তিস্তা নদী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
তিস্তা
তিস্তা নদী
উৎস উত্তর সিকিমের হিমালয় পর্বতমালা
অবস্থান ভারত, বাংলাদেশ
দৈর্ঘ্য ৩১৫ কিলোমিটার
উত্সের উচ্চতা ১৭,৪৮৭ ফুট
অববাহিকা আয়তন ২,৪৩০
কালিম্পঙের কাছে তিস্তা-রঙ্গিত সংযোগস্থল
উত্তর বাংলাদেশে তিস্তা অববাহিকার মানচিত্র

তিস্তা নদী (নেপালি: टिस्टा) ভারতের সিকিমপশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত একটি নদী। তিস্তা সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি বিভাগের প্রধান নদী। একে সিকিম ও উত্তরবঙ্গের জীবনরেখাও বলা হয়। সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর বাংলাদেশে প্রবেশ করে তিস্তা ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।[১]

হিন্দু পুরাণ অনুসারে এটি দেবী পার্বতীর স্তন থেকে উৎপন্ন হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে নদীটির বাংলা নাম তিস্তা এসেছে ‘ত্রি-সে্রাতা’ বা ‘তিন প্রবাহ’ থেকে। সিকিম হিমালয়ের ৭,২০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত চিতামু হ্রদ থেকে এই নদীটি সৃষ্টি হয়েছে। এটি দার্জিলিং -এ অবস্থিত শিভক গোলা নামে পরিচিত একটি গিরিসঙ্কটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। দার্জিলিং পাহাড়ে তিস্তা একটি বন্য নদী এবং এর উপত্যকা ঘনবনে আচ্ছাদিত। পার্বত্য এলাকায় এর নিষ্পাশন এলাকার পরিমাণ মাত্র ১২,৫০০ বর্গ কিলোমিটার। পার্বত্য এলাকা থেকে প্রথমে প্রবাহটি দার্জিলিং সমভূমিতে নেমে আসে এবং পরে পশ্চিমবঙ্গের (ভারত) দুয়ার সমভূমিতে প্রবেশ করে। নদীটি নিলফামারী জেলার খড়িবাড়ি সীমান্ত এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

অষ্টাদশ শতকের প্রায় শেষ পর্যন্ত এই ধারাটি বিভিন্ন নদীপ্রবাহের মাধ্যমে গঙ্গা নদীতে প্রবাহিত হতো। ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দের অতিবৃষ্টি একটি ব্যাপক বন্যার সৃষ্টি করেছিল এবং সেই সময় নদীটি গতিপথ পরিবর্তন করে লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধা জেলার মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে চিলমারী নদীবন্দরের দক্ষিণে ব্রহ্মপুত্র নদে পতিত হয়। তিস্তা নদীর সর্বমোট দৈর্ঘ্য ৩১৫ কিমি, তার মধ্যে ১১৫ কিমি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে অবস্থিত। তিস্তা একসময় করতোয়া নদীর মাধ্যমে গঙ্গার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল এবং এর অংশবিশেষ এখনও বুড়ি তিস্তা নামে পরিচিত।

তিস্তার মাসিক গড় পানি অপসারণের পরিমাণ ২,৪৩০ কিউসেক।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে তিস্তার ভারতীয় অংশে গজলডোবায় স্থাপিত বাঁধের সবগুলি গেটবন্ধ বন্ধ করে দেয়া হলে তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশে পানিপ্রবাহ শূন্যে নেমে আসে। এর ফলে বাংলাদেশের ১২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা অববাহিকায় মানুষেল জীবন যাত্রা স্থবির হয়ে পড়ে।[২] এর প্রতিবাদে এপ্রিল মাসে (২০১৪) বাংলাদেশে একটি প্রতিবাদী জনযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। [৩] এই জনযাত্রার মুখে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কিছু পানি ছাড়লে বাংলাদেশের ডালিয়া পয়েন্টে পানি স্বল্প সময়ের জন্য উল্লেখযেোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।[৪]

প্রবাহপথ[সম্পাদনা]

তিস্তা নদীর উৎস উত্তর সিকিমের হিমালয় পর্বতমালার ৫,৩৩০ মি (১৭,৪৮৭ ফু) উচ্চতায় অবস্থিত সো লামো হ্রদে[৫] হ্রদটি শেসচেনের কাছে ডোংখা গিরিপথের উত্তরে অবস্থিত।[৬]

তিস্তা নদী ছাঙ্গু, ইউমথাং ও ডোংকিয়া লা পর্বতশ্রেণী থেকে উৎপন্ন ছোট ছোট নদীর জলে পুষ্ট। সিকিমের রংপো ও পশ্চিমবঙ্গের তিস্তাবাজার শহরের মাঝের অংশে তিস্তাই উভয় রাজ্যের সীমানা নির্দেশ করছে। তিস্তা সেতুর (যে সেতুটি দার্জিলিংকালিম্পং শহরের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে) ঠিক আগে তিস্তা তার প্রধান উপনদী রঙ্গিতের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এখান থেকে তিস্তার গতি দক্ষিণমুখী। শিলিগুড়ি শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে সেবকের করোনেশন সেতু পেরিয়ে তিস্তা পশ্চিমবঙ্গের সমভূমি অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। তারপর পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলা ও বাংলাদেশের রংপুর জেলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তিস্তা মিশেছে ব্রহ্মপুত্রে।

ভূগোল[সম্পাদনা]

গ্যাংটকের পথে তিস্তা

সিকিমের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় তিস্তা নদী অনেকগুলি গিরিখাত সৃষ্টি করেছে। তিস্তার পথে নানা ধরনের বনভূমি দেখা যায়। নিম্ন অববাহিকায় ক্রান্তীয় পর্ণমোচী ও গুল্ম শ্রেণীর গাছপালা বেশি চোখে পড়ে। উচ্চ অববাহিকায় দেখা যায় আল্পীয় বনভূমি। নদী উপত্যকায় প্রচুর সাদা বালি পাওয়া যায়, যা এখানকার নির্মাণশিল্পের একটি প্রধান কাঁচামাল। নদীর জলে বড় বড় বোল্ডার দেখা যায় বলে তিস্তার‌্যাফটিং অভিযাত্রীদের কাছে এক আদর্শ নদী।

রংপো ও লোহাপুল শহরের কাছে তিস্তার বেশ খরস্রোতা। এখানে হোয়াইট রিভার র‌্যাফটিং খুব জনপ্রিয়। তিস্তাবাজার ও মেল্লি শহরের কাছে গ্রুপ র‌্যাফটিং-এর ব্যবস্থা রয়েছে। তিস্তা শান্তদর্শন নদী হলেও, নদীর গভীরের জল বেশ খরস্রোতা। ১৯১৫ সালে দার্জিলিঙের মিউনিসিপ্যাল ইঞ্জিনিয়ার জি. পি. রবার্টসন নদী সমীক্ষা করতে এসে নৌকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে জলে ডুবে মারা যান। নৌকাটি একটি নিমজ্জিত বোল্ডারে ধাক্কা খেয়ে এক ঘূর্ণির মধ্যে পড়ে যায়। যাত্রীদের কোনো খোঁজই পাওয়া যায়নি।

বর্ষাকালে তিস্তায় দুকুল ছাপিয়ে বন্যা হয়। এই সময় তিস্তার আশেপাশের পাহাড়ে ধ্বস নামতেও দেখা যায়।

তিস্তার পার্বত্য অববাহিকা।

নদীপথ পরিবর্তন[সম্পাদনা]

১৫০০ সালের পর থেকে বাংলার অনেক নদীর নদীখাতই ভৌগোলিক কারণে পরিবর্তিত হয়েছে। তিস্তা নদীর তাদের মধ্যে একটি।[৭]

তিস্তা নদী আগে জলপাইগুড়ির দক্ষিণে তিনটি ধারায় প্রবাহিত হত: পূর্বে করতোয়া, পশ্চিমে পুনর্ভবা ও মধ্যে আত্রাই। সম্ভবত এই তিনটি ধারার অনুষঙ্গেই ত্রিস্রোতা নামটি এসেছিল, যেটি কালক্রমে বিকৃত হয়ে দাঁড়ায় তিস্তা। তিনটি ধারার মধ্যে পুনর্ভবা মহানন্দায় মিশত। আত্রাই চলন বিলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে করতোয়ায় মিশত। তারপর আত্রাই-করতোয়ার যুগ্মধারাটি জাফরগঞ্জের কাছে মিশত পদ্মায়। ১৭৮৭ সালের এক বিধ্বংসী পর তিস্তা তার পুরনো খাত পরিবর্তন করে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মেশে।[৭]

রেনেলের মানচিত্রে (১৭৬৪-১৭৭৭) দেখা যায় তিস্তা উত্তরবঙ্গের একাধিক শাখায় (পুনর্ভবা, আত্রাই, করতোয়া ইত্যাদি) প্রবাহিত হত। সবকটি ধারা উত্তরবঙ্গের এখনকার পশ্চিমতম নদী মহানন্দায় মিশত। তারপর হুরসাগর নাম নিয়ে অধুনা গোয়ালন্দের কাছে জাফরগঞ্জে পদ্মায় মিশত। হুরসাগর নদীটি এখনও আছে। তবে পদ্মার বদলে এটি এখন মেশে যমুনা নদীতে[৮]

জলপ্রবাহ বণ্টন[সম্পাদনা]

১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তা নদীর পানি বন্টনের ব্যাপারে স্থির হয় যে, তিস্তা নদীর পানির শতকরা ৩৬ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ এবং ৩৯ শতাংশ পাবে ভারত। বাকী ২৫ শতাংশ পানি নদীটির সংরক্ষিত রাখা হবে। কিন্তু কী ভাবে এই পানি ভাগাভাগি হবে সে বিষয়ে কোন দিকনির্দেশনা ছিল না। বহুকাল পরে ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ২৫, ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত একটি যৌথবৈঠকে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ৮০ শতাংশ দু’দেশের সমান অংশে ভাগ করে অবশিষ্ট ২০ শতাংশ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে প্রস্তাব দেয়। ভারত এই প্রস্তাবে অসম্মতি প্রকাশ করে জানায় যে, বাংলাদেশ বাংলাদেশের সমান পানি পেতে পারে না। নীলফামারীর তিস্তা নদীর উজানে ভারত জলপাইগুড়ি জেলার মালবাজার মহকুমায় গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ করে বাংলাদেশে স্বাভাবিক জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে । ২০১৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিস্তা নদীর মূল পানিপ্রবাহের উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশের তিস্তায় আসতে দেয়া হয়েছে। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের শুষ্ক মৌসুমে ভারত কর্তৃক তিস্তার পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পানি-ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন যে, ‘তিস্তার মূল প্রবাহ ভারত প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তিস্তায় ডালিয়া ব্যারাজে উজান থেকে আসা পানিপ্রবাহ প্রায় শূন্য। এখন যে ৬০০-৭০০ কিউসেক পানি যা আসছে তা, ধারণা করি, ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের ভাটির উপনদী থেকে’।[৯] একটি সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, 'তিস্তার পানির ব্যাপারে ভারত আন্তর্জাতিক আইন ও মামলার উদাহরণ মানছে না। ফলে বাংলাদেশ অংশে তিস্তা মরে গেছে। পানি বন্টনের ব্যাপারে ভারতের একগুয়েমিতা, অনৈতিক ঢিলেমি ও হটকারীতায় তিস্তা তীরবর্তি ও আশেপাশের প্রকৃতি রুক্ষ হয়ে উঠেছে। তলদেশে অজস্র পাথর, নুড়ি, বালি আর পলি পড়ে তিস্তার বুকে শুষ্ক মৌসুমে উত্তপ্ত বালুর স্তুপ। অন্যদিকে বর্ষাকালে মুল গতিপথ বদলিয়ে তিস্তা প্রচন্ডভাবে আছরে পড়ে দুই তীরে। ফলে নির্দয় ভাঙ্গনে ফি বছর ২০ হাজার মানুষ বাড়িঘর, গাছপালা, আবাদী জমি হারিয়ে পথের ভিখেরী হয়। নদীর প্রবাহ পথে বিশাল চর ও উভয় তীরে ভাঙ্গনের তান্ডবে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে এর প্রস্থ কোন কোন জায়গায় ৫ কিলোমিটারেরও বেশী। কোন জায়গায় ৫০০ মিটার।[১০]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Bisht, Ramesh Chandra (2008-01-01)। International Encyclopaedia of Himalayas (5 Vols.)। New Delhi, India: Mittal Publication। পৃ: 19। আইএসবিএন 978-8183242653এএসআইএন B002QVXS82। সংগৃহীত 2009-11-28 
  2. অপমৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে তিস্তা নদী!
  3. ৫ দফা দাবি ঘোষণা করে শেষ হলো তিস্তা লংমার্চ
  4. তিস্তা ফের পানি শূন্য হয়ে পড়ছে, টইটম্বুর গজলডোবা
  5. Joshi, H. G. (2004)। Sikkim ; Past and Present। Mittal Publications। পৃ: 1। আইএসবিএন 978-8170999324। সংগৃহীত 2009-09-08 
  6. Gupta, Om (2006-06-27)। Encyclopaedia of India Pakistan & Bangladesh 9। Delhi, India: Isha Books। পৃ: 2409। আইএসবিএন 978-8182053892। সংগৃহীত 2009-09-11 
  7. ৭.০ ৭.১ Majumdar, Dr. R.C., History of Ancient Bengal, First published 1971, Reprint 2005, p. 4, Tulshi Prakashani, Kolkata, ISBN 81-89118-01-3.
  8. Majumdar, S.C., Chief Engineer, Bengal, Rivers of the Bengal Delta, Government of Bengal, 1941, reproduced in Rivers of Bengal, Vol I, 2001, p. 45, published by Education department, Government of West Bengal.
  9. তিস্তা প্রশ্নের সমাধান হতে হবে রাজনৈতিক
  10. অপমৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে তিস্তা নদী!