উদ্ভিদ প্রজনন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ছত্রাক এবং ফার্নের প্রজনন

পৃথিবীর প্রতিটি জীব মৃত্যুর পূর্বে তার বংশধর রেখে যেতে চায়। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। যে জটিল প্রক্রিয়ায় জীব তর প্রতিরূপ বা বংশধর সৃষ্টি করে তাকে প্রজনন বা জনন বলে।[১] প্রজনন বা জনন প্রধানত দুই প্রকার, যথা—

  • অযৌন জনন
  • যৌন জনন

অযৌন জনন[সম্পাদনা]

যে প্রক্রিয়ায় দুটি ভিন্নধর্মী জনন কোষের মিলন ছাড়াই জনন সম্পন্ন হয় তাই অযৌন জনন। নিম্নশ্রেণির জীবের অযৌন জননের প্রবণতা বেশি। অযৌন জনন প্রধানত দুই ধরনের। যথা– (১) স্পোর উৎপন্ন ও (২) অঙ্গজ জনন।

স্পোর উৎপন্ন[সম্পাদনা]

প্রধাণত নিম্নশ্রেণির উদ্ভিদে স্পোর বা অণুবীজ উৎপাদনের মাধ্যমে বংশ রক্ষা করার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। উদ্ভিদের দেহকোষ পরিবর্তিত হয়ে অণুবীজবাহী একটি অঙ্গের সৃষ্টি করে। এদের অণুজীবথলি বলে। একটি অণুবীজথলিতে সাধারণত অসংখ্য অণুবীজ থাকে। তবে কখনো কখনো একটি থলিতে একটি অণুবীজ থাকতে পারে। অণুবীজ থলির বাহিরেও উৎপন্ন হয়। এদের বহিঃঅণুবীজ। বহিঃঅণুবীজের কোনো কোনোটিকে কনিডিয়াম বলে। Mucor এর থলির মধ্যে অসংখ্য অণুবীজ উৎপন্ন হয়। Penicillium কনিডিয়া সৃষ্টির মাধ্যমে বংশ বৃদ্ধি করে।

অঙ্গজ জনন[সম্পাদনা]

  • কোনো ধরনের অযৌন রেণু বা জনন কোষ সৃষ্টি না করে দেহের অংশ খণ্ডিত হয়ে বা কোনো অঙ্গ রূপান্তরিত হয়ে যে জনন ঘটে তাকে অঙ্গজ জনন বলে। এ ধরনের জনন প্রাকৃতিক নিয়মে বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটলে তাকে প্রাকৃতিক অঙ্গজ জনন বলে।

প্রাকৃতিক অঙ্গজ জনন[সম্পাদনা]

বিভিন্ন পদ্ধতিতে স্বাভাবিক নিয়মেই এ ধরনের অঙ্গজ জনন দেখা যায়, যেমন–

ক্রমিক নং জননের ধরন বর্ণনা
১. দেহের খণ্ডায়ন সাধারণত নিম্নশ্রেণির উদ্ভিদে এ ধরনের জনন দেখা যায়। Spirogyra, Mucor ইত্যাদি উদ্ভিদের দেহ কোনো কারণে খণ্ডিত হলে, প্রতিটি খণ্ড একটি স্বাধীন উদ্ভিদ হিসেহে জীবনযাপন শুরু করে।
২. মূলের মাধ্যমে কোনো কোনো উদ্ভিদের মূল থেকে নতুন উদ্ভিদের সৃষ্টি হতে দেখা যায়, যেমন- পটল, সেগুন ইত্যাদি। কোনো কোনো মূল খাদ্য সঞ্চয়ের মাধ্যমে বেশ মোটা ও রসাল হয়। এর গায়ে কুঁড়ি সৃষ্টি হয় এবং তা থেকে নতুন উদ্ভিদ গজায়, যেমন- মিষ্টি আলু
৩. রূপান্তরিত কাণ্ডের মাধ্যমে উদ্ভিদের কোন অংশকে কাণ্ড বলে তা আমরা সবাই জানি। তবে কিছু কাণ্ডের অবস্থান ও বাহিরের চেহারা দেখে তাকে কাণ্ড বলে মনেই হয় না। এরা পরিবর্তিত বা রূপান্তরিত কাণ্ড। বিভিন্ন প্রতিকূলতায়, খাদ্য সঞ্চয়ের ফলে কিংবা অঙ্গজ জননের প্রয়োজনে এরা পরিবর্তিত হয়।

এদের বিভিন্ন রূপ নিম্নে দেওয়া হলো :

ক্রম নাম ব্যাখ্যা
ক. টিউবার বা স্ফীত কন্দ কিছু কিছু উদ্ভিদে মাটির নিচের শাখার অগ্রভাগে খাদ্য সঞ্চয়ের ফলে স্ফীত হয়ে কন্দের সৃষ্টি করে, এদের টিউবার বলে। ভবিষ্যতে এ কন্দ জননের কাজ করে। কন্দের গায়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গর্ত থাকে। এগুলো দেখতে চোখের মতো 👁 তাই এদের ‘চোখ’ বলা হয়। একটি চোখের মধ্যে একটি কুঁড়ি থাকে। আঁশের মতো অসবুজ পাতার (শল্কপত্র) কক্ষে এসব কুঁড়ি জন্মে। প্রতিটি চোখ থেকে একটি স্বাধীন উদ্ভিদের জন্ম হয়, যেমন- গোল আলু
খ. রাইজোম এরা মাটির নিচে সমান্তরালভাবে অবস্থান করে। কাণ্ডের মতো এদের পর্ব, পর্বসন্ধি স্পষ্ট। পর্বসন্ধিতে শল্কপত্রের কক্ষে কাক্ষিক মুকুল জন্মে। এরাও খাদ্য সঞ্চয় করে মোটা ও রসাল হয়। অনুকূল পরিবেশে এসভ মুকুল বৃদ্ধি পেয়ে আলাদা আলাদা উদ্ভিদ উৎপন্ন করে, যেমন- আদা,হলুদ
গ. কন্দ (বাল্ব) এরা অতি ক্ষুদ্র কাণ্ড। এদের কাক্ষিক ও শীর্ষ মুকুল নতুন উদ্ভিদের জন্ম দেয়, যেমন- পিঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি।
ঘ. স্টোলন কচুতে লতি থাকে। এরা কচুর শাখা কাণ্ড। এগুলো জননের জন্যই পরিবর্তিত হয়। স্টোলনের অগ্রভাগে মুকুল উৎপন্ন হয়। এভাবে স্টোলন উদ্ভিদের জননে সাহায্য করে; যেমন- কচু, পুদিনা ইত্যাদি।
ঙ. আফসেট কচুরিপানা, টোপাপানা ইত্যাদি জলল উদ্ভিদের শাখা কাণ্ড বৃদ্ধি পেয়ে একটি নতুন উদ্ভিদ উৎপন্ন করে। কিছুদিন পর মাতৃউদ্ভিদ থেকে এটি বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন উদ্ভিদে পরিণত হয়; যেমন- কচুরিপানা
চ. বুলবিল কোনো কোনো উদ্ভিদের কাক্ষিক মুকুলের বৃদ্ধি যথাযথভাবে না হয়ে একটি পিণ্ডের মতো আকার ধারণ করে। এদের বুলবিল বলে। এসব বুলবিল কিছুদিন পর গাছ থেকে খসে মাটিতে পড়ে এবং নতুন গাছের জন্ম দেয়; যেমন- চুপড়ি আলু
৪. পাতার মাধ্যমে কখনো কখনো পাতার কিনারায় মুকুল সৃষ্টি হয়ে নতুন উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়। যেমন- পাথরকুচি
  • এতক্ষণ যেসব প্রক্রিয়ার কথা বলা হলো তা প্রাকৃতিকভাবেই ঘটে। অঙ্গজ জননে উৎপাদিত উদ্ভিদ মাতৃউদ্ভিদের মতো গুণ সম্পন্ন হয়। এর ফলে কোনো নতুন বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ ঘটে না। উন্নত গুণসম্পন্ন অর্থকরী ফসলের ক্ষেত্রে তাই অনেক সময় কৃত্রিম অঙ্গজ জনন ঘটানো হয়।

কৃত্রিম অঙ্গজ জনন[সম্পাদনা]

ভালো জাতের আম, কমলা, লেবু, পেয়ারা ইত্যাদি গাছের কলম কলম করা হয়। যেসব উদ্ভিদের বীজ থেকে উৎপাদিত উদ্ভিদের ফলন মাতৃউদ্ভিদের তুলনায় অনুন্নত ও পরিমাণে কম হয়, সাধারণত সেসব উদ্ভিদে কৃত্রিম অঙ্গজ জননের মাধ্যমে মাতৃউদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করা হয়।

ক্রমিক নং জননের ধরন বর্ণনা
১. কলম (Grafting) কলম করার জন্য প্রথমে একটি সুস্থ গাছের কচি ও সতেজ শাখা নির্বাচন করতে হবে। উপযুক্ত স্থানে বাকল সামান্য কেটে নিতে হবে। এবার ঐ ক্ষত স্থানটি মাটি ও গোবর মিশিয়ে ভালোভাবে আবৃত করে দিতে হবে। এবার সেলোফেন টেপ অথবা পলিথিন দিয়ে ঐ স্থানটি মুড়ে দিতে হবে যাতে পানি লেগে মাটি ও গোবরের মিশ্রণ খসে না পড়ে। নিয়মিত পানি দিয়ে এ অংশটি ভিজিয়ে দিতে হবে। এভাবে কিছুদিন রেখে দিলে এ স্থানে মূল গজাবে। এর পরে মূলসহ শাখার এ অংশটি মাতৃউদ্ভিদ থেকে কেটে নিয়ে মাটিতে রোপণ করে দিলে নতুন একটি উদ্ভিদ হিসেবে বেড়ে উঠবে।
২. শাখা কলম (Cutting) আমরা জানি, গোলাপের ডাল কেটে ভেজা মাটিতে পুঁতে দিলে কিছুদিনের মধ্যেই তা থেকে নতুন কুঁড়ি উৎপন্ন হয়। এসব কুঁড়ি বড় হয়ে একটি নতুন গোলাপ গাছ উৎপন্ন করে।

যৌন জনন[সম্পাদনা]

ফুল থেকে ফল এবং ফল থেকে বীজ হয়। বীজ থেকে নতুন উদ্ভিদের জন্ম হয়।

  • ফুল → ফল → বীজ → নতুন গাছ

এভাবে একটি সপুষ্পক উদ্ভিদ যৌন জনন -এর মাধ্যমে বংশ বৃদ্ধি করে। তাই ফুল উদ্ভিদের যৌন জননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ফুল[সম্পাদনা]

আমরা বাড়ির আশেপাশে, বগানে অথবা বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় ফুল ফুটতে দেখেছি। একটি ফুলে মোট (প্রধান) পাঁচটি অংশ থাকে; যথা— (১) বৃতি, (২) দল বা পাপড়ি, (৩) পুংকেশর, (৪) গর্ভকেশর ও (৫) পুষ্পাক্ষ।

একটি আদর্শ ফুলের বিভিন্ন অংশ।

কোনো ফুলে যদি এই পাঁচটি অংশের সবগুলো থাকে তবে ফুলটি একটি সম্পূর্ণ ফুল; আর যদি (পাঁচটি অংশের সবগুলো) না থাকে তবে ফুলটি একটি অসম্পূর্ণ ফুল। কখনো কখনো ফুলে এই পাঁচটি অংশ ছাড়াও বৃতির নিচে একটি অতিরিক্ত অংশ থাকে। একে উপবৃতি বলে। জবা ফুলে এমন বৃতি দেখা যায়। আবার কোনো কোনো ফুলে বৃন্ত থাকে। এগুলো সবৃন্তক ফুল এবং যে ফুলগুলোয় বৃন্ত থাকে না সেগুলো অবৃন্তক ফুল।

উদ্ভিদের যৌন জনন প্রক্রিয়াঃ

পরাগায়নের ফলে পরাগরেণু গর্ভমুন্ডে স্থানান্তরিত হয়।এখান থেকে নিঃসৃতরস শুষে নিয়ে এটি ফুলে উঠে এবং এর আবরণ ভেদ করে একটি নালি বেরিয়ে আসে। এটি পরাগনালি। পরাগনালি গর্ভদন্ড ভেদ করে গর্ভাশয়ে ডিম্বকের কাছে গিয়ে পৌঁছ। ইতোমধ্যে এই পরাগনালিতে দুটি পুংগেমেট সৃষ্টি হয়। ডিম্বকের ভিতর পৌঁছে এই নালিকা ফেটে যায় এবং পুংগেমেট দুটি মুক্ত হয়। ডিম্বকের ভিতর ভ্রূণথলি থাকে। এর মধ্যে স্ত্রী গ্যামেট বা ডিম্বাণু উৎপন্ন হয় পুংগ্যামেটের একটি এই স্ত্রী গ্যামেটের সাথে মিলিত হয়। এভাবে নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়া শেষ হয়। অন্য পুংগ্যামেটটি গৌণ নিউক্লিয়াসের সাথে মিলিত হয় এবং সস্য উৎপন্ন করে।

নিষিক্তকরণ ও ফলের উৎপত্তি[সম্পাদনা]

জননকোষ (Gamete) সৃষ্টি নিষিক্তকরণের পূর্বশর্ত। একটি পুং গ্যামেট অন্য একটি স্ত্রী-গ্যামেটের সঙ্গে পরিপূর্ণভাবে মিলিত হওয়াকে নিষিক্তকরণ বলে। পরাগরেণু গর্ভমুণ্ডে স্থানান্তরিত হওয়ার পর এখান থেকে নিঃসৃত রস শুষে নিয়ে এটি ফুলে উঠে এবং এর আবরণ ভেদ করে একটি নালি বেরিয়ে আসে। এটি পরাগনালি। পরাগনালি গর্ভদন্ড ভেদ করে গর্ভাশয়ে ডিম্বকের কাছে গিয়ে পৌঁছে। ইতোমধ্যে এই পরাগনালিতে দুটি পুং গ্যামেট সৃষ্টি হয়। ডিম্বকের ভিতর পৌঁছে এই নালিকা ফেটে যায় এবং পুং গ্যামেট দুটি মুক্ত হয়। ডিম্বকের ভিতর সুথলি থাকে। এর মধ্যে স্ত্রী গ্যামেট বা ডিম্বাণু উৎপন্ন হয়। পুং গ্যামেটের একটি এই স্ত্রী গ্যামেটের সঙ্গে মিলিত হয়। এভাবে নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়া শেষ হয়। অন্য পুং গ্যামেটটি গৌণ নিউক্লিয়াসের সাথে মিলিত হয় এবং সস্য উৎপন্ন করে।

ফলের উৎপত্তি[সম্পাদনা]

আমরা ফল বলতে সাধারণত আম, কাঁঠাল, লিচু, কলা, আছুর, আপেল, পেয়ারা, সফেদা ইত্যাদি সুমিষ্ট ফলগুলােকে বুঝি। এগুলো পেকে গেলে রান্না ছাড়াই খাওয়া যায়। লাউ, কুমড়া, ঝিন্তা, পটল ইত্যাদি সবজি হিসেবে খাওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে এগুলাে সবই ফল। নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়া শেষ হলেই ফল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়া গর্ভাশয়ে যে উদ্দীপনার সৃষ্টি করে তার কারণে ধীরে ধীরে গর্ভাশয়টি ফলে পরিণত হয়। এর ডিস্থকগুলো বীজে রূপান্তরিত হয়। নিষিক্তকরণের পর গর্ভাশয় এককভাবে অথবা ফুলের অন্যান্য অংশসহ পরিপুষ্ট হয়ে যে অঙ্গ গঠন করে তাকে ফল বলে।

শুধু গর্ভাশয় ফলে পরিণত হলে তাকে প্রকৃত ফল বলে, যেমন- আম, কাঁঠাল। গর্ভাশয় ছাড়া ফুলের অন্যান্য অংশ পুষ্ট হয়ে যখন ফলে পরিণত হয় তখন তাকে অপ্রকৃত ফল বলে, যেমন-আপেল, চালতা ইত্যাদি। প্রকৃত ও অপ্রকৃত ফলকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা যায়, যেমন- সরল ফল, গুচ্ছফল ও যৌগিক ফল।

সরল ফল[সম্পাদনা]

ফুলের একটি মাত্র গর্ভাশয় থেকে যে ফলের উৎপত্তি তাকে সরল ফল বলে, যেমন- আম। এরা রসাল বা শুষ্ক হতে পারে। সরল ফল দুই প্রকার।

রসাল ফল
যে ফলের ফলত্বক পুরু এবং রসাল তাকে রসাল কল বলে। এ ধরনের ফল পাকলে ফলত্বক ফেটে যায় না। যেমন- আম, জাম, কলা ইত্যাদি।
নীরস ফল
যে ফলের ফলত্বক পাতলা এবং পরিপক্ব হলে ত্বক শুকিয়ে ফেটে যায় তাকে নীরস ফল বলে। যেমন-শিম, ঢেঁড়স, সরিষা ইত্যাদি।

গুচ্ছ ফল[সম্পাদনা]

একটি ফুলে যখন অনেকগুলাে গর্ভাশয় থাকে এবং প্রতিটি গর্ভাশয় ফলে পরিণত হয়ে একট বৌটার উপর গুচ্ছাকারে থাকে তখন তাকে গুচ্ছ ফল বলে, যেমন- চম্পা, নয়নতারা, আকদ, শরাফা ইত্যাদি।

যৌগিক ফল[সম্পাদনা]

একটি মঞ্জরির সম্পূর্ণ অংশ যখন একটি ফলে পরিণত হয় তখন তাকে যৌগিক ফল বলে, যেমন- আনারস, কাঁঠাল।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]