ঈশ্বরের অস্তিত্ব

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

ঈশ্বর আছেন কি নেই এটি অনেক প্রাচীনকাল থেকেই একটি দার্শনিক বিতর্কের বিষয়, যা বিভিন্ন সময়ে প্রতিটি সভ্যতায় যুক্তি ও তর্কের মাধ্যমে আলোচিত হয়ে এসেছে।[১] সভ্যতার শুরু থেকেই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব স্বীকারকারী আর অস্বীকারকারীদের এই বিতর্ক চলমান।

অবস্থান[সম্পাদনা]

আস্তিক্যবাদ[সম্পাদনা]

প্রথাগত আস্তিক্যবাদে ঈশ্বরের সংজ্ঞায়ন[সম্পাদনা]

ক্লাসিকাল আস্তিকবাদে, অন্যান্য ধারণা যেমন আস্তিকীয় ব্যক্তিবাদ, উন্মুক্ত আস্তিক্যবাদ এবং প্রক্রিয়া আস্তিকতা থেকে স্বতন্ত্রভাবে ঈশ্বরকে আধিভৌতিকভাবে চিহ্নিত করা হয় পরম সত্তা হিসাবে যিনি সর্বপ্রথম, নিরবধি, পরম সরল এবং সার্বভৌম সত্তা, যিনি কোনো নৃতাত্ত্বিক গুণাবলী বর্জিত। ক্লাসিকাল আস্তিকরা বিশ্বাস করেন না যে ঈশ্বরকে সম্পূর্ণরূপে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। তারা বিশ্বাস করে যে নিছক মানুষের পক্ষে ঈশ্বরকে সংজ্ঞায়িত করা তার অতীন্দ্রিয় প্রকৃতির বিরোধীতা করবে। রবার্ট ব্যারন উপমিতিসহ ব্যাখ্যা করেন যে, দ্বি-মাত্রিক বস্তুর পক্ষে ত্রিমাত্রিক মানুষের ধারণা করা অসম্ভব বলে প্রতীত হয়।

আধুনিক পশ্চিমা সমাজে, ঈশ্বরের ধারণার সাধারণ ফলস্বরূপ একেশ্বরবাদী, সর্বোচ্চ, চূড়ান্ত এবং ব্যক্তিগত সত্তার অন্তর্ভুক্ত করে, যেমনটি খ্রিস্টান, ইসলামিক এবং ইহুদি ঐতিহ্যে পাওয়া যায়। ইব্রাহিমীয় ঐতিহ্যের বাইরে একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোতে, ঈশ্বরের অস্তিত্বকে একই পরিভাষায় আলোচনা করা হয়। এই ঐতিহ্যগুলোতে, ঈশ্বরকে নির্দিষ্ট গ্রন্থের লেখক (হয় সরাসরি বা অনুপ্রেরণার মাধ্যমে) হিসাবেও চিহ্নিত করা হয়েছে, বা নির্দিষ্ট পাঠ্যগুলো ঈশ্বরের দ্বারা সৃষ্ট নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে বর্ণনা করে বা ঈশ্বরের কাছ থেকে যোগাযোগ (প্রত্যক্ষ বক্তৃতায় হোক বা স্বপ্ন বা অশুভের মাধ্যমে হোক)। কিছু ঐতিহ্যও বিশ্বাস করে যে ঈশ্বর হল সেই সত্তা যা বর্তমানে হস্তক্ষেপ বা তথ্য বা মতামতের জন্য প্রার্থনার উত্তর দিচ্ছে।

অনেক ইসলামী উলামা ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য দার্শনিক এবং বিবেকীয় প্রজ্ঞামূলক যুক্তির ব্যবহার করেছেন। উদাহরণ স্বরূপ, দ্বাদশ শতাব্দীর একজন ইসলামি পন্ডিত, দার্শনিক এবং চিকিৎসক ইবনে রুশদ বলেছেন যে শুধুমাত্র দুটি যুক্তি আছে যা মেনে চলার যোগ্য, যে দুটিকেই তিনি "মূল্যবান গ্রন্থ" (কোরআন) বলে অভিহিত করেছেন। রুশদ ঈশ্বরের অস্তিত্ব দাবি করার জন্য কোরানের নীতিগর্ভ উপমা ব্যবহার করে "বিমৃষ্য" এবং "উদ্ভাবন" উল্লেখ করেছেন। রুশদের যুক্তি মতে পৃথিবীর আবহাওয়ার ধরণগুলো মানুষের জীবনকে সমর্থন করার জন্য শর্তযুক্ত; সুতরাং, যদি কোন গ্রহ জীবন বজায় রাখার জন্য এত সূক্ষ্ম-রূপযুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে প্রত্যক্ষই এটি পরামর্শ দেয় একজন সূক্ষ্ম রূপকার- ঈশ্বরের অস্তিত্বের। সূর্য এবং চাঁদ মিল্কিওয়েতে ভাসমানরত কেবল এলোমেলো বস্তুই নয়, বরং তারা দিনরাত আমাদের সেবা করে এবং প্রকৃতি যে পন্থায় কাজ করে এবং যেভাবে জীবন গঠিত করে, মানবজাতি তা থেকে উপকৃত হয়। রুশদ মূলত একটি উপসংহারে পৌঁছেছেন যে, একজন উচ্চতর সত্তা থাকা বাধ্যতামূলক যিনি মানুষের প্রয়োজন মেটানোর জন্য নিখুঁতভাবে সবকিছু তৈরি করেছেন।

মূসা বিন মাইমুন, যিনি ব্যাপকভাবে মাইমোনাইডস নামে পরিচিত, একজন ইহুদি পণ্ডিত, তিনি যৌক্তিকভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। মাইমোনাইডস ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ দেন, কিন্তু তিনি অন্য সবার মত প্রথমে ঈশ্বরের সংজ্ঞা দিয়ে শুরু করেননি। বরং তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য পৃথিবী ও মহাবিশ্বের বর্ণনা ব্যবহার করেছেন। তিনি কথা বলেন স্বর্গীয় সংস্থাপন সম্পর্কে এবং কীভাবে তারা অনন্ত গতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মাইমোনাইডস যুক্তি দিয়েছিলেন যে যেহেতু প্রতিটি ভৌত ​​বস্তু সসীম, এটি শুধুমাত্র একটি সীমিত পরিমাণ শক্তি ধারণ করতে পারে। যদি মহাবিশ্বের সমস্ত কিছু, যার মধ্যে সমস্ত গ্রহ এবং নক্ষত্র রয়েছে, সসীম হয়, তাহলে মহাবিশ্বের সমস্ত কিছুর গতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি অসীম শক্তি থাকা বাধ্যতামূলক। একটি অসীম সত্ত্বাকে সংকুচিত করে, একমাত্র জিনিস যা গতিকে ব্যাখ্যা করতে পারে তা হল একটি অসীম সত্তা (অর্থাৎ ঈশ্বর) যা দেহের মধ্যে একটি শক্তিও নয়। মাইমোনাইডস বিশ্বাস করতেন যে এই যুক্তিটি আমাদেরকে ঈশ্বর আছেন তা বিশ্বাস করার জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করে, ঈশ্বর কি সে সম্পর্কে ধারণা নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ঈশ্বরকে বোঝা বা তুলনা করা যায় না।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

এই বিতর্কটি শুরু হয়ে ছিলো প্রাচীন ব্রোঞ্জ যুগ থেকেই প্রাচীন গ্রিকদের মাঝে, যখন গ্রিক দার্শনিকরা এ ব্যাপারে প্রশ্ন তুলে ছিল।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] প্রাচীন গ্রিক, মধ্যযুগীয় জাপানি ও নেটিভ আমেরিকানদের মাঝে বিতর্কটি তাদের দেবতার ধারণার মতোই পুরানো।

যুক্তিসমূহ[সম্পাদনা]

ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক ধরনের যুক্তি দেখান হয়ে থাকে। প্রাচীনকালে এই সকল যুক্তিগুলো দার্শনিক মতবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা পদার্থ বিদ্যার বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে এর পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়ে থাকে। দার্শনিক মতবাদে ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে বেশি যুক্তি থাকলেও বর্তমান অনেক পদার্থ বিজ্ঞানী ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশ্বাসীদের মতে ঈশ্বরের অস্তিত্ব কেবল ভাবগত ভাবেই উপ্লব্ধি সম্ভব। একে বিজ্ঞান দিয়ে প্রমাণের চেষ্টা অমুলক ও ব্যর্থ।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে ও বিপক্ষে এই সকল যুক্তিগুলোকে অধিবিদ্যা বা মেটাফিজিক্স, ব্যাবহারিক গবেষণা ও অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে হয়ে থাকে। দার্শনিক ভাবে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের বিষয়টি "জ্ঞানতত্ত্ব" (‘জ্ঞান কি’ এবং ‘কিভাবে এটি অর্জিত হতে পারে’ এধরণের আলোচনা) এবং "তত্ববিদ্যা" (স্বত্বার অস্তিত্বের প্রকৃতি সম্পর্কিত অধিবিদ্যার এক শাখা) আলোচিত হয়ে থাকে। 

দার্শনিক মতবাদ[সম্পাদনা]

পশ্চিমা দার্শনিকদের মাঝে প্লেটো এবং অ্যারিস্টট্ল, প্রথম সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের পক্ষে যুক্তি প্রদান করেন যা মহাজাগতিক যুক্তি তর্কের বিষয় বলে ধরা হয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] ঈশ্বর এর অস্তিত্ব আরো যে সকল তত্ত্ব আছে তার মধ্যে সেন্ট আন্যাসেলেমরা প্রণয়ন, দেন সত্তাতাত্ত্বিক যুক্তিইবনে রুসদ তার "কালাম যুক্তির" মাধ্যমেও সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন 

বৈজ্ঞানিক মতবাদ[সম্পাদনা]

বিজ্ঞানীরা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুসরণ করেন, যা বাস্তবিক পরীক্ষানিরীক্ষার দ্বারা তত্ত্ব যাচাইযোগ্য হতে হবে। এই ভিত্তিতে, সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সংক্রান্ত, যার জন্য প্রমাণ করা যাবে না, পরীক্ষা "definitionally" মিথ্যা বাইরে আওতার আধুনিক বিজ্ঞান। খ্রিস্টানদের ক্যাথলিক মণ্ডলী বজায় রাখে যে জ্ঞান ঈশ্বরের অস্তিত্ব হয়, "প্রাকৃতিক আলো মানবিক কারণে"।[২] Fideists স্বীকার করেন যে বিশ্বাস ঈশ্বরের অস্তিত্ব হতে পারে না, এক্তিয়ারভুক্ত বিক্ষোভের বা অপ্রমাণ, কিন্তু উপর অবস্থিত থাকলে সংশ্লিষ্ট বিশ্বাসের একা। নাস্তিকতার দেখেছে বিতর্কের জন্য সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব হিসেবে অপর্যাপ্ত, ভুল বা কম ওজনের তুলনায় যুক্তির বিরুদ্ধে। অন্যান্য ধর্ম যেমন বৌদ্ধ ধর্ম না, উদ্বেগের সঙ্গে নিজেদের দেবতা অস্তিত্ব সব সময়ে, যখন ধর্ম যেমন- জৈন ধর্ম সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যান, একটি স্রষ্টা দেবতা[৩]

আধুনিক বিজ্ঞান কোনো সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারেনি। বিজ্ঞানের মতে প্রকৃতির সবকিছু আপনা-আপনি সৃষ্টি হয়েছে। আর সৃষ্টির শুরু হয়েছে "Big Bang" বা মহাবিষ্ফোরণ সংঘটিত হওয়ার মাধ্যমে।

বিভিন্ন বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক উপমার সাহায্যে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে ভুল প্রমাণিত করার চেষ্টা করেছে। যেমন- ব্রিটিশ বিজ্ঞানী বার্ট্রান্ড রাসেল 'রাসেলের চায়ের কেতলি' নামক একটি বিখ্যাত তত্ত্বের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব কাল্পনিক বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তবে এসকল তত্ত্বের মাঝেও কিছু ত্রুটি রয়েছে।

প্রখ্যাত সাংবাদিক স্যাম হ্যারিসদানিয়াল ডেনেট দাবি করেছেন যে, ঈশ্বরবাদী ধর্মসমুহ ও তাদের ধর্মীয় পুস্তকসমুহ ঐশ্বরীয়ভাবে অনুপ্রাণিত না, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রয়োজনে সেগুলোকে মানুষই তৈরি করেছে। অর্থাৎ ঈশ্বর বা সৃৃষ্টিকর্তা নেই বলেই এই সব ধর্ম মানুষের সৃৃষ্টি। এর পরিপেক্ষিতে বিখ্যাত সাংবাদিক ক্রিস্টোফার হিচেন্স তার "গড ইজ নট গ্রেট" বইটি লিখেন। এরুপ সমালোচনার মাধ্যমে স্পষ্টতই সৃৃষ্টিকর্তার ধারণা কাল্পনিক বলে যুক্তি দেয়া হয়েছে।

বহির্জাগতিক প্রাণী বনাম. সৃষ্টিকর্তা[সম্পাদনা]

কিছু বিজ্ঞানী ভিনগ্রহের প্রাণিদের অস্তিত্বের সাথে ঈশ্বরের অস্তিত্বের তুলনা করে থাকেন। বিভিন্ন ধর্মের প্রাচীন মিথোলজিতে সৃৃষ্টিকর্তা বা স্বর্গীয় দূতেরা স্বর্গীয় বাহনে করে পৃৃথিবীতে নেমে আসে বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন- চৈনিক মিথোলজিতে, মহান সম্রাট ছিন শি হুয়াং (Qin Shi Huang) নাকি স্বর্গ থেকে নেমে এসেছিলেন এক স্বর্গীয় ড্রাগন এর পিঠে চেপে। তথাকথিত ভিনগ্রহের প্রাণীরাওতো অশনাক্ত উড়ন্ত বস্তু তে (ইউএফও) পৃথিবী তে নেমে আসে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি। তাদের (বিজ্ঞানী) মতে, প্রাচীনকালের মানুষরা হয়তো এই ইউএফওকেই স্বর্গীয় বাহন আর ভিনগ্রহের প্রাণীদের স্বর্গীয় দূত বা দেবতা ভেবে ভুল করে বসেছে। অর্থাৎ তাদের মতে তথাকথিত সৃৃষ্টিকর্তা বা দেবতারা আর কেউ না, তারা ভিনগ্রহের প্রাণী

১৯৭০ সালে দুই সোভিয়েত বিজ্ঞানী মাইকেল ভাসিন ও আলেকজান্ডার শারবাকোভ যুক্তি পেশ করেন যে চাঁদ "ফাঁপা"। যা বিজ্ঞানে "Hollow Moon Theory" বা "ফাঁপা চাঁদ তত্ত্ব" বলে। ভাসিন-শারবাকোভের মতে, চাঁদ হলো ফাঁপা এবং এর এর অভ্যন্তরে আছে একটি ভিনগ্রহের প্রাণীদের সামরিক ঘাঁটি। তারাই চাঁদ তৈরি করেছে পৃথিবীমানুষ এর কর্মকাণ্ডের উপর নজর রাখার জন্য।

এমনকি অনেক তত্ত্ব এমনও মত পোষণ করে, যে আমরা মানুষরাও নাকি ভিনগ্রহের প্রাণিদের দ্বারা তৈরি। অর্থাৎ ভিনগ্রহীরাই আমাদের সৃৃষ্টিকর্তা। ভিনগ্রহের প্রাণীরা পৃথিবীমঙ্গল গ্রহকে বেছে নিয়েছিল পরীক্ষামূলক প্রাণ সঞ্চারের জন্য। তাদের পরীক্ষায় জীব সৃৃষ্টি হলো এবং তা থেকে হলো মানুষ। মঙ্গল গ্রহের প্রাণ হয়তো কোনো কারণে বা ভিনগ্রহীদের ইচ্ছায় ধ্বংস হয়ে গেল। আর পৃৃথিবীরটা টিকে রইল।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. See e.g.
  2. Catechism of the Catholic Church, Paragraph 47; cf.
  3. Barron, Robert (২০১১)। Catholicism: A Journey to the Heart of the Faith। The Doubleday Religious Publishing Group। আইএসবিএন 9780307720511