একটি খুনের স্বপ্ন
আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত প্রথম প্রকাশের প্রচ্ছদ | |
| লেখক | হুমায়ুন আজাদ |
|---|---|
| প্রচ্ছদ শিল্পী | সমর মজুমদার |
| প্রকাশনার স্থান | বাংলাদেশ |
| ভাষা | বাংলা |
| বিষয় | প্রতিদানহীন প্রেম |
| ধরন | উপন্যাস |
| পটভূমি | ১৯৬০-এর দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় |
| প্রকাশক | আগামী প্রকাশনী |
প্রকাশনার তারিখ | ফেব্রুয়ারি ২০০৪ (প্রথম প্রকাশ) |
| মিডিয়া ধরন | ছাপা (শক্তমলাট) |
| পৃষ্ঠাসংখ্যা | ১১২[১] |
| ওসিএলসি | ৫৫৬৮৪৫৫৫ |
| পূর্ববর্তী বই | পাক সার জমিন সাদ বাদ (২০০৪) |
একটি খুনের স্বপ্ন বাংলাদেশের লেখক হুমায়ুন আজাদ রচিত একটি উপন্যাস। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে[২] (ফাল্গুন, ১৪১০ বঙ্গাব্দ) একুশে বইমেলায় বাংলাদেশের আগামী প্রকাশনী, ঢাকা থেকে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এটি হুমায়ুন আজাদ রচিত সর্বশেষ উপন্যাস। ১৯৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক তরুণের জীবনে আসা এক নারী এবং সেই নারীর প্রতি তরুণটির একতরফা প্রেম কাহিনী নিয়ে রচিত উপন্যাস হুমায়ুন আজাদের একটি খুনের স্বপ্ন এবং তিনি এই উপন্যাস উৎসর্গ করেছিলেন "১৯৬৪-১৯৬৮" পর্যন্ত তার নিজেরই কাটানো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনের সময়কালকে।[৩]
কাহিনী
[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্রাবাসের এক ভগ্নহৃদয়ের ছাত্র এক গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা পলাশিতে যায়, এরপর ওখান থেকে সে হেঁটে হেঁটে তার পছন্দের নারী সুফিয়ার বাসা যে এলাকায় সেখানে যায় যেটা ওখান থেকে বেশি দূরে নয়, সুফিয়াদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় সে, তার মনে সুফিয়ার প্রতি কিছুটা রাগ আর প্রেমাবেগ থাকা সত্ত্বেও সে সুফিয়াদের বাড়িতে প্রবেশ করার চেষ্টা করেনা, ফিরে চলে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্রাবাসে যেখানে সে বসবাস করে। তরুণটির সুফিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের কাহিনী বিস্তারিত ভাবে ফিরে আসতে থাকে।
গ্রামে এক কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া এই তরুণটি যখন কিশোর বয়সী ছিলো তখন থেকে তার মনে নারীসঙ্গ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠিনী সুফিয়া তার জীবনে প্রথম নারী হিসেবে আসে যে তাকে সঙ্গ প্রদান করে এবং যার দিকে তরুণটি তাকাতো অনেক আগে থেকেই কিন্তু কথা বলার সাহস পেতোনা, সুফিয়া একদিন নিজেই তার সঙ্গে নিজ থেকে কথা বলে, প্রথম কথাতেই তারা দুজনে স্কুটার এবং রিকশা ভ্রমণে যায় এবং পরের দিন ক্লাস শুরু হওয়ার আগে তরুণটি সুফিয়াকে বলে যে, সে তার প্রেমে পড়েছে তবে সুফিয়া প্রেমে পড়েছে কি পড়েনি সেটা জানেনা বলে, এই দিনই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরিত্যক্ত কক্ষে সুফিয়া তরুণটিকে নিয়ে যায় যেখানে পরে শমশের এবং সাবিহা নামের প্রেমিকযুগল চলে আসে, এই প্রেমিকযুগলের অন্তরঙ্গতা অবলোকন করে সুফিয়া এবং সুফিয়ার প্রেমে পড়া তরুণটি।
এই ঘটনার পরে দুই দিন ধরে সুফিয়া ক্লাস করতে আসেনা, তরুণটি দুই দিনে সুফিয়াকে নিয়ে অনেক চিন্তা করে যে সে কেন আসলোনা। তৃতীয় দিনে সুফিয়ার সঙ্গে তরুণটির দেখা হয় এবং তরুণটি সুফিয়াকে না আসার কারণ জিজ্ঞেস করলে সুফিয়া বলে যে সে এমনিতেই আসেনি। পরের দিন ক্লাসে এলেও সুফিয়া তরুণের দিকে তাকায় না; আর তার পরের দিন সুফিয়া নিজ থেকেই তরুণটিকে তার কাছে ডাকে, এবং কথা বলতে বলতে সুফিয়া তাকে তাদের বাসার ঠিকানা দেয় এবং এইবারও সুফিয়া তরুণটির প্রেমে পড়েছে কিনা জিজ্ঞেস করা হলে সুফিয়া আবারো আগের মতো বলে যে সে জানেনা। বুধবার বিকেলে সুফিয়াদের বাসায় যাওয়ার পর আড্ডা দিয়ে তরুণটিকে সন্ধ্যায় ছাদে নিয়ে যায় সুফিয়া এবং সুফিয়া তারপর এক পর্যায়ে তরুণটিকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু পরে সুফিয়া নিজেই বলে যে তরুণটি বেকার, তরুণটির পক্ষে সুফিয়ার দেখভাল করা সম্ভব নয়, এরপরে দেখা করার জন্য সুফিয়া বাসায় আসতে নিষেধ করে এবং শুক্রবারে রিকশায় ঘুরবে বলে দেয়। শুক্রবার লাইব্রেরির গেটে যেখানে সুফিয়া অপেক্ষা করতে বলেছিলো সেখানে তরুণটি বিকেলে অপেক্ষা করেও সুফিয়াকে পায়না এবং পরে এর জন্য তার অনেক মনঃক্ষুণ্ণ হয়।
ঐ দিনই রাত দশটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন্নাহ হলের বন্ধু নিজামের কাছে যায় তরুণটি এবং নিজাম তরুণটিকে বিদেশি সাময়িকী দেখায়। পরে নিজের হলে এসে সারারাত তরুণটি ঘুমাতে পারেনা সুফিয়ার দুশ্চিন্তায়। এরপরের কয়েক মাস সুফিয়ার সঙ্গে তরুণটির দেখাসাক্ষাৎয়ের বিবরণ সে ব্যক্তিগত ডায়েরিতে লিখে রাখে 'মধু' এবং 'বিষ' উল্লেখ করে, ১২ই ডিসেম্বর শুরু করে এবং ২১শে ফেব্রুয়ারি শেষ করে; মাঝখান দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক গোলমালের কারণে তরুণটিকে তার হল ছাড়তে হয় এবং সে গ্রিনরোডে তার মামাতো ভাই তোফাজ্জলের বাসায় গিয়ে ওঠে, নিজের গ্রামের বাড়িও যায় এবং গ্রামে দশম শ্রেণি পড়ুয়া এক মেয়ের প্রেম প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তরুণটির মন গ্রামে টেকেনা, সে গ্রামে যাওয়ার আগেই সুফিয়ার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তাদের বাসায় গিয়েছিলো এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝামেলা শেষ হওয়ার আগেই সে আবার ঢাকায় এসে সুফিয়ার বাসায় যায়, আবার সুফিয়া তরুণটিকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় এবং তরুণটি সুফিয়াকে বলে যে, সে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে তারপর চাকরি পেয়ে তারপর সুফিয়াকে বিয়ে করবে।
এরপর অনেকদিন তরুণটি সুফিয়াদের বাড়ি যায়না, বিষাদগ্রস্ত থাকে তার মন, সুফিয়াও তাকে ডাকেনা, তোফাজ্জলের বাসায় টেলিভিশন আছে, রেকর্ডপ্লেয়ার আছে, তরুণটি টেলিভিশন দেখা বা রেকর্ডপ্লেয়ারে গান শোনা কোনো কাজই করতে পারেনা নিজের বিষাদগ্রস্ততার কারণে। মার্চের শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু হয়ে যায় এবং তরুণটি আবার তার নিজের হলে ফিরে যায়, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয় কিন্তু তার মন থেকে বিষাদ যায়না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝামেলার পর প্রথম ক্লাসে সুফিয়া আসেনা, বিকেলে লাইব্রেরি থেকে বের হয়ে ক্যান্টিনে যাওয়ার সময় তরুণটির সাথে তার পূর্বপরিচিত এক নারী রহিমা বেগমের সঙ্গে দেখা হয়, রহিমা তরুণটিকে রমনা রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেয় এবং রহিমা আর তরুণটি দুজনে একত্রে রিকশায় চড়ে রমনা রেস্টুরেন্টে যায়, সেখানে তারা নান আর বটি কাবাব খায়। রহিমার সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করে হলে ফিরে তরুণটি সুফিয়াকে অনুভব করে। পরের দিন সকালের ক্লাসে তরুণটি না গিয়ে পরের ক্লাসে যায় দেরি করে এবং সুফিয়াকে দেখে বন্ধুবান্ধবীদের সঙ্গে, তরুণটির সঙ্গে সুফিয়াই আগে থেকে কথা বলে। তরুণটি একটি রেস্টুরেন্টে সুফিয়াকে নিতে চাইলে সুফিয়া বিকেলে তাদের বাসায় আসতে বলে। বাসায় আবার সুফিয়া তরুণটিকে ওইদিনই তাকে বিয়ে করতে চাওয়ার কথা বলে। এরপর বেশ কয়েকদিন সুফিয়ার সঙ্গে তরুণটির দেখা হয়না।
একদিন সুফিয়া বেড়াতে চাইলে গ্রিনরোডের তোফাজ্জলের বাসায় তরুণটি সুফিয়াকে নিয়ে যায়। দুই দিন পর তোফাজ্জলের দেওয়া শাড়ি সুফিয়া তরুণটিকে দেখায়, যেটা দেখে তরুণটি মনে মনে রাগ করে। ঐদিন তরুণটি বিভিন্ন চিন্তা করতে করতে রাতে ঘুমাতে পারেনা এবং সকালে ক্লাসে যায়না। পরের দিন আবার তরুণটি সুফিয়াদের বাসায় যায় এবং নিজেই সুফিয়াকে বিয়ে করবে বলে আর সুফিয়া এখন সম্ভব নয় বলে। পরের দিন আবার তরুণটি সুফিয়ার বাসায় যায় এবং সুফিয়ার মা বলে যে সুফিয়া বাইরে গেছে এক বান্ধবীর কাছে, সুফিয়া ফিরে আসলে তাকে তোফাজ্জলের দেওয়া শাড়ি পরিহিত অবস্থায় দেখতে পায় তরুণটি। কালকে বেড়াতে যাবে দুজন এরকম ঠিক হয়, কিন্তু সুফিয়ার জন্য অপেক্ষা করেও তরুণটি সুফিয়াকে পায়না, তরুণটি রিকশায় করে গ্রিনরোডে তোফাজ্জলের বাসার দিকে যায়, ঐ বাসার সামনে আসলে তোফাজ্জলের কাজের ছেলেটিকে বাসার নিচে খেলতে দেখতে পায়, আর তরুণটিকে দেখে ঘরের চাবি দিয়ে দেয় এবং তরুণটি চাবি দ্বারা বাসার দরজার তালা খুলে দেখে যে, বিছানায় সুফিয়া এবং তোফাজ্জল একসাথে নগ্ন হয়ে ঘুমিয়ে আছে।
আমি নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকে প্রথমে অন্ধ হয়ে যাই, তারপর আমার চোখে আলো জ্বলে ওঠে, অন্ধকার থেকেও যা উজ্জ্বল, মহাবিশ্ব ভেঙে পড়ার পর দেখা যাবে যে-আলো, আমি তাদের কাছে এগিয়ে যাই : বিকট সিল মাছের মতো থলথলে কালো নগ্ন তোফাজ্জল ভাইয়ের আবর্জনাস্তূপের মতো দেহের উপর একটি পা রেখে নগ্ন সুফিয়া ঘুমিয়ে আছে, সিলটি পড়ে আছে লাশের মতো, সুফিয়ার মুখটি পূর্ণিমার চাঁদের মতো জ্বলছে, সরস্বতী ও অসুর জড়িয়ে আছে একে অন্যকে, দুজনেই গভীর ঘুমে নিমজ্জিত, হয়তো একাধিক সঙ্গমের পর তারা ক্লান্ত সুখনিদ্রায় লুপ্ত হয়ে আছে, জেগে উঠে আবার সঙ্গম করবে পশু ও সুন্দরী
তরুণটি তার সবচেয়ে প্রিয় নারী সুফিয়াকে অন্য পুরুষের সঙ্গে নগ্ন দেখে রাগের মাথায় সুফিয়ার মুখের দিকে তালা ছুঁড়ে মারে, এতে সুফিয়ার আর তোফাজ্জলের ঘুম ভেঙে যায়; তালা ছুড়ে মারার কারণে সুফিয়া তার মুখে আঘাত পায়, এ জন্য তরুণটি সুফিয়াকে হাসপাতালে নিতে চায় কারণ তরুণটি তখনো সুফিয়াকে অবচেতন মনে ভালোবাসে যদিও সুফিয়া হাসপাতালে যেতে রাজি হয়না। তরুণটি এরপর ঐ বাসা থেকে ভগ্ন হৃদয়ে বের হয়ে যায়। তরুণটির প্রিয় নারী অন্য একজনের সঙ্গে নগ্ন হয়ে ঘুমায় - এটি তরুণটিকে মানসিক ভাবে ব্যথিত করে এবং তরুণটি একটি খুনের স্বপ্ন দেখে তবে তরুণটি কাকে খুন করতে হবে সেটা সে নিজেও জানেনা, শুধু খুন করার ইচ্ছে তার চিন্তা-চেতনায় আসে।
সারবস্তু
[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের এক ছাত্রের প্রেমকাহিনী উত্তম পুরুষে বর্ণিত হয়, যার নাম উপন্যাসটির কোথাও বলা হয় নি। উপন্যাসটির নায়িকার নাম হচ্ছে সুফিয়া (একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী যে ছাত্রটার সহপাঠী) যাকে নায়ক বলে যে, সে তার প্রেমে পড়েছে এবং বোঝায় যে সে তাকে ভালোবাসে, তবে সুফিয়া উপন্যাসটির নায়ককে কখনো কোথাও বলেনা যে, সেও তার প্রেমে পড়েছে কিন্তু নায়ক ধরে নেয় যে সুফিয়াও তার প্রেমে পড়েছে কারণ নায়ক সুফিয়ার সঙ্গে বেশ কয়েকবার চমৎকার সময় কাটাতে সক্ষম হয় এবং সুফিয়াই প্রথমে নায়ককে 'আপনি' থেকে 'তুমি' করে বলা শুরু করে।
সুফিয়া একসময় নায়ককে বিয়ে করতে চায় যদিও বিয়ে করা সম্ভব হয়ে ওঠেনা; পরবর্তীতে একসময় নায়কের এক মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে যে জীবনে সফল পুরুষ সুফিয়া শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে নায়ক মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ে। উপন্যাসটির কাহিনী মূলত প্রতিদানহীন প্রেম নিয়ে রচিত এবং খুন শব্দটা রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে, 'খুন' বলতে নায়কের প্রকৃতপক্ষে কাউকে খুন করতে চাওয়া বোঝানো হয়নি, 'খুন' শব্দটি দ্বারা নায়কের মানসিকভাবে ভেঙে পড়াকে বোঝানো হয়েছে।
পটভূমি
[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকের পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপট নিয়ে লেখা উপন্যাসটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল (উপন্যাসটিতে সংক্ষেপে 'এসএম হল' হিসেবে বর্ণিত) ছাত্রাবাসের পুবভবনের উত্তর দিকের দোতলার একটি কক্ষে বসবাসকারী এক তরুণের এক তরুণীর প্রতি ভালোবাসার কাহিনী নিয়ে, এই তরুণটিই হচ্ছে উপন্যাসটির নায়ক, লেখক হুমায়ুন আজাদ উপন্যাসটিতে তরুণটির নাম কখনোই উল্লেখ করেননি। তৎকালীন বাংলাদেশ তথা পূর্ব পাকিস্তানের সমাজ অনেক রক্ষণশীল ছিলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠিনীদের সঙ্গেও ছেলে শিক্ষার্থীদের 'আপনি' সম্বোধন করে কথা বলতে হতো, কারো সঙ্গে প্রেম হলে তখন 'তুমি' ব্যবহৃত হতো; উপন্যাসটির নায়কটিকে তার সহপাঠিনী সুফিয়ার সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে প্রথমে আপনি সর্বনাম ব্যবহার করে কথা বলতেই দেখা যায়, এবং নায়কের বন্ধু নিজামও সুফিয়াকে আপনি করেই বলে। উপন্যাসটির শুরুর দিকে এসএম হলের প্রহরীকে উপন্যাসটির নায়ককে 'স্যার' সম্বোধন করে কথা বলতে দেখা যায়, যা ১৯৬০-এর দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রীতি ছিলো। তাছাড়া তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদেরকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার নিচু শ্রেণীর মানুষরাও সম্মান দিয়ে কথা বলতো, 'স্যার' কিংবা 'সাহেব' বলে সম্বোধন করতো যেটা উপন্যাসটির শুরুতে বর্ণিত হয়েছে এবং উপন্যাসটির শেষের দিকে রহিমা নামের এক নারী যে উপন্যাসটির নায়কের পূর্বপরিচিত সেও নায়ককে 'আপনি' করে বলে।
উপন্যাসটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্রাবাস ঢাকা হল (এখন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল) এবং জিন্নাহ হলের (বর্তমানে মাস্টারদা সূর্যসেন হল) কথা বর্ণিত আছে, রয়েছে তৎকালীন আইয়ুব খান সরকারপন্থী ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠন এনএসএফ (ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন) সহ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (ইস্ট পাকিস্তান স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বা সংক্ষেপে এপসু) এর কথা। এছাড়াও উপন্যাসটিতে তৎকালীন ঢাকার একধরণের যানবাহন স্কুটার (একধরণের অটোরিকশা), ১৯৬০-এর দশকের উর্দু চলচ্চিত্র অভিনেত্রী নীলুর কথা, ঢাকার তৎকালীন 'গুলিস্তান', 'নাজ' চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহ, ঢাকার প্রথম চাইনিজ রেস্তোরাঁ চৌ চিন চৌ, 'চিটাগাং রেস্টুরেন্ট' (তৎকালীন ঢাকা কলেজের উল্টো দিকে অবস্থিত), তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নভেরার ভাস্কর্য, লাইফ সাময়িকী সহ ব্রিটিশ কাউন্সিল ঢাকার কথা উল্লেখ আছে।
চরিত্র
[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]- সুফিয়া - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, উপন্যাসের প্রধান নারী চরিত্র; একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্র যে সুফিয়ার সহপাঠী এবং সুফিয়ার প্রতি অতি তীব্র প্রেমাবেগ বোধ করে যে উপন্যাসের প্রধান পুরুষ চরিত্র এবং উপন্যাসের কাহিনী বর্ণনাকারী (উপন্যাসের প্রধান পুরুষ চরিত্রের নাম লেখক উপন্যাসের কোথাও উল্লেখ করেননি)
- তোফাজ্জল - উপন্যাসের নায়কের মামাতো ভাই, নায়কের চেয়ে দশ বছরের বড়ো, চাকরিজীবী, বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে, নায়কই সুফিয়ার সঙ্গে তোফাজ্জলের পরিচয় করিয়ে দেয়, তোফাজ্জল নামের এই পুরুষের সঙ্গে সুফিয়া নগ্ন হয়ে ঘুমিয়ে থাকে যেটা দেখে নায়কের মন একেবারে ভেঙে যায়
- সাবিহা সরদার - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী যে সুফিয়া এবং নায়কের পরিচিত
- শমশের আলি - সাবিহার প্রেমিক, এনএসএফের (ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন) সদস্য
- আহমদউল্লাহ মিয়া - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক যে উপন্যাসের নায়ক এবং সুফিয়াদের ক্লাস নেয়, নায়ককে প্রেম না করতে উপদেশ দেয় এই শিক্ষক
- রহিমা বেগম - এক নারী যে উপন্যাসের নায়কের পূর্বপরিচিত, এই নারীর সঙ্গে একবার 'রমনা রেস্টুরেন্ট'-এ খাওয়া দাওয়া করে নায়ক
- নিজাম - নায়কের বন্ধু, এনএসএফের সদস্য যে জিন্নাহ হলে থাকে
- রফিক - বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এবং মেয়েদের নগ্ন চিত্র অঙ্কনকারী নায়কের সহপাঠী
- রহমান - সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের পুবভবনের প্রধান কৌতুকশিল্পী যে নবম শ্রেণী পড়ুয়া এক মেয়েকে বিয়ে করে, নায়কের বন্ধু
- রাজিয়া - নায়ক নিজের গ্রামের বাড়ি গেলে দশম শ্রেণীর যে মেয়েটি তার কাছে পড়তে আসে এবং তার সঙ্গে প্রেম করার উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখে বইয়ের ভেতরে রেখে নায়ককে দেয়, নায়ক তাকে পাত্তা দেয়না
আরও দেখুন
[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]- ↑ "একটি খুনের স্বপ্ন"। Boierduniya (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ৩ আগস্ট ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩ আগস্ট ২০২১।
- ↑ মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম (২০১২)। "আজাদ, হুমায়ুন"। ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর (সম্পাদকগণ)। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। আইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১। ওসিএলসি 883871743। ওএল 30677644M।
- ↑ আজাদ, হুমায়ুন (ফেব্রুয়ারি ২০০৪)। একটি খুনের স্বপ্ন। আগামী প্রকাশনী। পৃ. ৫।