অধিবর্ষ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

অধিবর্ষ বা লিপ ইয়ার (ইংরেজি: leap year) হচ্ছে একটি বিশেষ পঞ্জিকা বছর যেখানে সাধারণ বছরের তুলনায় একটি অতিরিক্ত দিন (বা চান্দ্রসৌর পঞ্জিকার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মাস) থাকে। জোতির্বৈজ্ঞানিক বছর বা ঋতুগত বছরের সাথে সামঞ্জস্য রাখার জন্য এই অতিরিক্ত দিন (বা মাস) যোগ করা হয়।[১] যেহেতু কোনো জোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা বা ঋতু কোনো স্বাভাবিক সংখ্যক দিন অন্তর পুনরাবৃত্ত হয় না, সেহেতু প্রতি বছরে নির্দিষ্ট সংখ্যক দিনবিশিষ্ট বর্ষপঞ্জি কালের সঙ্গে জোতির্বৈজ্ঞানিক বা ঋতুগত বছর থেকে বিচ্যুত হবে। কিছু বছরে একটি অতিরিক্ত দিন (অধিদিন) বা মাস (অধিকমাস) যোগ করলে কোনো সভ্যতার বর্ষপঞ্জিকে সৌরজগতের ভৌত ধর্মের সাথে সামঞ্জস্য রাখা যায়।

জোতির্বৈজ্ঞানিক বছর বা পৃথিবী যে সময়ে সূর্যের চারপাশে একবার ঘুরে আসে সেটি ৩৬৫/ দিনের থেকে সামান্য কম। ঐতিহাসিক জুলীয় বর্ষপঞ্জিতে পরপর তিনটি স্বাভাবিক বছরে ৩৬৫টি দিন এবং পরবর্তী অধিবর্ষে ৩৬৬টি দিন রয়েছে, এবং অধিবর্ষের সময় ফেব্রুয়ারি মাসে ২৮টি দিনের জায়গায় ২৯টি দিন থাকে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত সিভিল বর্ষপঞ্জি গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জিতে এই জুলীয় অ্যালগরিদমের সামান্য ত্রুটিকে সংশোধন করেছিল। গ্রেগরীয় অ্যালগরিদম অনুযায়ী, কোনো মাস ৪ দ্বারা বিভাজ্য এবং ১০০ দ্বারা বিভাজ্য না হলে তবে সেই বছর অধিবর্ষ হবে। কিন্তু ১০০ দ্বারা বিভাজ্য হলে সেই বছর অধিবর্ষ হবে না যদি ঐ বছর ৪০০ দ্বারা বিভাজ্য না হয়।

পৃথিবীর আহ্নিক গতির পরিবর্তনের ফলে অনেকসময় সর্বজনীন সমন্বিত সময়ে (ইউটিসি) একটি অতিরিক্ত সেকেন্ড (লিপ সেকেন্ড) যোগ করে দিনের দৈর্ঘ্যকে সংশোধন করা হয়। অধিদিন বা অধিমাসকে নিয়মিতভাবে যোগ করা হলেও লিপ সেকেন্ডকে নিয়মিতভাবে যোগ করা যায় না, কারণ আহ্নিক গতি নিয়ে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়।

কম্পিউটিং জগতে অধিবর্ষ এক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, যা লিপ ইয়ার বাগ নামে পরিচিত। কোনো বছরকে সঠিকভাবে অধিবর্ষ হিসাবে চিহ্নিত না করার ফলে বা যে লজিক দ্বারা তারিখ নির্ধারণ করা হয় সেই লজিকে ২৯ ফেব্রুয়ারি তারিখকে সঠিকভাবে না সামলাতে পারলে এই সমস্যা দেখা দেয়।

জুলীয় বর্ষপঞ্জি[সম্পাদনা]

খ্রিস্টপূর্ব ৪৫-এর ১ জানুয়ারিতে জুলিয়াস সিজার এক আদেশ জারি করে চান্দ্রসৌর রোমান বর্ষপঞ্জিকে এক খাঁটি সৌর পঞ্জিকায় রূপান্তরিত করেছিলেন, যার ফলে অধিকমাস যোগ করার প্রয়োজন থাকবে না।তাঁর বর্ষপঞ্জিতে অধিবর্ষের নিয়ম সহজ ছিল: প্রতি চার বছর অন্তর একটি অতিরিক্ত দিন যোগ করতে হবে। এই অ্যালগরিদমটি বাস্তবের অনেক কাছাকাছি: এক জুলীয় বছর সমান ৩৬৫.২৫ দিন এবং এক গড় সৌর বছর সমান প্রায় ৩৬৫.২৪২২ দিন।[২]

গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি[সম্পাদনা]

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে কোন শতাব্দীর বছরগুলিতে অধিবর্ষ রয়েছে তা দেখানো হয়েছে।

এই বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ৪ দিয়ে বিভাজ্য বছরগুলোকে অধিবর্ষ বলা হয়। যেমন: ২০০৪ সাল একটি অধিবর্ষ। তবে এই নিয়মের ব্যতিক্রমও আছে। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরতে একদম নিখুঁতভাবে ৩৬৫.২৫ দিন সময় নেয় না, একটু কম নেয়। তাই দেখা গেছে যে চার বছর পর পর অধিবর্ষ ধরলে প্রতি চারশ বছরে ৩ দিন সময় বেশি ধরা হয়ে যায়। এই সমস্যার সমাধানের জন্য যেসব বছর ১০০ দ্বারা বিভাজ্য,কিন্তু ৪০০ দ্বারা নয় তাদের অধিবর্ষের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়।[৩] যেমন: ৪ দ্বারা বিভাজ্য হওয়া সত্ত্বেও ১৯০০ সাল অধিবর্ষ নয়। কারণ এটি ১০০ দ্বারা বিভাজ্য কিন্তু ৪০০ দ্বারা নয়। আর এভাবে প্রতি চারশত বছরে তার থেকে ৩টি লিপ ইয়ার বাদ দিয়ে ‌সেন্ট গ্রেগরী লিপ ইয়ার এর সঠিক ধারণা প্রবর্তন করেন।[৪]

জুলীয় ক গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জিতে অধিদিন[সম্পাদনা]

২০০৮ সালের একটি দিনলিপিতে ২৯ ফেব্রুয়ারি।

সাধারণত প্রতি চার বছর অন্তর ফেব্রুয়ারি মাসে যোগ হওয়া অতিরিক্ত দিনকে অধিদিন বা লিপ ডে (ইংরেজি: leap day) বলা হয়। পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঠিক ৩৬৫ দিনে আবর্তন করে না বলে বর্ষপঞ্জিতে এই অতিরিক্ত দিন যোগ করা হয়। পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে পাশ্চাত্যে ২৯ ফেব্রুয়ারি তারিখকে অধিদিন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়, কিন্তু জুলীয় বর্ষপঞ্জি চালু হওয়ার সময় অধিদিনকে ভিন্নভাবে চিহ্নিত করা হতো। প্রথমত, ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝে অধিদিন যোগ করা হতো, শেষে নয়, এবং ২৪ ফেব্রুয়ারি তারিখকে দুবার ধরা হতো।[৫] দ্বিতীয়ত, এই অধিদিনকে গণনার মধ্যে ধরা হতো না, যায় ফলে অধিবর্ষে ৩৬৫টি দিনই থাকত।[৬]

জন্মদিন[সম্পাদনা]

২৯ ফেব্রুয়ারিতে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিগণ সাধারণ বছরে ২৮ ফেব্রুয়ারি বা ১ মার্চে তাদের জন্মদিন পালন করে। তবে স্থানীয় আইন কীভাবে সময়ের ব্যবধান নির্ণয় করে তার উপর বৈধ জন্মদিন নির্ভর করে।

বাংলা বর্ষপঞ্জি বা বাংলা সন[সম্পাদনা]

বাংলা বর্ষপঞ্জিতে অধিবর্ষের ধারণা দেখা যায় না। পরবর্তিতে বাংলাদেশে বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রস্তুত নতুন বর্ষপঞ্জিমতে বাংলা বর্ষপঞ্জিতেও গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসরণে ফেব্রুয়ারি মাসের সমসাময়িক বাংলা মাসে, সাধারণত ফাল্গুন মাসে, প্রতি চার বছর পর পর একবার অতিরিক্ত একটি দিন গণনা করা হয়। তবে ভারতে ও বাংলাদেশের হিন্দুগণ ধর্মীয় কারণে এই রীতি অনুসরণ করেন না। সনাতনী বাংলা বর্ষপঞ্জিতে অধিবর্ষ একটু জটিল নিয়মে আসে। এক্ষেত্রে সাল থেকে ৭ বিয়োগ করে ৩৯ দিয়ে ভাগ করতে হয়। যদি ভাগশেষ শূন্য বা চার দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য হয় তবে ঐ সালকে অধিবর্ষ ধরা হয়। আর অধিবর্ষের অতিরিক্ত এক দিন চৈত্র মাসে যোগ হয়। এই হিসাব অনুযায়ী প্রতি ৩৯ বছরে ১০টি অধিবর্ষ আসে, যেটা জোতির্বৈজ্ঞানিক বর্ষপঞ্জির সাথে যথেষ্ট সামাঞ্জস্যপূর্ণ। তবে অতি লম্বা সময় ধরে এই নিয়ম অনুসরণ করে গেলে সম্ভবত সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।

ইসলামিক বর্ষপঞ্জি[সম্পাদনা]

ইসলামী ক্যালেন্ডারের পরিমার্জিত ও গণনাকৃত সংস্করণগুলিতে নিয়মিত লিপ দিন নেই, যদিও উভয়ই চন্দ্র মাসের ২৯ বা ৩০ দিন ধারণ করে, সাধারণত বিকল্প ক্রমানুসারে। যাইহোক, মধ্যযুগে ইসলামিক জ্যোতির্বিদদের দ্বারা ব্যবহৃত ট্যাবুলার ইসলামী ক্যালেন্ডার এবং এখনও কিছু মুসলমানদের দ্বারা ব্যবহৃত একটি ৩০ বছরের চক্রের ১১ বছরের মধ্যে চন্দ্র বছরের শেষ মাসে একটি নিয়মিত লিপ দিন যোগ করা হয়। এই অতিরিক্ত দিন গত মাসের শেষে পাওয়া যায়, ধূ-ল-হিজা, যা হজ মাসেরও।

আহমদীয়া মুসলিম সম্প্রদায় কর্তৃক গৃহীত হিজরি-শমসী ক্যালেন্ডার সৌর হিসাবের উপর ভিত্তি করে তৈরি এবং এর কাঠামোর সাথে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের অনুরূপ যেটি প্রথম বছরের হিজড়া দিয়ে শুরু হয়।

অ্যালগোরিদম[সম্পাদনা]

কোন বছর অধিবর্ষ কিনা তা বের করার প্রোগ্রামিং সংকেতের সারসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হল :-

function isLeapYear(year){

if((year % 400 === 0) || ((year % 4 === 0)&& (year % 100 !== 0) )){

console.log(`${year} is a leap year !`)

}else{

console.log(`${year} is not a leap year !`)

}

}

isLeapYear(2025);

জন্মদিন[সম্পাদনা]

যেসব শিশুর জন্ম লিপ ইয়ারে তাদেরকে লিপার/লিপ্লিং বলা হয়। এসকল শিশুরা তাদের প্রকৃত জন্মদিন ৪ বছর অন্তর পালন করতে পারে এবং সাধারণ বছরগুলোতে ২৮ ফেব্রুয়ারি অথবা ১ মার্চ তারা জন্মদিন পালন করে। কিছু দেশে এ সম্পর্কে নীতি নির্ধারণ করা আছে। চীনে ১০ অক্টোবর ১৯২৯ থেকে সিভিল কোড অনুযায়ী একজন লিপ্লিং এর আইনগত জন্মদিন সাধারণ বছরগুলোতে ২৮ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৯৯০ থেকে হংকং এ একজন লিপ্লিং এর সাধারণ বছরগুলোর জন্য জন্মদিন ১ মার্চ নির্ধারিত।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Meeus, Jean (১৯৯৮), Astronomical Algorithms, Willmann-Bell, পৃষ্ঠা 62 
  2. Astronomical almanac online glossary, US Naval Observatory, ২০২০, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা, সংগ্রহের তারিখ ২৮ জানুয়ারি ২০২২ 
  3. https://www.timeanddate.com/date/islam-leap-year.html, Time and Date AS, n.d., retrieved February 29, 2012
  4. ধারণা প্রবর্তন করেন।, আর এভাবে প্রতি চারশত বছরে। "অধিবর্ষ (Leap Year)"বালুচর ব্লগ। ১৩ এপ্রিল ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৩ এপ্রিল ২০২১ 
  5. Pollard (1940), p. 188.
  6. Cheney (2000), p 145, footnote 1.

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]