কোণার্ক সূর্য মন্দির

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান
কোনারক সুর্য মন্দির
Sun Temple, Konârak
বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী তালিকায় উল্লিখিত নাম (ইংরেজি)
কোণার্ক সূর্য মন্দিরের চাকা
অবস্থান  ভারত
ধরন সাংস্কৃতিক
মানদণ্ড i, iii, vi
তথ্যসূত্র ২৪৬
ইউনেস্কো অঞ্চল এশিয়া এবং অস্ট্রালেশিয়া
শিলালিপির ইতিহাস
শিলালিপি ১৯৮৪ (৮ম সভা)

কোণার্ক সুর্য মন্দির বা কোনারক সুর্য মন্দির,পুরী ওড়িশা কোণার্ক সুর্য মন্দির বা কোনারক সুর্য মন্দির ভারতের ওড়িশা রাজ্যের পুরী জেলার কোণার্ক শহর অবস্থিত সুর্য মন্দির। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে নির্মিত এই মন্দিরটি আন্তর্জাতিক বিশ্ব ঐতিহ্য প্রকল্প কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ও ইউনেস্কো নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকার মধ্যে স্থান পেয়েছে। কোনার্ক সূর্য মন্দির এখন Archaeological Survey of India (ASI) অধিনে।

অর্থ:-

কনার্ক শব্দের অর্থ - কোণ + অর্ক , কোণ= কোণা বা angel এবং অর্ক= সুর্য্য, অর্থাৎ সুর্য্যের বিভিন্ন কোণের অবস্থান । এই মন্দির টি সুর্য্যের বিভিন্ন অবস্থানে গুরুত্ব পুর্ন অর্থ বহন করে।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

উৎপত্তি[সম্পাদনা]

মন্দির গড়ে ওঠার পেছনে দুটি মত আছে।প্রথমত, পূর্বগঙ্গা রাজবংশের(1078- 1434) নরসিংহ দেব (1238-1264) 1232-1255 bc প্রথম বাংলা জয়ের স্মারক রূপে চন্দ্রাভাগা নদীর তীরে প্রাচীন মৈত্রিয়ারনে অর্থাৎ সাজেকের কোনারাকে এই মন্দির প্রতিষ্টা করেন। দ্বিতীয়ত, পুরান মতে শ্রীকৃষনের পুত্র সাম্‍ব ‌রূপে অত্যন্ত নায়ানভোলানো ছিলেন। সব মহিলাদের নজর কারতেন। সাম্‍ব একদিন নারদের ডাকে সাড়া দিতে ভুলে গেলে নারদের মোড়ে প্রতিরোধ স্পৃহা জাগে। এক দিন কৃষ্ণ যখন গোপিনীদের সঙ্গে লীলায় ব্যস্ত তখন নারদের কুতিরাতে সাম্‍ব সেখানে ঢুকে পড়ে।তখন গোপিনীদের নজর তার ওপর গিয়ে পড়ে। তখন কৃষ্ণ প্রচুর রেগে গিয়ে তাকে অভিশাপ দানের প্রয়োজনে শাস্তি দেন যে তার রূপ হারিয়ে যাবে। তখন মনে দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে সে কোনারাকে সমুদ্রের তীরে এসে সূর্জদেবকে কঠোর তপস্যায় মুগ্ধ করেনিজ হারানো রূপ ফিরে পেয়ে সমুদ্রতীরে এই মন্দির প্রতিষ্ঠএ করেন।

ধ্বংস[সম্পাদনা]

মন্দিরে সূর্যদেবতার যে বিশাল বিগ্রহ ছিল তা এখন নেই ।কালের করাল গ্রাসে স্থাপনার অনেকটাই আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত। এর কয়েকটি কারণ আছে। প্রথমত, বাংলার সুলতান সুলেমান খান কারানির সেনাপতি কালাপাহাড়ের আক্রমণে কোনার্ক মন্দির প্রথম ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ।উড়িষ্যার ইতিহাস অনুযায়ী কালাপাহাড় ১৫০৮ সালে কোনার্ক আক্রমণ করে । দ্বিতীয়ত,নরসিংহদেব মুসলিম মেয়ে কে বিয়ে করার জন্যে বহিসকিত হয়। তাই সে নিজে মন্দির ধঃসকরে। তৃতীয়ত, ১৬২৬ সালে খুরদার তত্কালীন রাজা পুরুষোত্তম দেবের পুত্র নরশিমা দেব সূর্যদেবের বিগ্রহটি পুরীর জগন্নাথের মন্দিরে নিয়ে যান । সেখানে একটি পৃথক মন্দিরে সূর্য ও চন্দ্র দেবতার বিগ্রহ স্থাপন করা হয় । শুধু বিগ্রহই নয় তিনি কোনার্ক মন্দির থেকে কারুকার্য করা অনেক পাথর পুরীর মন্দিরে নিয়ে যান। এমনকি নবগ্রহ পথ নামে একটি বিশাল প্রস্তর খন্ডও তিনি পুরীতে নিয়ে যান । মারাঠা শাসনামলে কোনার্ক মন্দির থেকে অনেক ভাস্কর্য ও প্রস্তরখন্ড পুরীতে নিয়ে যাওয়া হয় । ১৭৭৯ সালে কোনার্ক থেকে অরুণ কুম্ভ নামে বিশাল একটি স্তম্ভ নিয়ে পুরীর সিংহদ্বারের সামনে স্থাপন করা হয় । এই সময় মারাঠা প্রশাসন কোনার্কের নাট মন্ডপটি অপ্রয়োজনীয় মনে করে ভেঙ্গে ফেলে । সূর্যদেবের বিগ্রহ অপসারণের পর কোনার্কে পূজা ও আরতি বন্ধ হয়ে যায় । চতুর্থত,পর্তুগীজ জলদস্যুদের ক্রমাগত আক্রমণের ফলে কোনার্ক বন্দর বন্ধ করে দেওয়া হয় ।পর্তুগীজ জলদস্যুদের দস্যুবিতি করতে অসুবিধা হওয়ার জন্য পর্তুগীজ দস্যুরা কোনার্ক মন্দিরের মাথায় অবস্হিত অতি শক্তিশালি চুম্বক টিকে নষ্ঠ করে দেয়।

          আঠারশ' শতক নাগাদ কোনার্ক মন্দির তার সকল গৌরব হারিয়ে পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে ।মন্দিরের অনেক অংশ বালির নিচে চাপা পড়ে যায় ।মন্দির চত্বর ও এর আশেপাশের এলাকা ধীরে ধীরে ঘন অরণ্যে ছেয়ে যায় ।বুনো জন্তুরা বাসা বাঁধে মন্দিরের ভিতর । জলদস্যু ও ডাকাতের আস্তানায় পরিণত হয় কোনার্ক মন্দির । সেসময় দিনের আলোতেও সাধারণ মানুষ ভয়ে এর ত্রিসীমানায় যেত না ।

নির্মাণ ও গঠন[সম্পাদনা]

কলিঙ্গ রীতিতে নির্মিত মন্দিরের চূড়াগুলো পিরামিড আকৃতির।মন্দিরের সামনে রয়েছে নাটমন্ডপ ।এখানে একসময় দেবদাসীরা দেবতার উদ্দেশ্যে পূজানৃত্য পরিবেশন করতেন ।মন্দিরের ভিতরে রয়েছে নাটমন্দির,ভোগমন্দির ও গর্ভগৃহ। মন্দিরটির উচ্চতা প্রায় ৮৫৭ ফুট ।তবে মন্দিরের অনেক অংশ এখন বালিতে দেবে গেছে । মন্দিরের দেউল এখনো ২০০ ফুট উঁচু।

     উড়িষ্যা ও দ্রাবিড় স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণে নির্মিত মন্দিরটি ধূসর বেলে পাথরে বিশাল একটি রথের আকারে গড়া হয়েছে । সমুদ্র থেকে উঠে আসা সূর্যদেবের বিশাল রথ,তার সামনে রয়েছে সাত জোড়া ঘোড়া। সাতটি ঘোড়া মানে সপ্তাহের সাত দিন। বারো জোড়া বিশাল চাকার ওপর পুরো মন্দিরটি নির্মিত। চব্বিস্টি চাকা মানে চব্বিশ পক্ষ।  চাকার কারুকার্য দর্শকদের জন্য একটি প্রধান আকর্ষণ । প্রতিটি চাকা একেকটি সূর্যঘড়ি ।চাকার ভেতরের দাঁড়গুলো সূর্যঘড়ির সময়ের কাঁটা।আটটি দাড়ি মানে অষ্টপ্রহর। এখনো নিখুঁতভাবে সময় জানা যায় এই সূর্যঘড়ির সাহায্যে। মন্দিরের প্রবেশপথেই রয়েছে বিশাল দুটি সিংহের মূর্তি যারা লড়াই করছে দুটি রণহস্তীর সঙ্গে ।
      এছাড়া রয়েছে ডানসিং হল, ছায়াদেবীর মন্দির ও মায়া মন্দির। প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসে মন্দির প্রাঙ্গনে বসে ডান্স ফেস্টিবল। সেএই সময় বহু দূর থেকে ছুটে আসে বহু নৃত্যপ্রেমী মানুষ।

ভাস্কর্য[সম্পাদনা]

আজও ভোরের সূর্যোদয়ের প্রথম আলো মন্দিরের প্রাঙ্গনে এসে পড়ে। মন্দিরের ভাস্কর্য অনুপম। বেদী থেকে শুরু করে চূড়া পর্যন্ত প্রতি ইঞ্চি জায়গায় পাথরের ভাস্কর্য ও কারুকার্য রয়েছে । দেবতা,অপ্সরা,কি ন্নর,যক্ষ,গন্ধর্ব,নাগ,মানুষ,বালিকা বধূ বিয়ের শোভাযাত্রা,সমকামিতা,রাজার যুদ্ধ প্রস্তুতি, মৃদঙ্গকরতাম বীণা, মোহিনী,মিঠুন মূর্তি,ছয় হাতের শিব,রাজদরবারের নানান দৃশ্য,পৌরাণিক বিভিন্ন ঘটনার প্রতিরূপ,নৃত্যরত নরনারী,প্রেমিক যুগল,ফাঁদ দিয়ে হাতি ধরা,শিকারের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পাথরের বুকে ।মূর্তিগুলোর মানবিক আবেদন,নিখুঁত গড়ন,লীলায়িত ভঙ্গী শিল্পকলার চরম উত্কর্ষের নিদর্শন । মন্দিরের তরণে মানুষের মূর্তি শায়িত। সিংহ শক্তি অর্থাৎ ক্ষমতার প্রতীক এবং হাতি কিংবা সম্পদের প্রতীক এদের মাজে পিসে মরছে মানুষ।


উদ্ধার[সম্পাদনা]

বিংশ শতাব্দীতে প্রত্নতত্ববিদরা কোনার্ক মন্দির পুনরাবিষ্কার করেন।৩০০ বছর ধরে বালিরস্তূপের নীচে অনাদর ও অবহেলায় পড়ে থাকা এই সূর্য মন্দিরটি কে ১৯০৪ খ্রী বড়লাট লর্ডকার্জন উদ্ধার করেন ৷ তবে তার ও আগে কোন বিপর্যয় বসত মূল সূর্যমন্দির টি অবুলুপ্ত হয় ৷ আমরা যেটাকে মন্দির হিসেবে দেখি সেটা আসলে নাট মন্দির,মূল মন্দির নয় ৷ ফলে লোকচক্ষুর সামনে উন্মোচিত হয়। কোনার্ক মন্দিরের অপূর্ব স্থাপত্য শৈলী,বিষ্ময়কর ভাস্কর্যকীর্তি ও অনন্য শিল্প সম্ভার । কোনার্ক মন্দিরের অনেক শিল্প কীর্তি এখন সূর্য মন্দির জাদুঘর ও উড়িষ্যার জাতীয় জাদুঘরে রয়েছে । প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী কোনার্কের সূর্য মন্দির দেখতে আসেন ।প্রাচীন ভারতীয় স্থপতি ও ভাস্করদের শিল্পনৈপুণ্য ও সৃষ্টিশীলতা আজও মানুষকে বিস্ময় বিমুগ্ধ করে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

স্থানাঙ্ক: ১৯°৫৩′১৫″উত্তর ৮৬°০৫′৪১″পূর্ব / ১৯.৮৮৭৪৪৪° উত্তর ৮৬.০৯৪৫৯৬° পূর্ব / 19.887444; 86.094596

[[বিষয়শ্রেণী:ভারতের বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান]