নয়াবিশ্ব

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
সেবাশ্চিয়ান মুন্সটার দ্বারা তৈরি নয়াবিশ্বের মানচিত্রও, ১৫৪০ সালে তৈরি।

নয়াবিশ্ব (নিউ ওয়ার্ল্ড) দ্বারা দক্ষিণ গোলার্ধের বৃহৎ অংশ বিশেষ করে উত্তরদক্ষিণ আমেরিকাকে বোঝানো হয়।[১] ইতালীয় অন্বেষক আমেরিগো ভেসপুচি আমেরিকা একটি নতুন মহাদেশ আবিষ্কার করেছিল এবং এরপরে মুন্ডাস নোভাস নামে একটি পত্রিকায় তার গবেষণাগুলো প্রকাশিত হওয়ার পরে ১৬তম শতাব্দীর শুরুর দিকে আবিষ্কারের যুগে এই শব্দটি প্রসিদ্ধি লাভ করে।[২] এই উপলব্ধি ইউরোপীয় ভৌগলিকদের ভৌগলিক দিগন্তকে প্রসারিত করেছিল। তারা ভেবেছিল যে বিশ্বটি আফ্রিকা, ইউরোপ এবং এশিয়া নিয়ে গঠিত। এই তিনটি মহাদেশ সম্মিলিতভাবে এখন প্রাচীন বিশ্ব (ওল্ড ওয়ার্ল্ড) বা আফ্রো-ইউরেশিয়া হিসাবে পরিচিত। আমেরিকা বিশ্বের চতুর্থ অংশ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল।[৩]

ব্যবহার[সম্পাদনা]

"প্রাচীন বিশ্ব" ও "নয়াবিশ্ব" পদগুলো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, বিশ্বের প্রধান জীবজৈবিক অঞ্চলের পার্থক্য করার উদ্দেশ্যে এবং এর মধ্যে উদ্ভিদ এবং প্রাণীজ প্রজাতির শ্রেণিবদ্ধকরণের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ।

ঐতিহাসিক প্রসঙ্গে "নয়াবিশ্ব" ব্যবহৃত হয়, যেমন, ক্রিস্টোফার কলম্বাসের ভ্রমণ, স্পেনীয় ইউকাটান বিজয় এবং উপনিবেশিক সময়ের অন্যান্য ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা করার সময়। বিকল্প শব্দের অভাবের জন্য এই শব্দটি আমেরিকা এবং পার্শ্ববর্তী মহাসাগরীয় দ্বীপ যেমন বারমুডা এবং ক্লিপারটন দ্বীপকে নিয়ে আলোচনা করার জন্য এখনও এই শব্দটি কার্যকর।

নয়াবিশ্বের ইতিহাস ''হিস্টরিয়া অ্যান্টিপডাম নিউ ওয়েলট", ১৬৩১।

"নয়াবিশ্ব" শব্দটি একটি জীববৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়। প্রাচীন বিশ্ব এবং নয়াবিশ্বের প্রজাতির কথা উল্লেখ করার সময় এটি ব্যবহৃত। জৈবিক শ্রেণিবিন্যাসবিদরা প্রায়শই আমেরিকান অঞ্চলে পাওয়া যায় এমন প্রজাতির গোষ্ঠীর সাথে "নয়াবিশ্ব" লেবেল যুক্ত করেন, তাদেরকে "প্রাচীন বিশ্ব" (ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়া) এর প্রজাতিগুলো থেকে আলাদা করার জন্য। যেমন- নয়াবিশ্ব বানর, নয়াবিশ্ব শকুন, নয়াবিশ্ব ওয়ার্বলারস (এক প্রকার পাখি)।

শব্দটি প্রায়শই কৃষিতে ব্যবহৃত হয়। নব্যপ্রস্তর যুগীয় বিপ্লব থেকে উদ্ভূত এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের একটি সাধারণ কৃষির ইতিহাস আছে এবং হাজার বছর আগে এই তিনটি মহাদেশের মধ্যে একই উদ্ভিদ এবং প্রাণী ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই এগুলোকে একত্রে "প্রাচীন বিশ্ব" হিসাবে শ্রেণিবদ্ধ করা সুবিধাজনক। সাধারণ প্রাচীন বিশ্ব ফসল (যেমন-যব, মসুর, জই, মটর, রাই, গম) এবং পোষা প্রাণী (যেমন-গরু, মুরগী, ছাগল, ঘোড়া, শূকর, ভেড়া) আমেরিকাতে ছিল না। ১৪৯০ এর দশকে কলম্বীয় যোগাযোগ ("কলম্বিয়ান এক্সচেঞ্জ") আমেরিকাতে এই ফসলগুলোর পরিচয় দেয়। অপরপক্ষে, অনেক ফসল কলম্বিয়ার সংস্পর্শের পরে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার আগে শুধু আমেরিকাতেই উৎপাদিত হতো। এখনও এসব ফসল "নয়াবিশ্ব ফসল" হিসাবে অভিহিত হয়।'কমন বীনস' (শিম জাতীয় শস্য), ভুট্টা, স্কোয়াশ (কুমড়ার মতো), অ্যাভোকাডো, টমেটো এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যাপসিকাম এবং টার্কি মূলত প্রাকৃতিকভাবে গৃহপালিত হয়েছিল মেসোআমেরিকার কলম্বীয় মানুষ দ্বারা। দক্ষিণ আমেরিকার আন্ডিস অঞ্চলের কৃষকরা শিমুল আলু, চিনাবাদাম, আলু, এবং আলপাকা, গিনিপিগ এবং লামার মতো পোষা প্রাণী নিয়ে এসেছিলেন। অন্যান্য বিখ্যাত নয়াবিশ্ব ফসলের মধ্যে রয়েছে কাজু, কোকো, রাবার, সূর্যমুখী, তামাক, ভ্যানিলা এবং পেয়ারা, পেঁপে এবং আনারসের মতো ফল।

শব্দটির উৎপত্তি[সম্পাদনা]

আমেরিগো ভেসপুচি ঘুমন্ত আমেরকানদের জাগিয়ে তোলে।

"নয়াবিশ্ব" ( ল্যাটিনে "মুন্ডাস নোভাস") শব্দটি প্রথমবার আবিষ্কারক আমেরিগো ভেসপুচি তার বন্ধু লরেঞ্জো দি পিয়ের ফ্রান্সেস্কো দে 'মেডিসিকে ১৫০৩ সালের বসন্তে লিখিত একটি চিঠিতে বাবহার করেছিলেন। পরবর্তীতে এটি ১৫০৩-১৫০৪ এ মুন্ডাস নোভাস শিরোনামে প্রকাশিত হয়।। ক্রিস্টোফার কলম্বাস অনুসারে পশ্চিমের ইউরোপীয় নৌ-পরিবহনকারীদের দ্বারা আবিষ্কৃত জমিগুলো এশিয়ার কিনারা নয় বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন মহাদেশ বা "নয়াবিশ্ব", ভেসপুচির চিঠিতে প্রথমবার এই অনুমানের পক্ষে যুক্তি রয়েছে।[৩]

মুন্ডাস নোভাস অনুযায়ী, ভেসপুচি ১৭ আগস্ট ১৫০১ এ ব্রাজিল আসার সময় বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি একটি "নতুন জগতে" ছিলেন[৪] এবং পর্তুগিজ নাবিকরা এশিয়ার বিষয়ে তাকে যা বলেছিলেন তার সাথে সেখানকার প্রকৃতি ও লোকের তুলনা করেছিলেন। "বেজেগুইচে" (ডাকার উপসাগর, সেনেগাল) এ দুটি ভিন্ন অভিযানের মধ্যে একটি বিখ্যাত সাক্ষাৎ হয়েছিল। নতুন আবিষ্কার করা ব্রাজিলের উপকূলে চার্ট করার পথে ভেসপুচির নিজস্ব বহির্গমন অভিযান এবং পেড্রো আলভারেস ক্যাব্রালের দ্বিতীয় পর্তুগিজ ইন্ডিয়ার জাহাজ ভারত থেকে দেশে ফিরার সময় এই সাক্ষাৎ হয়। পূর্ববর্তী বছরগুলোতে ইতিমধ্যে ভেসপুচি আমেরিকা গিয়েছিলেন। সম্ভবত ওয়েস্ট ইন্ডিজে যা দেখেছিলেন তার সাথে ফিরে আসা নাবিকরা তাকে পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ সম্পর্কে যা বলেছিল তার পুনর্মিলন করতে অসুবিধা হয়েছিল। ভেসপুচি বেজেগুইচে থাকাকালীন সময়ে লরেঞ্জোকে একটি প্রাথমিক যা তিনি পর্তুগিজ বহরের সাথে ফেরত পাঠিয়েছিলেন।[৫] এই সময়ে তার কথোপকথনের বিষয়ে একটি বিভ্রান্তি প্রকাশ করেছিলেন। পূর্ব ব্রাজিলের উপকূলের বিস্তৃত অঞ্চলটি কে দিয়ে ১৫০১-১৫০২ এর মধ্য দিয়ে ভেসপুচি তার মানচিত্র তৈরির যাত্রার সময় অবশেষে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছিলেন। ব্রাজিল থেকে ফিরে আসার পরে, ১৫০৩ এর বসন্তে আমেরিগো ভেসপুচি লিসবনে মুন্ডাস নুভাস চিঠিটি ফ্লোরেন্সের লরেঞ্জোকে রচনা করেছিলেন। যার বিখ্যাত উদ্বোধনী অনুচ্ছেদ ছিলঃ[৬]

এই দিনগুলোতে আমি তোমাকে নতুন দেশ থেকে প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে সম্পূর্ণরূপে লিখেছিলাম। দেশগুলো পর্তুগালের রাজার নির্দেশে এবং তার জাহাজগুলোর মাধ্যমে অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে। এটিকে একটি নতুন বিশ্ব বলা বৈধ, কারণ এই দেশগুলোর কোনওটিই আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে পরিচিত ছিল না এবং যারা তাদের বিষয়ে শুনবে তাদের জন্য এটি সম্পূর্ণ নতুন হবে। পূর্ববর্তীদের মতামত ছিল যে দক্ষিণের সীমানা রেখার বাইরে বিশ্বের বৃহত্তর অংশ স্থল নয়, কেবল সমুদ্র ছিল যেটাকে তারা আটলান্টিক বলে অভিহিত করেছে। এমনকি যদি তারা কোনও মহাদেশ রয়েছে বলে থাকে তবে তারা এটি অধ্যুষিত হওয়ার অস্বীকার করার জন্য অনেকগুলো কারণ দিয়েছে। তবে এই মতটি মিথ্যা, এবং সত্যের সম্পূর্ণ বিরোধী। আমার শেষ সমুদ্রযাত্রা এটি প্রমাণ করেছে কারণ আমি দক্ষিণাঞ্চলে একটি মহাদেশ পেয়েছি।। আমাদের ইউরোপ বা এশিয়া বা আফ্রিকার চেয়ে অনেক প্রাণী দ্বারা পরিপূর্ণ এবং আমাদের কাছে পরিচিত অন্য কোনও অঞ্চলের চেয়ে মনোরম।

ভেসপুচির চিঠিটি ইউরোপে প্রকাশিত হওয়ার পর জনগণের মধ্যে বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছিল এবং সঙ্গে সঙ্গে অন্য কয়েকটি দেশে আবারও ছাপা হয়েছিল।[৭]

পূর্বে ব্যবহার[সম্পাদনা]

আমেরিগো ভেসপুচি নয়াবিশ্ব (মুন্ডাস নুভাস) শব্দটির প্রথম ব্যবহার করার কৃতিত্ব পেলেও এধরনের অন্যান্য শব্দ তার পূর্বে প্রচলিত ছিল।

ভেনিসিয়ান অন্বেষণকারী আলভিস ক্যাডামোস্তো সাহারা-নিম্ন আফ্রিকা কথা উল্লেখ করার জন্য "আন ওয়েলরো মুন্ডো" ("অন্য একটি বিশ্ব") শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন, যেখানে তিনি পর্তুগিজের পক্ষে ১৪৫৫ এবং ১৪৫৬ সালে অন্বেষণ করেছিলেন।[৮] তবে এটি নিছক একটি সাহিত্যের বিকাশ ছিল, বিশ্বের নতুন "চতুর্থ" অংশের অনুমান নয়। ক্যাডমোস্টো যথেষ্ট সচেতন ছিলেন সাহারা-নিম্ন আফ্রিকা আসলে আফ্রিকা মহাদেশের অংশ ছিল।

ভেসপুচির সাথে ইতালীয় বংশোদ্ভূত স্প্যানিশ কাহিনীকার পিটার মারটিয়ার ডি'অঙ্গিরাকে প্রায়শই আমেরিকা একটি নতুন বিশ্ব হিসাবে মনোনীত করার জন্য কৃতিত্ব দেওয়া হয়।[৯] পিটার মারটিয়ার পুরো আমেরিকা আবিষ্কারের ইতিহাসের শিরোনামে অরবে নোভো (আক্ষরিক অর্থে "নতুন গ্লোব", তবে প্রায়শই "নতুন বিশ্ব" হিসাবে অনুদিত হয়) শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন, যা ১৫১১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। পিটার মারটিয়ার ১৪৯৩ সাল থেকে কলম্বাসের আবিষ্কার সম্পর্কে মন্তব্য করা ব্যক্তিগত চিঠি লিখছিলেন এবং শুরু থেকেই কলম্বাসের দাবি পূর্ব এশিয়ায় ("ইন্ডিজ") পৌঁছেছে বলে সন্দেহ করেছিল। তিনি তাই বিকল্প নামগুলো দ্বারা অভিহিত করে।[১০] কলম্বাস তার প্রথম সমুদ্রযাত্রা থেকে ফিরে আসার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরে, পিটার মার্টিয়ার কলম্বাসের আবিষ্কারকৃত স্থানগুলোকে "ওয়েস্টার্ন অ্যান্টিপোডস" (ল্যাটিনে "অ্যান্টিপোডিবাস ওসিডুইস", ১৪ মে, ১৪৯৩-এর চিঠি)[১১], "পৃথিবীর নতুন গোলার্ধে" "(ল্যাটিনে "নভো টেরারাম হেমিস্ফেরিও", ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৪৯৩)[১২] এবং ১ নভেম্বর, ১৪৯৩-এর একটি চিঠিতে কলম্বাসকে "নতুন গ্লোবের আবিষ্কারক" (ল্যাটিনে "কর্নেলস নোক নভি অরবিস রেপারার")[১৩] হিসাবে উল্লেখ করে চিঠি লিখেছেন। এক বছর পরে (২০ই অক্টোবর, ১৪৯৪) পিটার মারটিয়ার আবার ''নতুন গ্লোব'' ("নোভো ওরবে") এবং "পশ্চিমা গোলার্ধ" (ল্যাটিনে "অব ওসিডেন্টে হেমিস্ফেরো") বলে অভিহিত করেন।

ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯৮ সালে তার তৃতীয় ভ্রমণে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে এসেছেন। তার তৃতীয় সমুদ্রযাত্রার ফলাফলের প্রতিবেদন করে ১৪৯৯ সালে চিঠিতে স্পেনের রানি প্রথম ইসাবেলা এবং রাজা দ্বিতীয় ফার্দিনান্দকে কলম্বাস বর্ণনা করেছেন যে কীভাব অরিনোকো বদ্বীপের বিশাল জলরাশি পারিয়ার উপসাগরে ছুটে এসেছিল তাই পূর্বে কোনও অজানা মহাদেশ অবশ্যই এর পিছনে আছে।[১৪] যাইহোক, কলম্বাস এই অনুমানটিকে বাতিল করে দেয় এবং পরিবর্তে প্রস্তাব দেয় যে দক্ষিণ আমেরিকার ভূমিকম্প একটি "চতুর্থ" মহাদেশ নয়, বরং বাইবেলের স্বর্গ। পূর্বের অজানা "নতুন" অংশ নয়, তবে খ্রিস্টীয় জগতে ইতিমধ্যে "অপরিচিত"।[১৫] অন্য একটি চিঠিতে (প্রিন্স জনের নার্সকে, ১৫০০ লিখে লেখা) কলম্বাস "নতুন আকাশ ও পৃথিবী" ("নিউভো সিয়েলো-মুন্ডো") পৌঁছে যাওয়ার কথা লিখে[১৬] এবং তিনি স্পেনের রাজাদের অধীনে "অন্য একটি বিশ্ব" স্থাপন করেছিলেন ("ওট্রো" মুন্ডো")[১৭]

স্বীকৃতি[সম্পাদনা]

দ্য ভিঞ্চি গ্লোব, ১৫০৪ সাল।

ভেসপুচি কেবলমাত্র দক্ষিণ আমেরিকার মহাদেশীয় ভূমিকে "নতুন বিশ্ব" বলেছিল।[১৮] সেই সময় উত্তর আমেরিকা মহাদেশের বেশিরভাগ অংশ আবিষ্কার করা যায় নি এবং ভেসপুচির মন্তব্যগুলো ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আগে আবিষ্কৃত অ্যান্টিল দ্বীপপুঞ্জগুলো আসলে এশিয়ার পূর্ব প্রান্ত হতে পারে সম্ভাবনাটি বাতিল করা হয়নি। যেহেতু কলম্বাস অবধি জোর দিয়েছিলেন ১৫০৬ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত।[১৯] ১৫০৪ সালে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি দ্বারা নির্মিত একটি গ্লোব উত্তর এবং মধ্য আমেরিকা বাদে নতুন বিশ্বকে চিত্রিত করে।[২০] ইন্ডিজ সম্পর্কিত সমস্ত বিদ্যমান তথ্য ১৫০৫ সালে স্পেনের টরোতে স্পেনীয় রাজতন্ত্ররা জুন্তা দে নাভ্যাগান্তেস নামে পরিচিত ভূমি সন্ধানকারীদের (ন্যাভিগেটর) একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন। ১৫০৮ সালে বার্গোসে এই সম্মেলন হয়েছিল। কী আবিষ্কার হয়েছিল তা নিয়ে একটি চুক্তিতে এসে স্প্যানিশ অনুসন্ধানের ভবিষ্যতের লক্ষ্য নির্ধারণ করার জন্য এটি অনুষ্ঠিত হয়। আমেরিগো ভেসপুচি উভয় সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন এবং তাদের উপর প্রভাব ফেলে। বুর্গোসে, তিনি স্পেনের নেভিগেশনের পাইলটো মেয়র নিযুক্ত হয়েছিলেন।[২১] এটা প্রায় নিশ্চিত যে ভেসপুচি তার সাম্প্রতিক 'নতুন বিশ্ব' অনুমানটি সেখানে তার সহকর্মী নেভিগেটদের কাছে পেশ করেছিলেন। এই সম্মেলনগুলোর সময়ই স্প্যানিশ কর্মকর্তারা অবশেষে মেনে নিয়েছিলেন যে অ্যান্টিলিস এবং মধ্য আমেরিকার পরিচিত অংশটি মূলত তারা যে ইন্ডিজ খুঁজছিল তা নয় (কলম্বাস তখনও জোর দিয়েছিল যে আন্টিলিস ও মধ্য আমেরিকা ইন্ডিসই ছিল) এবং স্প্যানিশ অন্বেষণকারীদের জন্য নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিলো। এশিয়াতে যথাযথভাবে যাত্রা করার জন্য আমেরিকার মধ্য দিয়ে কোনও সমুদ্রের উত্তরণ বা প্রণালী সন্ধান করার প্রকল্প গৃহীত হয়।[২২] ইংরেজিতে তখনও 'নিউ ওয়ার্ল্ড' শব্দটি অব্যবহৃত ছিল এবং তুলনামূলক দেরিতে প্রচলিত হয়।[২৩]

মানচিত্রে নয়াবিশ্ব[সম্পাদনা]

১৫২৯ সালের ডিয়েগো রিবেরো দ্বারা তৈরি মানচিত্র। এখানে আমেরিকা অঞ্চলকে মুন্ডাস নভাস বলে অভিহিত করা হয়।

যদিও ভেসপুচির পরে এটি সাধারণত গৃহীত হয়েছিল যে কলম্বাসের আবিষ্কারগুলো এশিয়া নয় বরং একটি "নতুন বিশ্ব" ছিল, তবে দুটি মহাদেশের মধ্যে ভৌগলিক সম্পর্ক তখনও অস্পষ্ট ছিল।[২৪] পূর্ব এশিয়ার উপকূলে বিশাল অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রের অস্তিত্বের দ্বারা এশিয়া এবং আমেরিকার মধ্যে অবশ্যই একটি বিশাল সমুদ্র থাকতে হবে। ইরাটোস্থিনিস দ্বারা পৃথিবীর আকার গণনা করা হিসাবে এশিয়া এবং সদ্য আবিষ্কৃত ভূমিগুলোর মধ্যে একটি বিশাল জায়গা রয়েছে।

এমনকি ভেসপুচির আগেও বেশ কয়েকটি মানচিত্র, যেমন- ১৫০২ সালের ক্যান্টিনো প্ল্যানিস্ফিয়ার এবং ১৫০৪ সালের এর ক্যানেরিও মানচিত্রের পূর্ব দিকে চীন এবং মানচিত্রের পশ্চিমে উত্তর আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার আবিষ্কারগুলোর মধ্যে একটি বিশাল উন্মুক্ত মহাসাগর এঁকেছেন। তবে তারা এশীয় ভুমিকে পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম গোলার্ধের দিকে প্রসারিত করেছে। যেমন, ক্যান্টিনো প্ল্যানিস্ফিয়ার মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে এশিয়ার কোনা হিসেবে চিত্রিত করা হয়। কিছু মানচিত্র, যেমন ১৫০৬ সালের কন্টারিনি-রোসেলির মানচিত্র এবং ১৫০৮ সালের জোহানেস রুইশ মানচিত্র টলেমি এবং কলম্বাসের দাবি অনুসারে উত্তর এশিয়ার ভূমিকে পশ্চিম গোলার্ধে প্রসারিত করেছে এবং পরিচিত উত্তর আমেরিকার সাথে মিলিত করেছে। এই মানচিত্রগুলোতে কিউবার কাছে জাপান অবস্থিত এবং দক্ষিণ আমেরিকার চারপাশে সাগর।[২৪] ১৫০৭-এর ওয়াল্ডসেমলারের মানচিত্র, যা বিখ্যাত কসমোগ্রাফির ইন্ট্রোডাক্টিয়োর (একটি বই) সাথে রয়েছে (যার মধ্যে ভেসপুচির চিঠিগুলোর পুনরায় ছাপ রয়েছে) আধুনিক মানচিত্রের সাথে সবচেয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই মানচিত্রে পূর্ব দিকে এশিয়া এবং নয়াবিশ্বের মাঝে সাগর আছে, কোনো ভূমি নেই। মানচিত্রটি বিখ্যাতভাবে দক্ষিণ আমেরিকাকে নাম দেয় "আমেরিকা"। তবে, মার্টিন ওয়াল্ডসেমলারের মানচিত্রটি তার পূর্ববর্তী মানচিত্র থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়ে আগের ধারনার দিকে ফিরে আসে। পরের মানচিত্রে এশীয় ভূমি উত্তর আমেরিকাতে মিশ্রিত হয়েছিল (যাকে তিনি এখন টেরা দে কিউবা এশি পার্টিস বলে থাকেন) এবং দক্ষিণ আমেরিকা থেকে "আমেরিকা" নামটি বাদ দিয়ে টেরা ইনকগনিটো নাম দেয়।[২৪]

নতুন বিশ্বের পশ্চিম উপকূল অর্থাৎ প্রশান্ত মহাসাগর ১৫১৩ সালে ভাস্কো নেজ ডি বালবোয়া আবিষ্কার করেছিলেন। তবে আরও ১৫ বছর পর ফার্দিনান্দ ম্যাগেলানের সমুদ্রযাত্রা ১৫১৯-২২ এর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছিল যে প্রশান্ত মহাসাগর আমেরিকা থেকে এশিয়া বিচ্ছিন্ন করে। উত্তর আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলকে চিত্রিত করার আগে আরও কয়েক বছর লাগে, দীর্ঘমেয়াদি সন্দেহ হয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে বেরিং প্রণালী আবিষ্কার হওয়ার পর এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকা সংযুক্ত ছিল না নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। ১৬তম শতাব্দীর কিছু ইউরোপীয় মানচিত্র (যেমন ১৫৩৩ সালের জোহানেস সোনারের গ্লোব) তখনও উত্তর আমেরিকাকে স্থল সেতু দ্বারা এশিয়ার সাথে সংযুক্ত করে চিত্রিত করেছে।[২৪]

১৫২৪ সালে, জিয়োভানি দা ভেরাজাজনো সমুদ্রযাত্রার একটি রেকর্ডে এই শব্দটি উত্তর আমেরিকার আটলান্টিক উপকূলে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার অংশ আছে তা বোঝাতে ব্যবহার করেছিলেন।[২৫]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

আমেরিকা মহাদেশে ইউরোপীয়দের উপনিবেশ স্থাপন

আমেরিকা অঞ্চল

উত্তর আমেরিকা

দক্ষিণ আমেরিকা

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "America." The Oxford Companion to the English Language (আইএসবিএন ০-১৯-২১৪১৮৩-X). McArthur, Tom, ed., 1992. New York: Oxford University Press, p. 33: "[16c: from the feminine of Americus, the Latinized first name of the explorer Amerigo Vespucci (1454–1512). The name America first appeared on a map in 1507 by the German cartographer Martin Waldseemüller, referring to the area now called Brazil]. Since the 16c, a name of the western hemisphere, often in the plural Americas and more or less synonymous with the New World. Since the 18c, a name of the United States of America. The second sense is now primary in English: ... However, the term is open to uncertainties: ..."
  2. Mundus Novus: Letter to Lorenzo Pietro Di Medici, by Amerigo Vespucci; translation by George Tyler Northrup, Princeton University Press; 1916.
  3. M.H.Davidson (1997) Columbus Then and Now, a life re-examined. Norman: University of Oklahoma Press, p. 417)
  4. The letter says 17 August 1501, although translators variously rendered it also as 7 August 1501, 10 August 1501, or 1 August 1501. Canovai, Stanislao। Viaggi di Amerigo Vespucci। পৃষ্ঠা 158।  Bonari, Bruno। Amerigo Vespucci। পৃষ্ঠা 222। 
  5. This preliminary letter from Bezeguiche was not published, but remained in manuscript form. It is reproduced in F.A. de Varnhagen (de Varnhagen, Francisco Adolfo (১৮৬৫)। Amerígo Vespucci, son caractère, ses écrits ... sa vie et ses navigations ...। পৃষ্ঠা 78–82 – Google Books-এর মাধ্যমে। ).
  6. English translation of Mundus Novus as found in Markham (Vespucci, Amerigo (১৮৯৪)। The Letters of Amerigo Vespucci and Other Documents Illustrative of His Career। Markham, Clements কর্তৃক অনূদিত। পৃষ্ঠা 42–52 – Google Books-এর মাধ্যমে। )
  7. Varnhagen, Amerígo Vespucci (1865: pp. 13–26) provides side-by-side reproductions of both the 1503 Latin version Mundus Novus, and the 1507 Italian re-translation "El Nuovo Mondo de Lengue Spagnole interpretato in Idioma Ro. Libro Quinto" (from Paesi Nuovamente retrovati). The Latin version of Mundus Novus was reprinted many times (see Varnhagen, 1865: p. 9 for a list of early reprints).
  8. Cadamosto Navigationi, c. 1470, as reprinted in Giovanni Ramusio (1554: p. 106). See also M. Zamora Reading Columbus, (1993: p. 121)
  9. de Madariaga, Salvador (১৯৫২)। Vida del muy magnífico señor Don Cristóbal Colón (Spanish ভাষায়) (5th সংস্করণ)। Mexico: Editorial Hermes। পৃষ্ঠা 363। "nuevo mundo", [...] designación que Pedro Mártyr será el primero en usar 
  10. E.G. Bourne Spain in America, 1450–580 New York: Harper (1904: p. 30)
  11. Peter Martyr, Opus Epistolarum (Letter 130 p. 72)
  12. Peter Martyr, Opus Epistolarum, Letter 133, p. 73
  13. Peter Martyr, Opus Epistolarum (Letter 138, p. 76)
  14. "if the river mentioned does not proceed from the terrestrial paradise, it comes from an immense tract of land situated in the south, of which no knowledge has been hitherto obtained" (Columbus 1499 letter on the third voyage, as reproduced in R.H. Major, Select Letters of Christopher Columbus, 1870: p. 147)
  15. J.Z. Smith, Relating Religion, Chicago (2004: pp. 266–67)
  16. Columbus 1500 letter to the nurse (in Major, 1870: p. 154)
  17. Columbus's 1500 letter to the nurse(Major, 1870: p. 170)
  18. F.A. Ober Amerigo Vespucci New York: Harper (1907: pp. 239, 244)
  19. S.E. Morison The European Discovery of America, v.2: The southern voyages, 1492–1616.(1974: pp. 265–66).
  20. Missinne, Stefaan (Fall 2013). "A Newly Discovered Early Sixteenth-Century Globe Engraved on an Ostrich Egg: The Earliest Surviving Globe Showing the New World". The Portolan, journal of the Washington Map Society (87): p. 8–24.
  21. For an account of Vespucci at Toro and Burgos, see Navarette Colección de los viages y descubrimientos que hicieron por mar los españoles desde fines del siglo XV(1829: v.iii, pp. 320–23)
  22. C.O. Sauer The Early Spanish Main. Cambridge (1966: pp. 166–67)
  23. Sobecki, Sebastian (২০১৫)। "New World Discovery"Oxford Handbooks Onlineডিওআই:10.1093/oxfordhb/9780199935338.001.0001 (নিষ্ক্রিয় ২০২০-০১-২২)। সংগ্রহের তারিখ ২ জুন ২০১৬ 
  24. J.H. Parry, The Discovery of the Sea (1974: p. 227)
  25. Verrazzano, Giovanni da (1524)."The Written Record of the Voyage of 1524 of Giovanni da Verrazzano as recorded in a letter to Francis I, King of France, July 8th, 1524" ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৬ তারিখে. Citing: Wroth, Lawrence C., ed. (1970). The Voyages of Giovanni da Verrazzano, 1524–1528. Yale, pp. 133–43. Citing: a translation by Susan Tarrow of the Cèllere Codex.