্ষরতার হার ৮৯%। পুরুষদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৯৩. ১৬% এবং নারীদের মধ্যে এই হার ৮৬. ৩১%। সারা ভারতের সাক্ষরতার হার ৭৫.০৬%; তার চাইতে নৈহাটি এর সাক্ষরতার হার বেশি।এই শহরের জনসংখ্যার ৯% হল ৬ বছর বা তার কম বয়সী। নৈহাটি শহরের জনঘনত্বব ১৮,৬৪১/ বরগকিলোমিতার , যা বিশ্বে ৫০তম স্থানে।

প্রখ্যাত ব্যক্তিরা[সম্পাদনা]

অনেক বিখ্যাত মানুষের বাসস্থান ও জন্মস্থান নৈহাটি শহর।

বিদ্যাধর ভট্টাচার্য্য[সম্পাদনা]

বিদ্যাধর ভট্টাচার্য্য একজন বাঙালী ব্রাহ্মণ যিনি রাজস্থানের জয়পুর শহরের নকশা করেছিলেন বলে কথিত আছে।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী[সম্পাদনা]

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, একজন প্রখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক, ভারততত্ত্ববিদ, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতা - তাঁরও আদিবাড়ি এখানেই। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজকোষাগার থেকে চর্যাপদের পুঁথি আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত। এই আবিস্কারের ওপর রচিত তার গবেষণা গ্রন্থ "হাজার বছরের পুরান বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গান ও দোঁহা" নামে ১৯১৬ সালে প্রকাশ পায়, যা বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন ও অমূল্য সম্পদ। এ ছাড়াও উনি অনেক প্রাচীন পুঁথি ও গ্রন্থ আবিষ্কার করেন।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়[সম্পাদনা]

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

উনিশ শতকের নবজাগরনের অন্যতম রূপকার এবং বাংলা সাহিত্যে উপন্যাস স্বংরূপটি যার হাতে প্রথম জনপ্রিয় রূপ পায়, তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর জন্মও ১৮৮৩৮ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে জুন এই নৈহাটি শহরে। উনি ওনার বাবার মত সরকারী চাকরি করতেন। ডেপুটি মেজিস্ট্রেড ও ডেপুটি কালেক্টর পদে নিযুক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন। ওনার লেখা বিখ্যাত উপন্যাসগুলি হল- রাজসিংহ, দূর্গেশনন্দিনী, বিষবৃক্ষ, ইন্দিরা। এছাড়াও কমলাকান্তের মতো চরিত্রও তাঁরই সৃষ্টি। "বঙ্গদর্শন" - এর মতো যুগান্তকারি পত্রিকার সম্পাদক তিনি। "আনন্দমঠ" উপন্যাসে ব্যাবহৃত "বন্দেমাতরম" গানটি তৎকালীন সময়ের স্বদেশী আন্দোলনের বিপ্লবীদের প্রভাবিত করেছিলো।

শ্যামল মিত্র[সম্পাদনা]

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় গায়ক শ্যামল মিত্রেরও জন্মস্থান এখানে। ১৯২৯ সালের নভেম্বর মাসে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর গাওয়া গান এখনও সমানভাবে জনপ্রিয়। "অমানুষ" চলচ্চিত্রে তাকে আমরা সুরকার হিসেবেও পাই। "আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে," "ওই আঁকা বাঁকা যে পথ," "জীবন খাতার প্রতি [পাতায়" এই গানগুলি এত বছর পরেও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

সমরেশ বসু[সম্পাদনা]

সমরেশ বসু বাঙলা সাহিত্যের একজন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক। তিনি কালকুট ছদ্মনামেও কিছু গ্রন্থ লিখেছেন। তারিই লেখায় শ্রমজীবী মানুষের জীবন যন্ত্রনা, যৌনতা, রাজনীতীর ছাপ পাই। ১৯৮০ সালে তিনি আকাদেমি পুরস্কার পান ""শাম্ব" নামের উপন্যাস লেখার জন্য। গোগল, বিবর, কোথায় পাব তারে - এগুলি তাঁর বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম। তাঁর কৈশর কাটে নৈহাটিতে।

কেশবচন্দ্র সেন[সম্পাদনা]

বাংলার নবজাগরনের অন্যতম পুরোধা হলেন কেশব চন্দ্র সেন। তাঁর জন্মস্থান নৈহাটির গরিফা এলাকায়। ১৮৩৮ সালে তিনি জন্মগ্রহন করেন। তিনি বাংলায় ব্রাহ্ম আন্দোলনেরও পুরোধা পুরুষ। তাঁর নামে স্কুল ও পাঠাগার এখনও নৈহাটিতে আছে।

এছাড়াও মৃনালকান্তি ঘোষ, রূপা ঘোষ, সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মস্থানও এখানে। প্রসঙ্গত, বর্তমানের জনপ্রিয় আধুনিক বাঙলা গায়ক রাঘব চট্টোপাধ্যায়ও এখানকারই মানুষ।

মৎস্য চাষ[সম্পাদনা]

নৈহাটি বটতলা এলাকায় ব্যাপক পরিমাণে মাছের চাষ হয়।রুই,কাতলা,মাগুর,কই,পাবদাএরকম নানা স্বাদু জলের মাছ চাষ করা হয়। বটতলা রাজেন্দ্রপুর পাইকারী বাজার আছে যা খুবই জনপ্রিয়।অনেক ধরণের মানুষ এই মাছ চাস ও ব্যবসা করে থাকে।

উৎসব[সম্পাদনা]

নৈহাটিতে বিখ্যাত উৎসব হল কালী পুজা।"বড় মা " পুজা তাদের মধ্য সব থেকে প্রাচীন ও বিখ্যাত। এখানকার দুর্গা পুজা, ছট পুজা এবং নানা সম্প্রদায় উৎসব বেশ স্মারহে পালিত হয়।পুজার পাশাপাশি প্রত্যাক বছর এর শেষ সপ্তাহ জুড়ে চলে নৈহাটি বইমেলা, শিশুমেলা,শিল্পমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুসঠান। যাকে বলা হয় "নৈহাটি উৎসব"।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Naihati"Falling Rain Genomics, Inc (ইংরেজি ভাষায়)। সংগৃহীত অক্টোবর ১৫, ২০০৬ 
  2. "ভারতের ২০০১ সালের আদমশুমারি" (ইংরেজি ভাষায়)। সংগৃহীত অক্টোবর ১৫, ২০০৬