স্থিতিবিদ্যা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
চিরায়ত বলবিদ্যা

নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র
চিরায়ত বলবিদ্যার ইতিহাস

স্থিতিবিদ্যা হল বলবিদ্যার একটি শাখা। এটি ভারের (বল এবং টর্ক বা "ভ্রামক") বিশ্লেষণের সাথে সম্পর্কিত। এটি এমন একটি ভৌত তন্ত্রের উপর কাজ করে যেখানে ত্বরণ হয় না (a=০), বরং তন্ত্রটি তার পরিবেশের সাথে স্থির ভারসাম্যে থাকে। কোন একটি তন্ত্রে নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র প্রয়োগ করে পাওয়া যায়:

এখানে গাঢ় ফন্ট একটি সদিক বা ভেক্টর রাশিকে বোঝায়, যার মান এবং দিক আছে। হল মোট বল যা কোন তন্ত্রের ওপর কাজ করছে, হল সেই তন্ত্রের ভর এবং হল সমগ্র তন্ত্রের ত্বরণ। বলগুলির সদিক রাশি যোগ (ভেক্টর যোগ) করলে সেটি ত্বরণের মান এবং দিক প্রকাশ করে এবং ভরের ব্যস্তানুপাতিক হয়। স্থিতিশীল ভারসাম্য অনুমান করলে = ০ থেকে পাওয়া যায়:

বলগুলির ভেক্টর যোগ করলে, যদি একটি বল অজানা থাকে, সেটি বার করে নেওয়া যায়। সুতরাং স্থিত ভারসাম্য অবস্থায়, সম্পূর্ণ তন্ত্রের ত্বরণ শূন্য এবং তখন হয় তন্ত্রটি স্থিতিতে আছে, অথবা এর ভরকেন্দ্র অপরিবর্তনীয় গতিতে চলছে। একইভাবে শূন্য ত্বরণ অনুমানের প্রয়োগ করে তন্ত্রের ওপর কাজ করা ভ্রামকগুলির যোগ করে পাই:

এখানে, হল তন্ত্রের ওপর কাজ করা ভ্রামকগুলির ভেক্টর যোগফল, হল ভরের জড়তার ভ্রামক এবং = ০ হল সমগ্র তন্ত্রের কৌণিক ত্বরণ। একে শূন্য ধরলে পাওয়া যায়:

ভ্রামকগুলির ভেক্টর যোগ করলে, যদি একটি ভ্রামক অজানা থাকে, সেটি বার করে নেওয়া যায়। এই দুটি সমীকরণ একত্রে, তন্ত্রের ওপর কাজ করা করে দুটি ভার (বল এবং ভ্রামক) সমাধানের জন্য প্রয়োগ করা যেতে পারে।

নিউটনের প্রথম গতিসূত্র থেকে, এটি সূচিত করে যে, তন্ত্রের প্রতিটি অংশে মোট বল এবং মোট টর্ক শূন্য। মোট বল শূন্যের সমান হওয়াটি হল ভারসাম্যের জন্য প্রথম শর্ত এবং মোট টর্ক শূন্য হওয়া হল ভারসাম্যের জন্য দ্বিতীয় শর্ত। দেখুন স্থিতিগতভাবে অনির্দিষ্ট

ইতিহাস[সম্পাদনা]

আর্কিমিডিস (আনু. ২৮৭ – আনু. ২১২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) স্থিতিবিদ্যায় অগ্রণী কাজ করেছেন।[১][২] পরবর্তীকালে থিবিটর কাজে স্থিতিবিদ্যার অনেক উন্নতি দেখতে পাওয়া যায়।[৩]

সদিক বা ভেক্টর রাশি[সম্পাদনা]

দণ্ডের স্থির ভারসাম্যের উদাহরণ। বলগুলির এবং ভ্রামকগুলির যোগফল শূন্য।

স্কেলার হল এমন একটি রাশি যার কেবলমাত্র একটি মান থাকে, যেমন ভর বা তাপমাত্রা। একটি ভেক্টরের মান এবং দিক আছে। একটি ভেক্টর সনাক্ত করার জন্য বেশ কয়েকটি চিহ্ন রয়েছে, যার মধ্যে পড়ে:

  • একটি গাঢ় অক্ষর V
  • একট নিম্নরেখাঙ্কিত অক্ষর V
  • অক্ষরের উপর একটি তীরযুক্ত

সামান্তরিক সূত্র বা ত্রিভুজ সূত্র ব্যবহার করে ভেক্টর যুক্ত করা হয়। সমকোণীয় ভূমিতে ভেক্টরের উপাংশ থাকে। i, j, এবং k এই একক ভেক্টরগুলি, প্রথা অনুযায়ী, যথাক্রমে x, y এবং z অক্ষ বরাবর থাকে।

বল[সম্পাদনা]

বল হল একটি বস্তুর ওপর অন্য বস্তুর ক্রিয়া। বল প্রয়োগ করার অর্থ হল ঠেলা অথবা টানা, এবং এটি কোনও বস্তুকে তার ক্রিয়ার দিকে চালিত করে। একটি বলের ক্রিয়াটি তার মানের দ্বারা, ক্রিয়ার দিকের দ্বারা এবং কোন বিন্দুতে এটি প্রয়োগ হয়েছে তার দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। সুতরাং, বল একটি ভেক্টর রাশি, কারণ এর প্রভাবটি দিকের পাশাপাশি ক্রিয়ার পরিমাণের উপরও নির্ভর করে।[৪]

বলকে সংস্পর্শ এবং বস্তু বল হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। একটি সংস্পর্শ বল সরাসরি দুটি বস্তুর মধ্যে সংস্পর্শের মাধ্যমে উৎপাদিত হয়; এর উদাহরণ হল একটি বস্তুতে অবলম্বনকারী পৃষ্ঠ দ্বারা প্রয়োগ করা বল। একটি বল ক্ষেত্রের মধ্যে বস্তুর অবস্থানের কারণে বস্তুটি যে বল অনুভব করে সেটি হল বস্তু বল, উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অভিকর্ষজ, বৈদ্যুতিক বা চৌম্বকীয় ক্ষেত্রে কোন বস্তু যে বল অনুভব করে, এবং এই ক্ষেত্রে অন্য কোন বস্তুর সাথে সংস্পর্শ ঘটেনা। পৃথিবীর অভিকর্ষীয় ক্ষেত্রে দেহের ওজন হল বস্তু বল।[৫]

বলের ভ্রামক[সম্পাদনা]

কোনও বস্তুকে তার প্রয়োগের অভিমুখে চালিত করার প্রবণতা ছাড়াও, একটি বল কোন বস্তুকে একটি অক্ষকে কেন্দ্র করে আবর্তিত করতে পারে। অক্ষটি যে কোনও রেখা হতে পারে যা বলের ক্রিয়া রেখার ছেদক নয় বা সমান্তরালও নয়। এই ঘূর্ণন প্রবণতাকে বলা হয় বলের ভ্রামক (M)। ভ্রামককে টর্কও বলা হয়।

একটি বিন্দুকে কেন্দ্র করে ভ্রামক[সম্পাদনা]

F বলের ভ্রামক বাহুর চিত্র।

O বিন্দুতে একটি বলের ভ্রামকের মান হল, O বিন্দু থেকে F বলের ক্রিয়া রেখার লম্ব দূরত্ব এবং বলের মানের গুণফল: M = F · d, যেখানে

F = প্রযুক্ত বল
d = অক্ষ থেকে বলের ক্রিয়া রেখার লম্ব দূরত্ব। এই লম্ব দূরত্বকে ভ্রামক বাহু বলা হয়।


ভ্রামকের অভিমুখ ডান হাতের নিয়ম দ্বারা নির্ণয় করা হয়, যেখানে বামাবর্ত বা ঘড়ির কাঁটার উল্টোদিক (সিসিডাব্লু) পৃষ্ঠাটির বাইরে যাচ্ছে, এবং দক্ষিণাবর্ত বা ক্লকওয়াইজ (সিডাব্লু) পৃষ্ঠায় দিকে ঢুকছে। ভ্রামকের অভিমুখ একটি প্রচলিত চিহ্ন ব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রকাশ করা যেতে পারে, যেমন একটি যোগ চিহ্ন (+) বামাবর্ত ভ্রামকের জন্য এবং একটি বিয়োগ চিহ্ন (−) দক্ষিণাবর্ত ভ্রামকের জন্য, অথবা এর উলটো। ভ্রামকগুলি ভেক্টর হিসাবে একসাথে যুক্ত করা যেতে পারে।

ভেক্টর বিন্যাসে, দৈর্ঘ ভেক্টর, rকে (O বিন্দু থেকে ক্রিয়া রেখা পর্যন্ত যে ভেক্টর) বল ভেক্টর, Fদিয়ে সদিক গুণন করলে ভ্রামক পাওয়া যায়:[৬]

ভ্যারিগননের উপপাদ্য[সম্পাদনা]

ভ্যারিগননের উপপাদ্যে বলা হয়েছে যে কোনও বিন্দুর সাপেক্ষে একটি বলের ভ্রামক, সেই একই বিন্দু সাপেক্ষে বলের উপাদানগুলির ভ্রামকের যোগফলের সমান।

সাম্য সমীকরণ[সম্পাদনা]

একটি বস্তুর স্থির ভারসাম্য স্থিতিবিদ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। একটি বস্তু তখনই ভারসাম্য অবস্থায় থাকে যখন বস্তুতে প্রযুক্ত সমস্ত বলের ভেক্টর যোগফল শূন্য হয়। একটি কার্তেসীয় স্থানাংক ব্যবস্থায় ভারসাম্য সমীকরণগুলি তিনটি অদিক সমীকরণ দ্বারা প্রকাশ করা যেতে পারে, যেখানে তিনটি দিকের বলের ভেক্টর যোগফলের মান শূন্যের সমান। এই ধারণার একটি প্রকৌশল প্রয়োগ করে ভারের অধীনে তিনটি তারের প্রসারণ নির্ধারণ করা হয়, উদাহরণস্বরূপ একটি বস্তুকে ওপরে তুলতে গেলে উত্তোলক যন্ত্রের প্রতিটি তারের ওপর প্রযুক্ত বল বা একটি উষ্ণ বায়ু বেলুনকে গাই তারের সাহায্যে মাটিতে ধরে রাখা।[৭]

জড়তার ভ্রামক[সম্পাদনা]

চিরায়ত বলবিদ্যায়, জড়তার ভ্রামক, যাকে ভর ভ্রামক, ঘূর্ণন জড়তা, ভরের মেরুজ জড়তার ভ্রামক, বা কৌণিক ভরও (এসআই একক কেজি·বর্গ মি) বলা হয়, সেটি হল কোনও বস্তুর ঘূর্ণনের পরিবর্তনের প্রতিরোধের একটি পরিমাপ। এটি একটি ঘূর্ণায়মান বস্তুর ঘূর্ণনের প্রতি জড়তা। রৈখিক গতিবিজ্ঞানে ভর যে ভূমিকা পালন করে, জড়তার ভ্রামকটি ঘূর্ণন গতিবিজ্ঞানে সেই একই ভূমিকা পালন করে, কৌণিক ভরবেগ এবং কৌণিক বেগের মধ্যে, টর্ক এবং কৌণিক ত্বরণের মধ্যে, এবং অন্যান্য বিভিন্ন রাশির মধ্যে সম্পর্কের বর্ণনা দেয়। এর প্রতীক হল I। সাধারণত জড়তার ভ্রামক বা মেরুজ জড়তার ভ্রামক উল্লেখ করতে J ব্যবহৃত হয়।


যদিও জড়তার ভ্রামকের একটি সাধারণ সদিক ব্যবহারই অনেক পরিস্থিতিতেই যথেষ্ট, আরও উন্নত টেন্সর ব্যবস্থা দিয়ে লাট্টুর ঘূর্ণন এবং জাইরোস্কোপীয় গতির মতো জটিল তন্ত্রগুলির বিশ্লেষণ করা যায়।

লেওনার্ড অয়লার তাঁর ১৭৬৫ সালের গ্রন্থ থিয়োরিয়া মোটাস কর্পোরাম সলিডোরাম সিউ রিজিডোরাময়ে এই ধারণাটি প্রবর্তন করেছিলেন; তিনি জড়তার ভ্রামক এবং অনেকগুলি সম্পর্কিত ধারণা, যেমন জড়তার মূল অক্ষ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।


আরো দেখুন[সম্পাদনা]

টীকা[সম্পাদনা]

  1. Lindberg, David C. (১৯৯২)। The Beginnings of Western Scienceবিনামূল্যে নিবন্ধন প্রয়োজন। Chicago: The University of Chicago Press। পৃষ্ঠা 108-110 
  2. Grant, Edward (২০০৭)। A History of Natural Philosophyসীমিত পরীক্ষা সাপেক্ষে বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার, সাধারণত সদস্যতা প্রয়োজন। New York: Cambridge University Press। পৃষ্ঠা 309-10। 
  3. Holme, Audun (২০১০)। Geometry : our cultural heritageসীমিত পরীক্ষা সাপেক্ষে বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার, সাধারণত সদস্যতা প্রয়োজন (2nd সংস্করণ)। Heidelberg: Springer। পৃষ্ঠা 188আইএসবিএন 3-642-14440-3 
  4. Meriam, James L., and L. Glenn Kraige. Engineering Mechanics (6th ed.) Hoboken, N.J.: John Wiley & Sons, 2007; p. 23.
  5. Engineering Mechanics, p. 24
  6. Hibbeler, R. C. (২০১০)। Engineering Mechanics: Statics, 12th Ed.বিনামূল্যে নিবন্ধন প্রয়োজন। New Jersey: Pearson Prentice Hall। আইএসবিএন 0-13-607790-0 
  7. Beer, Ferdinand (২০০৪)। Vector Statics For Engineers। McGraw Hill। আইএসবিএন 0-07-121830-0 

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • Beer, F.P. & Johnston Jr, E.R. (১৯৯২)। Statics and Mechanics of Materials। McGraw-Hill, Inc। 
  • Beer, F.P.; Johnston Jr, E.R.; Eisenberg (২০০৯)। Vector Mechanics for Engineers: Statics, 9th Ed.। McGraw Hill। আইএসবিএন 978-0-07-352923-3 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]