যৌনসঙ্গম

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
নারী ও পুরুষের যৌনসঙ্গম। বাৎসায়নের কামসূত্র গ্রন্থে বর্ণীত একটি আসন চিত্রায়িত হয়েছে এখানে

যৌনসঙ্গম বা মৈথুন দুই জন মানুষের (বা প্রাণীর) দৈহিক মিলন যা ঘটে স্ত্রীর জননাঙ্গে (যোনি) পুরুষের জননাঙ্গ (শিশ্ন) প্রবেশের মাধ্যমে। যেসব প্রাণী যৌন জননের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করে তাদের সবাই যৌনসঙ্গমে পারঙ্গম। এর উদ্দেশ্য প্রজনন ও দৈহিক সুখ লাভ- এর যেকোন একটি বা উভয়টিই হতে পারে। সঙ্গম শেষে পুরুষের যখন রাগমোচন বা অরগ্যাজম ঘটে তখন তার জননাঙ্গ থেকে বীর্য নিঃসৃত হয়, যদিও বীর্যস্খলনের অন্য উপায়ও আছে (যেমন, হস্তমৈথুন)।

মানুষের ক্ষেত্রে মৈথুন সম্ভাব্য সবচেয়ে অন্তরঙ্গ ব্যবহার, এর মাধ্যমে পুরুষ ও নারী একে অপরের সবচেয়ে কাছাকাছি আসতে পারে। অনেকের জন্য এটাই আনন্দ ও সন্তুষ্টির সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম এবং প্রেম ও ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ। মৈথুনের এক পর্যায়ে সর্বোচ্চ আনন্দ লাভ হয়ে থাকে যাকে চরমানন্দ বা রাগমোচন (ইংরেজিতে Orgasm) বলা হয়। রাগমোচন কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এতে আনন্দের সাথে মিশে থাকে দেহ ও মনের এক ধরণের নিরুদ্বেগ শৈথিল্য। পুরুষের ক্ষেত্রে বীর্যস্খলনের সময়ই রাগমোচন লাভ হয়, এর পাশাপাশি পেশীর ক্রিয়ার কারণে তার শিশ্ন কয়েকবার কেঁপে ওঠে এবং অণ্ডকোষ শক্ত হয়ে একটু উপরে উঠে আসে। অধিকাংশ পুরুষের ক্ষেত্রেই রাগমোচনের অব্যবহিত পরেই পুনর্বার মৈথুন করা সম্ভব না, কেননা বীর্যপাতের সঙ্গে সঙ্গে শিশ্নের উত্থান রহিত হয়। শিশ্নের পুনরুত্থান তথা সঙ্গমশক্তি পুনরুদ্ধারের জন্য কিছুটা সময় লাগে। স্ত্রীর ক্ষেত্রে ইউটেরিন ও যোনির দেয়ালের পেশীগুলোর মুহুর্মুহু সংকোচনের মাধ্যমে রাগমোচন ঘটে। এটা ক্ষেত্রবিশেষে একসাথে কয়েকবার হতে পারে আবার সামান্য সময়ের ব্যবধানে হতে পারে। অনেক স্ত্রীর ক্ষেত্রে পুরো দেহব্যাপী অনেকক্ষণের জন্য রাগমোচন ঘটতে পারে। পুরুষের চেয়ে নারীর রাগমোচন অনেক দীর্ঘস্থায়ী হয়।[১]

উদ্দেশ্য[সম্পাদনা]

নর-নারীর সবচেয়ে প্রিয় যৌনাসন ‘যাজক আসন’।[২][৩]

প্রজনন প্রক্রিয়া[সম্পাদনা]

পৃথিবীর সকল প্রাণীই তার প্রজনন কর্ম সম্পাদন করে। প্রজননের ফল হচ্ছে শারিরিক সুখ এবং বংশ বৃদ্ধি করা। যৌনক্রিয়ার কেন্দ্রীয় অংশ হলো "যৌনসঙ্গম" বা স্ত্রী-অঙ্গে পুরুষাঙ্গের প্রবেশ এবং বীর্যপাত। এই প্রজনন প্রক্রিয়ার ফল স্বরুপ প্রাণী তার বংশ বিস্তার করে থাকে। বিভিন্ন প্রাণী বিভিন্নভাবে তার প্রজনন চালিয়ে থাকে। যেমন মানুষ তার প্রজনন চালায় স্বীয় নারী/পুরুষ দ্বারা। মানুষের প্রজনন প্রক্রিয়াটা সকল প্রাণী থেকে ভিন্ন। প্রজননের উদ্দেশ্যে সঙ্গম করলে স্ত্রীর যোনীর ভেতর শিশ্ন থাকা অবস্থায়ই পুরুষের বীর্যস্খলন করতে হয়। এতে বীর্যের মধ্যে থাকা শুক্রাণু স্ত্রীর দেহে ইতিমধ্যে থাকা ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ পায়। শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনের মাধ্যমে সৃষ্ট জাইগোটই সন্তান উৎপাদনের পথে প্রথম ধাপ। কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে স্ত্রীদেহের ভেতরেই সন্তান বেড়ে ওঠে এবং একসময় তার যোনীপথ দিয়েই সন্তানকে বের করে আনা যায়। তবে মাছের মত প্রাণীদের ক্ষেত্রে স্ত্রী ডিমটি আগেই বের করে দেয় যা ফুটে এক সময় বাচ্চা বের হয়। সকল স্তন্যপায়ী প্রাণীই যৌনসঙ্গম করে থাকে।[৪]

শারীরীক সুখ[সম্পাদনা]

মানুষ বিভিন্নভাবে যৌনসুখ পেতে পারে। তবে যৌনসুখের প্রধান অবলম্বন আরেকটি দেহ। একজন মেয়ে বা ছেলে তার বিপরিত জনকে দিয়েই সাধারণত: শারীরীক সুখ লাভ করে। শারীরীক সুখ বলতে এখানে শুধুই দেহভিত্তিক লালসা বা আনন্দকে বুঝিয়েছে। এক্ষেত্রে মানুষ চরম সুখ পেয়ে থাকে।

যৌনসঙ্গমের বিভিন্ন পর্যায়[সম্পাদনা]

মানুষ স্তন্যপায়ী প্রাণী। সকল স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো মানুষের ক্ষেত্রেও সাধারণত প্রথমে পুরুষ এবং স্ত্রী পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং কামাসক্ত হয়। এরপর পুরুষ ও নারী নিকটবর্তী হয়ে পরস্পরকে স্পর্শ করে এবং পুরুষটি তার সঙ্গিনীকে বিভিন্নভাবে আলিঙ্গন করে। পুরুষ এবং স্ত্রী পরস্পরের কামোদ্দীপক অঙ্গগুলি স্পর্শ করে যৌন বাসনাকে বর্ধিত করে। এরপর পুরুষটি তার শিশ্নটি (পুং জননাঙ্গ) স্ত্রীটির যোনিপথে প্রবেশ করিয়ে অঙ্গচালনা করে। অঙ্গচালনার এক পর্যায়ে পুরুষের বীর্যস্খলন হয়। এই ভাবে পুরুষ স্ত্রীযৌনাঙ্গে বীর্যদান করে। এই বীর্যের মধ্যে থাকে শুক্রানু যেটি স্ত্রী শরীরে ডিম্বানুর সঙ্গে মিলিত হয় এবং ফলে স্ত্রীর গর্ভসঞ্চার হয়।

শৃঙ্গার[সম্পাদনা]

দ্য কিস, রঁদ্যা সৃষ্ট ভাস্কর্য, ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দ

যোনীতে লিঙ্গ প্রবিষ্টকরণের পূর্বে কামোদ্দীপক কার্যকলাপকে বলা হয় শৃঙ্গার। আলিঙ্গন, চুম্বন, অঙ্গমর্দন, লেহন, দংশন প্রভৃতি স্বাভাবিক শৃঙ্গার হিসেবে পরিগণিত। বাৎসায়নের কামসূত্রে ৬৪টি কলার কথা উল্লিখিত আছে যা শৃঙ্গারের অন্তর্ভূত। এছাড়া মুখমৈথুন বা মুখে শিশ্ন প্রবিষ্টকরণ, যোনী বা পায়ুপথে আঙ্গুলি চালনা ইত্যাদিও শৃঙ্গারের অন্তর্ভূত। নাভিলেহন এবং নাভির গন্ধ শুঁকা সবচেয়ে জনপ্রিয় শৃঙ্গার ।[৫]

আসন[সম্পাদনা]

যৌনসঙ্গম কালে নারী-পুরুষের পারস্পরিক অবস্থানকে বলা হয় আসন ।

চরমানন্দ বা রাগমোচন[সম্পাদনা]

যৌনসঙ্গমের শেষ পরিণতি চরমানন্দ লাভ। এই অবস্থাকে বলা হয় রাগমোচন (অরগ্যাজম)। পুরুষের ক্ষেত্রে বীর্যপাতের মাধ্যমে রাগমোচন তথা চরমানন্দ লাভ হয়। স্ত্রীর ক্ষেত্রে কোন বীর্যপাতের ন্যায় বিশেষ ক্ষরণ বা নিঃসরণ হয় না।

গর্ভসঞ্চার প্রতিরোধ[সম্পাদনা]

যৌনসঙ্গম কালে স্ত্রী যোনীতে পুরুষের বীর্য নিক্ষেপের ফলে গর্ভসঞ্চারের সম্ভাবনা থাকে। এই সম্ভাবনা দূরীকরণের জন্য নানাবিধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। যেমন কনডম, জন্ম নিরোধক বড়ি ইত্যাদি। প্রজননের ইচ্ছা না থাকলে, পুরুষ স্ত্রীর যোনীর ভেতর বীর্য প্রবেশ করতে দেয় না। এর নানাবিধ উপায় রয়েছে: যেমন, বীর্যস্খলনের ঠিক আগে আগে শিশ্ন স্ত্রীর জননাঙ্গ থেকে বের করে আনা। তবে মানুষ কেবল আনন্দ ও সুখের জন্য যৌনসঙ্গমের আরও কিছু উপায় উদ্ভাবন করেছে, যেমন, পুরুষের জননাঙ্গে কনডম ব্যবহার, যাতে যোনীর ভেতর শিশ্ন থাকা অবস্থায় রাগমোচন ঘটলেও বীর্য স্ত্রীদেহে মিশতে না পারে। তাছাড়া স্ত্রী যদি নিয়মিত জন্মনিরোধক বড়ি বা পিল গ্রহণ করে তাহলে তার দেহে বীর্য মিশলেও সন্তানের জন্ম হয় না।

পায়ুকাম[সম্পাদনা]

পুরুষের সাথে পুরুষের যৌনসঙ্গম। এখানে রোমান সম্রাট হাড্রিয়ান ও তার সহচর আন্টিনোয়াসের সঙ্গম চিত্রায়িত করেছেন ফরাসি চিত্রকর এদুয়ার্দ-অঁরি আভরিল।

সাধারণভাবে স্ত্রী যোনীতে পুরুষ শিশ্ন প্রবেশকরণই যৌনসঙ্গমের রীতি। কিন্তু কোন কোন দম্পতি পায়ুপথকে যৌনাঙ্গ হিসাবে ব্যবহার করে এবং পুরুষ তার শিশ্ন স্ত্রীর পায়ুপথে প্রবেশ করিয়ে যৌনসঙ্গম করে।[৬] এর ফলে স্ত্রী জরায়ুতে পুরুষের বীর্যপাত হয় না, গর্ভধারণও সম্ভব নয়।[৭][৮] এছাড়া পুরুষ সমকামী ব্যক্তিবর্গ (গে) চরমানন্দের লক্ষ্যে একে অপরের পায়ুতে শিশ্ন প্রবেশ করায় ।[৯] পায়ুকামের ক্ষেত্রে যার পায়ুতে শিশ্ন প্রবেশ করানো হয় তিনি অনেক ব্যথা পান তবে প্রবেশকারী অনেক আনন্দ পেয়ে থাকেন।[১০]

পায়ুকাম করলে মলত্যাগ করার সময় পায়ুতে ব্যথা করে[১১] , কোষ্ঠকাঠিন্য হয়,[১২][১৩] পাইলস হয়,[১৪] মল আসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে মানুষ মারা যেতে পারে ।[১৫][১৬][১৭] এছাড়া অতিরিক্ত পায়ুকামের ফলে পায়ুপথে ক্যান্সার হয়।[১৮]

গবেষণায় দেখা গেছে যে যৌনক্রিয়ার সময় পুরুষের অন্তত একবার হলেও পায়ুপথে শিশ্ন প্রবেশ করানোর ইচ্ছা জাগে।[১৯] পায়ুপথে যোনির মতো পিচ্ছিলকারক পদার্থ নেই তাই অনেকে পায়ুপথে তেল ব্যবহার করে পিচ্ছিল করে তোলেন এতে শিশ্ন চালনা সহজ হয়।[২০] উল্লেখ্য কনডম ব্যবহার পায়ু ক্যান্সার নিরোধ করেনা ।[২১] অর্থাৎ কনডম ব্যবহার করলেও পায়ুপথে ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা থাকে ।[২২]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Sexual Intercourse, Sexual Health Center, Discovery Health
  2. Keath Roberts (2006)। Sex। Lotus Press। পৃ: 145। আইএসবিএন 8189093592, 9788189093594 |isbn= মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য)। সংগৃহীত August 17, 2012 
  3. Wayne Weiten, Margaret A. Lloyd, Dana S. Dunn, Elizabeth Yost Hammer (2008)। Psychology Applied to Modern Life: Adjustment in the 21st CenturyCengage Learning। পৃ: 423। আইএসবিএন 0495553395, 9780495553397 |isbn= মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য)। সংগৃহীত January 5, 2012 
  4. Sexual Intercourse, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা
  5. http://www.indiaparenting.com/boards/showmessage.cgi?messageid=10372&table_name=dis_loverel_sex
  6. http://www.webmd.com/sex/anal-sex-health-concerns
  7. উদ্ধৃতি ত্রুটি: অবৈধ <ref> ট্যাগ; Crooks নামের ref গুলির জন্য কোন টেক্সট প্রদান করা হয়নি
  8. SIECUS Prevalence of Unprotected Anal Sex among Teens Requires New Education Strategies"[১] Accessed January 26, 2010
  9. http://www.netdoctor.co.uk/sexandrelationships/analsex.htm
  10. http://goaskalice.columbia.edu/pain-anal-sex-and-how-prevent-it
  11. http://www.mckinley.illinois.edu/handouts/anal_sex.html
  12. http://www.gutsense.org/constipation/anal_sex.html
  13. http://www.justanswer.com/medical/77ng2-hi-suffering-constipation-having-anal-sex.html
  14. https://www.healthtap.com/topics/can-you-get-hemorrhoids-by-having-anal-sex
  15. http://ehealthforum.com/health/incomplete-bowel-movements-t175229.html
  16. http://goaskalice.columbia.edu/anal-protrusion-after-anal-sex
  17. http://expressmilwaukee.com/article-permalink-6938.html
  18. http://www.fascrs.org/patients/conditions/anal_cancer/
  19. http://www.thefrisky.com/2009-03-12/mind-of-man-why-guys-want-anal-sex/
  20. http://www.askmen.com/dating/love_tip_150/188_love_tip.html
  21. http://www.cancer.org/cancer/analcancer/detailedguide/anal-cancer-prevention
  22. http://www.cancer.org/healthy/findcancerearly/menshealth/cancer-facts-for-gay-and-bisexual-men

বহি:সংযোগ[সম্পাদনা]