সুরিনাম

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Republic of Suriname
Republiek Suriname
পতাকা কোট অফ আর্মস
নীতিবাক্য
Justitia - Pietas - Fides  (লাতিন)
"সুবিচার - ধর্মপরায়ণতা - আনুগত্য"
জাতীয় সঙ্গীত
God zij met ons Suriname
রাজধানী
(ও বৃহত্তম নগরী)
পারামারিবো
৫°৫০′ উত্তর ৫৫°১০′ পশ্চিম / ৫.৮৩৩° উত্তর ৫৫.১৬৭° পশ্চিম / 5.833; -55.167
রাষ্ট্রীয় ভাষাসমূহ ওলন্দাজ
জাতীয়তাসূচক বিশেষণ সুরিনামি
সরকার সাংবিধানিক গণতন্ত্র
 -  রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড ভেনেতিয়ান
স্বাধীনতা নেদারল্যান্ডস থেকে 
 -  তারিখ ২৫শে নভেম্বর, ১৯৭৫ 
আয়তন
 -  মোট  বর্গ কিমি. (৯১ত্ম)
 বর্গ মাইল 
 -  জলভাগ (%) ১.১
জনসংখ্যা
 -  জুলাই, ২০০৫ আনুমানিক ৪,৪৯,৮৮৮ (১৭০তম)
 -  ২০০৪ আদমশুমারি ৪,৮৭,০২৪ 
 -  ঘনত্ব ২.৭/বর্গ কিলোমিটার 
./বর্গ মাইল
জিডিপি (পিপিপি) ২০০৫ আনুমানিক
 -  মোট $২.৮৯৮ বিলিয়ন (১৬০তম)
 -  মাথাপিছু $৫,৬৮৩ (৯৬তম)
মানব উন্নয়ন সূচক (২০০৩) ০.৭৫৯ (মধ্যম) (৮৯তম)
মুদ্রা সুরিনামি ডলার (SRD)
সময় স্থান ART (ইউটিসি-৩)
 -  গ্রীষ্মকালীন (ডিএসটি) পালন করা হয় না (ইউটিসি-৩)
ইন্টারনেট টিএলডি .sr
কলিং কোড ৫৯৭

সুরিনাম বা সুরিনাম প্রজাতন্ত্র (ইংরেজি: Republic of Suriname; ওলন্দাজ ভাষায়: Republiek Suriname) আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। ১৯৭৫ সালের আগ পর্যন্ত সুরিনাম নেদারল্যান্ড্‌সের একটি উপনিবেশ ছিল এবং তখন এর নাম ছিল ওলন্দাজ গায়ানা। সুরিনামের আয়তন ১,৬৩,২৬৫ বর্গ কিমি। এটি দক্ষিণ আমেরিকার ক্ষুদ্রতম স্বাধীন রাষ্ট্র। সুরিনামের একমাত্র নগর এলাকা ও রাজধানীর নাম পারামারিবো

ঔপনিবেশিক প্ল্যান্টেশন ব্যবস্থার ফলশ্রুতিতে সুরিনামে বহু জাতির মানুষের বসবাস। যেসব প্ল্যান্টেশনে আখ ও অন্যান্য শস্যের চাষ হত, সেগুলি আফ্রিকা থেকে আনা দাসশ্রমের উপর নির্ভরশীল ছিল। দাসপ্রথার অবসানের পর ভারত, ইন্দোনেশিয়াএশিয়ার অন্যান্য অঞ্চল থেকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে সুরিনামের অর্ধেক মানুষ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত। এছাড়া এশীয় ও ইউরোপীয়দের মিশ্র জাতি ক্রেওলেরাও সুরিনামের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ গঠন করেছে।

সুরিনামের অর্থনীতি মূলত বক্সাইটের খননশিল্পভিত্তিক। বক্সাইট উত্তোলনের এটি থেকে অ্যালুমিনিয়াম নিষ্কাশন করা হয় এবং বিদেশে, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হয়।

১৬শ শতকের শেষের দিকে এই এলাকায় প্রথম ইংরেজ, ফরাসিওলন্দাজ বেনিয়াদের আগমন ঘটে। ঐ শতকেরই শেষ প্রান্তে দেশটি ওলন্দাজ উপনিবেশে পরিণত হয়। ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা লাভের অল্পকাল পরেই একটি সামরিক অভ্যুত্থানে সুরিনামের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। ১৯৮৭ সালে গণতন্ত্র ফিরে আসলেও ৯০-এর দশকেও সেনাবাহিনী যথেষ্ট ক্ষমতা প্রদর্শন করতে থাকে। ২১শ শতকের শুরুতে অর্থনীতির ঊর্ধ্বগতি গণতান্ত্রিক সরকারের স্থায়িত্বের ব্যাপারে আশার সঞ্চার করেছে।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

ইউরোপীয়দের আগমনের আগে বর্তমান সুরিনাম এলাকাটিতে আরাওয়াক, কারিবওয়ার্‌রাউ নামের আদিবাসী আমেরিকান গোত্রগুলি বাস করত। বেশির ভাগ আদিবাসী আমেরিকান ছোট ছোট স্বাধীন গ্রামে বাস করত, যেখানে আত্মীয়তার বন্ধনে গঠিত হত সম্প্রদায়। এরা শিকার করে ও ক্ষেতখামার করে জীবন চালাত। মূলত কন্দ জাতীয় ফসলের আবাদ হত, যেমন কাসাভা। উপকূলের লোকেরা আরাওয়াক ভাষায় এবং অভ্যন্তরভাগের লোকেরা কারিবীয় ভাষায় কথা বলত।

ইউরোপীয়দের বসতি স্থাপন[সম্পাদনা]

১৬শ শতকের শেষভাগে এসে ওলন্দাজ, ফরাসি ও ইংরেজ বণিকেরা সুরিনামের উপকূলে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে। ১৭শ শতকের প্রথমার্ধে ইংরেজ বণিকেরা দেশটিতে বসতি স্থাপন শুরু করে। ১৬৫০ সালে সুরিনাম নদীর তীরে একটি ব্রিটিশ দল প্রথম স্থায়ী ইউরোপীয় বসতি স্থাপন করে। পরবর্তীতে ওলন্দাজ পশ্চিম ভারতীয় কোম্পানির একটি নৌবহর এই বসতিটি দখল করে। ১৬৬৭ সালে ব্রেডার চুক্তির মাধ্যমে ইংরেজরা উত্তর আমেরিকায় নিউ অ্যামস্টার্ডাম (বর্তমান নিউ ইয়র্ক শহর)-এর বিনিময়ে এই উপনিবেশটির একাংশ ওলন্দাজদের দিয়ে দেয়। ফলে সুরিনাম সরকারীভাবে ওলন্দাজ নিয়ন্ত্রণে আসে। তখন থেকে ওলন্দাজরা সুরিনামকে একটি উপনিবেশ হিসেবে শাসন করতে থাকে। তবে ১৭৯৫-১৮০২ এবং ১৮০৪-১৮১৬ যুদ্ধচলাকালে ব্রিটিশরা সাময়িকভাবে সুরিনামের দখল নিয়েছিল।

ঔপনিবেশিক প্ল্যান্টেশন ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

সুরিনামে ওলন্দাজ উপনিবেশের অর্থনীতির প্রাথমিক ভিত্তি ছিল প্ল্যান্টেশন কৃষি। ওলন্দাজেরা সুরিনামে অনেক প্ল্যান্টেশন স্থাপন করে এবং আফ্রিকা থেকে বিরাট সংখ্যক ক্রীতদাসকে এগুলিতে কাজ করাতে নিয়ে আসে। প্ল্যান্টেশনে চাষ করা শস্যের মধ্যে প্রধান ছিল আখ। তবে কিছু কিছু প্ল্যান্টেশনে কফি, কাকাও, নীল, তুলা, খাদ্যশস্য ও কাঠ উৎপাদনী বৃক্ষও উৎপাদন করা হত। ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত প্ল্যান্টেশন অর্থনীতি প্রসার লাভ করে। সেসময় এখানে ৫৯১টি প্ল্যান্টেশন ছিল, যাদের মধ্যে ৪৫২টি চিনি ও অন্যান্য বাণিজ্যিক শস্য উৎপাদন করত এবং এবং ১৩৯টি খাদ্যশস্য ও কাঠ উৎপাদন করত। ১৭৮৫ সালের পর কৃষি উৎপাদন হ্রাস পেতে থাকে। প্ল্যান্টেশনের মালিকেরা অন্যত্র আরও বেশি আয় করা শুরু করে, এবং দাসদের মুক্তিলাভের ফলে প্ল্যান্টেশনের খরচ বেড়ে যায়। ১৮৬০ সাল নাগাদ মাত্র ৮৭টি চিনির খামার অবশিষ্ট ছিল এবং ১৯৪০ সালে এসে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৪।

চিনি উৎপাদনকারী অন্যান্য দাসভিত্তিক উপনিবেশগুলির মত সুরিনামেও সমাজব্যবস্থা তিনটি স্তরে বিভক্ত ছিল। সবচেয়ে উপরের স্তরে ছিল একটি ক্ষুদ্র অভিজাত ইউরোপীয় শ্রেণী। এরা ছিল মূলত সরকারী কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, প্ল্যান্টেশনের মালিকেরা, যারা তাদের প্ল্যান্টেশনে বসবাস করত এবং প্ল্যান্টেশনের প্রশাসকেরা, যারা মালিকের অনুপস্থিতিতে সেগুলির দেখাশোনা করত। ইউরোপীয়দের সিংহভাগই ছিল ওলন্দাজ, তবে কেউ কেউ জার্মান, ফরাসি, বা ইংরেজও ছিলেন। অভিজাত শ্রেণীর ঠিক নিচের স্তরটিতে ছিল মুক্ত নাগরিকদের নিয়ে গঠিত মধ্যস্তর। জাতিগতভাবে বিচিত্র এই দলটির সদস্য ছিল সুরিনামে জন্ম নেওয়া ইউরোপীয় বংশদ্ভূত লোক, দাসী মহিলদের গর্ভে ইউরোপীয়দের ঔরসজাত সন্তানাদি, এবং যেসমস্ত দাসকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল বা যারা মুক্তি কিনে নিয়েছিল। সমাজের একেবারে নিম্নস্তরে ছিল দাসেরা, এবং এরাই ছিল সমাজের বৃহদংশ।

সুরিনামের দাসপ্রথা ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির। দাসদেরকে সম্পত্তির মত ব্যবহার করা হত, এবং তাদের কোন আইনি অধিকার ছিল না। ঔপনিবেশিক আইন অনুসারে দাসদের মালিকদের ছিল সর্বময় একচ্ছত্র ক্ষমতা। কোন কোন দাস নদীপথে পালিয়ে দেশের অভ্যন্তরভাগের অতিবৃষ্টি অরণ্যে স্বাধীন গ্রাম স্থাপন করে বিছিন্নভাবে বসবাস করত। উপনিবেশের সেনাদল দিয়ে এদের ধরে আনার অনেক চেষ্টা করা হলেও তারা তাদের স্বাধীনতা বজায় রাখে। এদের বংশধরেরা আজও সেসব এলাকায় বসবাস করে।

১৯শ শতকের শুরুর দিকে ইউরোপীয় মনোভাব দাসপ্রথা অবসানের প্রতি অনুকূল হয়। ১৯শ শতকের মধ্যভাগে ইংরেজ ও ফরাসিরা আইন করে তাদের দাসদের মুক্তির ব্যবস্থা করে। তখন ওলন্দাজেরাও তাদের উপনিবেশগুলিতে দাসদের মুক্তির ব্যাপারে প্রস্তুতি নিতে থাকে। সুরিনামের প্ল্যান্টেশন মালিকেরা ভয় করছিল যে মুক্তিপ্রাপ্ত দাসেরা আর প্ল্যান্টেশনে কাজ করতে চাইবে না। তাই আইন করে মুক্তির পরেও ১০ বছর ন্যূনতম ভাড়ায় সরকারী নির্দেশনায় দাসদের প্ল্যান্টেশনে কাজ করা বাধ্যতামূলক করা হয়। ১৮৬৩ সালে পূর্ণ মুক্তির পর প্রাক্তন দাসেরা ভাল বেতনের চাকরি ও উন্নত শিক্ষার আশায় পারামারিবো শহরে ভিড় জমাতে থাকে।

এই স্থানান্তরের ফলে সুরিনামের প্ল্যান্টেশনগুলিতে কর্মীর যে অভাব দেখা দেয়, তা পূরণ করতে এশিয়া থেকে শ্রমিক আমদানি করে নিয়ে আসা হয়। ১৮৫৩১৮৭৩ সালের মধ্যে ২৫০২ জন চীনা শ্রমিক এবং ১৮৭৩ থেকে ১৯২২ সালের ভেতর ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে আরও প্রায় ৩৪ হাজার, এবং ১৮৯১ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে ৩২,৯৬৫ জন শ্রমিক নিয়ে আসা হয়। এই শ্রমিকেরা নির্দিষ্ট সংখ্যক বছরের জন্য প্ল্যান্টেশনে কাজ করার প্রতিশ্রুতি সম্বলিত চুক্তি স্বাক্ষর করে এখানে কাজ করতে আসে। এদের অধিকাংশই কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিল। বর্তমানে এই এশীয় শ্রমিকদের বংশোদ্ভূতরা সুরিনামের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি অংশ গঠন করেছে।

ঔপনিবেশিক সরকার[সম্পাদনা]

ঔপনিবেশিক পর্বের অধিকাংশ সময় জুড়ে একজন ওলন্দাজ-নিযুক্ত গভর্নর সুরিনাম শাসন করতেন এবং তাকে এই কাজে দুইটি কোর্ট সাহায্য করত। এই কোর্টগুলির উপনিবেশের ভোটারদের দ্বারা নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্যে থেকে ওলন্দাজরা কর্মচারী বেছে নিত। ১৮৬৬ সালে কোর্টগুলি বিলুপ্ত করে একটি আইনসভা গঠন করা হয়, যদিও গভর্নরের আইনসভার নির্দেশের বিরুদ্ধে ভেটো প্রদানের ক্ষমতা ছিল। সম্পত্তি ও শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে কঠোর নিয়মের কারণে প্ল্যান্টেশনের মালিকেরাই সুরিনামের আইনসভায় প্রথমদিকে আধিপত্য বিস্তার করতেন। ওলন্দাজ সরকার যোগ্যতার নিয়ম শিথিল করার সাথে সাথে উচ্চ- ও নিম্ন-শ্রেণীর ক্রেওলেরা ১৯০০ সালের পর থেকে আইনসভায় আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে। তবে ১৯৪৯ সাল পর্যন্তও যোগ্য ভোটারের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ২%-এর বেশি ছিল না। ১৯৪৯ সালে সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ককে ভোটপ্রদানের ক্ষমতা দেয়া হয়।

১৯২২ সালে সুরিনাম নেদারল্যান্ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। ১৯৫৪ সালে একটি নতুন সংবিধান করে এটিকে ওলন্দাজ রাজ্যের অন্যান্য সদস্যদের সমমানের একটি সদস্যের মর্যাদা দেয়া হয়। অন্য সদস্যগুলি ছিল নেদারল্যান্ড্‌স নিজে এবং ক্যারিবীয় সাগরে অবস্থিত নেদারল্যান্ড্‌স অ্যান্টিল দ্বীপপুঞ্জ। এই নতুন সংবিধান মোতাবেক ওলন্দাজ সরকার সুরিনামের প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্কের দেখাশোনা করত এবং সুরিনামের গভর্নর নিয়োগ করত, আর সুরিনামবাসীরা একটি আইনসভা নির্বাচন করত, যা সুরিনামের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারগুলি দেখাশোনা করত।

স্বাধীনতা[সম্পাদনা]

১৯৭৩ সালের নির্বাচনে নেদারল্যান্ড্‌স থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা সমর্থনকারী একটি কোয়ালিশন জয়লাভ করে এবং প্রধানমন্ত্রী হেন্‌ক আরনের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে। এই সরকার ওলন্দাজ সরকারের সাথে স্বাধীনতার বিষয়ে কথাবার্তা বলা শুরু করে। ১৯৭৫ সালের ২৫শে নভেম্বর ওলন্দাজ সরকার সুরিনামকে স্বাধীনতা প্রদান করে। তবে প্রায় ৪০,০০০ লোক ওলন্দাজ নাগরিকত্বেই থেকে যান এবং সুরিনাম থেকে নেদারল্যান্ড্‌সে ফেরত চলে যান। ১৯৭৭ সালে নতুন স্বাধীন সুরিনাম প্রজাতন্ত্রের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে হেন্‌ক আরন তাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখেন।

সামরিক শাসন[সম্পাদনা]

১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি সামরিক অভ্যুত্থানে আরন ক্ষমতাচ্যুত হন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেজিরে বুতের্সে-র নেতৃত্বে একদল সেনা অফিসার জাতীয় সেনা কাউন্সিল গঠন করেন। ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই কাউন্সিল আইনসভা বিলোপ করে এবং সংবিধান স্থগিত করে। কাউন্সিল রাষ্ট্রপতি হেঙ্ক চিন সেনকেও ক্ষমতাচ্যুত করে। সেন ও আরও হাজার হাজার লোক নেদারল্যান্ড্‌সে পালিয়ে যান। বুতের্সে সুরিনামের জাতীয় নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন এবং সেনাপ্রধান হিসেবে দেশ চালাতে থাকেন। ১৯৮০১৯৮১ সালে পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা এবং ১৯৮২ সালে একটি গণতান্ত্রিক বিরোধী জোট গঠনের প্রচেষ্টাকে নিষ্ঠুর হাতে দমন করা হয়। ১৯৮৫ সালে সেনাবাহিনী ১৫ জন নাগরিকের উপর অত্যাচার চালায় ও তাদের হত্যা করে। এ ঘটনার পর নেদারল্যান্ড্‌স সুরিনামকে সাহায্য দেয়া বন্ধ করে দেয়। আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সেনাবাহিনী একটি নতুন আইনসভা গঠনে সায় দেয়। রাজনৈতিক দলগুলির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে নেয়া হয় এবং আরন আবার জাতীয় কাউন্সিলে যোগ দেন।

১৯৮৬ সালে দেশটিতে গেরিলা যুদ্ধ আরম্ভ হয় এবং অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ে। সুরিনামীয় মুক্তিবাহিনী নামের এই বিদ্রোহীরা সাংবিধানিক অবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালায়। কয়েক মাসের মধ্যে তারা প্রধান প্রধান বক্সাইট খনি ও শোধনকারী শিল্পগুলি বন্ধ করে দিতে সক্ষম হয়। এই সময় একটি নতুন সংবিধান রচনা করা হয় এবং ১৯৮৭ সালের গণভোটে ৯৩% ভোট পেয়ে এটি পাশ হয়।

বেসামরিক সরকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা[সম্পাদনা]

১৯৮৭ সালের সংবিধান নাগরিক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে। নভেম্বরের নির্বাচনে বুতের্সের দল ৫১টি আসনের মধ্যে মাত্র ২টিতে জয়লাভ করে, অন্যদিকে ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নামের বহুজাতিক দল ৪০টি আসন জেতে। ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় আইনসভা প্রাক্তন কৃষিমন্ত্রী রামসেওয়াক শংকরকে রাষ্ট্রপতি এবং আরনকে উপ-রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে। ১৯৮৮ সালে ওলন্দাজেরা আবার সুরিনামকে সাহায্য পাঠাতে শুরু করে এবং পরবর্তী সাত থেকে আট বছর ধরে ৭২১ মিলিয়ন ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়। বক্সাইট খনিগুলিতে আবার কাজ শুরু হয়।

সাংবিধানিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও বুতের্সে সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখেন। তিনি ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে শংকরের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। ১৯৯১ সালে নতুন করে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং নিউ ফ্রন্ট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নামের একটি কোয়ালিশন সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে। ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী ও নিউ ফ্রন্ট কোয়ালিশনের নেতা রোনাল্ড ভেনেতিয়ান রাষ্ট্রপতি পদ লাভ করেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচিনে ভেনেতিয়ানের কোয়ালিশন স্বল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়। ন্যাশনাল ডেমোক্র‌্যাটিক পার্টির জুল উইডেনবশ নতুন রাষ্ট্রপতি হন।

১৯৯৮১৯৯৯ সালে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, সরকারী চাকুরেদের বেতন প্রদানে ব্যর্থতা, এবং ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণের মত অর্থনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি হয় এবং দলে উইডেনবশের সরকারের উপর অনাস্থার সৃষ্টি হয়। ১৯৯৯ সালের মে মাসে দেশব্যাপী এক ধর্মঘট হয় ও মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। দেশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। উইডেনবশ এক বছর আগেই ২০০০ সালের মে-তে নির্বাচন দেন। এই নির্বাচনে ভেনেতিয়ানের নিউ ফ্রন্ট কোয়ালিশন বিজয়ী হয় এবং ২০০০ সালের আগস্টে ভেনেতিয়ান আবার রাষ্ট্রপতি পদলাভ করেন। জাতীয় সংসদে ভেনেতিয়ানের মূল বিরোধী দল ছিল মিলেনিয়াম কম্বিনেশন, যার নেতৃত্বে ছিলেন বুতের্সে।

১৯৯৭ সালে ওলন্দাজ সরকার বুতের্সের বিরুদ্ধে একটি আন্তর্জাতিক গ্রেফতার ওয়ারেন্ট জারি করে। তার বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডসে বিপুল পরিমাণে কোকেন পাচারের অভিযোগ আনা হয়। সুরিনাম বুতের্সেকে নেদারল্যান্ডসের হাতে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং এই অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে। ২০০০ সালের জুনে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের এক আদালতে বুতের্সেকে তার অনুপস্থিতিতেই বিচার ও শাস্তি প্রদান করা হয়। ২০০৪ সালে ওলন্দাজ ও সুরিনাম সরকার মাদক চোরাচালানি বন্ধের ব্যাপারে পরস্পরকে সহযোগিতার ব্যাপারে একমত হয়।

২০০৫ সালে সুরিনামের সর্বশেষ আইনসভা নির্বাচনে ভেনেতিয়ানের নিউ ফ্রন্ট কোয়ালিশন দশটি আসন হারায় এবং এর ফলে সংসদে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ক্ষুন্ন হয়। জুলাই মাসে ৫১-সদস্যবিশিষ্ট আইনসভা দুই দফা ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্ণয়ের চেষ্টা করে, কিন্তু ভেনেতিয়ান কিংবা বিরোধী প্রার্থী রাবিন পারমেসার কেউই দরকারী দুই-তৃতীয়াংশ ভোট অর্জনে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত ২০০৫ সালের আগস্ট মাসে ৮৯১ সদস্যবিশিষ্ট প্রাদেশিক কাউন্সিলের সভায় এক বিশেষ ভোটে ভেনেতিয়ান রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

রাজনীতি[সম্পাদনা]

১৯৭৫ সালে রচিত সংবিধান অনুযায়ী ১৯৮০ সাল পর্সন্ত সুরিনামের প্রশাসন চালানো হয়। জনগণ দ্বারা নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ছিলেন সরকার প্রধান, এবং তাকে সহায়তা করতেন একটি মন্ত্রণালয় ও এক-কাক্ষিক আইনসভা। ১৯৮০ সালে সামরিক ক্যু-এর পর সংবিধান স্থগিত করা হয় এবং আইনসভা রদ করে দেয়া হয়। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি কাউন্সিল দেশ শাসন করা শুরু করে।

১৯৮৭ সালে নতুন একটি সংবিধান গণভোটের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। এই সংবিধান অনুসারে ৫১ জন সদস্যের জাতীয় সংসদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষমতা দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতি ৫ বছর মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হন। জাতীয় সংসদের সদস্যরা ৫ বছরের জন্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন।

প্রশাসনিক অঞ্চলসমূহ[সম্পাদনা]

Suriname districts numbered.png

সুরিনাম দশটি জেলায় বিভক্ত:

  1. ব্রোকোপোন্দো জেলা
  2. কোম্মেউইনে জেলা
  3. কোরোনিয়ে জেলা
  4. মারোউইনে জেলা
  5. নিকারিয়ে জেলা
  6. পারা জেলা
  7. পারামারিবো জেলা
  8. সারামাক্কা জেলা
  9. সিপালিউইনি জেলা
  10. ওয়ানিকা জেলা

জেলাগুলি আবার ৬২টি রেসর্টে বিভক্ত।

ভূগোল[সম্পাদনা]

সুরিনামের উত্তরে আটলান্টিক মহাসাগর, পূর্বে ফরাসি গায়ানা, দক্ষিণে ব্রাজিল, ও পশ্চিমে গায়ানা। গায়ানা ও ফরাসি গায়ানার সাথে সীমান্তের দক্ষিণাংশ নিয়ে বিতর্ক আছে। সুরিনামের আটলান্টিক তটরেখা ৩৮৬ কিমি দীর্ঘ, এবং দেশটি আটলান্টিক তীর থেকে প্রায় ৪০০ কিমি ভেতর পর্যন্ত অবস্থিত। দেশটি তিনটি প্রধান ভৌগোলিক অঞ্চলে বিভক্ত: উপকূলীয় সমভূমি, সাভানা মালভূমি ও অরণ্যাবৃত উঁচুভূমি।

উপকূলীয় সমভূমি পশ্চিমে ৮০ কিমি থেকে পূর্বে ১৬ কিমি পর্যন্ত প্রস্থবিশিষ্ট। এটি মূলত সমুদ্র সমতল বা তার নিচে অবস্থিত জলাভূমি যার মাঝে মাঝে বালুময় এলাকার সারি অবস্থিত। পানি নিষ্কাশন করে ও বাঁধ নির্মাণ করে এই সমভূমি ক্ষেতখামারের কাজে ব্যবহার করা হয়। উপকূলীয় সমভূমির দক্ষিণে একটি সরু সাভানা তৃণভূমি কেন্দ্রীয় মালভূমিকে আবৃত করে রেখেছে। এখানে বিক্ষিপতভাবে কিছু চাষবাস হয়, কিন্তু মাটি বড় আকারের কৃষিকাজ চালানোর মত উর্বর নয়। সব মিলিয়ে দেশের মাত্র ১% ভূমি কৃষিকাজের উপযোগী। দেশের অভ্যন্তরের বাকী চার-পঞ্চমাংশ ঘন নিরক্ষীয় অরণ্যে আবৃত একটি উঁচুভূমি। উঁচুভূমিটি দেশের মধ্য-পশ্চিম অংশে গিয়ে পর্বতময় এলাকায় পরিণত হয়। পর্বত এলাকার দক্ষিণ-পশ্চিমে আরেকটি তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র সাভানা মালভূমি অবস্থিত।

সুরিনামের ভেতর দিয়ে চারটি প্রধান নদী উত্তরমুখে প্রবাহিত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে পড়েছে। পশ্চিম থেকে পূর্বে এগুলি হল যথাক্রমে কোরান্তিয়েন নদী (যা গায়ানার সাথে সীমান্তের অনেকটাই তৈরি করেছে); কপারনাম নদী; সুরিনাম নদী; এবং মারোউইন নদী (যা ফরাসি গায়ানার সাথে সীমান্ত তৈরি করেছে)। এগুলি ছাড়াও বেশ কিছু নদী আছে যেগুলি পরিবহন ও কৃষিকাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

জলবায়ু[সম্পাদনা]

সুরিনামের জলবায়ু নিরক্ষীয়, আর্দ্র ও বৃষ্টিবহুল। বার্ষিক তাপমাত্রা ২৩° থেকে ৩২°সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে। উপকূলীয় এলাকায় বাৎসরিক ৮০ ইঞ্চিরও বেশি বৃষ্টিপাত হয়। তবে ভেতরের দিকের এলাকায় এর পরিমাণ হ্রাস পেয়ে ৬০ ইঞ্চি হয়। প্রতি বছর দুইবার বর্ষা হয়; মধ্য-নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত একটি ছোট বর্ষাকাল এবং মার্চ থেকে মধ্য-জুলাইব্যাপী দীর্ঘ বর্ষাকাল। ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্য-মার্চ পর্যন্ত একটি ছোট শুষ্ক ঋতু এবং আগস্ট থেকে মধ্য-নভেম্বর পর্যন্ত আরেকটি শুষ্ক ঋতু বিরাজ করে।

প্রাকৃতিক সম্পদ[সম্পাদনা]

সুরিনামের প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে প্রধান হল বক্সাইট, লোহা, তামা, নিকেল এবং কাঠ। বক্সাইট ছাড়া বাকিগুলির বেশির ভাগই এখনও পূর্ণ ব্যবহার হয়নি। সুরিনামের পাহাড়ি জলপ্রপাতবিশিষ্ট নদীগুলি থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের চমৎকার সুযোগ আছে।

পরিবেশগত সমস্যা[সম্পাদনা]

সুরিনাম সরকার ১৯৯৮ সালে ৪০ লাখ একরের কেন্দ্রীয় সুরিনাম জাতীয় অভয়ারণ্য সৃষ্টি করেছেন। কাঠ শিল্পের কারণে বন উচ্ছেদ একটি বর্ধনশীল পরিবেশ সমস্যা। পরিবেশবাদী ও কাঠ ব্যবসায়ীদের মধ্যে এ নিয়ে বিরোধ আছে।

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

ক্ষুদ্র জনসংখ্যা, দেশের অভ্যন্তরে পরিবহনের স্বল্পতা এবং ১৯৮০-র দশকের সামরিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সুরিনামের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাধা দিয়েছে। বক্সাইট উত্তোলন এবং সেখান থেকে অ্যালুমিনা ও অ্যালুমিনিয়ামের নিষ্কাশন এখানকার আয়ের প্রধান উৎস এবং দেশটির প্রধান রপ্তানি দ্রব্য এই তিনটি পদার্থ। ফলে বিশ্ববাজারে এগুলির দামের উঠানামা সুরিনামের অর্থনীতিতে দারুণ প্রভাব ফেলে।

সুরিনামে সোনা, লোহা, ম্যাঙ্গানিজ, তামা ও অন্যান্য খনিজের ভাণ্ডার থাকলেও এগুলি এখনও অব্যবহৃত। সম্প্রতি দেশটি পেট্রোলিয়াম [১] ও স্বর্ণের [২] মজুদের ব্যবহার শুরু করেছে। উত্তোলিত পেট্রোলিয়ামের বেশির ভাগই দেশটি নিজেই ব্যবহার করে। সুরিনামে প্রস্তুত অন্যান্য দ্রব্যের মধ্যে আছে বিভিন্ন খাদ্য ও পানীয়, তামাকজাত দ্রব্য, নির্মাণ সামগ্রী এবং বস্ত্র।

কৃষিকাজ মূলত উপকূলের সমভূমিতেই সীমাবদ্ধ। ধান সুরিনামের প্রধান শস্য। দেশের অর্ধেক ক্ষেত খামার ধান উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। এর আগে আখ প্রধানতম অর্থকরী ফসল ছিল, তবে বর্তমানে এর তেমন গুরুত্ব নেই। অন্যান্য ফসলের মধ্যে আছে কলা, পাম তেল, লেবু-জাতীয় গাছ। উপকূলে চিংড়ির খামার প্রসার লাভ করেছে এবং চিংড়ি দেশটির অন্যতম রপ্তানি দ্রব্য।

পর্যটন[সম্পাদনা]

সুরিনামে পর্যটন এখনও তেমন উন্নত নয়। রাজধানী পারামারিবো-তে ওলন্দাজ ঔপনিবেশিক ধাঁচের কতগুলি দালান আছে। আর দেশের অভ্যন্তরভাগে আছে ক্রান্তীয় গাছপালা ও বন্য জীবজন্তু। দেশের অভ্যন্তরভাগে মূলত উড়োজাহাজে করে কিংবা নদীপথে যেতে হয়।

বাণিজ্য ও মুদ্রা[সম্পাদনা]

২০০১ সালে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩০৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমদানির পরিমাণ ছিল ৪৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মূলত খাবার, জ্বালানি ও শিল্পজাত দ্রব্য আমদানি করা হয়। সুরিনামের দ্রব্যের প্রধান ক্রেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, নরওয়ে, ফ্রান্সকানাডা। আর সুরিনাম যেসব দেশ থেকে আমদানি করে তারা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো এবং জাপান১৯৯৫ সালে সুরিনাম অ্যাসোসিয়েশন অফ ক্যারিবিয়ান স্টেটস নামের মুক্ত বাণিজ্য সংগঠনে যোগদান করে।

সুরিনামের মুদ্রার নাম সুরিনামি ডলার; এটি ১০০ সেন্টে বিভক্ত। ২০০৪ সালে ১ মার্কিন ডলারের মূল্যমান ছিল ২.৭৩৫ সুরিনাম ডলার। ২০০৪ সালের আগে মুদ্রাটির নাম ছিল সুরিনাম গিল্ডার। সেন্ট্রাল ব্যাংক ভান সুরিনাম টাকা ছাপায়।

পরিবহন ও যোগাযোগ[সম্পাদনা]

সুরিনামে পরিবহনের সুব্যবস্থা মূলত দেশটির উত্তরাংশেই সীমাবদ্ধ। দেশটিতে প্রায় ৫০০০ কিমি দীর্ঘ রাস্তা আছে। মূল মহাসড়কটি পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত এবং এটি আলবিনানিউ নিকারি-কে সংযুক্ত করেছে। কোন যাত্রীবাহী রেল পরিবহন নেই। সমুদ্র উপকূলীয় শহর ও দেশের অভ্যন্তরের গ্রামগুলির মধ্যে নৌ-পরিবহনই প্রধান। পারামারিবো এবং নিউ নিকারি প্রধান সমুদ্র বন্দর। মোয়েঙ্গো, পারানাম এবং স্মালকাল্ডেন বক্সাইট পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সুরিনামের প্রধান বিমানবন্দর জান্দেরিজে অবস্থিত। জাতীয় বিমান সংস্থার নাম সুরিনাম এয়ারলাইন্স

দেশটিতে অনেকগুলি বেতার স্টেশন এবং কয়েকটি টেলিভিশন স্টেশন আছে। মূলত ওলন্দাজ ও অন্যান্য ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়। ১৯৯৭ সালের তথ্য অনুযায়ী প্রতি ১০০০ জন সুরিনামবাসীর ৭২৮ জনের রেডিও, ২৫৩ জনের টেলিভিশন এবং ১৮২ জনের টেলিফোন সংযোগ ছিল।

জনসংখ্যা[সম্পাদনা]

সুরিনামের লোকসংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লাখ। এটি জনসংখ্যার দিক থেকে দক্ষিণ আমেরিকার ক্ষুদ্রতম দেশ। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যা মাত্র ৩, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন জনঘনত্বের একটি। দেশটির জনগণের অর্ধেকেরও বেশি পারামারিবো শহরে বাস করেন। ৩ লাখ জন-অধ্যুষিত পারামারিবো দেশটির বৃহত্তম শহর, রাজধানী ও প্রধান সমুদ্র বন্দর। সুরিনামের অভ্যন্তরে জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যন্ত কম।

সুরিনামের জনগণ জাতিগতভাবে বিচিত্র। প্রায় ৩৭% লোক ভারত থেকে আগত হিন্দু এবং দেশটির প্রধান জনগোষ্ঠী। আরও আছে ক্রেয়োল, যারা আফ্রিকান কিংবা আফ্রিকান-ইউরোপীয় মিশ্র জাতি এবং জনসংখ্যার ৩১%। আরও আছে ইন্দোনেশীয় (১৫%) এবং কৃষ্ণাঙ্গ ম্যারুন (১০%), আদিবাসি আমেরিকান (৩%), চীনা (২%) এবং ইউরোপীয় (১%)। স্বাধীনতার পর এবং পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে সামরিক একনায়ক ক্ষমতায় আসার পর অনেক সুরিনামী নাগরিক নেদারল্যান্ড্‌সে স্থায়ীভাবে চলে যান। কেউ কেউ নেদারল্যান্ড্‌সে পড়াশোনা ও চাকরির জন্যও যান।

সুরিনামের জাতিগত গোষ্ঠীগুলি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত এবং কিছু কিছু পেশার কাজ গোষ্ঠীবিশেষের জন্য নির্দিষ্ট। উচ্চবিত্তদের মধ্যে জাতিগত মেলামেশা অবাধ হলেও অন্যান্য অর্থনৈতিক শ্রেণীতে গোষ্ঠীগুলো একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে থাকতে ও নিজস্ব আচার ব্যবস্থা মেনে চলতে পছন্দ করে। ক্রেওল জনগোষ্ঠীর একটি ওলন্দাজ-শিক্ষায় শিক্ষিত ক্ষুদ্র উচ্চবিত্ত অংশ (সরকারী কর্মকর্তা ও পেশাজীবী) থাকলেও এদের অধিকাংশই অর্ধদক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক। পূর্ব ভারতীয়রা মূলত কৃষক, তবে ইদানিং এরা শহুরে পেশার দিকে মনোযোগী হচ্ছে। জাভানীয়রা মূলত খামার শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। চীনারা মূলত শহরে খুচরা দোকানদারি করে এবং মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্গত। ম্যারুন ও আদিবাসী আমেরিকানেরা দেশটির অনুন্নত অভ্যন্তরভাগে বসবাস করে। সুরিনামের ম্যারুন কৃষ্ণাঙ্গরা ওলন্দাজদের কাছে বুশ নিগ্রো (Bosch Negers) নামে পরিচিত; এরা পশ্চিম আফ্রিকান ধর্মকর্ম ও রীতিনীতি পালন করে এবং আফ্রিকান ধাঁচের চাষবাস ও মাছ ধরায় নিয়োজিত।

ভাষা[সম্পাদনা]

সুরিনামের জাতিগত বৈচিত্র‌্য এর ভাষার বৈচিত্র‌্যে প্রকাশিত। দেশটির সরকারী ভাষা ওলন্দাজ হলেও বেশির ভাগ মানুষ স্রানান টোংগো বা টাকি টাকি নামের একটি ক্রেওল ভাষায় কথা বলে। এই ক্রেওলটিতে বিভিন্ন ভাষার সম্মিলন ঘটেছে। সুরিনামে প্রচলিত অন্যান্য ভাষার মধ্যে আছে ইংরেজি ভাষাফরাসি ভাষা। এছাড়া আদিবাসী আমেরিকানেরা এখনও আদিবাসী ভাষায় কথা বলে থাকেন।

ধর্ম[সম্পাদনা]

সুরিনামের প্রধান ধর্মগুলি হল খ্রিস্টধর্ম। খ্রিস্টানদের বেশির ভাগই আফ্রিকান রোমান ক্যাথলিক, আর এশীয়দের প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে মোরাভীয় গির্জার অনুসারীদের সংখ্যা বেশি।

শিক্ষা[সম্পাদনা]

সুরিনামে ৬ থেকে ১২ বছরের ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক। ২০০০ সালে প্রায় ৬৫ হাজার শিশু প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে। সাক্ষরতার হার ৯৪.২%। সুরিনামের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় আন্টন ডি কোম বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৮ সালে পারামারিবো-তে প্রতিষ্ঠিত হয়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. (ইংরেজি) Rigzone Staatsolie Launches Tender for 3 Offshore Blocks
  2. (ইংরেজি) Cambior Development of the Gross Rosebel Mine in Suriname

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]