আমানুল হক

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Jump to navigation Jump to search
আমানুল হক
জন্ম আমানুল হক
১৯২৫ সালে
শাহজাদপুর গ্রাম, সিরাজগঞ্জ
মৃত্যু ৩ এপ্রিল, ২০১৩
ঢাকা
পেশা চিত্রগ্রাহক
যে জন্য পরিচিত ভাষা সৈনিক

আমানুল হক একজন বাংলাদেশী চিত্রগ্রাহক যিনি ভাষা আন্দোলনের শহীদদের একমাত্র ছবি তুলেছিলেন।তিনি একজন ভাষা সৈনিক।

প্রাথমিক জীবন[সম্পাদনা]

আমানুল হক সিরাজগঞ্জের ছোট্ট গ্রাম শাহজাদপুরে ১৯২৫ সালে তার জন্ম গ্রহণ করেন।তাঁর বাবার অণুপ্রেরণায় ছোটবেলা থেকেই তিনি আঁকাআঁকি করতেন। বড় হয়ে কিছুদিন আর্ট কলেজে লেখাপড়াও করেছেন তিনি। পরে তিনি চাকরি পান ঢাকা মেডিকেল কলেজে আর্টিস্ট কাম ফটোগ্রাফার পদে। মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তিনি এঁকে দিতেন মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের জন্য। একটা ভাঙ্গা বক্স ক্যামেরা নিয়ে চারিদিকে ঘুরে বেড়াতেন এবং ছবি তুলতেন। তিনি ১৯৫২ সালে জড়িয়ে পড়েন ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে।[১]

ভাষা আন্দোলন[সম্পাদনা]

আমানুল হক সর্বক্ষণই তাঁর নিজের কাঁধে ক্যামেরা ঝুলিয়ে রাখতেন। চোখে কিছু আটকে গেলেই তিনি তার ছবি তুলে রাখতেন যা ছিল তাঁর নেশা। একুশে ফেব্রুয়ারিতে খারাপ ঘটনা ঘটতে পারে, এটা তিনি আগে থেকেই অনুমান করতে পেরেছিলেন। তাই ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি তাঁর ক্যামেরা পকেটে লুকিয়ে রেখেছিলেন। ঐদিন গাজীউল হক, আব্দুল মতিন, অলি আহমেদ, গোলাম মওলাসহ আরও কয়েকজনের নেতৃত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছোট ছোট মিছিল বের হয়েছিল । পুলিশ মিছিল বাইরে আসার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনকারীদের লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং মিছিলে গুলি চালায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে অনেক মানুষ। আমানুল হক তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং দেখেন কয়েকজন ধরাধরি করে রক্তমাখা একজনকে হাসপাতালে নিয়ে আসছে। সেটা ছিল গুলিবিদ্ধ বরকতকে । প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে ঐ রাতে হাসপাতালে ভর্তির পর তিনি মারা যান। ঐ দিন বরকতসহ রফিকউদ্দিন আহমদ, জব্বার, আব্দুস সালাম এবং নাম না জানা এক কিশোর শহীদ হন। ২২শে ফেব্রুয়ারি পুরনো হাইকোর্ট ভবন এবং কার্জন হলের মাঝামাঝি একটি জায়গায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন শফিউর রহমান এবং রিকশাচালক আউয়ালসহ আরও কয়েকজন। পুলিশ ২১ এবং ২২ তারিখের বেশিরভাগ লাশই গুম করতে সক্ষম হয়েছিল।[১]

ঐতিহাসিক ছবি[সম্পাদনা]

শহীদ রফিককে যখন নামানো হয়, তখন দেখি মাথার ঘিলু গড়িয়ে পড়ছিল। আলোকচিত্রশিল্পী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রফিকুল ইসলাম আমানুল হককে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করতে থাকেন। রফিকুল আলমের ক্যামেরায় ফিল্ম ছিল না। রফিকুল আলম বলেনঃ “আমানুল হক সাহেবের কাছে একটা-দুটো ফিল্ম ছিল, তিনি ছবি তুলেছেন।” [২] রফিকের লাশ ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলে সবাই ভেতরে গিয়ে লাশ খুঁজি পায়নি।তখন সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের সহকারী পরিচালক কাজী মোহম্মদ ইদ্রীস গোলমালের খবর শুনে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চলে আসেন খবর জানতে।তখন ৪র্থ বর্ষের ছাত্রী হালিমা খাতুন তাকে বলেন যে নিহত একজনের লাশ রক্ষিত আছে হাসপাতালের পেছনে এবং তিনি চাইলে সে লাশ দেখতে পারেন । [৩] কাজী মোহম্মদ ইদ্রীস আমানুল হককে গোপনে নিয়ে আসেন ছবি তোলার জন্য। সাংবাদিক কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস রফিকুল আলম ও আমানুল হককে নিয়ে গেলেন জরুরি বিভাগের পাশে একটা পাশে একটা আলাদা ঘরে যেখান থেকে লাশ গুম করে ফেলা হবে। ইদ্রিস সাহেব তাদের গোপনে ছবি তুলতে দিলেন। এটা ছিল একটা গোপন ব্যাপার।তাই সংকেত পাওয়ার পরপরই আমানুল সন্তর্পনে এগিয়ে যান হালিমার কাছে রক্তস্নাত লাশের ছবি তোলার জন্য যা ছিল শহীদ রফিকউদ্দিনের লাশ। রফিকুল ইসলাম তখন আমানুল হককে বলেন ছবি তুলতে। কারণ তাঁর কাছে ফ্লিম ছিল না। সেই ছবিটাই কিন্তু শহীদদের একমাত্র ছবি।[২] আমানুল হক বলেন, “ঢাকা মেডিকেলে সেদিন রফিকের ছবি তুলতে গিয়ে আঁতকে উঠেছিলাম। অন্ধকার একটি ঘরে রাখা ছিল রফিকের লাশ। আমি কয়েকজনের সহায়তায় সেদিন তার ক্ষতবিক্ষত লাশের ছবিটি তুলতে পেরেছিলাম।“[১] ছবিটির তিনটি কপি করা হয় যার একটি দেয়া হয় এ.এস.এম মোহসিনকে, মাজেদ খানকে (ইসলামের ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) এবং শেষ কপিটি দেয়া হয় দৈনিক আজাদে প্রকাশের জন্য যা মওলানা আকরাম খাঁর নির্দেশে আর ছাপানো যায় নি। ছাত্ররা ছবিটি ব্যবহার করে লিফলেট ছাপায় যা দুর্ভাগ্যবশতঃ পুলিশ বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ করে। অনেক পরে সাপ্তাহিক বিচিত্রার প্রচ্ছদে ছবিটি পুনঃপ্রকাশিত হয়।[৩]

বিখ্যাত ব্যক্তিদের সাথে[সম্পাদনা]

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের ছবি তুলে আমানুল হক পরিচিত হয়ে গিয়েছিলেন দ্রুত। ১৯৫৭ সালে টাঙ্গাইলের কাগমারীতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মহাসম্মেলনের তাঁর আলোকচিত্রের একটা প্রদর্শনী হয়েছিল। সেখানে এসেছিলেন ভারত থেকে সাংবাদিক হিসেবে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় আর লেখক তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় আমানুল হকের তোলা শহীদ রফিকের ছবিটি পোস্টার করে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রচার হয়েছিল। তাই তাঁর বিরুদ্ধে প্রায়ই পুলিশের হয়রানি হত। তিনি সেজন্য কলকাতায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সিনেমার কাজ শেখার জন্য। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁকে নিয়ে যান সত্যজিত রায়ের কাছে ৩ নম্বর লেক টেম্পল রোডের বাড়িতে ১৯৫৯ সালে। তিনি সেদিন একটা ছবি তুলেছিলেন।তারপর প্রায়ই ঐ বাড়িতে যেতেন নানাকাজে। সত্যজিত রায়ের স্ত্রী বিজয়া রায় তাকে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিতেন। তিনি তাঁর লেখা আমাদের কথা বইতে আমানুল হক সম্পর্কে লিখেছেন।আমানুল হক তখন সত্যজিত রায়ের মা সুপ্রভা রায়ের সঙ্গে সত্যজিত্, বিজয়া রায় আর তাঁদের ছেলে সন্দ্বীপের যৌথ ছবি তুলে দেন।একদিন তিনি সত্যজিত রায়ের ঘরে ঢুকে দেখেন টেবিলে বাংলাদেশের দুটি পত্রিকা সাপ্তাহিক চিত্রালী ও সংবাদ যা এই দুটি সত্যজিত্ রায় নিয়মিত রাখতেন। সেখানে অভিনেত্রী ববিতার একটি ছবি দেখে সত্যজিত রায় ববিতা সম্পর্কে আমানুল হকের কাছে জানতে চান যা ছিল আসলে আমানুল হকেরই তোলা। সত্যজিত পরে ববিতাকে অশনি সংকেত ছবির নায়িকা হিসেবে নির্বাচন করেন। আমানুল হকের জীবনের বিশাল এক সময় সত্যজিত রায়ের সঙ্গে কাটিয়েছেন। তিনি নতুন ছবির শুটিং হলেই আমানুল হককে চিঠি লিখতেন, আর তিনি কলকাতায় গিয়ে শুটিংয়ের ছবি তুলতেন।[৪]

বর্তমান অবস্থা[সম্পাদনা]

তিনি আজিজ সুপার মার্কেটের ৫ম তলাতে থাকেন অবিবাহিত অবস্থাতে। আমার দেশ চিত্র মালা নামে ছবির একটা সংকলন করার জন্য আমানুল হক ৫০ বছর ধরে ছবি তুলছেন। এখন তিনি সেই ছবিগুলো নিয়ে বই করার চেষ্টা করছেন যা আমেরিকা থেকে হওয়ার কথা। তাঁর শরীর এখন ভালো যাচ্ছে না। প্রচুর ওষুধ খাচ্ছেন এবং অর্থসংকটেও পড়েছেন। তাই বইটা নিয়ে তেমন কাজ করতে পারছেন না।[৪]

সন্মাননা[সম্পাদনা]

আমানুল হক ২০১১ সালে একুশে পদক লাভ করেন বাংলাদেশ সরকার থেকে।[৫]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "রফিকের ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখে আঁতকে উঠেছিলাম"দৈনিক যুগান্তর। ৯ই ফেব্রুয়ারি,২০১১। সংগ্রহের তারিখ ২০শে ফেব্রুয়ারি,২০১১  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ=, |সংগ্রহের-তারিখ= (সাহায্য)
  2. চৌধুরী, চন্দন (২৩-০২-২০১০)। "ঐতিহাসিক ছবি"দৈনিক কালের কন্ঠ। সংগ্রহের তারিখ ২০শে ফেব্রুয়ারি,২০১১  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ=, |সংগ্রহের-তারিখ= (সাহায্য)
  3. "একুশের সাড়া জাগানো সেই ছবিটির গল্প"সচলায়তন। ০২ ফেব্রুয়ারি ২০০৮। সংগ্রহের তারিখ ২০শে ফেব্রুয়ারি,২০১১  Authors list-এ |প্রথমাংশ1= এর |শেষাংশ1= নেই (সাহায্য); এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ=, |সংগ্রহের-তারিখ= (সাহায্য)
  4. হেলাল, মাসুক (০৪-০৪-২০১০)। "মুখচ্ছবিঃ ছবির শিল্পী আমানুল হক"দৈনিক প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ২০শে ফেব্রুয়ারি,২০১১  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ=, |সংগ্রহের-তারিখ= (সাহায্য)
  5. ডেস্ক, প্রথম আলো (২০-০২-২০১১)। "প্রধানমন্ত্রী আজ একুশে পদক প্রদান করবেন"দৈনিক প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ২০শে ফেব্রুয়ারি,২০১১  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ=, |সংগ্রহের-তারিখ= (সাহায্য)