ভারতের পার্বত্য রেলপথ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
ভারতের পার্বত্য রেলপথ
Darjeelinghimalayanrailway.jpg
ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান
অবস্থান ভারত উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
অন্তর্ভুক্ত কালকা-সিমলা রেলওয়ে
দার্জিলিং হিমালয়ান রেল
নীলগিরি পার্বত্য রেল উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
মানদণ্ড ii, iv[১]
তথ্যসূত্র ৯৪৪
শিলালিপির ইতিহাস ১৯৯৯ (২৩তম সভা)
প্রসারণ ১৯৯৯ দার্জিলিং হিমালয়ান রেল; ২০০৫ কালকা-সিমলা রেলওয়ে; ২০০৮ নীলগিরি পার্বত্য রেলপথ
বিপদাপন্ন  ()

ভারতের পার্বত্য রেলপথ হল সারা বিশ্বে চালু অনুরূপ ২০টি ন্যারো বা মিটার-গেজ রেলপথের মধ্যে ভারতে চালু ছয় বা সাতটি ছোটো রেলপথ।[২] এই লাইনগুলি চালু হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনকালে। এগুলি আজও চালু অবস্থাতেই আছে। বর্তমানে এগুলি ভারতীয় রেলের নিয়ন্ত্রণাধীন। এই রেলপথগুলির মধ্যে চারটি উত্তর ভারতের হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত। এগুলি হল: দার্জিলিং হিমালয়ান রেল (১৮৮১), কালকা-সিমলা রেল (১৮৯৮), কাংড়া উপত্যকা রেল পাঠানকোট (১৯২৪) ও কাশ্মীর রেল (২০০৫)।দুটি রেলপথ অবস্থিত দক্ষিণ ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতমালায়। এগুলি হল: নীলগিরি পার্বত্য রেল, তামিলনাড়ুমাথেরন পার্বত্য রেল, মহারাষ্ট্র।২০শ শতাব্দীতে দক্ষিণ অসমের কাছাড় পার্বত্য অঞ্চলের বরাক নদী উপত্যকায় লামডিং–শিলচর লাইনটি চালু হয়। দার্জিলিং হিমালয়ান রেল, নীলগিরি পার্বত্য রেল ও কালকা-শিমলা রেল ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃত।[৩][৪][৫]

এই রেলপথগুলি ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শৈলশহরকে পাহাড়ের পাদদেশীয় অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ব্রিটিশ শাসনকালে যখন দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে এই রেলপথগুলি নির্মিত হয়েছিল, তখন প্রযুক্তিগত উন্নতি বিশেষ ঘটেনি। তাই এই রেলপথগুলিকে "প্রযুক্তির উন্নয়নে মূল্যবিনিময়ের অসাধারণ উদাহরণ" ও প্রকৌশলের অসাধারণত্বের উদাহরণ মনে করা হয়।[৩][৪][৫]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

ভারতের হিমালয় ও অন্যান্য পার্বত্য অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের ইচ্ছা তদনীন্তন ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর মনে দেরিতে উদিত হয়েছিল। ভারতের পার্বত্য রেলপথ এই ইচ্ছারই ফলশ্রুতি। ১৮৪৪ সালে ভারতের তদনীন্তন ভাইসরয় স্যার জন লরেন্স[৬] পার্বত্য অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপনের, বিশেষত সামরিক গ্যারিসন গড়ে তোলার এক বিতর্কিত ধারণার জন্ম দেন। ব্রিটিশরা দেশের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে সমৃদ্ধ শৈলশহরগুলিতে স্টেশন স্থাপন করার একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। এই প্রস্তাবটি সাধারণভাবে ‘হিল রেলওয়ে’ নামে পরিচিত হয়। যে শৈলশহরগুলি এই জন্য নির্বাচিত হয় সেগুলি ছিল তদনীন্তন ব্রিটিশ ভারতের ‘গ্রীষ্মকালীন রাজধানী’ শিমলা; অধুনা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে অবস্থিত দার্জিলিং, যা চা বাগান ও পূর্ব হিমালয়ের সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত; অধুনা হিমাচল প্রদেশ রাজ্যের কাংড়া উপত্যকা; তামিলনাড়ুর নীলগিরি পর্বতমালার ঊটকামান্ড এবং মুম্বই শহরের কাছে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার মাথেরন শৈলশহর।[৪][৭][৮]

১৮৭৮ সালে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলপথের নির্মাণকার্য শুরু হয়। এরই সঙ্গে সঙ্গে পার্বত্য যাত্রীবাহী রেলপথের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ পার্বত্য একালাগুলিকে সমতলের সঙ্গে যুক্ত করার কাজ শুরু হয়। তদনীন্তন পূর্ববঙ্গ রেলের ফ্র্যাঙ্কলিন প্রেস্টিজ হিলকার্ট রোড বরাবর শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত একটি পার্বত্য ট্রামওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৮৮১ সালে দার্জিলিং পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের কাজ শেষ হয়।[৪][৭]

অধুনা তামিলনাড়ু রাজ্যে নীলগিরি পার্বত্য রেলের প্রস্তাবনা গৃহীত হয়েছিল ১৮৫৪ সালে। দার্জিলিং হিমালয়ান রেল নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার পর ১৮৯৪ সালে এই রেলপথটির নির্মাণকার্য শুরু হয়। তবে এই পার্বত্য অঞ্চলটি অধিকতর দুর্গম ছিল বলে এবং এখানকার উচ্চতা ৩২৬ মিটার (১,০৭০ ফু) থেকে ২,২০৩ মিটার (৭,২২৮ ফু)-এর মধ্যে থাকায় এই ৪৬ কিলোমিটার (২৯ মা) দীর্ঘ এই রেলপথটির নির্মাণকার্য শেষ হয় ১৯০৮ সালে। ৯৬ কিলোমিটার (৬০ মা) দীর্ঘ কালকা–শিমলা রেলপথের নির্মাণকার্য শুরু হয় ১৮৯৮ সালে। ১৯০৩ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন এই রেলপথের উদ্বোধন করেন। এই রেলপথ উক্ত দুর্গম অঞ্চলের সঙ্গে অবশিষ্ট দেশের সংযোগ রক্ষা করছে। মাথেরন–নেরাল ‘টয় ট্রেনে’র কাজ সম্পীর্ণ হয় ১৯০৭ সালে। মাথেরন মুম্বই থেকে ১০৮ কিলোমিটার (৬৭ মা) দূরে অবস্থিত একটি শৈলশহর। ১৯২৯ সালে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ কাংড়া উপত্যকায় রেলপথ নির্মিত হয়।[৩][৪][৫]

ভারতের পার্বত্য রেলপথগুলির তিনটিকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এগুলি বর্ণিত হয়েছে “দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে কার্যকরী রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের সমস্যার সাহসী ও মেধাদীপ্ত ইঞ্জিনিয়ারিং সমাধান” হিসেবে।[৩] ১৯৯৯ সালে দার্জিলিং হিমালয়ান রেল, ২০০৫ সালে নীলগিরি পার্বত্য রেল এবং ২০০৮ সালে কালকা-শিমলা রেল এই মর্যাদা পায়। এগুলি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অধীনে দুই ও চার ক্রাইটেরিয়ায় ‘ভারতের পার্বত্য রেলপথ’ নামে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মাথেরন ও চতুর্থ লাইনটি ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক সংস্থায় এখনও বিবেচনাধীন।[৩][৮]

ভারতের পার্বত্য রেলপথগুলোর তালিকা নিচে দেয়া হলো:

নাম দৈর্ঘ্য কিমি দৈর্ঘ্য মাইল নির্মিত ধরণ গেজ
দার্জিলিং হিমালয়ান রেল ৮৮ ৫৫ ১৮৮১ ন্যারো গেজ 2 ft (৬১০ mm)
নীলগিরি পার্বত্য রেলপথ ৪৬ ২৯ ১৯০৮ মিটার গেজ ১,০০০ mm (3 ft 3 38 in)
কালকা-সিমলা রেলওয়ে ৯৬ ৬০ ১৯০৩ ন্যারো গেজ 2 ft 6 in (৭৬২ mm)
মাথেরন পাহাড়ি রেলপথ ২০ ১২ ১৯০৭ ন্যারো গেজ 2 ft (৬১০ mm)
কাংড়া উপত্যকা রেলপথ ১৬৪ ১০২ ১৯২৯ ন্যারো গেজ 2 ft 6 in (৭৬২ mm)
Total: ৪১৪ ২৫৭

দার্জিলিং হিমালয়ান রেল[সম্পাদনা]

বাঁদিকে: বাতাসিয়া লুপের উপরের অংশে একটি এক্সকারশন ট্রেন (প্রকৃতপক্ষে শিলিগুড়িগামী একটি খালি গাড়ি)। ডানদিকে: দার্জিলিং হিমালয়ান রেলের লুপ লাইন, ১৯২১।

দার্জিলিং হিমালয়ান রেল বা ‘টয় ট্রেন’ হল একটি ৬১০ মিলিমিটার (২ ফুট) ন্যারো গেজ রেলপথ। ৮৮ কিলোমিটার (৫৫ মা) ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দার্জিলিং শহরকে শিলিগুড়ির সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই রেলপথটি ভারতীয় রেলের অধীনস্থ। ভারতে বিখ্যাত এই রেলপথটি ব্রিটিশ সরকার তৈরি করেছিল। দার্জিলিং ছিল একটি প্রধান গ্রীষ্মকালীন শৈলশহর এবং দার্জিলিং জেলা একটি প্রধান চা-উৎপাদক জেলা। এই রেললাইনের উচ্চতা শিলিগুড়িতে ১০০ মিটার (৩৩০ ফু) এবং দার্জিলিং-এ ২,২০০ মিটার (৭,২০০ ফু)। ঘুম শহরে এই উচ্চতা সর্বাধিক - ২,৩০০ মিটার (৭,৫০০ ফু)।[৯][১০]

১৮৭৮ সালে কলকাতার সঙ্গে শিলিগুড়ির রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়। কিন্তু শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যেতে হলে, ধূলিধূসরিত পথে টাঙায় চড়ে যেতে হত। বাংলার তৎকালীন লেফট্যানেন্ট-গভর্নর অ্যাশলে ইডেন কর্তৃক নিযুক্ত একটি কমিটির সুপারিশ ক্রমে এবং ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানির এজেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন প্রেস্টিজের অনুরোধে ১৮৭৯ সালে এই রেলপথের নির্মাণকার্য শুরু হয় এবং কাজ শেষ হয় ১৮৮১ সালের জুলাই মাসে।[৯][১১] ভূমিক্ষয়ের হাত থেকে লাইনটিকে রক্ষা করার জন্য এর পর বেশ কয়েকবার লাইনটির মেরামত করা হয়। ১৯০৯-১৯১০ সালে দার্জিলিং হিমালয়ান রেল বার্ষিক ১৭৪,০০০ যাত্রী এবং ৪৭,০০০ টন মাল বহন করেছিল।[১০]

এই রেলপথের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল চারটি লুপ (স্পাইরাল ও চারটি জিগজ্যাগ)। প্রথম দিকের চার চাকার ক্যারেজের পরিবর্তে পরে প্রথম বগি ক্যারেজ চালু হয়। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পের পর লাইন ও স্টেশনগুলির ব্যাপক উন্নতি ঘটানো হয়। পরে উত্তরপশ্চিম সীমান্ত রেলের অধীনে এই রেলপথের আরও উন্নতি ঘটানো হয়। দার্জিলিং মেলের জন্য একটি আধুনিক ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহৃত হলেও, দার্জিলিং হিমালয়ান রেলপথে এখনও বাষ্পচালিত ইঞ্জিনে ট্রেন চলে।[৯][১১][১২]

দার্জিলিঙে দার্জিলিং হিমালয়ান রেল স্টেশনের প্যানোর্যাhমিক দৃশ্য।

১৯৯৯ সালে দার্জিলিং হিমালয়ান রেল ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের স্বীকৃতি পায়। এটিই ভারতের পার্বত্য রেলের প্রথম লাইন যেটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের স্বীকৃতি পেয়েছিল। একটি আশ্বাসপত্র এই মর্মে লিপিবদ্ধ হয় যে, ঘোষিত ঐতিহ্যবাহী স্থানের মধ্যে একটি বাফার জোন সৃষ্টির পাশাপাশি এখানে বাষ্পচালিত ইঞ্জিন রাখা হবে।[৩]

আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল রেললাইন বরাবর বিভিন্ন সাইনবোর্ডের মাধ্যমে পর্যটকদের কতকগুলি বিশেষ জায়গা চিনিয়ে দেওয়া। এই জায়গাগুলির নাম ‘অ্যাগোনি পয়েন্ট’, ‘সেনসেশন কর্নার’ ইত্যাদি। লুপগুলিতে পাহাড়ের ও নিচের উপত্যকার সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়। এগুলিও পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।[৪]

নীলগিরি পার্বত্য রেল[সম্পাদনা]

ভারতের একমাত্র র্যােক অ্যান্ড পিনিয়ন রেল ব্যবস্থা

নীলগিরি পার্বত্য রেল হল একক ট্র্যাক-বিশিষ্ট ৪৬ কিলোমিটার (২৯ মা) একটি মিটার গেজ একক লাইন রেলব্যবস্থা। ১৮৯৯ সালের জুন মাসে প্রথমে কুরনুর ছিল এই পথের শেষ রেল স্টেশন। পরে ১৯০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফার্নফিল এবং ১৯০৮ সালেরি অক্টোবরে তা উটকামান্ড পর্যন্ত প্রসারিত হয়। বর্তমানে এটি দক্ষিণ ভারতের নীলগিরি পর্বতমালার মেত্তুপালায়াম শহর থেকে উদাগামণ্ডলম (উটকামান্ড) শৈলশহর পর্যন্ত প্রসারিত। দুটি শহরেই তামিলনাড়ু রাজ্যে অবস্থিত। এটিই ভারতের একমাত্র র্যােক রেলপথ। এটিতে অল্টারনেটিভ বাইটিং ব্যবস্থা (সাধারণভাবে ‘র্যা ক অ্যান্ড পিনিয়ন’ রেল ব্যবস্থা নামে পরিচিত) ব্যবহৃত হয়েছে। এটি চালিত হয় একধরনের বিশেষ ইঞ্জিনের মাধ্যমে.১৮৮৬ সালে স্যার গালফোর্ড এল. মোলসওয়ার্থের রিপোর্টে এই রেলপথ সম্পর্কে বলা হয়েছিল:[১৩]

Two distinct functions – 1st that of traction by adhesion as in an ordinary loco; 2nd that of traction by pinions acting on the track bars. The brakes are four in number – two handbrakes, acting by friction; and two acting by preventing the free escape of air from cylinder and thus using compressed air in retarding the progress of the engine. The former are used for shunting whilst the later for descending steep gradients. One of the handbrakes acts on the tyres of the wheels in the ordinary manner and the second acts on grooved surfaces of the pinion axle, but can be used in those places where the rack is laid.[১৩]

এই রেলপথে ট্রেনগুলি ৪৬ কিলোমিটার (২৯ মা) দীর্ঘ পথ যায় ২০৮টি বাঁক, ১৬টি সুড়ঙ্গ ও ২৫০টি সেতু পেরিয়ে। পাহাড়ের চড়াইয়ের পথে যাত্রা করতে লাগে ২৯০ মিনিট। উৎরাই পথে নামতে লাগে ২১৫ মিনিট।[৪][১৪][১৫]

২০০৫ সালের জুলাই মাসে এই চালু রেলপথের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রাচীনতম ও সবচেয়ে খাড়াই ‘র্যা ক অ্যান্ড পিনিয়ন প্রযুক্তি’র জন্য এটিকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের স্বীকৃতি দেয়। এখন পাদদেশীয় স্টেশন কাল্লার পর্যন্ত ৭.২ কিলোমিটার (৪.৫ মা) দীর্ঘ একটি মিটার গেজ বিভাগ রয়েছে। এখান থেকে র্যা ক রেল ব্যবস্থা শুরু হয়েছে এবং তা পাহাড়ে উঠে গিয়ে বারোটি টানেল পেরিয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে বৃহত্তম টানেলটির দৈর্ঘ্য ৯৭ মিটার (৩১৮ ফু)। ৭.২ কিলোমিটার (৪.৫ মা) দীর্ঘ এই পথের ঢাল ১:১২.৫। কুরনুর পর্যন্ত এই বিভাগে বাষ্পচালিত ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়। কুরনুর তেকে উটকামান্ড পর্যন্ত ঢাল ১:২৩।[৪][৭]

কালকা–শিমলা রেল[সম্পাদনা]

তারাদেবী স্টেশনে শিবালিক ডিউল্যাক্স এক্সপ্রেস
রেলপথের একটি বড়ো সেতুর উপর সাধারণ যাত্রীবাহী ট্রেন।

শিমলা হল অধুনা ভারতের হিমাচল প্রদেশ রাজ্যের রাজধানী।[৪][১৬] হিমালয়ের পাদদেশে ৭,২৩৪ ফুট (২,২০৫ মি) উচ্চতায় এই শহর অবস্থিত। ১৮৬৪ সালে এটি ছিল ব্রিটিশ ভারতের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী এবং ভারতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সদর দফতর। কালকা হল অধুনা হরিয়ানা রাজ্যের পঞ্চকুলা জেলার একটি শহর।[৪][১৬][১৭]

এই রেলপথ গঠনের আগে, বহির্জগতের সঙ্গে শিমলার যোগসূত্র ছিল গ্রাম্য ঠেলাগাড়ি। ১৮৯৮ সালে দিল্লি-আম্বালা-কালকা রেলওয়ে কোম্পানি শিবালিক পর্বতমালায় রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু করে। ১৮৮৪ থেকে ১৮৯৮ সালের মধ্যে বিভিন্ন বিকল্প পথে পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দিল্লি-আম্বালা-কালকা রেলওয়ে কোম্পানিই এই রেলপথ নির্মাণের দায়িত্ব পায়। ৯৫.৬৬ কিলোমিটার (৫৯.৪৪ মা) দীর্ঘ 2 ft 6 in (৭৬২ mm) ন্যারো গেজ লাইনটি ট্রেন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয় ১৯০৩ সালের ৯ নভেম্বর।[৭]

এই লাইনে ১০৩টি টানেল ও ৮৬৪টি সেতু (বহু-খিলানবিশিষ্ট গ্যালারি ধাঁচের সেতু, রোমান অ্যাকুইডাক্ট ধরনের) সেতু আছে। একটি সেতু ১৮.২৯ মিটার (৬০.০ ফু) দীর্ঘ এবং প্লেট গার্ডার স্প্যান ও স্টিল ট্রুস নির্মিত। ভূমির ঢাল ১: ৩৩ বা ৩%। ৩১৯টি বাঁক আছে। সবচেয়ে সংকীর্ণ বাঁকটি ৪৮ ডিগ্রি। এটি যে ইঞ্জিনিয়ার পর্বতের দুই প্রান্তকে জুড়তে চেয়ে সুড়ঙ্গ নির্মাণে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করেন তাঁর নামাঙ্কিত (তাঁকে সেই টানেলের কাছেই সমাহিত করা হয়েছিল)। তাঁর ভারতীয় সঙ্গী ভালকু এইচ. এস. হ্যারিংটনকে পরিত্যক্ত সুড়ঙ্গটি থেকে ১ কিলোমিটার (০.৬২ মা) দূরে আরেকটি সুড়ঙ্গ খুঁড়তে সাহায্য করেছিলেন। ভারতের তদনীন্তন ভাইসরয় তাঁকে একটি পদক ও একটি পাগড়ি দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন।[৭]

কালকা থেকে শিমলা পর্যন্ত যাত্রাপথে পড়ে ৩.২ কিলোমিটার (২.০ মা) দীর্ঘ কোটি সুড়ঙ্গ, ধরমপুর মেন স্টেশন (কালকা থেকে ৩২ কিলোমিটার (২০ মা) দূরে), সমতল জমিতে টাকসাল, গুমমান ও ধরমপুরের তিনটি লুপ, জাটোঘের দিকে তারাদেবী প্রসপেক্ট হিল, শিমলায় ওল্ড দোভেলদেল চেম্বার্সের টার্মিনাস (ইনভেরার্মের দিকে)। এই পথের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলি হল (কালকা থেকে দূরত্ব অনুসারে): দাগশাই (কালকা থেকে ৩৮.৪ কিলোমিটার (২৩.৯ মা) দূরে এবং ১,৬০০ মিটার (৫,২০০ ফু) উচ্চতায়) ও সোলান। গ্রীষ্মকালে এই অঞ্চলে প্রচুর পর্যটক আসেন। তাঁদের সুবিধার্থে বিভিন্ন যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী (বিশেষত আলু বহনকারী) ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গে শিবালিক এক্সপ্রেস ও শিবালিক প্যালেস সেলুন নামে দুটি বিলাসবহুল ট্রেনও চালানো হয়। এছাড়া সেনাবাহিনীর প্রয়োজনেও বিভিন্ন ট্রেন চলে।[৪]

২০০৮ সালে নীলগিরি পার্বত্য রেল ও দার্জিলিং হিমালয়ান রেলের সঙ্গে এই লাইনটিও ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান ঘোষিত হয়।[৩]

মাথেরান পার্বত্য রেল[সম্পাদনা]

বাঁদিকে:মাথেরান রেল নং ৭৪০, পিটারবরোর রেলওয়ার্ল্ডে (যুক্তরাজ্য) সংরক্ষিত। ডানদিকে:মাথেরান রেলের টয় ট্রেন।

মহারাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী রেলপথ মাথেরান পার্বত্য রেলপথ তৈরি হয়েছিল ১৯০১ থেকে ১৯০৭ সালের মধ্যে। তৈরি করেছিলেন হুসেন আসমজি পিরভোয় এবং অর্থসাহায্য করেছিলেন তাঁর বাবা স্যার আদমজি পিরভোয় (আদমজি গোষ্ঠীর)। এই রেলপথটি ৬১০ মিলিমিটার (২ ফুট) গেজ লাইন। পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় কারজাট ও মুম্বইয়ের কাছে নেরালমাথেরানের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করেছে এই ২০ কিলোমিটার (১২ মা) দীর্ঘ রেলপথটি। ১৯০০ সালে এই রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল। ১৯০৪ সালে নির্মাণকার্য শুরু হয় এবং ১৯০৭ সালে এই রেলপথ যাত্রী চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। প্রথমে যে ট্র্যাকটি স্থাপিত হয় সেটি ছিল ৩০ এলবি/ইয়ার্ড রেল। কিন্তু এখন অপেক্ষাকৃত বেশি ভারী ৪২ এলবি/ইয়ার্ড রেল ব্যবহার করা হয়। ভূমির ঢালের পরিমাণ ১: ২০ (৫%)। অনেক বাঁক থাকায় রেলের গতিবেগ ২০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা (১২ মা/ঘ)তে সীমাবদ্ধ।১৯৮০-এর দশক থেকে ধসের ভয়ে লাইনটি বর্ষাকালে বন্ধ রাখা হয়। তাছাড়া সারা বছরই এই পথে রেল চলে। মধ্য রেল এই রেলপথটি পরিচালনা করে।[৪][১৮]

এই লাইনের বৈশিষ্ট্য হল অশ্বখুরাকৃতি তীর। ক্ষয় রোধ করার জন্য তৈরি এই তীরগুলিকে দেখা যায় ট্রেন যখন বাঁক নেয় তখন। এই পথের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলি হল, প্রথম নেরাল স্টেশন, হেরদাল হিল সেকশন, ভেকরা খুদ খাদ, “ওয়ান কিস টানেল” নামে পরিচিত (একটি চুম্বন করতে যে সময় লাগে সেই সময়ের মধ্যেই এই সুড়ঙ্গ পার হওয়া যায় বলে এমন নাম) এই পথের একমাত্র সুড়ঙ্গ, “ওয়াটার পাইপ” স্টেশন (এখন ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয় বলে এই স্টেশনটি পরিত্যক্ত হয়েছে), দুটি সংকীর্ণ জিগজ্যাগ সহ মাউন্টেন বেরি, প্যানোরামা পয়েন্ট ও সর্বশেষ স্টেশন মাথেরান বাজার। মুম্বই ও পুণের মধ্যে ব্রডগেজ লাইনটি এই রেলপথের কাছেই অবস্থিত। এই দুই শহরকে যুক্তকারী রাস্তাটিও দুই বার এই লাইন পার হয়েছে।[৪]

কাংড়া উপত্যকা রেল[সম্পাদনা]

কাংড়া উপত্যকা রেলপথে টয় ট্রেন

কাংড়া উপত্যকা রেলপথ উপ-হিমালয় অঞ্চলে অবস্থিত। পাঠানকোট থেকে যোগিন্দরনগর পর্যন্ত প্রসারিত ১৬৩ কিলোমিটার (১০১ মা) দীর্ঘ এই রেলপথটি যে উপত্যকার উপর দিয়ে গিয়েছে সেটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও কিছু প্রাচীন হিন্দু তীর্থস্থানের অবস্থিতির জন্য খ্যাত। অধুনা উত্তর রেলের নিয়ন্ত্রণাধীন 2 ft 6 in (৭৬২ mm) গেজের এই লাইন তৈরির পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল ১৯২৬ সালে। ১৯২৯ সালে এই রেলপথ চালু হয়। এই রেলপথ সাধারণত ‘কাংড়া টয় ট্রেন’ নামে পরিচিত। এই লাইনের সর্বোচ্চ বিন্দুটি আহজু স্টেশনে অবস্থিত। এর উচ্চতা ১,২৯১ মিটার (৪,২৩৬ ফু)। যোগিন্দরনগর টার্মিনাসের উচ্চতা ১,১৮৯ মিটার (৩,৯০১ ফু)।[১৯] এই লাইনে ৯৭১টি অদ্ভুত নকশার সেতু ও দুটি সুড়ঙ্গ আছে। এর মধ্যে দুটি উল্লেখযোগ্য সেতু হল রেওন্দ নালার উপর একটি স্টিল আর্চ সেতু ও বনগঙ্গা নদীর উপর একটি গার্ডার সেতু। এই রেলপথে জমির ঢাল বেশি না হলেও সবচেয়ে খাড়াই অংশটি ১৪২ কিলোমিটার (৮৮ মা) দূরে অবস্থিত এখানে জমির প্রস্থ ২১০ মিটার (৬৯০ ফু) এবং ঢাল ১:১৯ (চড়াইয়ের ঢাল ১:৩১ ও ১:২৫)। এই রেলপথে যেতে যেতে ধৌলাধর পর্বতমালার (বিশেষত কাংড়ামঙ্গোয়াল) শৃঙ্গগুলি এবং কাংড়া দুর্গের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়।[২][৪][৫]

লামডিং–হাফলং–বদরপুর পার্বত্য বিভাগ (অসম)[সম্পাদনা]

উত্তরপূর্ব সীমান্ত রেল ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ মাহুর-হারানগাজাও পার্বত্য বিভাগটি সংরক্ষণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে লামডিং-শিলচর মিটার গেজ লাইনটিও ব্রডগেজে রূপান্তরিত করা হয়েছে।[২০] এই পথে ৩৭টি সুড়ঙ্গ ও ৫৮৬টি সেতু আছে।[২১] এই রেলপথে স্টেশনের সংখ্যা ২৪।[২২] হারানগাজাও-জাতিঙ্গা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ঢালযুক্ত জমি রয়েছে – ১:৩৭।

কাশ্মীর রেল[সম্পাদনা]

শ্রীনগর রেল স্টেশনে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন।

কাশ্মীর রেল হল ভারতের একটি নির্মীয়মান রেলপথ। এই রেলপথের মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যটি ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হতে চলেছে। এই রেল প্রকল্পের সরকারি নাম ‘জম্মু উধমপুর শ্রীনগর বারামুলা রেলওয়ে লিঙ্ক’। জম্মু থেকে শুরু করে ৩৪৫ কিলোমিটার দূরে বারামুলা শহর পর্যন্ত এই রেলপথ প্রসারিত হবে।

অন্যান্য পরিকল্পিত প্রকল্প[সম্পাদনা]

বিলাসপুর-মান্ডি-লেহ রেল নির্মানকার্য শেষের পর বিশ্বের উচ্চতম রেলপথ হবে।[২৩]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. http://whc.unesco.org/en/list/944.
  2. Abram, David (২০০৩)। Rough guide to India। Rough Guides। পৃ: ৪৭৯। আইএসবিএন 1-84353-089-9। সংগৃহীত ২০১০-০২-২০ 
  3. "Mountain Railways of India"। World Heritage:UNESCO। সংগৃহীত ২০১০-০২-১৯ 
  4. Kohli, M.S.; Ashwani Lohani (২০০৪)। "Mountains of India: Tourism, Adventure, Pilgrimage"The Indian Mountain Railway (Indus Publishing)। পৃ: 97–106। আইএসবিএন 81-7387-135-3। সংগৃহীত ২০১০-০২-২০ 
  5. "Luxury Trains of India"। সংগৃহীত ২০১০-০২-২০ 
  6. "Steam in History"। The Indian Railways fan Club (IRFCA)। সংগৃহীত ২০১০-০৪-০৩ 
  7. "Mountain Railways of India – Chugging and romancing the hills"। সংগৃহীত ২০১০-০২-২০ 
  8. Srinivasan, Rupa; Manish Tiwari and Sandeep Silas (২০০৬)। Our Indian Railway: themes in India's Railway history। Foundation Books। পৃ: xxxiv–xxxv। আইএসবিএন 81-7596-330-1। সংগৃহীত ২০১০-০২-২১  |coauthors= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  9. Whittle, Paul; Terry Martin। "A Brief History of the DHR"History and A Trip Up the Line। Darjeeling Himalayan Railway Society। সংগৃহীত ২০০৭-০২-২৪ 
  10. "History of Darjeeling Himalayan Railway"। সংগৃহীত ২০১০-০৪-০৩ 
  11. "DHr History"। Darjeeling.net। সংগৃহীত ২০১০-০২-১৯ 
  12. "The Loop, Agony Point, Darjeeling [Hill Railway]"। British Library Online Gallery। সংগৃহীত ২০১০-০২-২১ 
  13. Kholi p.104
  14. Krishnan, Govind. V.M। NMR Nilgiri Mountain Railway:From Life Line to Oblivion। Paypall। 
  15. "Cultural Sites inscribed on UNESCO’s World heritage List"India-Mountains railways of India। World Heritage List;UNESCO। ২০০৫-০৬-১৫। 
  16. "HP declares Kalka–Shimla railway as 'heritage' property"। The Hindu। ২০১০-০২-২১। সংগৃহীত ২০১০-০২-১৯ 
  17. Singh, Jagmeet (২০০২-০৬-১৫)। "Man behind Barog tunnel lies forgotten"The Tribune, Chandigarh। সংগৃহীত ২০১০-০২-১৯ 
  18. Plaque with history of the Railway
  19. http://indiarailinfo.com/arrivals/ahju-ahju/6339
  20. Bijay Sankar Bora (Nov ২১, ২০১০)। "Track record"। The Tribune (Spectrum)। 
  21. http://www.youtube.com/watch?feature=endscreen&NR=1&v=xXFkV_N3Zvs
  22. Mohan Bhuyan (২০০৪-০১-১০)। "Badarpur–Lumding Trip Report"Indian Railways Fan Club 
  23. "When men defies his limits: Living in the altitude : Articles"। SummitPost। সংগৃহীত ২০১২-০৪-০২ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]