২৪ পরগনা জেলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(অবিভক্ত চব্বিশ পরগণা থেকে পুনর্নির্দেশিত)
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান

১৭৫৭ সালে বাংলার নবাব মীরজাফর কলকাতার দক্ষিণে কুলপি পর্যন্ত অঞ্চলে ২৪ টি জংলীমহল বা পরগনার জমিদারি সত্ত্ব ভোগ করার অধিকার দেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকেএই ২৪টি পরগনা হল-১-আকবরপুর ২-আমীরপুর ৩-আজিমবাদ ৪-বালিয়া ৫-বাদিরহাটি ৬-বসনধারী ৭-কলিকাতা ৮-দক্ষিণ সাগর ৯-গড় ১০-হাতিয়াগড় ১১-ইখতিয়ারপুর ১২-খাড়িজুড়ি ১৩-খাসপুর ১৪-মেদনমল্ল ১৫-মাগুরা ১৬-মানপুর ১৭-ময়দা ১৮-মুড়াগাছা ১৯-পাইকান ২০-পেচাকুলি ২১-সাতল ২২-শাহনগর ২৩-শাহপুর ২৪-উত্তর পরগনা। সেই থেকে অঞ্চলটির নাম হয় ২৪ পরগণা

বন, বাদা, খাড়ি, ভেড়ি, নদ-নদী নিয়ে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক রূপ গঠিত। এর দক্ষিণে সুন্দরবনের কর্দমাক্ত সিক্ত বনাঞ্চল বাদাবন নামে পরিচিত।এই বাদাবন (Mangrove forest) র‌য়াল বেঙ্গল টাইগারের বাসভূমি। নদনদীর ভাটা দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয় বলে এই অঞ্চল একসময় ভাটিদেশ নামে পরিচিত ছিল।

প্রাচীন বাংলা[সম্পাদনা]

খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমির “ট্রিটিজ অন জিওগ্রাফি” বইয়ে গঙ্গারিডি বা গঙ্গারিদাই জাতির কথা বলা হয়েছে। গঙ্গারিডাই বা গঙ্গারিডি জাতির মানুষের আবাসস্থল ছিল এই অঞ্চলে।মৌর্যযুগের অনেক নিদর্শন সংলগ্ন অঞ্চলসমূহ থেকে মিলেছে।

২৪টি পরগনা সরাসরি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অংশ ছিল না। গৌড় রাজ শশাঙ্ক এই অঞ্চলে শাসন কায়েম করতে পারেনি। পাল বংশের রাজা ধর্মপালের রাজ্যভুক্ত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। তবে সেন যুগের বহু দেব-দেবীর মূর্তি জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আবিস্কৃত হয়েছে।

কলকাতার শিয়ালদহের কাছে পুকুর খুঁড়ে প্রায় ৩০ ফুট নিচে সুন্দরী গাছের অনেক গুড়ি পাওয়া গিয়েছিল। মাতলার কাছে ১০-১২ ফুট মাটি খুঁড়ে একসময় দেখা গিয়েছে যে, একাধিক সুন্দরী গাছ কঙ্কালের মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ থেকে বোঝা যায়, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে এ অঞ্চলের মাটি বসে গিয়েছে; সেজন্য ঘরবাড়ি, মন্দির, মূর্তি, রাজপ্রাসাদ ইত্যাদি কোন চিহ্ন এখানে দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তার অধিকাংশই মাটির তলায় সমাধিস্থ।[১]

“মনসামঙ্গল” কাব্যে ২৪ পরগনা জেলার অনেক জায়গার নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। চাঁদ সওদাগর চম্পকনগরী থেকে যাত্রা শুরু করে তাঁর তরী ভাসিয়েছিলেন ভাগীরথীর প্রবাহে।তিনি কুমারহট্ট, ভাটপাড়া,কাকিনাড়া,মুলাজোর,গারুলিয়া,ইছাপুর, দিগঙ্গা-চনক (ব্যারাকপুর),খড়দহ, চিৎপুর, কলিকাতা,কালীঘাট ইত্যাদি জায়গা পার হয়েছিলেন।তিনি চম্পকনগরী থেকে যাত্রা শুরু করে বারুইপুরে পৌঁছেছিলেন।

গঙ্গার প্রাচীন প্রবাহ কালীঘাট দিয়ে পূর্ব-দক্ষিণ অভিমুখে বৈষ্ণবঘাটা, গড়িয়া, রাজপুর, হরিনাভি, কোদালিয়া, চাংড়িপোতা, মালঞ্চ, মাহিনগর, শাসন, বারুইপুর, ময়দা,দক্ষিণ বারাসত, জয়নগর মজিলপুর, প্রভৃতি গ্রাম দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হত৷ সাগর অভিমুখী গঙ্গাপ্রবাহপথের এই গ্রামগুলি ধর্মার্থীদের কাছে পবিত্র ছিল এবং সেজন্য দাক্ষিণাত্য বৈদিক ব্রাহ্মণরা এখানে বহুকাল আগে থেকে বসবাস শুরু করেছিলেন।[২]

কর্ণপুর রচিত “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থে ও ২৪টি পরগনা জেলার অনেক জায়গার নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।“মনসামঙ্গল” কাব্যে ও “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থে পাওয়া বিভিন্ন জায়গার নাম ও বিবরণ তুলনা করলে দেখে যায় ২৪ পরগনা জেলার উক্ত জায়গাগুলির অস্তিত্ব ছিল। চাঁদসওদাগর বারুইপুরে পৌছে আদি গঙ্গা তীরবর্তী মনসামন্দির লুঠ করেন। শ্রীচৈতন্যদেব বারুইপুরের কাছে অতিসরাতে অনন্ত পন্ডিতের আতিথ্য গ্রহণ করেন।মথুরাপুর থানা অঞ্চলে ছিল ছত্রভোগ বন্দর।

ইসলামিক যুগ[সম্পাদনা]

জানা যায়, গৌড় থেকে মাহিনগর (পাঠান সুলতানদের রাজকর্মচারী মহীপতি বসুর নামানুসারে এই গ্রামের নাম) পর্যন্ত ভাগীরথী গঙ্গার প্রবাহ ছিল এবং এখানে সুলতান হুসেন শাহের (১৪৯৩ - ১৫১৮) নৌবহরের একটি বড় ঘাঁটি ছিল।[১]

ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে এই অঞ্চলের নদীপথে পর্তুগিজ জলদস্যুদের একচ্ছত্র আদিপত্য ছিল। পরবর্তি ১০০ বছর তাদের আদিপত্য বজায় ছিল উত্তর ২৪টি পরগনা ও দক্ষিণ ২৪টি পরগনার বসিরহাট অঞ্চলে। এই সময় পর্তুগিজ জলদস্যুদের অত্যাচারে অনেক সমৃদ্ধশালী জনপদ জনশূন্য হয়ে যায়।

মুঘল যুগ[সম্পাদনা]

১৭ শতাব্দীর শুরুতে প্রতাপাদিত্য যশোর,খুলনা, বরিশালসহ গোটা ২৪ পরগনা জেলার অধিপতি ছিলেন। যশোররাজ প্রতাপাদিত্য পর্তুগিজ জলদস্যুদের সঙ্গে বারবার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিলেন। তিনি সাগরদ্বীপ, সরসুনা ,জগদ্দল প্রভৃতি অঞ্চলে দুর্গ বানিয়ে এদের আটকাবার চেষ্টা করেন। ১৮৯০ সালে সুন্দরবন সফরকারী এক ইংরেজ সাহেব রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজপুরীর ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান; যা সেসময় 'The Statesman' পত্রিকায় 'The Ruined City of the Sunderbans' নামে প্রকাশিত হয়েছিল।[৩]

১৬১০ সালে মুঘল সেনাপতি মান সিংহের হাতে প্রতাপাদিত্য পরাজিত হন। ভবানন্দ মজুমদার নামে এক তালুকদারের বিশ্বাসঘাতকতায়, যিনি বর্ধমানে গিয়ে মান সিংহের সাথে দেখা করেন, এবং প্রতাপাদিত্যকে কীভাবে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলা যায় সে ব্যাপারে পরামর্শ দেন ।

মান সিংহ ছিলেন কামদেব ব্রহ্মচারীর শিষ্য । কামদেবের বংশধর হালিশহরের জায়গিরদার লক্ষীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়কে ১৬১০ সালে সম্রাট জাহাঙ্গির মাগুরা,পাইকান, আনোয়ারপুর, কলকাতা ইত্যাদি একুশটি অঞ্চলের জমিদারি স্বত্ত্ব দেন। প্রতাপাদিত্য যখন রাজা বসন্ত রায়কে হত্যার ষড়যন্ত্র করেন তখন থেকে প্রতাপাদিত্যের সংস্রব ত্যাগ করেছিলেন লক্ষ্মীকান্ত। হালিশহর নামটি লক্ষ্মীকান্তর পূর্বপুরুষ পাঁচু শক্তি খানের হাভেলির কারণে কালক্রমে হালিশহর হয় । পাঁচু শক্তি খান ছিলেন হুমায়ুনের আফগান সেনাদের প্রধান। লক্ষ্মীকান্তর বংশধরদের বলা হয় সাবর্ণ চৌধুরী, কেননা তাঁরা আকবরের কাছ থেকে 'রায়' এবং জাহাঙ্গিরের কাছ থেকে 'চৌধুরী' খেতাব পান।

লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার-এর নাতি কেশবচন্দ্র মজুমদার মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে দক্ষিণ ২৪ পরগনাখুলনার জমিদার নিযুক্ত হন।

ঔপনিবেশিক শাসন[সম্পাদনা]

১৭৫৭ সালে বাংলার নবাব মীরজাফর কলকাতার দক্ষিণে কুলপি পর্যন্ত অঞ্চলে ২৪ টি জংলীমহল বা পরগনার জমিদারি সত্ত্ব ভোগ করার অধিকার দেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে। এই ২৪টি পরগনা হল-১-আকবরপুর ২-আমীরপুর ৩-আজিমবাদ ৪-বালিয়া ৫-বাদিরহাটি ৬-বসনধারী ৭-কলিকাতা ৮-দক্ষিণ সাগর ৯-গড় ১০হাতিয়াগড় ১১-ইখতিয়ারপুর ১২-খাড়িজুড়ি ১৩-খাসপুর ১৪-মেদনমল্ল ১৫মাগুরা ১৬-মানপুর ১৭-ময়দা ১৮-মুড়াগাছা ১৯-পাইকান ২০-পেচাকুলি ২১-সাতল ২২-শাহনগর ২৩-শাহপুর ২৪-উত্তর পরগনা। সেই থেকে অঞ্চলটির নাম হয় ২৪ পরগণা।

ব্রিটিশ রাজ[সম্পাদনা]

১৭৫৯ সালে কোম্পানি লর্ড ক্লাইভকে এই ২৪টি পরগনা ব্যক্তিগত জায়গীর হিসাবে দেয়। ১৭৭৪ সালে লর্ড ক্লাইভের মৃত্যুর পর এটি আবার কোম্পানির হাতে চলে আসে। ইংরেজ আমলে ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনিক কারণে বহুবার ভাগ হয়েছে।১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার আগে পূর্ব পাকিস্তান হবার পর যশোর জেলার বনগাঁ২৪টি পরগনা জেলার মধ্যে চলে আসে এবং সুন্দরবনের বৃহত্তম অংশ খুলনা ও বাখরগঞ্জের মধ্যে চলে আসে। ইংরেজ আমলে কলকাতা ২৪ পরগনা জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভারতের রাজধানীতে পরিণত হয়।

স্বাধীনতা আন্দোলন[সম্পাদনা]

ভারত বিভাগ[সম্পাদনা]

স্বাধীনতার পর[সম্পাদনা]

১৯৮৩ সালে ডঃ অশোক মিত্রের প্রসাসনিক সংস্কার কমিটি এই জেলাকে বিভাজনের সুপারিশ করে। ১৯৮৬ সালে ১লা মার্চ জেলাটিকে উত্তর ২৪ পরগণা জেলাদক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা নামে দুটি জেলায় ভাগ করা হয়। দুটি জেলাই প্রেসিডেন্সি বিভাগের অন্তর্ভুক্ত।

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন[সম্পাদনা]

১৯২৩ সালে বারুইপুরের দু'মাইল উত্তর-পশ্চিমে গোবিন্দপুর গ্রামে দ্বাদশ শতাব্দীর সেনবংশীয় রাজা লক্ষ্মণসেনের গ্রামদানের একটি তাম্রশাসন পাওয়া যায় (দ্রষ্টব্য খাড়ি গ্রাম)। এই গ্রামে পুরানো একটি পুকুরপাড়ে (হেদোপুকুর নামে পরিচিত) কারুকাজ করা ইটের একটি স্তুপ দেখা যায়। গোবিন্দপুরের মাইলখানেক দক্ষিণে বেড়াল-বৈকুণ্ঠপুরে প্রাচীন একটি দুর্গের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায় এবং আরও দক্ষিণে কল্যাণপুর গ্রামে প্রাচীন একটি জীর্ণ মন্দিরে একটি শিবলিঙ্গ আছে যাঁকে 'রায়মঙ্গল' কাব্যের 'কল্যাণ-মাধব' বলে চিহ্নিত করা হয়।

বারুইপুরের পাঁচমাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে কুলদিয়া গ্রামে বেশ সুন্দর একটি সূর্যমূর্তি (১ ফুট ১০ ইঞ্চি উঁচু ও ১ ফুট চওড়া) এবং সঙ্গে বেলেপাথরের নৃসিংহের একটি প্লাক পাওয়া গিয়েছে। জয়নগর থানার মধ্যে দক্ষিণ বারাসাত গ্রামে বিষ্ণু, নৃসিংহের একাধিক পাথরের মূর্তি, বিষ্ণুচক্র, স্তম্ভ ইত্যাদি পাওয়া গেছে। এখানকার সেনপাড়ায় পুকুর খননের সময় মাথায় নিখুঁত বহুগুণাবিশিষ্ট সর্পছত্রযুক্ত জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের একটি নগ্নমূর্তির সন্ধান মিলেছিল। দক্ষিণ-বারাসাতের দুই মাইল দক্ষিণে বড়ুক্ষেত্র বা বহড়ু গ্রামেও ছ'ফুট উঁচু সুন্দর একটি সূর্যমূর্তি পাওয়া গেছে, গ্রামের লোক 'পঞ্চানন' বলে এর পূজা করেন। ময়দাগ্রামে পুকুর খুঁড়তে গিয়ে প্রায় দেড়ফুট উঁচু নৃত্যরত চমৎকার একটি গণেশমূর্তি পাওয়া যায়।

জয়নগরেও সূর্যমূর্তি পাওয়া গেছে; মথুরাপুরে ভূমিস্পর্শমুদ্রাযুক্ত একটি ভাঙা বুদ্ধমূর্তি এবং সূর্যমূর্তি পাওয়া গেছে। মথুরাপুরের দুই মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে ঘটেশ্বর গ্রামে বিংশ শতকের প্রথম দিকে পুকুর খননের সময় তিনটি জৈনমূর্তি পাওয়া যায়, তার মধ্যে একটি মূর্তি কুসংস্কারবশত জলে ফেলে দেওয়া হয়, একটি বেদখল হয়ে যায়, আর একটি মজিলপুরের কালিদাস দত্ত নিজের সংগ্রহে নিয়ে এসে রাখেন। কাঁটাবেনিয়া গ্রামেও অনুরূপ বিষ্ণুমূর্তি, বাসুদেবমূর্তি, গণেশমূর্তি, মন্দিরের দ্বারফলক, বড় বড় প্রস্তরস্তম্ভ এবং একটি বৃহৎ জৈন পার্শ্বনাথের নিখুঁত মূর্তি পাওয়া গেছে, এটি বর্তমানে বিশালাক্ষি দেবীর সঙ্গে গ্রামদেবতা 'পঞ্চানন'রূপে পূজিত হন।

জয়নগরের তিন মাইল দক্ষিণে উত্তরপাড়ার জমিদারদের একটি পুরানো কাছারিবাড়ির কাছে পুকুর সংস্কারের সময় তিনটি সুন্দর বিষ্ণুমূর্তি ও একটি দশভূজা দুর্গামূর্তি পাওয়া যায়; মূর্তিগুলো জমিদাররা তাদের উত্তরপাড়া লাইব্রেরিতে নিয়ে যান৷ ছত্রভোগে একটি কুবেরের মূর্তি, বিষ্ণু ও দশভূজা দুর্গামূর্তি, ব্রোঞ্জের গণেশ ও নৃসিংহমূর্তি পাওয়া গেছে। আটঘরা থেকে তাম্রমুদ্রা, মৃৎপাত্রের টুকরো, পোড়ামাটির মেষমূর্তি, যক্ষ্মিণীমূর্তি, শীলমোহর,তৈজসপত্র, পাথরের বিষ্ণুমূর্তি ইত্যাদি মিলেছে।

১৮৬০-এর দশকে মথুরাপুর থানার মধ্যে, লট নং ১১৬, পুরানো আদিগঙ্গার খাত থেকে এখানকার গভীর জঙ্গল পরিস্কারের সময় 'জটার দেউল' নামে একটি মন্দির আবিষ্কৃত হয়। অনেকের মতে, এখানে জটাধারী নামে এক শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত ছিল; আবার কারোর মতে, জটাধারী বড় বড় বাঘ এখানে ঘুরে বেড়াত। অধিকাংশ প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, জটার দেউলের স্থাপত্যশৈলীর সাথে ভুবনেশ্বরের দেউল স্থাপত্যের মিল আছে এবং সেদিক থেকে ও অন্যান্য আবিষ্কৃত নিদর্শন বিচার করে এর নির্মাণকাল আনুমানিক দ্বাদশ শতাব্দী।

১৯১৮ সালে জঙ্গল সাফ করার সময় জটার দেউলের ছ'মাইল দূরে দেউলবাড়ি নামক স্থানে (লট নং ১২২) এই ধরনের আরও একটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায় (এখন বিলুপ্ত)। এই স্থানের আধমাইল পূর্বে কমবেশি একবিঘা পর্যন্ত বিস্তৃত একটি অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ দেখা গিয়েছিল। ১৯২১-২২ সালে জটার দেউলের বারো-তেরো মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে জগদ্দল গাঙের কাছে আরও একটি মন্দিরের অবশেষের হদিশ মিলেছিল। মাটি খোঁড়ার সময় এখানে (বনশ্যামনগর) ইটের ঘর, প্রচুর ইট মৃৎপাত্রের টুকরো এবং মানুষের অস্থি-কঙ্কাল ইত্যাদি পাওয়া যায়।

এর আটমাইল উত্তর-পশ্চিমে (লট নং ১১৪) এসময় জঙ্গলের মধ্যে বেশ একটি বড় ইটের স্তুপ খুঁড়ে নিচে একটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়, গর্ভগৃহ ছাড়া এই মন্দিরের আর কোন অংশের চিহ্ন ছিল না। খননকালে চারটি বিষ্ণুমূর্তি (একটি ৪ ফুট উঁচু, দুটি ৩ ফুট ৪ ইঞ্চি এবং আরেকটি ৩ ফুট ২ ইঞ্চি উঁচু) ও একটি নটরাজমূর্তি (মূর্তিটি ৩ ফুট ১ ইঞ্চি উঁচু, দশহাতযুক্ত; গলায় আজানুলম্বিত একটি মালা আছে, মালার নিচে দশটি নরমুণ্ড ঝোলানো।)। এছাড়া, পাথরপ্রতিমা, রাক্ষসখালি প্রভৃতি অঞ্চলেও অষ্টধাতুর বুদ্ধমূর্তি , অন্যান্য পাথর ও পোড়ামাটির মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে।[৪]


তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ঘোষ, বিনয়, "পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি", তৃতীয় খন্ড, প্রথম সংস্করণ, প্রকাশ ভবন, পৃষ্ঠা: ১৫২
  2. ঘোষ, বিনয়, "পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি", তৃতীয় খন্ড, প্রথম সংস্করণ, প্রকাশ ভবন, পৃষ্ঠা: ২২০
  3. ঘোষ, বিনয়, "পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি", তৃতীয় খন্ড, প্রথম সংস্করণ, প্রকাশ ভবন, পৃষ্ঠা: ২৭৪
  4. ঘোষ, বিনয়, "পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি", তৃতীয় খন্ড, প্রথম সংস্করণ, প্রকাশ ভবন, পৃষ্ঠা: ১৫২-১৫৫

আকর গ্রন্থ[সম্পাদনা]

  • আদি গঙ্গার তীরে-ডঃ প্রতিসকুমার রায়চৌধুরী-মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, কলকাতা।
  • চব্বিশ পরগনার আঞ্চলিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি-গোকুল চন্দ্র দাস-প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স কলকাতা
  • পশ্চিমবঙ্গ-জেলা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা সংখ্যা
  • পশ্চিমবঙ্গ-শিবনাথ শাস্ত্রী সংখ্যা
  • দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার অতীত-কালিদাস দত্ত
  • রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ-শিবনাথ শাস্ত্রী

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]