বিষয়বস্তুতে চলুন

মূল (উদ্ভিদবিদ্যা)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
একটি তুলা গাছের প্রাথমিক ও গৌণ মূলসমূহ

মূল বা শেকড় হচ্ছে একটি বৃক্ষ বা গাছের ভিত্তি। উদ্ভিদের বীজের ভ্রূণমূল অংশ থেকে এটি উৎপন্ন হয়। একে বলা হয় স্থানিক মূল। আবার অনেক সময় ভ্রূণমূল ছাড়াও উদ্ভিদের অন্য অংশ থেকে মূল তৈরি হতে পারে। তখন সেই মূলকে বলা হয় অস্থানিক মূল। যেমন পাথরকুচি গাছের পাতা থেকে মূল বেরিয়ে আসে। গাছের শেকড় মাটির তলায় অনেকখানি নেমে গিয়ে মাটির ওপর গাছকে সোজা করে রাখে। শেকড় কেবল মাত্র গাছটিকে মাটির উপর শক্ত করে শুধু দাড় করিয়েই রাখে না, সঠিক খাদ্য দ্রব্য খনিজ সরবরাহ করে তার পুর্ণ বিকাশের সুযোগ করে দেয়।[] তাই মূল বা শেকড় গাছের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মধ্যে থাকে প্রধান মূল। প্রধান মূল থেকে আবার ছোট ছোট অনেক শাখামূল ও প্রশাখা মূল বের হয়।[]

মূলের কাজ

[সম্পাদনা]
গাছের বিশাল বয়স্ক শিকড়, মাটির উপরে

মূলের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল গাছকে মাটিতে আঁকড়ে ধরে রাখা। শেকড় ছোট বা বড় যাই হোক না কেন মাটি থেকে গাছের জন্য খাদ্যরস সংগ্রহ করে।[] গাছের তৈরি খাবার শিকড় সঞ্চয় করে রাখে ভবিষ্যতের জন্য। শিকড়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ মাটি থেকে পানি ও খনিজ লবণ টেনে কাণ্ডের মধ্য দিয়ে পাতায় পৌঁছে দেয়া। কচি মূলের আগার একটু পিছনে জন্মায় মূলরোম। এই মূলরোমই মাটি থেকে জল ও খাদ্য উপাদান সংগ্রহ করে। শেকড় দিয়ে টানা রস কীভাবে লম্বা লম্বা গাছের ডগায় পৌঁছে যায় সেটি সত্যিই বিচিত্র। কোনো কোনো গাছের শিকড় এতটাই খাবার সংগ্রহ করে জমা রাখে যে শিকড়ের খুব চেনা চেহারাটা তখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। যেমন: মূলা, গাজর, শালগম, মিষ্টি আলু,শতমূলী গাছের মূল। এই সব গাছের মূল খাবার সংগ্রহ করে মোটা হয়।[]

মূলের প্রকারভেদ

[সম্পাদনা]

পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য বা অভিযোজন এর ফলে মূল বিভিন্ন রকমের হয়। বিভিন্ন ধরনের মূলের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো;

  • স্থানিক মূল/প্রধান মূল: ভ্রূণমূল থেকে উৎপন্ন মূলকে স্থানিক মূল বলে। স্থানিক মূলের যে অক্ষটি মাটির মধ্যে উল্লম্বভাবে অবস্থান করে এবং শাখা-প্রখাশা মূল সৃষ্টি করে তাকে প্রধান মূল বলে। যেমন- আম, বট, সরিষা ইত্যাদি গাছের মূল।
  • অস্থানিক মূল: ভ্রূণমূল ছাড়া উদ্ভিদের অন্য যে কোন অংশ থেকে উৎপন্ন মূলকে অস্থানিক মূল বলে। যেমন-পাথরকুচির পত্রাশ্রয়ী মূল, কেয়া গাছের ঠেশ মূল, বট গাছের স্তম্ভমূল ইত্যাদি।
  • গুচ্ছ মূল বা শিফা মূল: প্রধান মূল নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর ভ্রূণমূলের গোড়া থেকে যে সরু সুতোর মত মূল গুচ্ছাকারে জন্মায় তাদের গুচ্ছ মূল বা শিফা মূল বলে। যেমন -ধান, গম, ঘাস ইত্যাদি গাছের মূল।
  • মূলাকাকার মূল: মধ্যাঞ্চল স্ফীত এবং উভয় দিক সরু এমন পরিবর্তিত প্রধান মূলকে মূলাকাকার মূল বলে। যেমন - মূলো গাছের মূল।
  • শাঙ্কবাকার মূল: যে পরিবর্তিত প্রধান মূল উপরের দিক স্ফীত এবং নীচের দিক সরু হয়ে শাঙ্কবাকার ধারণ করে তাকে শাঙ্কবাকার মূল বলে। যেমন - গাজর


  • শালগমাকার মূল: যে পরিবর্তিত স্থানিক মূল বীজপত্রাবকাণ্ড সহ অধিকাংশ অঞ্চল স্ফীত হয়ে শালগমের আকৃতি ধারণ করে তাকে শালগমাকার মূল বলে। যেমন- শালগম।
  • শ্বাস মূল: লবণাম্বু উদ্ভিদের যে সব শাখামূল মাটির উপরে উঠে এসে বায়ু থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে তাকে শ্বাসমূল বলে। যেমন -সুন্দরী গরান গাছের মূল।
  • স্তম্ভ মূল: কাণ্ডের শাখা-প্রশাখা থেকে উৎপন্ন হয়ে মাটি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে যে সব অস্থানিক মূল স্তম্ভাকার ধারণ করে তাদের স্তন্তমূল বলে। যেমন - বট গাছের মূল।
  • ঠেশমূল: কাণ্ড থেকে উৎপন্ন হয়ে তির্যকভাবে মাটিতে প্রবেশ করে যে সব অস্থানিক মূল কাণ্ডের ঠেশ রূপে কাজ করে তাদের ঠেশ মূল বলে। যেমন -কেয়া,আখ গাছে ঠেশ মূল থাকে।
  • আরোহী মূল: দুর্বল কাণ্ডের পর্ব থেকে উৎপন্ন যে সব অস্থানিক মূল কোন অবলম্বনকে জড়িয়ে সংশ্লিষ্ট উদ্ভিদকে আরোহণে সাহায্য করে তাকে আরোহী মূল বলে। গজপিপুল, পান গাছে আরোহীমূল দেখা যায়।
  • দৃঢ় সংলগ্নী মূল: পরাশ্রয়ী উদ্ভিদের যে সব মূল দিয়ে আশ্রয়দাতাকে জড়িয়ে থাকে তাদের দৃঢ়সংলগ্নী মূল বলে। অর্কিড গাছে এই মূল দেখা যায়।
  • সংকোচী মূল: পরিবর্তিত ভু-নিম্নস্থ কাণ্ডের যে সব মূল মৃদ্গত কাণ্ডকে খাড়া ভাবে থাকতে সাহায্য করে তাদের সংকোচী মূল বলে। কলাবতী, মানকচু গাছে এই মূল দেখা যায়।
  • হ্যাপ্টেরা: যে বিশেষ ধরনের মূলের সাহায্যে পাহাড়ী গাছ পাথরের গায়ে আটকে থাকে তাদের হ্যাপ্টেরা বা হোল্ডফাস্ট বলে। পোডেস্টেমন উদ্ভিদে এই মূল থাকে।
  • কণ্টকমূল: গাছের গোড়ায় যে সব কণ্টকসদৃশ মূল গাছকে মাটিতে আবদ্ধ রাখে তাদের কন্টকমূল বলে। তাল, নারকেল গাছে এই মূল দেখা যায়।
  • অধিমূল: কাণ্ডের গোড়া থেকে উৎপন্ন হয়ে চ্যাপ্টা ও প্রসারিত যে সব মূল কাণ্ডকে মাটির উপর খাড়াভাবে থাকতে সাহায্য করে তাদের অধিমূল বলে। শিমুল,বয়ড়া ইত্যাদি গাছে এই মূল দেখা যায়।
  • চোষক মূল: পরজীবী উদ্ভিদেরা যে বিশেষ মূলের সাহায্যে পোষক উদ্ভিদদেহ থেকে পুষ্টিরস শোষণ করে তাদের চোষক মূল বলে। যেমন -স্বর্ণলতা, আলোকলতা গাছের মূল।
  • পরাশ্রয়ী মূল: পরাশ্রয়ী উদ্ভিদের ভেলামেনযুক্ত যে সব অস্থানিক মূল বায়ুতে ঝুলে থাকে এবং বাতাসের জলীয় বাষ্প শোষণ করে তাদের পরাশ্রয়ী মূল বলে। যথা-অর্কিড গাছের মূল।
  • আত্তীকরণ মূল: কাণ্ডের শাখা-প্রশাখা থেকে উৎপন্ন ক্লোরোফিল যুক্ত যে সব মূল খাদ্য সংশ্লেষে সহায়তা করে তাদের আত্তীকরণ মূল বলে। উদাহরণ -গুলঞ্চ, পানিফল গাছের মূল।
  • জলজ শ্বাসমূল বা ভাসমান মূল: ভাসমান জলজ উদ্ভিদের কাণ্ডের পর্ব থেকে উৎপন্ন স্পঞ্জের ন্যায় যে মূলগুলি গাছকে ভেসে থাকতে সাহায্য করে এবং শ্বাসকার্যে সাহায্য কবে তাদের জলজ শ্বাসমূল বা ভাসমান মূল বলে। উদাহরণ -কেশরা বা কেশরদাম গাছের মূল।

জনন মূল বা পত্রাশ্রয়ী মূল: পাতার কিনারা থেকে উৎপন্ন যে সব অস্থানিক মূল জননে সাহায্য করে তাদের জনন মূল বা পত্রাশ্রয়ী মূল বলে। উদাহরণ-পাথরকুচি গাছের পাতার মূল।

  • কন্দাল মূল: খাদ্য সঞ্চয়ের জনা রূপান্তরিত ব্রততীর কন্দ সদৃশ অস্থানিক মূলকে কন্দাল মূল বলে। রাঙা আলু বা মিষ্টি আলুতে কন্দালমূল দেখা যায়।
  • গুচ্ছিত ভাণ্ডার মূল: কাণ্ডের ভূনিম্নস্থ সর্ব নিম্ন পর্ব থেকে উৎপন্ন স্ফীত খাদ্য সঞ্চয়ী অস্থানিক মূলকে গুচ্ছিত ভাণ্ডার মূল বলে। শতমূলী, ডালিয়া উদ্ভিদে এই মূল থাকে।
  • অর্বুদযুক্ত মূল: মৃদ্‌গত কাণ্ড থেকে উৎপন্ন অস্থানিক মূলের অবস্থিত স্ফীত অর্বুদের ন্যায় মূলকে অর্বুদযুক্ত মূল বলে। আম-আদা গাছে এই মূল দেখা যায়।
  • মালাকৃতি মূল: খাদ্য সঞ্চয়ের ফলে যে সব অস্থানিক মূল পর্যায়ক্রমে স্ফীত ও সংকুচিত হয়ে মালার আকার ধারণ করে তাকে মালাকৃতি মূল বলে। যেমন -মুথাঘাসের মূল।
  • বলয়াকৃতি মূল: অস্থানিক মূলের দৈর্ঘ্য বরাবর চাকতির মতো স্ফীত এবং বলয়াকারে সজ্জিত ভাণ্ডার মূলকে বলয়াকৃতি মূল বলে। ইপিকাক উদ্ভিদে এই মূল দেখা যায়।[]

মূলের গঠন

[সম্পাদনা]

মুলের শারীরবৃত্ত(Physiology), অন্তর্গঠন (Anatomy), এবং অঙ্গসংস্থান (Morphology)এ বৈচিত্র্য দেখা যায়।

মূলের দৈর্ঘ্য

[সম্পাদনা]

মূল সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ধারণা, এগুলো বৃক্ষের উপরিভাগের শামিয়ানা বা ক্যানপির বিস্তৃতির চেয়ে বেশি নয় কিন্তু আদতে তা ক্যানপির দ্বিগুণ-ত্রিগুণও হতে পারে। একটি ৫০ ফুট ক্যানোপিসম্পন্ন গাছের শিকড়ের বিস্তার হতে পারে ১৫০ ফুট পর্যন্ত। তবে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে গাছের শিকড়ের বিস্তৃতি ক্রান্তীয় অঞ্চলের শিকড়ের তুলনায় কম হয়। বৃক্ষের অধিকাংশ শিকড়, বলতে গেলে প্রায় ৯০ শতাংশই থাকে মাটির মাত্র ৩০ সেন্টিমিটার গভীরতার মধ্যে। বৃক্ষের মোটা কাষ্ঠল শিকড়গুলো এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে প্লেট সৃষ্টি করে যাতে পাথর পর্যন্ত শক্তভাবে আটকে থাকতে পারে।

মূলের অঙ্গসংস্থান

[সম্পাদনা]
বৃক্ষের শিকড়সমূহ

মূল বা শেকড়ের গঠনে প্রধানত তিনটি অংশ থাকে। এগুলো হলো: ভাজক অঞ্চল, দীর্ঘায়ন অঞ্চল এবং পরিস্ফুরণ অঞ্চল। একটি শেকড়ের বাইরের দিকে থাকে একসারি ছোট ছোট ইটের মতো কোষ। এর নাম এপিব্লেমা। এপিব্লেমার মাঝে মাঝে থাকে এককোষী মূলরোম। মূলরোমের তলায় ফাঁকে ফাঁকে থাকে কয়েক সারি গোলাকার কোষ। এ কোষগুলো নাম কর্টেক্স। এই কর্টেক্সেই জমা থাকে শিকড়ের সব খাবার। কর্টেক্সের শেষে থাকে এন্ডোডার্মিসপেরিসাইকল। শিকড়ের ঠিক মাঝের অংশেও থাকে অনেক কোষ। এই কোষগুলোকে বলে জাইলেমকলা। জাইলেমের মধ্যের নল বেয়েই রস উঠে যায় ওপরে। জাইলেমের সঙ্গেই পর্যায়ক্রমে আর এক ধরনের কোষসমষ্টি থাকে, যার নাম ফ্লোয়েম। ফ্লোয়েমের কাজ হলো সূর্যের আলোর সাহায্যে পাতায় যে খাবার তৈরি হয় সেই খাবার নিচের দিকে নামিয়ে আনা। জাইলেম ও ফ্লোয়েম কোষগুলোই গাছের সব খাবার বহন করে গাছকে সুস্থ সবল রাখে।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Harley Macdonald & Donovan Stevens (৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯)। Biotechnology and Plant Biology। EDTECH। পৃ. ১৪১–। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৮৩৯৪৭-১৮০-৩
  2. "ব্রিটানিকা, উদ্ভিদের মূল"
  3. "Plant parts=Roots"University of Illinois Extension
  4. বই উদ্ধৃতি=উচ্চমাধ্যমিক জীববিজ্ঞান| লেখক=শৈলেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়-তুষারকান্তি ষন্নিগ্রহী| শিরোনাম=মূল| প্রকাশক= শ্রীভূমি পাবলিশিং কোম্পানি, কলকাতা| আই এস বি এন=| বছর=১৯৭৬| পৃ.= ৫১
  5. বই =জীববিদ্যা | লেখক=গুহ- দাশগুপ্ত-সাঁতরা | প্রকাশক=মৌলিক লাইব্রেরী, কলকাতা | বছর=২০০৪ | পৃ.৩৫৫,৩৫৬,৩৫৭

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]