ইবন বতুতা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ইবন বতুতা
IbnBattatuEffendi.jpg
জন্ম ফেব্রুয়ারি ২৪, ১৩০৪
তাঞ্জিয়ার, মরোক্কো
মৃত্যু ১৩৬৮ অথবা ১৩৭৭
তাঞ্জিয়ার, মরোক্কো
অন্য নাম সামস-উদ-দীন(চীন), মাওলানা বদর-উদ-দীন(ভারত)
যে জন্য পরিচিত বিশ্ব ভ্রমণ
ধর্ম মুসলিম

আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবন বতুতা (আরবি: أبو عبد الله محمد بن عبد الله اللواتي الطنجي بن بطوطة‎, ʾAbū ʿAbd al-Lāh Muḥammad ibn ʿAbd al-Lāh l-Lawātī ṭ-Ṭanǧī ibn Baṭūṭah) সুন্নি মুসলিম পর্যটক, চিন্তাবিদ, বিচারক এবং সুন্নি ইসলামের মালিকি মাযহাবে বিশ্বাসী একজন ধর্মতাত্ত্বিক। তিনি ১৩০৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী মরোক্কোর তাঞ্জিয়ারে জন্মগ্রহন করেন।[১] চীন সহ পৃথিবীর অনেক যায়গায় তিনি "শামস-উদ-দীন" [২] নামেও পরিচীত। ইবন বতুতা সারা জীবন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেরিয়েছেন। পৃথিবী ভ্রমণের জন্যই তিনি মূলত বিখ্যাত হয়ে আছেন। একুশ বছর থেকে শুরু করে জীবনের পরবর্তী ৩০ বছরে তিনি প্রায় ৭৫,০০০ মাইল[৩](১,২০,০০০কিমি) অঞ্চল পরিভ্রমণ করেছেন। তিনিই একমাত্র পরিব্রাজক যিনি তার সময়কার সমগ্র মুসলিম বিশ্ব ভ্রমণ করেছেন এবং এর সুলতানদের সাথে স্বাক্ষাত করেছেন। অর্থাৎ বর্তমান পশ্চিম আফ্রিকা থেকে শুরু করে মিশর, সৌদি আরব, সিরিয়া, ইরান, ইরাক, কাজাকিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীন ভ্রমণ করেছিলেন। তার কিছুকাল পূর্বে এমন দীর্ঘ ভ্রমণ করে বিখ্যাত হয়েছিলেন ভেনিসের ব্যাবসায়ী এবং পরিব্রাজক মার্কো পোলো। কিন্তু তিনি মার্কো পোলোর চেয়েও তিনগুন বেশি পথ সফর করেছেন। ভ্রমণকালে তিনি এই উপমহাদেশের বিখ্যাত ব্যাক্তিত্ব, সুফি, সুলতান, কাজি এবং আলেমদের সাক্ষাত লাভ করেন। ৩০ বছরে প্রায় ৪০ টি দেশ ভ্রমণ করে নিজ দেশ মরোক্কোতে ফেরার পর মরোক্কোর সুলতান আবু ইনান ফারিস তার ভ্রমণকাহিনীর বর্ননা লিপিবদ্ধ করার জন্য একজন সচিব নিয়োগ করেন। এই ভ্রমণকহিনীর নাম "রিহলা"। এটি ১৪শ শতকের পূর্ব, মধ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সম্রাজ্যের ইতিহাসের অন্যতম দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রথম জীবন[সম্পাদনা]

ইবন বতুতা তার গ্রন্থে নিজের সম্পর্কে যতটুকু লিখে গেছেন তার চেয়ে বেশি কিছু জানা সম্ভব হয় নি। তিনি ১৩১৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী মরোক্কোর তাঞ্জিয়ারে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তার বাবা ছিলেন একজন কাজী। তার ধারনা মতে তার পরিবার পশ্চিম আফ্রিকার লাওয়াতা যাযাবর জাতীদের উত্তরশুরী। তার পরিবার সুন্নি মতবাদের অনুসারী হওয়ায় কিশোর বয়স থেকেই ইসলাম ধর্মের উপর শিক্ষা লাভ করেন। ১৩২৫ সালে তার বয়স যখন ২১ বছর তখন তিনি হজ্জ্বব্রত পালনের লক্ষে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। সেই সময় সাধারনত মরোক্কো থেকে হজ্জ্ব করে ফিরতে হাজীদের ১৫ থেকে ১৬ মাস সময় লাগতো কিন্তু এই মহান পরিব্রাজক অর্ধেক পৃথিবী ঘুরে, তিনবার হজ্জ করে তার জন্মভূমিতে ফিরেছিলেন চব্বিশ বছর পর।

হজ্জ্ব পালন ও মোহাম্মাদ (সাঃ) এর রওজা মোবারক জিয়ারতের আকাঙ্খা নিয়ে আমি যেদিন জন্মভূমি তাঞ্জিয়ার ছেড়ে মক্কার পথে যাত্রা করলাম, সেদিন ছিল হিজরি ৭২৫ সালের ২রা রজব (১৪ই জুন ১৩২৫, বৃহস্পতিবার)। সেই হিসাব মতে তখন আমার বয়স ২২ বছর (২১ বছর ৪ মাস)। পথে সঙ্গী হিসাবে কাউকে না পেয়ে বা কোন কাফেলার খোঁজ না পেয়ে আমি একাই বেরিয়ে পড়ি। তখন আমার মা বাবা বেঁচে ছিলেন। তাদের ছেড়ে আসার পর্বটা খুব কঠিন ছিল, বিদায়ের সময় ভীষন কষ্ট হচ্ছিল আমাদের সবার[৪]

মক্কায় প্রথম হজ্জ্ব[সম্পাদনা]

তেরশ শতকের ইরাকী চিত্রকর ইয়াহিয়া ইবনে মোহাম্মদ আল-ওয়াস্তির আকা ছবিতে একদল হজ্জ্বযাত্রী।

১৩২৫ সালের ১৪ ই জুন তারিখে ইবন বতুতার বয়স ছিল ২১ বছর ৪ মাস। এ সময় তিনি মক্কা নগরীতে গিয়ে হজ্জ্ব পালনের উদ্দেশ্যে জন্মভূমি ত্যাগ করেন। সে হিসেবে তার যাত্রার সূচনা হয় ১৩২৫ সালের ১৪ জুন মরক্কোর তানজিয়ার থেকে।

হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে তিনি উত্তর আফ্রিকার সমূদ্র তীর ঘেঁষে পায়ে হেটে মক্কা রওনা দেন। এই পথে তিনি আব্দ-আল-ওয়াদিদ এবং হাফসিদ সম্রাজ্য, তিমসান, বিজাইরা এবং তিউনিস হয়ে মক্কায় পৌছান। যাত্রা পথে তিনি তিউনিসে দুই মাস আবস্থান করেন।[৫] আরব বেদুইনদের থেকে নিরাপদ থাকতে এবং অন্যান্য সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন কাফেলার সাথে এই পথ অতিক্রম করেন তিনি। তখন তিউনিসের সুলতান ছিলেন আবু ইয়াহিয়া। ১৩২৫ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম দিকে উপকূলীয় পথে সাফাক্স হয়ে কাবিস শহরে পৌছান। এই কাবিস শহরে তিনি তিউনিসের এক উকিলের মেয়েকে চুক্তিতে বিয়ে করেন।[৬] কিন্তু পরবর্তিতে ত্রিপলি আসতে আসতে উকিলের সাথে তার সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাওয়ায় এই বিয়ে বেশিদিন টেকে নি। অবশ্য ত্রিপলির পরবর্তি শহর ফেজে এসে তিনি এক ছাত্রের মেয়েকে বিয়ে করেন।

১৩২৬ সালের ৫ই এপ্রিল ইবন বতুতা তৎকালিন বাহরি মাম্লুক সম্রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন শহর আলেক্সান্দ্রিয়া পৌছান। আলেক্সান্দ্রিয়ায় তিনি ২জন ধার্মিক তপস্বীর সাথে স্বাক্ষাত করেন। এদের একজন হলেন শেখ বোরহানউদ্দিন, তিনি ইবনে বতুতাকে তার বিশ্ব ভ্রমন সম্পর্কে ভবিষ্যৎবানী করেন যে, 'আমার মনে হচ্ছে তুমি বিদেশ ভ্রমন পছন্দ করো। তুমি ভারতে আমার ভাই ফরিদউদ্দিন, সিন্ধু প্রদেশ রুকনউদ্দিন এবং চীনে বুরহানউদ্দিনের সাথৈ দেখা করবে এবং আমার শুভেচ্ছে পৌছে দেবে।' অপর ব্যক্তি হলেন শেখ মুর্শিদি, যিনি ইবনে বতুতার একটি স্বপ্লের অর্থ ব্যাক্ষ্যা করেন। এই দুই ব্যক্তির সাথে স্বাক্ষাতের পূর্বে তার এতো দূর দেশ ভ্রমনের পরিকল্পনা ছিলো না, কিন্তু তাদের অনুপ্রেরণায় তিনি তার বিশ্ব ভ্রমনের পরিধি আরও বিস্তার করেন। .[৭][৮] এক সপ্তাহ সেখানে থাকার পর তিনি মাম্লুক সম্রাজ্যের রাজধানি কায়রো অভিমুখে যাত্রা করেন। সেই সময় কায়রো ঐ এলাকার এটি গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিলো। কায়রোতে প্রায় ১মাসের মত অবস্থান করার পর তিনি মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা করেন।[৯] মক্কা যাওয়ার অন্যতম পথগুলো রেখে তিনি একটি অল্প পরিচীত পথে যাবার সিদ্ধান্ত নেন যেটা নীল নদ পার হয়ে আইদাব বন্দর দিয়ে যেতে হয়।[lower-alpha ১] বন্দরে পৌছার পর স্থানিয় গোষ্ঠিরা তাকে কায়রো ফেরৎ যেতে বাধ্য করে।[১০] পূনরায় কায়রো পৌছে তিনি একজন সুফির সাথে সাক্ষাৎ করেন। তার নাম শেখ আবুল হাসান আল সাদিদি। তিনি ইবন বতুতাকে বলেন যে মক্কা যাওয়ার সবচেয়ে ভাল পথ হল সিরিয়া হয়ে যাওয়া কারন এই পথ ধরে গেলে হিব্রু, বেথেলহেম এবং জেরুসালেম পাওয়া যায় কিন্তু দুঃখের বিষয় হল মাম্লুক সম্রাজ্য এই পথ ভ্রমনকারীদের ডাকাত এবং লুটেরাদের থেকে সুরক্ষিত রাখার কোন ব্যাবস্থাই করে নি।

রমজান মাস দামেস্কাসে (বর্তমান সিরিয়ার রাজধানি) কাটিয়ে তিনি মদিনাগামি একটি কাফেলার সাথে যোগ দেন। মদিনায় হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর রওজা মোবারক জিয়ারত করে চার দিন পর তিনি মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। মক্কা পৌছে হজ্জ্ব পালন করে তিনি তাঞ্জিয়ার ফিরে যাওয়ার বদলে মধ্য এশিয়ার দিকে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

ইরাক এবং পার্সিয়া[সম্পাদনা]

ইবন বতুতা পার্শীয়ান মোঙ্গল সম্রাজ্যের তাবরিজ শহরে খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য গিয়েছিলেন.

মক্কায় এক মাস কাটানোর পর ইবন বতুতা আরব উপসাগর হয়ে ইরাক গামী এক কাফেলার সাথে যোগ দেন। এই কাফেলা তাকে নাজাফ শহর পর্যন্ত নিয়ে যায় যেখানে হযরত আলী (রাঃ) এর মাজার রয়েছে। হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর জামাতা এবং ইসলামের চতুর্থ খলিফা। মাজার জিয়ারত শেষে তার কাফেলা ইরাকের উদ্দেশ্যে রওনা দিলে তিনি কাফেলার সাথে ইরাক না যেয়ে দক্ষিণ দিকে টাইগ্রিস নদী পার হয়ে বশরা শহরের দিকে রওনা হন। বশরা থেকে তিনি পারস্যের সবচেয়ে বিখ্যাত শহর ইস্পাহানের দিকে যাত্রা করেন। ইস্পাহান থেকে তিনি শিরাজ শহরে যান। এই শিরাজ শহরটি মংগল আক্রমনে বিপর্যস্ত ছিল। সেখান থেকে তিনি বাগদাদের উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং ১৩২৭ সালের জুন মাসে বাগদাদ পৌছান। বাগদাদ শহরটিতে তখনও চেঙ্গিজ খানের নাতি হালাকু খানের সৈন্যবাহিনীর ১২৫৫ সালের আক্রমনের ছবি স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছিল।
বাগদাদে তিনি শেষ মঙ্গল সম্রাট আবু সাঈদের সাথে দেখা করেন এবং তার উপদেশে তিনি রাজকিয় কাফেলায় যোগ দিয়ে উত্তর দিকে সিল্ক রোড হয়ে তাবরিজ শহরে যান। তৎকালিন সময়ে তাবরিজ শহর ছিল উত্তর দিক দিয়ে মোঙ্গল সম্রাজ্যে প্রবেশের প্রধান পথ এবং অন্যতম ব্যাবসা বানিজ্যের কেন্দ্র। এখান থেকে তিনি আরেকটি কাফেলার সাথে যোগ দিয়ে পুনরায় আরব উপদ্বিপ হয়ে মক্কা এসে দ্বিতীয়বারের মত হজ্জ্ব করেন এবং পরবর্তী ৩ বছর মক্কাতেই অবস্থান করেন।

আরব উপদ্বীপ[সম্পাদনা]

ইবন বতুতা পরবর্তী তিন বছরের জন্য মক্কায় অবস্থান করে ১৩৩০ সালের হজ্জ্বের পর তিনি জেদ্দা থেকে লোহিত সাগরের তীরের দিকে যাত্রা করেন। একটি ছোট নৌকার সাহায্যে ইয়েমেন পৌছেন। ইয়েমেনের তৎকালীন সূলতান ছিলেন নূর-উদ-দীন। ইয়েমেনের তা’ঈজ শহরে সুলতানের সাথে সাক্ষাৎ করার পর চারদিন অবস্থান করে তিনি এককালীন রাজধানী সানার দিকে যাত্রা করেন। সানায় আসার পর কিছুদিন অবস্থান করে এডেন বন্দর হয়ে তিনি মোগাদিসুর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

সোমালিয়া ও সাওয়াহিলি তীর[সম্পাদনা]

জায়লা বন্দর.

এডেন বন্দর থেকে জাহাযে চারদিনের যাত্রা করে তিনি জায়লা (বর্তমানে বারবারাহ আরবি শব্দ বারবারাহ অর্থ আফ্রিকার শিং) শহরে পৌছান। জায়লা থেকে পনেরো দিনের যাত্রা করে অবশেষে ম্যাকদ্যাশ’অ (মোগাদিশু) পৌছান। তার বর্ননা মতে তৎকালীন মোগাদিসু ছিল ব্যাবসা বানিজ্যের কেন্দ্র। বিভিন্ন এলাকা থেকে বনিকেরা মোগাদিসু বন্দরে যেয়ে ব্যাবসা করতেন। তখন মোগাদিসু ভাল মানের একপ্রকার সূতি কাপড়ের জন্য বিখ্যাত ছিল যেটা তারা মিসর, সিরিয়া সহ অন্যান্য জায়গায় রফতানি করত। ম্যাকদ্যাশ’অর তৎকালীন সুলতান ছিলেন আবু বকর। সুলতানের আতিথিয়তায় মোগাদিসুতে তিনি মোট চারদিন ছিলেন। মোগাদিশু ছেড়ে তিনি সাওয়াহি’লি রওনা দেন। (আরবি শব্দ আস-সাওয়াহিল অর্থ উপকূলীয় এলাকা) সাওয়াহি’লি তৎকালীন সময়ে “বিলদ-আল-যাঞ্জ” নামে পরিচীত ছিল যার অর্থ হল যাঞ্জদের ভূমি। যাঞ্জ শব্দটা কোন ভাষা থেকে এসেছে তা জানা যায় না তবে মধ্যযুগে আরবরা পূর্ব আফ্রিকার নিগ্রোদের এই নামে ডাকত। তার সাওয়াহি’লি আসার অন্যতম কারন ছিল কুলওয়া (বর্তমানে কেনিয়াতাঞ্জানিয়ার উপকূলের কিছু অংশের নাম) শহর পরিদর্শন করা। ইবন বতুতা এই শহরকে অত্যন্ত সুন্দর শহর হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার ভ্রমনের সময় এখানকার সুলতান ছিলেন আবুল মুজাফফর হাসান। তিনি ইসলামী কায়দায় সম্রাজ্য চালানোর জন্য এবং তার দান দাখ্যিন্যের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর তার ভাই দাউদ তার বংশের সেই সুনাম রাখেন নি। আফ্রিকার এই অঞ্চলটিতে খুব ভাল জাতের ঘোড়া পাওয়া যেত। এখান থেকে প্রশিক্ষিত ঘোড়া ভারতে রফতানি হত। মৌসুমি বায়ূতে পরিবর্তন আসতে থাকলে ১৩৩০ সালে তিনি ওমান ও হরমুজ প্রনালী হয়ে পুনরায় হজ্জ্ব পালনের উদ্দেশে মক্কার দিকে রওনা দেন।

মধ্য এশিয়া[সম্পাদনা]

কনস্টান্টিনোপলের সম্রাট আন্দ্রোনিকাস তৃতীয়

মক্কায় আরো এক বছর কাটিয়ে তিনি ভারতবর্ষের সম্রাট মোহাম্মদ বিন তুঘলকের অধীনে চাকরি করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৩৩০ সালে তিনি গাইড এবং কাফেলার খোজে আনাতোলিয়ার (বর্তমানের তুরষ্কের পূর্ব দিকে) দিকে যাত্রা করেন যেখান থেকে বণিকেরা ভারতবর্ষে যেয়ে ব্যাবসা করে। সিরিয়ার লাতাকিয়া বন্দর থেকে একটি জাহাযে করে তুরস্কের দক্ষিণ দিকে আলানা পৌছান। তারপর পায়ে হেটে কুনিয়া হয়ে কৃষ্ণ সাগরের তীরে পৌছান।
সিনোপ হয়ে আজাক (Azaq, পরবর্তীতে Azov) শহরে পৌছে সেখানকার খানদের আমিরেরের সাথে দেখা করেন। আজাকে পৌছে দেখলেন যে আমীর উজবেক খানের রাজধনী সারা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই দেখে ইবন বতুতা তার সাথে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলে আমীর তাকেও সাথে নেন।
ত্রোয়োদশ শতাব্দিতে

উজবেক খানের রাজত্বকালে গোল্ডেন হোর্ডের পতাকা

প্রতিষ্ঠিত খান সম্রাজ্য পরে ব্লু হোর্ড ও হোয়াইট হোর্ড নামে দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। ব্লু হোর্ড এলাকা ছিল কিয়েভ (বর্তমানে ইউক্রেনের রাজধানী) থেকে ককেশাস, আরাল সাগর ও খিবা পর্যন্ত। সুলতান মোহাম্মদ উজবেক খান (১৩১২-১৩৪০) ছিলেন ব্লু হোর্ড খানদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী।
যাত্রা পথে আস্ত্রখানে সুলতানের মহল্লার (ভ্রাম্যমান গ্রাম) দেখা পাওয়া যায়। সেই মহল্লাতেই সুলতান তুঘলক খানের সাথে ইবন বতুতার প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ হয়। সেই সাথে তিনি সুলতানের স্ত্রীদের সাথেও সাক্ষাৎ করেন এবং অনেক উপহার সামগ্রী পান। সুলতানের তৃতীয় স্ত্রী ছিলেন কনস্টান্টিনোপোলের দোর্দোন্ডপ্রতাপ সম্রাট আন্দ্রোনিকার তৃতীয় এর মেয়ে বায়লূন। বায়লূন সেই সময় আন্তঃস্বত্বা ছিলেন এবং সুলতানের কাছে তার বাবার বাড়িতে সন্তান প্রসব করার ইচ্ছা পোষন করলে সুলতান তাকে অনুমতি দেন। সেই সাথে ইবন বতুতাকেও খাতুনের মহল্লার সাথে কনস্টান্টিনোপল যাওয়ার অনুমতি দেন। তিনি ১৩৩৪ সালের শেষের দিকে কনস্টান্টিনোপোল পৌছান। এটিই ছিল ইসলামী সম্রাজ্যের বাইরে ইবন বতুতার প্রথম সফর। কনস্টান্টিনোপল সম্পর্কে বর্ননা দিতে গিয়ে ইবন বতুতা তার বই “রিহলা” তে বলেন-

“শহরটা আকারের দিক দিয়ে ব্যাপক বিস্তৃত এবং মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া গোল্ডেন হর্ন নদীর জন্য শহরটি দুভাগে বিভক্ত। নদীতে নিয়মিত জোয়ার ভাটা হয় । অতীতে নদী পারাপারের জন্য সেতু ছিল কিন্তু সেটা ভেঙে যাওয়ায় এখন নৌকায় করে পার হতে হয়। এ নদীর পূব পাড়ের অংশের নাম ইস্তাম্বুল। এপাড়েই আছে সম্রাটের প্রাসাদ এবং গন্যমান্যদের বাস। এ শহরের বাজার ও রাস্তাঘাট অনেক প্রসস্ত এবং পাথর দিয়ে বাধানো। প্রতিটা বাজারে প্রবেশের জন্য বড় বড় ফটক আছে, রাতে সেগুলো বন্ধ থাকে।”

তিনি শহরের অনেক প্রশিদ্ধ যায়গার বর্ননা দিয়েছেন, তার মধ্যে আয়া হেলেনা (Aya Helena, পরবর্তীতে Sent Helena) গির্জা। এই গির্জার প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে শোনা যায় যে এটি নির্মান করেছিলেন আসাফ, বেরেচিয়াহর ছেলে; যিনি হযরত সুলায়মান (আঃ) এর ভাতিজা ছিলেন। গ্রীকদের যত গির্জা আছে সেন্ট হেলেনা তাদের মধ্যে সবচেয়ে সেরা। দেয়াল দিয়ে চারিদিক ঘেরা গির্জাটিকে একটি শহরের মত হনে হয়। কিছুদিন থাকার পর কনস্টান্টিনোপল থেকে অস্ত্রখানে ফিরে তিনি জানতে পারেন যে সূলতান তুঘলক তার রাজধানীতে ফিরে গেছেন। তার রাজধানী সারায় যেয়ে সুলতানের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভারত এবং চায়নার উদ্দেশে রওনা দেন।

ভারতবর্ষ[সম্পাদনা]

মোহাম্মদ বিন তুঘলকের শাষন আমলের মসজিদ যেখানে ইবন বতুতা প্রায় ছয় বছর কাজী হিসেবে কাজ করেছেন

সারা থেকে প্রায় তিন মাস ধরে যাত্রা করে খাওয়ারিজম হয়ে হিন্দুকুশ পার হয়ে তিনি গজনি পৌছান। এর মাঝে তিনি তৎকালীন প্রশিদ্ধ শহর সমরখন্দ এওং খুরাশানে (বর্তমান আফগানিস্তান) সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য অবস্থান করেন। তারপর ১৩৩৩ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর আরবি ৭৩৪ সালের পহেলা মহররমে সিন্ধের পাঞ্জাব পৌছান। পাঞ্জাব শহরে পৌছার সাথে সাথে ইবন বতুতার আগমন বার্তা সিন্ধের রাজদধানী মুলতানের গভর্নরের কাছে এবং দিল্লির বাদশা সুলতান মোহাম্মদ শাহ এর কাছে পাঠানো হয়। সিন্ধ থেকে দিল্লি ডাক পৌছাতে স্বাভাবিকভাবে প্রায় পঞ্চাশ দিন লাগার কথা কিন্তু বাদশাহর গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ডাক দিল্লিতে মাত্র পাঁচ দিনেই পৌছে যায়। বহিরাগত যে-ই হোক, সুলতানের তরফ থেকে তাকে ভারতে ঢুকতে দেওয়া হবে কি না, হলেও কোন শ্রেনীর মর্যাদা দেওয়া হবে সে ব্যাপারে দিল্লি থেকে অফিসিয়াল নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তাকে সিন্ধের রাজধানী মুলতানে অপেক্ষা করতে হয়। ইবন বতুতাকেও অপেক্ষা করতে হল এবং শেষ পর্যন্ত তাকে “আজিজ” (সম্মানিত) পদবি দেওয়া হল।

পাঞ্জাব পার হয়ে নলখাগড়ার জংগলের মধ্য দিয়ে জননী শহর হয়ে সিওয়াসিতান (Siwasitan, পরবর্তীতে Sehwan) পৌছান। এই শহরেই খুরাশানের নামকরা ডাক্তার আলা আল-মুককের সাথে তার দেখা হয়। এই ডাক্তারের সাথেই তিনি পরবর্তীতে লাহোর (তৎকালীন লাহারি) পৌছান। সেখানে গভর্নরের সাথে পাঁচদিন থেকে আবোহার (Abuhar, পরবর্তীতে Abohar) হয়ে ভারতে পৌছান। আবোহার ছিল বর্তমান ভারতের মূল ভূখন্ডের প্রথম শহর। ভারতে ইবন বতুতা প্রায় সাত বছর অবস্থান করেন। সুলতান তাকে দুটি ছোট গ্রাম দিয়ে দেন যাতে করে এর থেকে সংগৃহীত রাজস্ব উত্তোলন করে তিনি তার খরচ চালাতে পারেন এবং এই সময়টা তিনি মালিকি সম্প্রদায়ের কাজি হিসেবে সুলতান কতৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হন। কাজী হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার অন্যতম কারন ছিল তার পিতাও কাজী ছিলেন। কাজীর দায়িত্ব পালনকালীন ইবন বতুতা অনেক বেহিসেবি খরচ করেন যা সুলতানের দৃষ্টিগোচর হয়। অপরদিকে ইবন বতুতাও সুলতানের রহস্যময় আচরনে ত্যাক্ত হয়ে ভারত থেকে চলে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন। অবশেষে সুলতান তাকে চীনে মোঙ্গল সম্রাট মোহাম্মদ ইবন তুঘলকের কাছে দূত হিসেবে প্রেরন করার ইচ্ছা পোষন করলে তিনি রাজি হয়ে যান। সুলতান তার ভ্রমনের জন্য ২ টি জাহাজ, কর্মচারী এবং ক্রীতদাশের ব্যাবস্থা করলেন।

চীন যাওয়ার উদ্দেশ্যে সমুদ্র তীরের দিকে যাওয়ার সময় রাস্তায় তিনি একদল ডাকাত দ্বাড়া আক্রান্ত হন। এই আক্রমনে তিনি সবকিছু হারান কিন্তু কোনরকমে প্রানে বেঁচে যান। প্রায় দশদিন পর তিনি পুনরায় তার সংগিদের সাথে মিলিত হন এবং বর্তমান ভারতের গুজরাটের দিকে রওনা হন। গুজরাটে তিনি সুলতানের মূল্যবান উপটৌকোন গুলোর সুরক্ষার জন্য প্রায় পঞ্চাশ জন আবিসিনিয়ান হাবসি যোদ্ধা ভাড়া করলেন এবং কয়েকদিন যাত্রা করে অবশেষে কালিকোট বন্দরে পৌছান যেখান থেকে তার চীন যাত্রা শুরু হওয়ার কথা ছিল। ইবন বতুতা কালিকোট বন্দরে পৌছানোরও প্রায় দুইশত বছর পরে পর্তুগীজ পরিব্রাজক ভাস্কো দা গামা এই বন্দরে এসে পৌছান। তিনি যখন কালিকোটের মসজিদসমূহের পরিদর্শনে ব্যাস্ত ছিলেন তখন এক আচমকা ঝড় এসে সুলতানের মূল্যবান উপটৌকোন সহ তার একটি জাহায ডুবিয়ে দেয়। এতে করে ঐ জাহাযের সব নাবিক মৃত্যুবরন করে। সুলতানের প্রেরিত সমস্ত উপহার হারিয়ে ফেলে তার আর দিল্লি ফেরৎ যাওয়ার কোন উপায় ছিল না। তাই তিনি তৎকালীন দক্ষিণ ভারতের কিছু অংশের শাষনকর্তা জামাল-উদ-দীনের নিরাপত্তায় কিছুদিন থাকলেন। চীনের সম্রাটের কাছে ভারতের সুলতানের পাঠানো উপহারসামগ্রী হারিয়ে ফেলার পর ভারত ছেড়ে যাওয়া ছাড়া ইবন বতুতার আর কোন উপায় অন্তর ছিল না কিন্তু তিনি তার চীন যাওয়ার ইচ্ছার প্রতি অনড় ছিলেন। তাই তিনি অবশেষে মালদ্বীপের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন।

মালদ্বীপ[সম্পাদনা]

মালদ্বীপের অনেকগুলো দ্বীপের মধ্যে একটি দ্বীপ

যদিও ইবন বতুতা খুব অল্প সময়ের জন্য মালদ্বীপ আসার পরিকল্পনা করেন, তিনি এই দ্বীপে প্রায় নয় মাস অবস্থান করেন। মালদ্বীপ একসময় বৌদ্ধ অধ্যুষিত এলাকা থাকায় এখানে খুব একটা দক্ষ্য কাজী ছিল না। তাই ইবন বতুতাকে মালদ্বীপেও কজী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। মালদ্বীপে অবস্থানকালীন সময়কালীন তিনি মোট চারটি বিয়ে করেন এর মধ্যে একটি করেন রাজপরিবারে।[১১] তার বই রিহলা তে মলদ্বীপ সম্পর্কে বর্ননা দিতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে এখানকার মানুষেরা অনেক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালবাসে এবং খালি পায়ে হাটে। মেয়েদের ব্যাপারে বর্ননা দিতে গিয়ে তিনি বলেন যে এখানকার মেয়েরা শরিরের নিম্নাংশ সুতি কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখে কিন্তু উর্ধাংশ অনাবৃত রাখে। তিনি কাজী থাকা অবস্থায় অনেক কড়া ইসলামিক নিয়ম কানুন চালু করতে সমর্থ হলেও মেয়েদের পোষাক পরিবর্তনের ব্যাপারে তিনি তেমন একটা সুবিধা করে উঠতে পারেন নি। মালদ্বীপে অবস্থানের শেষের দিকে ইবন বতুতার সাথে এখানকার উজিরের মনমালিন্য দেখা দিলে তিনি সিলন (বর্তমান শ্রীলংকা) হয়ে চীন যাওয়ার ইচ্ছা পোষন করেন এবং অবশেষে একটি জাহাজে চড়ে শ্রীলংকা চলে যান।

শ্রীলংকা[সম্পাদনা]

শ্রীলংকার মা’বার (মাদুরি) উপকূলে যাওয়ার সময় প্রচন্ড এক ঝড়ের ধাক্কায় তার জাহাজ প্রায় ডুবে গিয়েছিল। ডুবন্ত জাহাজের পেছনের পাটাতনে প্রায় সমস্ত রাত কাটানোর পর একদল হিন্দু এসে তাকে উদ্ধার করে এবং সুলতানের দরবারে পৌছানোর ব্যাবস্থা করে দেয়। তখনকার দামাঘানের সুলতান ছিলেন গিয়াস-উদ-দিন যিনি ছিলেন ভারতের সূলতান মোহাম্মদের নিয়োজিত মাদুরির সামরিক গভর্নর। মাদুরিতে কিছুদিন অবস্থান কালে তিনি শ্রীলংকার এডামস পিক এবং তেনাভারাম মন্দির পরিদর্শন করেন। পরবর্তীতে ইবন বতুতা সুলতান গিয়াস-উদ-দিনকে মালদ্বীপ দখলের জন্য প্রলুব্ধ করেন এবং আক্রমনের জন্য সেখানে সৈন্য পাঠাতে রাজী করেন। তারপর তিনি ইয়েমেন যাওয়ার উদ্দেশে একটি জাহাজে চড়েন কিন্তু সেই জাহাজের বহরে জলদস্যু কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ায় এবং সকল সহায় সম্বল হারিয়ে পুনরায় মালদ্বীপ যান। তখন পর্যন্তও তার চীন যাওয়ার ইচ্ছায় কোনরকম ভাটা পড়েনি তাই তিনি মালদ্বীপ থেকে একটি চীনা বানিজ্য যাহাজে করে চীনের উদ্দেশে রওনা দেন। টানা তেতাল্লিশ দিন যাত্রা করে তিনি বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌছান।

বাংলাদেশ[সম্পাদনা]

টানা তেতাল্লিশ রাত সাগরে কাটিয়ে অবশেষে আমরা বাংলাদেশ পৌছালাম। সবুজে ঘেরা বিশাল এক দেশ, প্রচুর চাল পাওয়া যায়। অন্য সব জিনিষও এত সস্তায় পাওয়া যায় সে দেশে যে এরকম আর কোথাও দেখি নি। তবে দেশটির আর সবকিছু হতাশাব্যাঞ্জক। খুরাশানের (বর্তমান আফগানিস্তান) লোকেরা দেশটিকে বলে “প্রানপ্রাচুর্যে ভরা জাহান্নাম" [১২]

ইবন বতুতার বর্ননায় পাওয়া যায় মাত্র এক দিরহাম দিয়ে তখন বাংলাদেশ আটটি স্বাস্থবান মুরগী পাওয়া যেত, এছাড়াও এক দিরহামে পনেরোটা কবুতর, দুই দিরহামে একটি ভেড়া এবং এক স্বর্নমূদ্রারও কম মূল্যে দাসদাসী কিনতে পাওয়া যেত। যখন ইবন বতুতা বর্তমান বাংলাদেশে এসে পৌছান তখন এখানকার সুলতান ছিলেন ফখর-উদ-দিন। ইবন বতুতার বাংলাদেশে আসার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল মহান দরবেশ শেখ জালাল-উদ-দিনের (হযরত শাহ জালাল রঃ) সাথে সাক্ষাৎ করা। সিলেটের পর্বতশ্রেণির মধ্যে যেখানে শেখ জালাল-উদ-দিন থাকতেন সেখান থেকে প্রায় দুই দিনের দূরত্বেই তার দুজন শিষ্যের সাথে দেখা হয় ইবন বতুতার। তাদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন যে শেখ জালাল-উদ-দিন আদেশ দিয়েছেন, পশ্চিম থেকে যে পর্যটক তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসছেন তাকে যেন স্বাগত জানিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। অথচ ইবন বতুতার সাথে শেখ জালাল-উদ-দিনের আগে থেকে কোন পরিচয় ছিল না কিংবা ইবন বতুতা তার আগমনের কোন খবরও শেখ জালাল-উদ-দিনকে দেন নি। এখান থেকেই ইবন বতুতা শেখ জালাল-উদ-দিনের আধ্যাত্বিক ক্ষমতার ব্যাপারে ইঙ্গিত পান। হযরত শাহজালালের (রঃ) সাথে সাক্ষাৎ করে ফেরার পথে ইবন বতুতা একটি ছাগলের পশমের কোট উপহার পান। ইবন বতুতার বর্ননা মতে শেখ জালাল উদ-দিন একটি পাহাড়ের গুহায় বসবাস করতেন যেখানে তারা ছাগল পূষতেন দুধ এবং মাখনের জন্য। তার সহযোগীরা প্রত্তেকেই সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন এবং কেউই এদেশীয় ছিলেন না। অবশেষে শেখ জালাল-উদ-দিনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তিনি ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দীপের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

চীন[সম্পাদনা]

ইবন বতুতা চীনের কুয়ানজু বন্দরে এসে পৌছান। শহরটি জায়তুন শহর নামেও পরিচীত ছিল

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে যাত্রা করে প্রায় চল্লিশ দিন পর সুমাত্রা উপকূলে পৌছেন। সেখানকার সূলতান আল-মালিক আজ-জহিররের আতিথিওতায় প্রায় দুই সপ্তাহ কাটানোর পর সূলতান তাকে চীন যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সহ একটি ছোট জাহাজের ব্যাবস্থা করে দেন। সেখানথেকে প্রায় চল্লিশ দিন যাত্রা করে ১৩৪৫ সালে বর্তমান চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের কুয়ানজু (Quanzhou) বন্দরে পৌছান[১৩]

তার বর্ননা মতে তৎকালীন কুয়ানজুর অধিবাসীরা হুবহু মানুষের প্রতিকৃতি আঁকতে পারদর্শি ছিলেন। সুলতানের সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় যখন তিনি স্থানীয় বাজারের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন এক চিত্রকরের দ্বারা নিজের একটি প্রতিকৃতি আঁকিয়ে নেন। সূলতানের সাথে দেখা করে ফেরার পথে তিনি লক্ষ্য করেন যে তাঁর এবং তাঁর সাথীদের প্রতিকৃতি শহরের দেয়ালে দেয়ালে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে তিনি জানতে পারলেন যে শহরে কোন আগন্তুক আসলেই তার প্রতিকৃতি এভাবে টাঙিয়ে রাখা হয় যাতে করে সেই আগন্তুক কোন অপকর্ম করে পালিয়ে যেতে না পারে। জেইতুন শহরে তার সাথে কাজী আল-ইসলামের সাথে দেখা হয় যার সাথে ইবন বতুতার ভারতেও একবার দেখা হয়েছিল। কাজী আল-ইসলাম চীনে এসে ব্যাবসা করে বেশ অর্থোপার্জন করেছিলেন। ইনি ইবন বতুতাকে বেশ কিছু উপহার সামগ্রী দান করেন।

ইবন বতুতার বর্ণনায় চীনের স্থাপত্য এবং শিল্পকলায় পরিপূর্নতার নিদর্শন পাওয়া যায়। তিনি চীনের চিত্রকলার অনেক প্রশংশা করেন কিন্তু চীনের রসনা তাকে বিন্দুমাত্র উপভোগ্য মনে হয়নি। চীনে অবস্থানকালে তিনি বেইজিংএর গ্রান্ড ক্যানেল, ইয়াজুজ ও মাজুজ অংশে ভ্রমন করেন। চীনের অনেক প্রশংসা করলেও চীন যে তাকে কোনভাবেই বিমোহিত করতে পারেনি তার ইংগিত পাওয়া যায় তার উক্তি থেকেই-


কেন যেন চীন নামের দেশটি আমাকে আকর্ষন করতে ব্যার্থ হল। দুঃখ হলো এত বড় বিশাল একটি দেশ বিধর্মীদের কবজায় আটকা পড়ে আছে বলে। যখনই আমি বাসার বাইরে যেতাম, খেয়াল করতাম কোনদিকে কোনরকম বিদ্রোহের আভাস পাওয়া যায় কি না, তারপর হতাশ হয়ে ফিরে আসতাম। দড়জা বন্ধ করে নিজেকে ভিতরে আটকে রাখতাম। একান্ত প্রয়োজন না হলে বাইরে বের হতাম না। [১৪]


চীনে ইবন বতুতা শামস-উদ-দিন নামে পরিচীত ছিলেন। তার বর্ণনায় চীনে তার কোন উপপত্নি থাকার কথা জানা না গেলেও বিভিন্ন ইতিহাসবিদের মতে চীনে তিনি একটি উপপত্নি গ্রহণ করেছিলেন। ধারনা করা হয় যে সেখান থেকেই ডিং (শামস-উদ-দিন থেকে পরিবর্তীত হয়ে চীনা ভাষায় “শিং-শু-ডিং”) পরিবারের উৎপত্তি। [১৫] অবশেষে ১৩৪৬ সালে তিনি তার দেশ মরোক্কো ফেরৎ যাওয়ার উদ্দেশে সূলতানের দেওয়া একটি জাহাজে করে কুয়ানজু থেকে পশ্চিম দিকে রওনা দেন।

স্বদেশ প্রত্যবর্তন এবং কালা জ্বর[সম্পাদনা]

কুয়ানজু থেকে তিনি ভারত হয়ে মরোক্কোর পথে রওনা দেন ১৩৪৬ সালে। দুমাস জাহাজে কাটিয়ে তিনি সুমাত্রা পৌছান। সেখানে দুই মাস থেকে তিনি কাওলাম (ইতিহাসবিদদের মতে এটা বর্তমান মিয়ানমারের কোন বন্দর) বন্দর হয়ে তিনি ১৯৪৭ সালের আপ্রিলের শেষ দিকে ভারত পৌছান। ভারতে অবস্থান করার বদলে ফেরার পথে আরো একবার মক্কায় হজ্জ্ব করার পরিকল্পনা করেন কারন তার ধারনা ছিল ভারতের সূলতান মোহাম্মদ বিন তুঘলক চীনা সম্রাটের কাছে পাঠানো উপটৌকোন হারিয়ে ফেলার জন্য তার প্রতি সদয় নাও হতে পারেন। ভারত থেকে অন্য একটি বানিজ্যিক জাহাজে চড়ে ভারত মহাসাগর হয়ে তিনি মাসকাটের দিকে যাত্রা করেন। মাসকট থেকে হরমুজ প্রণালী হয়ে সিরাজ, ইস্পাহান হয়ে ১৩৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে বাগদাদ পৌছান। বাগদাদে পৌছে তিনি জানতে পারেন যে সেখানকার সূলতান আবু সাঈদের মৃত্যু হলে তার ফুপাতো ভাই শেখ হাসান তার সম্রাজ্য দখল করে নেন।
১৩৪৮ সালের শুরুতে তিনি সিরিয়ার সামেস্কাসে পৌছান। সেখানকার স্থানীয় জাহিরিয়া একাডেমিতে তার সাথে মরোক্কোর তাঞ্জিয়ারের এক নামকরা শেখের সাথে দেখা হয়ে যায়। তার কাছে থেকে ইবন বতুতা জানতে পারেন যে তার বাবা পনেরো বছর আগে মারা গেছেন তবে তার মা এখনও বেঁচে আছেন।[১৬] দামেস্কাসে তিনি ১৩৪৮ সালের শেষ পর্যন্ত থাকলেন। তখন সিরিয়া এবং গাজায় কালা জ্বরের মহামারি ছড়িয়ে পরেছে। ইবন বতুতা স্থানীয় কাজীর কাছ থেকে জানতে পারেন যে প্রতিদিন মৃতের সংখ্যা ২৪০০ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি যখন হেবরন আর গাজা পৌছালেন তখন দেখলেন যে মহামারির প্রোকোপ কিছুটা কমে প্রতিদিন গড়ে ১১০০ তে নেমে এসেছে। এই মহামারি থেকে বাঁচতে ইবন বতুতা প্রতিদিন রোজা রাখতেন। সেখান থেকে কায়রোতে যেয়ে সেখানেও দেখলেন মহামারি থামেনি। ইবন বতুতা কায়রো পৌছানোর আগে এখানে প্রতিদিন মৃতের সংখ্যা ২১,০০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।[১৭] কায়রো থেকে মিশরের সাঈদ বন্দর হয়ে ১৩৪৮ সালের ১৬ নভেম্বর তিনি মক্কা পৌছান। ১৩৪৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত হজ্জ্ব সেরে তিনি ফেজ হয়ে ঐ বছরেই তার নিজ দেশ তাঞ্জিয়ার পৌছান। তাঞ্জিয়ার পৌছে তিনি দেখতে পান যে তার মা ও পরলোক গমন করেছেন।[১৮]

আল-আন্দুস, স্পেন এবং উত্তর আফ্রিকা[সম্পাদনা]

ইবন বতুতা গ্রানাডা ভ্রমন করেন যেটা আল-আন্দুস সম্রাজ্যের শেষ নিদর্শন ছিল

তার নিজের শহর তাঞ্জিয়ারে পৌছে তিনি আসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রায় তিন মাস শয্যাশায়ী থেকে সুস্থ হওয়ার পর ইবন বতুতা সূলতানের অনুরোধে যুদ্ধে (জিহাদে) অংশগ্রহন করার জন্য রক্ষি বাহিনীতে যোগ দেন এবং সৈন্যবাহিনীর সাথে জাহাজে চড়ে আন্দালুসিয়ায় পৌছান।[১৯] স্পেনের খৃষ্টান শাষক আডফুনাস (Alfonso XI) দশ মাস ধরে জোবেল (জিব্রাল্টার) দখল এবং অবরোধ করে রেখেছিলেন। আডফুনাসের ধারনা ছিল যে অবরোধ করে রাখলে হয়তো মুসলিমরা পরাজিত হবে এবং দূর্গের সকলকে একসাথে বন্দি করা যাবে। কিন্তু আডফুনাস নিজেই কালাজ্বরের মহামারিতে আক্রান্ত হন এবং মারা যান। এতে করে মুসলিমদের আর আডফুনাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না। যুদ্ধ করার প্রয়োজন না হওয়ায় ইবন বতুতা স্পেনের ভ্যালেনসিয়া এবং গ্রানাডা ভাল করে ঘুরে দেখার সুযোগ পান।
আল আন্দুস থেকে তিনি মরোক্কোতে ফেরৎ আসেন এবং আফ্রিকার এমন কিছু অঞ্চল পরিদর্শন করার ইচ্ছা পোষন করেন যেগুলো মুসলিম অধ্যুষিত কিন্তু তার এখনও সেগুলোতে যাওয়া হয় নি। তিনি মরোক্কোতে ফিরে কিছুকাল অবস্থান করে মারাক্কিস যান যেটা সাম্প্রতিক মহামারিতে একেবারে খালি হয়ে গেছে। তাই এর রাজধানী ফেজ শহরে স্থানান্তর করা হয়েছিল। সেখান থেকে পুনরায় তিনি তার নিজের শহর তাঞ্জিয়ার পৌছান।

সাহারা মরুভূমি এবং মালি[সম্পাদনা]

ইবন বতুতা ট্রান্স সাহারান বানিজ্য রুটের একটি গুরুত্বপূর্ন শহর আওয়ালাতায় কিছুদিন অবস্থান করেন

প্রায় সমস্ত মুসলিম সম্রাজ্য ভ্রমনের পর আর একটি মাত্র মুসলিম দেশ ভ্রমণ বাকি ছিল তাঁর, সেটি হল নিগ্রোল্যান্ড। ১৩৫১ সালের বসন্তে ইবন বতুতা সাহারা মরুভুমির উত্তরে সিজিলমাসার উদ্দেশ্যে ফেজ নগরী ত্যাগ করেন।[২০] সিজিলমাসাতে তিনি কয়েকটি উট কেনেন এবং প্রায় চার মাস কাটান। সেখান থেকে ১৩৫২ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি লবনের খনির শহর তাঘাজার (Taghaza) উদ্দেশ্যে রওনা দেন। প্রায় পঁচিশ দিন পর সেখানে পৌছেন। ইবন বতুতা বর্ননা মতে সেখানকার ঘরবাড়ি এবং মসজিদগুলো লবনের ব্লক দিয়ে তৈরী আর ছাদগুলো তৈরী ছিল উটের চামড়া দিয়ে। সেই এলাকায় গাছপালা তেমন একটা ছিল না আর এখানকার পানি অত্যন্ত লবনাক্ত ছিল তাই ইবন বতুতা তাঘাজাতে খুব কম সময় কাটান।
তাঘাজাতে প্রায় দশদিন অতিবাহিত করার পর বিরাট সাহারা মরুভূমি পার হবার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য তিনি তাসারাহলার একটি মরুদ্যানে তিন দিন অবস্থান করেন এবং মরুভূমির জন্য পর্যাপ্ত রসদ ও পানি সংগ্রহ করেন। তাসারাহলা থেকে যাত্রা শুরু করে আওয়ালাতায় একবার যাত্রাবিরতি দিয়ে ট্রান্স সাহারান বানিজ্য রুটের দিকে রওনা দেন। সিজিলমাসা থেকে এই রাস্তায় প্রায় ১৬০০ কিঃমিঃ সাহারা মরুভূমি পার হতে তার প্রায় দুই মাস লাগে। নাইজার নদীর তীরে মালি সম্রাজ্যে পৌছে তিনি সূলতানের সাথে সাক্ষাত করেন। তৎকালীন মালি সম্রাজ্যের সূলতান ছিলেন মানসা সুলায়মান[২১](মানসা একটি উপাধি অর্থ- সূলতান, এবং তার নাম ছিল সুলায়মান) যিনি ১৩৪১ সাল থেকে এখানকার সূলতান হিসেবে আছেন। মানসা সূলতান কিপ্টেমির জন্য কুখ্যাত ছিলেন। এখানকার স্থানীয়দের আতিথিওতা ইবন বতুতার কাছে মনমুগ্ধকর মনে হলেও সূলতানের আতিথিওতা খুব একটা পছন্দ হল না তার। ইবন বতুতার বর্ননা মতে এখানকার মানুষ ধর্মভীরু হলেও এখানকার নারীরা ইসলামী পর্দাপ্রথা মানতেন না। তারা সকলেই এমনকি সুলতানের কন্যারাও সকলের সামনে বিবস্ত্র হয়ে ঘুরে বেড়াতো। মালিতেই ইবন বতুতা সার্বপ্রথম জলহস্তি দেখেন। মালিতে আট মাস অবস্থান করে তিনি তার কাফেলা নিয়ে তিম্বুক্তের দিকে রওনা হন। তিম্বুক্ত থেকে তিনি নাইজার নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত গাঁও শহরে যান। গাঁও শহরে অবস্থানকালে তিনি মরোক্কোর সম্রাট আবু ইনান ফারিসের একটি পত্র পান যেখানে তাকে মরোক্কো ফেরৎ যাওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। সম্রাটের আদেশ পাওয়া মাত্রই ইবন বতুতা তার কাফেলা তৈরী করেন এবং মরোক্কোর উদ্দেশ্যে রওনা হন। ১৩৫৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি মরোক্কোর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন এবং ১৩৫৪ সালের শুরুর দিকে তার জন্মভূমিতে শেষবারের মত পদার্পন করেন।

রিহলা[সম্পাদনা]

তাঞ্জিয়ারের মদিনা শহরের একটি বাড়ি যেটা ইবন বতুতার কবর হওয়ার সম্ভাবনা আছে

মরোক্কোর ফেজ নগরীতে গিয়ে ইবন বতুতা সুলতান আবু ইনান ফারিজ এবং তার সভাসদদের কাছে তার সমস্ত ভ্রমন কাহিনী খুলে বলেন।[২২] তার সমসাময়িক আরেক ঐতিহাসিক ইবন খালাদুনের (Ibn Khaldun) বর্ননা থেকে জানা যায় যে তাঁরা সেসব বিশ্বাস করেন নি। তবে গল্প বলার ফলে অন্য দিক থেকে লাভ হয়েছিল ইবন বতুতার। উজিরদের মধ্য থেকে একজন ক্ষমতাধর সমর্থক জুটে গিয়েছিল তাঁর। তার চাপে পড়ে সুলতান নিজের একান্ত সচীবদের একজন ঈবন জুজাঈকে তাঁর ভ্রমনের বিস্তারিত লিখে রাখার নির্দেশ দেন। শুরু হয় বলা ও লিখার পর্ব। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যে ঈবন জুজাঈ ইবন বতুতার প্রতিটি কথা ও বর্ননা হুবহু লিপিবদ্ধ করেন নি। তবে আরবী নাম ও জায়গার নামের ব্যাপারে অনেক সচেতন ছিলেন ঈবন জুজাঈ। অনেক ক্ষেত্রেই তার সম্পাদনায় ত্রুটি পাওয়া গেছে। লেখার ধরন সাধারন কিন্তু তার মধ্যে কিছুস্থানে কবিতার ছত্র যোগ করে লেখায় বৈচিত্র আনতে চেষ্টা করেছেন। কোথাও কোথাও আবার নিজের কিছু অভিজ্ঞতার কথাও জুড়ে দিয়েছেন। ইবন জুবাইর নামে আন্দালুসিয়ার এক পন্ডিৎ দ্বাদশ শতাব্দিতে মিশর হিজাজ, সিরিয়া এবং পূর্বের বিভিন্ন জায়গা ভ্রমন করে বিখ্যাত হয়েছিলেন। ইবন বতুতার যেসকল ভ্রমন পথ ও বর্ননা ইবন জুবাইরের সাথে মিলে যায় সে জায়গায় ঈবন জুজাঈ নতুন কোন কাহিনী না লিখে ইবন জুবাইরের ভ্রমনের বর্ননাই তুলে ধরেছেন।
অবশেষে ১৩৫৫ সালের ৯ই ডিসেম্বর মৌখিক বর্ননা শেষ হলে “রিহলা” নামক বইটি লিপিবদ্ধ করার কাজ শেষ হয়। রিহলা কথাটির সারমর্ম হল “মুসলিম সম্রাজ্য, এর সৌর্য, শহর এবং এর গৌরবান্বিত পথের প্রতি উৎসাহিদের জন্য একটি দান” (A Gift to Those Who Contemplate the Wonders of Cities and the Marvels of traveling” আরবী:"تحفة النظار في غرائب الأمصار وعجائب الأسفار‎ ")

ঈবন জুজাঈ এর মতে ইবন বতুতা নিজেই বলেছেন "আল্লাহর রহমতে সমগ্র পৃথিবী ভ্রমনের মনঃকামনা পূর্ন হয়েছে যেটা কোন সাধারন মনুষের পক্ষে সম্ভব না।" বইয়ের শেষে ঈবন জুজাঈ যোগ করেন

এখানে শেষ হল সফর বর্ননার, যেটাকে আমি শেখ আবু আবদুল্লাহ মোহাম্মদ ইবন বতুতার বয়ান থেকে কিছুটা সংক্ষেপিত করে লিপিবদ্ধ করেছি। যেকোন বোধসম্পন্ন মানুষ সহজেই বুঝবেন তিনি ছিলেন যুগের পরিব্রাজক। যদি কেউ বলেন যে তিনি ছিলেন মুসলমান সম্প্রদায়ের পরিব্রাজক তাহলে তিনি একটুও বাড়িয়ে না বলার দায়ে অভিযুক্ত হবেন।[২৩]

বতুতার ভ্রমণকৃত স্থানসমূহ[সম্পাদনা]

ভ্রমণপথ ১৩২৫–১৩৩২[সম্পাদনা]

ভ্রমণপথ ১৩৩২–১৩৪৬[সম্পাদনা]

ইবন বতুতা এশিয়া-এ অবস্থিত
Battuta-path-1332-1346.png
ইবন বতুতার ভ্রমন পথ ১৩৩২-১৩৪৬ (কৃষ্ণ সাগর, মধ্য এশিয়া, ভারত, দক্ষিণ এশিয়া এবং চীন)

ভ্রমণপথ ১৩৪৯–১৩৫৪[সম্পাদনা]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. http://www.si.edu/Content/SE/Educator%20Guides/Journey-to-Mecca.pdf
  2. Ibn Buttuta, Travels in Asia and Africa 1325-1345, Published by Routledge and Kegan Paul (ISBN O 7100 9568 6)
  3. http://www.teachislam.com/dmdocuments/scholars_ibn_battuta_the_great_traveller.pdf
  4. পৃষ্টা নম্বরঃ ২১, ট্রাভেলস অব ইবন বতুতা। আরবি থেকে ইংরেজি অনুবাদ এইচ.এ.আর. গিব, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ ইফতেখার আমিন। ISBN 948-776-287-2
  5. Dunn 2005, p. 37; Defrémery & Sanguinetti 1853, p. 21 Vol. 1
  6. Dunn 2005, p. 39; Defrémery & Sanguinetti 1853, p. 26 Vol. 1
  7. Travels of Ibne Batutah translated by H.A.R Gibb
  8. Defrémery & Sanguinetti 1853, p. 27 Vol. 1
  9. Dunn 2005, p. 49; Defrémery & Sanguinetti 1853, p. 67 Vol. 1
  10. Dunn 2005, pp. 53–54
  11. http://www.sangam.org/taraki/articles/2006/02-26_Ibn_Battuta_Jaffna_Kingdom.php?uid=1547
  12. পৃষ্টা নম্বরঃ ২১৮, ট্রাভেলস অব ইবন বতুতা। আরবি থেকে ইংরেজি অনুবাদ এইচ.এ.আর. গিব, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ ইফতেখার আমিন। ISBN 948-776-287-2
  13. http://ibnbattuta.berkeley.edu/9china.html
  14. পৃষ্টা নম্বরঃ 243, ট্রাভেলস অব ইবন বতুতা। আরবি থেকে ইংরেজি অনুবাদ এইচ.এ.আর. গিব, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ ইফতেখার আমিন। ISBN 948-776-287-2
  15. http://books.google.com.bd/books?id=GSA_AaRdgioC&pg=PA123&d=&hl=en&ei=SszhTfraO8fg0QGR-_2HBw&sa=X&oi=book_result&ct=result&redir_esc=y#v=onepage&q&f=false
  16. পৃষ্টা নম্বরঃ ২৫৪, ট্রাভেলস অব ইবন বতুতা। আরবি থেকে ইংরেজি অনুবাদ এইচ.এ.আর. গিব, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ ইফতেখার আমিন। ISBN 948-776-287-2
  17. পৃষ্টা নম্বরঃ ২৫৫, ট্রাভেলস অব ইবন বতুতা। আরবি থেকে ইংরেজি অনুবাদ এইচ.এ.আর. গিব, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ ইফতেখার আমিন। ISBN 948-776-287-2
  18. http://ibnbattuta.berkeley.edu/10Return.html
  19. http://ibnbattuta.berkeley.edu/11andalusia.html
  20. http://ibnbattuta.berkeley.edu/12westafrica.html
  21. http://people.hofstra.edu/alan_j_singer/teaching_global_history/5.6.pdf
  22. http://ibnbattuta.berkeley.edu/13conclusion.html
  23. পৃষ্টা নম্বরঃ ২৮৮, ট্রাভেলস অব ইবন বতুতা। আরবি থেকে ইংরেজি অনুবাদ এইচ.এ.আর. গিব, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ ইফতেখার আমিন। ISBN 948-776-287-2


উদ্ধৃতি ত্রুটি: "lower-alpha" নামের গ্রুপের <ref> ট্যাগ রয়েছে, কিন্তু এর জন্য <references group="lower-alpha"/> ট্যাগ দেয়া হয়নি