তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(তারাশংকর বন্দোপাধ্যায় থেকে পুনর্নির্দেশিত)


তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম (১৮৯৮-০৭-২৪)জুলাই ২৪, ১৮৯৮
লাভপুর, বীরভূম জেলা, বাংলা, ব্রিটিশ ভারত (অধুনা পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)
মৃত্যু সেপ্টেম্বর ১৪, ১৯৭১(১৯৭১-০৯-১৪)
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
জীবিকা ঔপন্যাসিক, ছোটোগল্পকার
উল্লেখযোগ্য পুরস্কার রবীন্দ্র পুরস্কার
সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার
জ্ঞানপীঠ পুরস্কার
পদ্মভূষণ

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (জুলাই ২৪, ১৮৯৮-সেপ্টেম্বর ১৪, ১৯৭১) বিংশ শতাব্দীর একজন বিশিষ্ট বাঙ্গালী সাহিত্যিক ছিলেন। তিনি ৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি গল্পের বই, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধের বই, ৪টি আত্মজীবনী এবং ২টি ভ্রমণ কাহিনী লিখেছেন। এই বিশিষ্ট জ্ঞানী মানুষটি রবীন্দ্র পুরস্কার, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার এবং পদ্মভূষণ পুরস্কারে পুরস্কৃত হন।

জন্ম ও শিক্ষা[সম্পাদনা]

১৮৯৮ সালের জুলাই ২৪[১] পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা-মায়ের নাম হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রভাবতী দেবী। তাদের বাড়িতে নিয়মিত কালী ও তারা মায়ের পুজো হতো। তার বাবা মা দুজনেই ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ও আদর্শনিষ্ঠ। তারাশঙ্করের জন্মগ্রহণ করার আগে প্রভাবতী দেবী ও হরিদাসের জ্যেষ্ঠপুত্রের মৃত্যু হয়। তাই তাদের পরিবারে তারা মায়ের পুজো শুরু হওয়ার ঠিক দশমাস পরে তারাশঙ্করের জন্ম হয়। তারা মায়ের দয়ায় জাত বলেই তার নাম রাখা হয় তারাশঙ্কর।তারাশঙ্কর ছোটবেলায় মাদুলি, তাবিচ, কবচ এবং বহু সংস্কারের গন্ডিতে বড় হয়ে ওঠেন। আসলে সততা, ধর্মভাব, ভক্তি ও ধর্মশাস্ত্রীয় বিশ্বাস তিনি পেয়েছিলেন মায়ের কাছ থেকে। যদিও পরবর্তী জীবনে এ সব বিশ্বাস নিয়ে অনেক দ্বিধা দ্বন্দ্ব ও জিজ্ঞাসা তার মনকে আলোড়িত করেছে। তারাশঙ্করের বাল্যজীবন কাটে গ্রামের পরিবেশেই। গ্রামের স্কুল থেকে। লাভপুরের যাদবলাল হাই স্কুল থেকে ১৯১৬সালে এন্ট্রান্স(প্রবেশিকা) পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে প্রথমে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে এবং পরে সাউথ সুবার্বন কলেজে(এখনকার আশুতোষ কলেজ) ভর্তি হন। তিনি সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। স্বাস্থ্যভঙ্গ এবং রাজনৈতিক কার্যকলাপের কারণে তাঁর পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি।

ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার কারণে ১৯৩০ সালে গ্রেপ্তার হলেও পরে মুক্তি পেয়ে যান। এরপর নিজেকে সাহিত্যে নিয়োজিত করেন। ১৯৩২ সালে তিনি প্রথমবার শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে দেখা করেন। এই সালেই তাঁর প্রথম উপন্যাস "চৈতালী ঘূর্ণি" প্রকাশ পায়।

তারাশঙ্কর ১৯৪০-এ বাগবাজারে একটি বাড়ি ভাড়া করে নিজের পরিবারকে কলকাতায় নিয়ে আসেন। ১৯৪১-এ তিনি বরানগরে চলে যান। তারাশঙ্কর ১৯৪২-এর বীরভূম জেলা সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন এবং ফ্যাসিস্টবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংগঠনের সভাপতি হন।[২]। তিনি ১৯৭০ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন[৩]

রাজনৈতিক জীবন[সম্পাদনা]

তারাশঙ্কর কংগ্রেসের কর্মী হয়ে সমাজসেবামূলক কাজ করেন এবং এর জন্য তিনি কিছুদিন জেল খাটেন। একবার তিনি ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্টও হয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বিধান পরিষদের সদস্য হন[৪]

লেখার বৈশিষ্ট্য[সম্পাদনা]

তাঁর লেখায় বিশেষ ভাবে পাওয়া যায় বীরভূম-বর্ধমান অঞ্চলের সাঁওতাল, বাগদি, বোষ্টম, বাউরি, ডোম, গ্রাম্য কবিয়াল সম্প্রদায়ের কথা। ছোট বা বড় যে ধরনের মানুষই হোক না কেন, তারাশঙ্কর তাঁর সব লেখায় মানুষের মহত্ত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন, যা তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় গুন। সামাজিক পরিবর্তনের বিভিন্ন চিত্র তাঁর অনেক গল্প ও উপন্যাসের বিষয়। সেখানে আরও আছে গ্রাম জীবনের ভাঙনের কথা, নগর জীবনের বিকাশের কথা।

চলচ্চিত্র[সম্পাদনা]

তারাশঙ্করের উপন্যাস, গল্প ও নাটক নিয়ে চল্লিশটিরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। সত্যজিৎ রায়ও তারাশঙ্করের জলসাঘর এবং অভিযান উপন্যাসের সফল চিত্ররূপ দিয়েছেন। তাঁর যেসব রচনা চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে সেগুলির মধ্যে আছে --

  • জলসাঘর(১৯৫৮) ও অভিযান(১৯৬২) সত্যজিৎ রায়-এর পরিচালিত, অগ্রদানী [পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৯৮৩], আগুন [অসিত সেন, ১৯৬২], আরোগ্য নিকেতন [বিজয় বসু, ১৯৬৯। জাতীয় পুরষ্কারপ্রাপ্ত], উত্তরায়ণ [অগ্রদূত, ১৯৬৩] কবি [দেবকী বসু, ১৯৪৯ এবং সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৯৭৫], কান্না [অগ্রগামী, ১৯৬২], কালিন্দী [নরেশ মিত্র, ১৯৫৫], গণদেবতা [তরুণ মজুমদার, ১৯৭৯], চাঁপাডাঙার বউ [নির্মল দে, ১৯৫৪], জয়া [চিত্ত বসু, ১৯৬৫], ডাকহরকরা [অগ্রগামী, ১৯৫৮], দুই পুরুষ [সুবোধ মিত্র, ১৯৪৫ এবং সুশীল মুখোপাধ্যায়, ১৯৭২] ধাত্রীদেবতা [কালীপ্রসাদ ঘোষ, ১৯৪৮], না [শ্রীতারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৯৫৪], ফরিয়াদ [বিজয় বসু, ১৯৭১], বিচারক [প্রভাত মুখোপাধ্যায়, ১৯৫৯], বিপাশা [অগ্রদূত, ১৯৬২], মঞ্জরী অপেরা [অগ্রদূত, ১৯৭০], রাইকমল [সুবোধ মিত্র, ১৯৫৫], শুকসারী [হারানো সুর গল্প অবলম্বনে,সুশীল মজুমদার পরিচালিত, ১৯৬৯], সন্দীপন পাঠশালা [অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়, ১৯৪৯], সপ্তপদী [অজয় কর, ১৯৬১], হার মানা হার [মহাশ্বেতা উপন্যাস অবলম্বনে, সলিল সেন পরিচালিত, ১৯৭২], হাঁসুলীবাঁকের উপকথা [তপন সিংহ,১৯৬২],[৫][৬] এবং বেদেনি (২০১০) প্রভৃতি।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ[সম্পাদনা]

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্য কর্মের সংক্ষিপ্ত তালিকা নিম্নে প্রদত্ত হল :

  • নিশিপদ্ম ১৯৬২
  • ব্যর্থ নায়িকা
  • বিচারক, (১৯৫৭)
  • ফরিয়াদ, ১৯৭১
  • তামস তপস্যা, ১৯৫২
  • কালবৈশাখী, ১৯৬৩
  • কালিন্দী, ১৯৪০
  • গণদেবতা, ১৯৪২
  • পঞ্চগ্রাম, ১৯৪৪
  • আরোগ্য নিকেতন, ১৯৫৩
  • নাগিনী কন্যার কাহিনী, ১৯৫২
  • রাধা, ১৯৫৮
  • যোগভ্রষ্ট,১৯৬০
  • ডাইনি
  • একটি প্রেমের গল্প
  • রাধারানী
  • সপ্তপদী,১৯৫৭
  • হাঁসুলি বাঁকের উপকথা, ১৯৫১
  • চিরন্তনী
  • কবি, ১৯৪৪
  • কীর্তিহাটের কড়চা, ১৯৬৭
  • চৈতালি ঘূর্ণি, ১৯৩১
  • ধাত্রীদেবতা, ১৯৩৯
  • না, ১৯৬০
  • রসকলি, ১৯৩৮
  • পাষানপুরী, ১৯৩৩
  • চাঁপাডাঙার বৌ, ১৯৫৪
  • সন্ধ্যামনি
  • লেখার কথা
  • নীলকন্ঠ, ১৯৩৩
  • রাইকমল, ১৯৩৪
  • জলসাঘর, ১৯৩৭
  • যে বই লিখতে চাই
  • প্রেম ও প্রয়োজন, ১৯৩৫
  • কালাপাহাড়
  • বেদেনী
  • আমার চোখে কপালকুন্ডলা
  • আগুন, ১৯৩৭
  • মন্বন্তর, ১৯৪৪
  • হারানো সুর, ১৯৪৫
  • ছলানময়ী
  • স্বর্গমর্ত, ১৯৬৮
  • সন্দীপন পাঠশালা, ১৯৪৬
  • ঝড় ও ঝরাপাতা, ১৯৪৬
  • যাদুকরী
  • আমি যদি আমার সমালোচক হতাম
  • অভিযান, ১৯৪৬
  • পদচিহ্ন, ১৯৫০
  • যতিভঙ্গ, ১৯৬২
  • বন্দিনী কমলা
  • ডাকহরকারা, ১৯৫৮
  • আমার কালের কথা
  • পঞ্চপুত্তলী, ১৯৫৬
  • সংকেত, ১৯৬৪
  • মণি বৌদি, ১৯৬৭
  • পৌষলক্ষ্মী
  • ভূতপুরাণ
  • গন্নাবেগম
  • তমসা,১৯৬৩
  • বসন্তরোগ, ১৯৬৪
  • মঞ্জরী অপেরা, ১৯৬৪
  • বিপাশা, ১৯৫৮
  • উত্তরায়ন, ১৯৫০
  • মহাশ্বেতা, ১৯৬০
  • একটি চড়ুই পাখি ও কালো মেয়ে, ১৯৬৩
  • জঙ্গলগড়, ১৯৬৪
  • মহানগরী, ১৯৬৬
  • কালরাত্রি, ১৯৭০
  • ভুবনপুরের হাট, ১৯৬৪
  • অরণ্যবহ্নি, ১৯৬৬
  • হীরাপান্না, ১৯৬৬
  • অভিনেত্রী, ১৯৭০
  • গুরুদক্ষিণা, ১৯৬৬
  • শুকসারী কথা, ১৯৬৭
  • শতাব্দীর মৃত্যু
  • শক্করবাঈ, ১৯৬৭
  • ইতিহাস ও সাহিত্য
  • নবদিগন্ত, ১৯৭৩
  • রবীন্দ্রনাথ ও বাংলার পল্লী
  • দুই পুরুষ (নাটক)
  • ছায়াপথ, ১৯৬৯
  • মস্কোতে কয়েকদিন
  • পথের ডাক
  • দ্বীপান্তর
  • বিংশশতাব্দী (নাটক)
  • কালান্তর
  • সুতপার তপস্যা, ১৯৭১
  • একটি কালো মেয়ে, ১৯৭১
  • বিচিত্র, ১৯৫৩
  • নাগরিক, ১৯৬০
  • কান্না, ১৯৬২
  • বৈষ্ণবের আখড়া

নাটক[সম্পাদনা]

  • দ্বীপান্তর(১৯৪৫)
  • পথের ডাক(১৯৪৩)
  • দুই পুরুষ(১৯৪৩)

পুরস্কার[সম্পাদনা]

১৯৫৫ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের কাছ থেকে “রবীন্দ্র পুরস্কার” লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে “সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার” পান। ১৯৫৭ সালে তিনি চীন সরকারের আমন্ত্রণে চীন ভ্রমণে যান। এর পরের বছর তিনি অ্যাফ্রো-এশিয়ান লেখক সঙ্ঘের কমিটি গঠনের প্রস্ততিমূলক সভায় যোগদানের উদ্দেশ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন গমণ করেন। এর পর তিনি তাসখন্দে অনুষ্ঠিত অ্যাফ্রো-এশিয়ান লেখক সম্মেলনে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৬২ সালে তারাশঙ্কর পদ্মশ্রী ও ১৯৬৮ সালে পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত হন। [৭]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান - প্রথম খণ্ড - সংশোধিত পঞ্চম সংস্করন - সাহিত্য সংসদ
  2. "জন্ম ও শিক্ষা" 
  3. সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান - প্রথম খণ্ড - সংশোধিত পঞ্চম সংস্করন - সাহিত্য সংসদ
  4. সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান - প্রথম খণ্ড - সংশোধিত পঞ্চম সংস্করন - সাহিত্য সংসদ
  5. তারাশঙ্কর ও বাংলা চলচ্চিত্র : ধ্রুবগোপাল মুখোপাধ্যায়। সাহিত্য ও সংস্কৃতি:তারাশঙ্কর স্মৃতি সংখ্যা, ১৩৯৯
  6. বিশ শতকের বাংলা ছবি : সম্পাদনা তপন রায়, ২০০১
  7. "পুরস্কার"