আবু বকর ইবন আবী কুহাফা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
আবু বকর
রাজত্বকাল ৬৩২৬৩৪
সমাধিস্থল মসজিদে নববী
পূর্বসূরি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)
উত্তরসূরি উমর

আবু বকর ইবন আবী কুহাফা (আরবি: ابو بكر الصديق)(c. ৫৭৩–আগস্ট ২৩, ৬৩৪/১৩ হিজরী)[১] ইসলামের প্রথম খলিফা এবং ইসলাম গ্রহণকারী তৃতীয় ব্যক্তি। সুন্নী বিশ্বাসমতে তিনি খুলাফায়ে রাশীদুন-এর একজন অর্থাৎ সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত খলীফা। শিয়াদের মতে আবু বকর নবী মুহাম্মদের আদেশ অমান্য করে খলীফা হয়েছেন। তবে সকল ঐতিহাসিক এবং ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে আবু বকর ইসলামের প্রথম খলীফা হিসেবে চিহ্নিত।[২][৩][৪][৫][৬][৭][৮][৯] তিনি ৬৩২ থেকে ৬৩৪ সাল পর্যন্ত ইসলামী সাম্রাজ্যের খলীফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইবন সিরিনের মতে মুহাম্মদের পর ইসলামের আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য আবু বকরের কোন বিকল্প ছিল না এবং তিনি তার দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে সমর্থ হন। আয়েশার উদ্ধৃতিমতে আবু বকর এবং উসমান ইসলাম গ্রহণের পূর্বেউ কখনও মদ স্পর্শ করেননি। এসকল পর্যবেকষণের ভিত্তিতেই আবু বকরের দৃঢ়তার পরিচয় পাওয়া যায়।

পূর্ণ নাম ও বংশ[সম্পাদনা]

ওয়াজির খান মসজিদ, (ষোড়শ শতাব্দী) কেন্দ্রীয় নামাজ কক্ষের উত্তর দেয়ালে নবীর সাহাবীদের কথা লিখা আছে।

আবু বকর ছিল তার কুনিয়া তথা ডাকনাম; মূল নাম আবদুল্লাহ ইবন উসমান বা শুধু আবদুল্লাহ। তার বাবা উসমানের কুনিয়া ছিল আবু কুহাফা। এজন্য আবু বকরকে আবদুল্লাহ ইবন আবী কুহাফাও বলা হয়ে থাকে। ইসলামী জীবনচরিতে তার নাম আবু বকর সিদ্দিকী বলা হয়। আস-সিদ্দীক উপাধিটি নবী মুহাম্মদ তাকে দিয়েছিলেন। তার অন্য উপাধি ছিল আতিক বা আতিকুল্লাহ মিনান্‌ নার। আবু বকরের সিদ্দীক উপাধির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। নবী মুহাম্মদ এক রাত্রিতে সমগ্র মহাবিশ্ব পরিভ্রমণ করে আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভ করেছেন বলে কথিত আছে। এই ভ্রমণ ছিল প্রথমে মক্কা থেকে জেরুজালেম এবং পরে সেখান থেকে উর্দ্ধারোহন। ফিরে আসার পর কেউই তার কথায় বিশ্বাস করছিলোনা। কারণ পুরো ভ্রমনে পৃথিবীতে কোন সময়ই অতিবাহিত হয়নি। অনেক সাহাবীর মধ্যেও খানিক সন্দেহ দেখা দিয়েছিলো, অবশ্য তারা সবাই মেনে নিয়েছিলেন। ফিরে আসার পর মক্কার কুরাইশরা মুহাম্মদের সামনে আবু বকরকে প্রশ্ন করে, "তুমি কি এটি বিশ্বাস কর যে, মুহাম্মদ গত রাতে জেরুজালেম পর্যন্ত ভ্রমনে গিয়ে ফিরে এসেছেন?" জবাবে আবু বকর বলেছিলেন, "তিনি যদি এটি বলে থাকেন তবে আমি অবশ্যই বিশ্বাস করি। এর চেয়েও অধিক কিছু হলেও বিশ্বাস করতাম।" এই কথা বলার পরই নবী তাকে সিদ্দীক উপাধি দেন।[১০]

আবু বকর মক্কার বনু তাইম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। এই গোত্রটি কুরাইশ গোত্রের একটি উপ-গোত্র ছিল। কুরাইশ বংশের উপর দিকে ষষ্ট পুরুষে গিয়ে মুহাম্মদের বংশের সাথে আবু বকরের বংশ মিলিত হয়েছে। এই ষষ্ঠ পুরুষ ছিলন মুররা। জীবনকালে তার বেশ কয়েকটি ছেলেমেয়ে জন্মে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত আয়েশা যার সাথে নবী মুহাম্মদের বিয়ে হয়েছিলো। তার এক ছেলে মুহাম্মদ ইবন আবু বকর তার মৃত্যুর পর জন্মগ্রহণ করে। শিয়াদের মতে এই পুত্র আলীর পক্ষভুক্ত লোকদের মধ্যে অন্যতম ছিল। আবু বকর বিখ্যাত সাহাবী ও যোদ্ধা তালহা'র দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন।

জীবনী[সম্পাদনা]

৫৭৩ - ৬১০: প্রাথমিক জীবন[সম্পাদনা]

ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি

ইসলামের নবী মুহাম্মদের জন্মের মাত্র দুই বছরের কিছু বেশী সময় পর আবু বকর জন্মগ্রহণ করেন। অর্থাৎ তার জন্ম সাল ছিল আনুমানিক ৫৭৩। তার মৃত্যুও হয়েছিলো নবীর মৃত্যুর দুই বছর পর; তাই মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিলো নবীর বয়সের সমান।[১১] প্রথম জীবনে কুরাইশদের মধ্যে তিনি অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। তার জ্ঞান, মেধা, বুদ্ধি এবং সৎ চরিত্রের জন্য সবাই তাকে শ্রদ্ধা করত। সেই যুগে মক্কাবাসীদের দিয়াত বা রক্তের ক্ষতিপূরণের সমুদয় অর্থ তার কাছে জমা থাকত। আরবদের বংশীয় জ্ঞানে তিনি সুপণ্ডিত ছিলেন। তার কাব্য প্রতিভাও বিশেষ ক্রতিত্বের দাবীদার। বক্তৃতা বাগ্মীতা এবং ভাবগাম্ভীর্যে অনেকের উপরে ছিলেন। ব্যাবসায়ী ছিলেন বলেই অনেকের সাথেই তার ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল তার ঘরে মক্কার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়মিত সভা বসতো। তার বাবাও বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। তিনি প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণ না করলেও আবু বকরকে তেমন কোন বাঁধা দেননি। মক্কা বিজয়ের পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। অবশ্য আবু বকরের মা প্রাথমিক যুগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তার মা মক্কার দারুল আরকামে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি আবু বকর খলীফা থাকা অবস্থায় ৯০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

আবু বকর পরিবারের একমাত্র পুত্র সন্তান ছিলেন। বেশ বিলাসিতার সাথেই বড় হয়েছেন। বিশ বছর বয়স পর্যন্ত পিতার উপর নির্ভরশীল ছিলেন। এই বয়সে পিতার ব্যবসার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। শৈশব থেকেই আবু বকর এবং মুহাম্মদ (সাঃ) বন্ধু ছিলেন। নবীর অধিকাংশ বাণিজ্যিক সফরে আবু বকর সঙ্গী হয়েছিলেন। আবু বকরের মধ্যে আরবের কোন অপসংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়নি, কখনও মদ স্পর্শ করেননি। তার জীবনের সাথে মুহাম্মদের জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। যখন ইসলাম অবতীর্ণ হয় তখন তার বয়স ছিল আনুমানিক ৩৮ বছর। মুহাম্মদের কথায় মক্কার বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। এ সময় আবু বকর বিনা দ্বিধায় ইসলাম গ্রহণ করে নেন। এ সম্বন্ধে নবী মুহাম্মদ বলেছেন,


আমি যাকেই ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি, একমাত্র আবু বকর ছাড়া প্রত্যেকের মধ্যে কিছু না কিছু দ্বিধার ভাব লক্ষ্য করেছি

৬১০ - ৬৩২[সম্পাদনা]

৬৩২: মুহাম্মদের ইন্তেকাল[সম্পাদনা]

৬৩২ - ৬৩৪: খিলাফতকাল[সম্পাদনা]

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওফাতের কিছুকাল পূর্বে রোমানদের নিকট থেকে মোতা যুদ্ধের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য সৈন্য বাহিনী তৈরী করার হুকুম দিয়েছিলেন এবং সে সৈন্য বাহিনীর সেনাপতি হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) (যিনি মুতার যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন) তাঁর পুত্র হযরত উসামা (রা.) কে মনোনীত করেন। এযুদ্ধে অধিকাংশ প্রথম সাড়ীর সাহাবায়ে কেরাম যেমন হযতর আবু বকর উমর প্রমুখ সাহাবীগণও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু এই সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করার পূর্বেই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়েন। অতপর তিনি ইন্তেকাল করেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইন্তেকালের সাথে সাথে আরবের মাঝে ধর্মাš—রিতের প্রবণতা দেখা দিল। নওমুসলিম গোত্র সমূহ যাদের মাঝে ইমানের নূর পুরোপুরি ভাবে প্রতিফলিত হয়নি। তারা একে একে মুরতাদ হতে লাগল। এ পরিস্থিতি ইসলামের জন্য বড়ই নাজুক ছিল। ফলে কিছু সংখ্যক সাহাবী পরামর্শ দিলেন যে কিছুদিনের জন্য উসামার বাহিনীর যাত্রা মুলতবী করা হউক। প্রথমে মুরতাদদের শায়েস্থা করা হোক। কিন্তু আবু বরক (রা.) তাদের পরামর্শ গ্রহণ করলেন না। তিনি বললেন- যে ঝান্ডা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ মোবারক হাতে বেধে গেছেন, তা আমি খুলতে পারব না। অতপর কতিপয় সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেন, উসামা তো হালেন নবীন অনভিজ্ঞ ব্যক্তি, তাই তার স্থানে অন্য কাউকে নিযুক্ত করা হোক। তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল যাকে সেনাপতি নিযুক্ত করেছেন আমি কিভাবে তাকে বরখাস্থ করব। বাস্থবতা হলো এই যে, যদি আবু বকর (রা.) এ দুই পরামর্শের মধ্য হতে কোনো একটি মেনে নিতেন তাহলে অন্যান্যদের জন্য রাসূলের হুকুম হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যেতো। মোটকথা হযরত আবু বকর (রা.) উসামা বাহিনী রওয়ানা হওয়ার আদেশ দিলেন এবং তাদের বিদায় দেয়ার জন্য নিজেও কিছুদুর পযর্ন্ত এগিয়ে গেলেন। তিনি এভাবে গেলেন যে, হযরত উসামা ঘোর সাওয়ার আর তিনি পায়দল হেঁটে চলছেন। হযরত উসামা (রা.) বললেন, হে রাসূলের খলিফা আপনিও সাওয়ারীতে আরোহণ করুন। নতুবা আমাকে অনুমতি দিন যে আমি পায়দল হয়ে যাব। হযরত আবু বকর (রা.) জবাব দিলেন, আল্লাহর কসম দুটির কোনাটাই আমি মানব না। এতে কি অসুবিধা রয়েছে যে কিছুদূর হেঁটে আমি আল্লাহর রাস্থায় পায়ে ধুলো লাগাবো? অথচ গাজীর প্রতিটি কদমের বিনিময়ে ৭০০ নেকী লেখা হয়ে থাকে। উসামার সৈন্য বাহিনীর মাঝে হযরত উমর (রা.)ও শামিল ছিলেন। খালীফাতুল মুসলিমীন এর পরামর্শদাতা হিসেবে মদীনায় থেকে যাওয়া জরুরী ছিল। তাই হযরত আবু বকর (রা.) নিজ প্রয়োজনীয়তার কথা উললেখ করে হযরত উসামা (রা.) এর কাছে প্রস্থাব করলেন যে তিনি যে তাকে রেখে যান। উসামা (রা.) তাকে অনুমতি দিলেন। এটাও বাস্থবিক পক্ষ সেই নবুয়্যাত সত্তার খাতিরে ছিল। হযরত আবু বকর (রা.) এর দৃষ্টিভঙ্গি এই ছিল যে, হযরত উসামা (রা.) সেই পবিত্র সত্তার থেকে আদিষ্ট যার অনুগত্য আমার অনুগত্যের চেয়ে অগ্রগামী। অতএব তার ইখতিয়ার এর মাঝে আমার কোন ধরণের হেস্থপ করার অধিকার নেই।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

আবু বকরের খিলাফত[সম্পাদনা]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র এবং পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. "Abu Bakr Siddiq"anwary-islam.com। সংগৃহীত 2007-01-12 
  2. "The Rightly-Guided Caliphs"University of Southern California। সংগৃহীত 2007-01-12 
  3. "The Islamic World to 1600"University of Calgary। সংগৃহীত 2007-01-12 
  4. "The Caliphate"Washington State University। সংগৃহীত 2007-01-12 
  5. "Abu Bakr"Princeton University। সংগৃহীত 2007-01-12 
  6. "Abu Bakr"Columbia Encyclopedia, Sixth Edition 2006। সংগৃহীত 2007-01-12 
  7. "Abu Bakr"Encyclopædia Britannica। সংগৃহীত 2007-01-12 
  8. "Religion & Ethics - Islam"BBC। সংগৃহীত 2007-01-12 
  9. "Through a Glass Darkly: On the Misunderstanding of Islam and America and 9/11"University of Pennsylvania। সংগৃহীত 2007-01-12 
  10. "Abu Bakr." Watt; Encyclopedia of Islam.
  11. আবু বকর সিদ্দীক (রা)' - আসহাবে রাসূলের জীবনকথা; লেখক - মুহাম্মদ আবদুল মা'বুদ; অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পৃ. ২১
  • Fred Donner. The Early Islamic Conquests. Princeton University Press, 1981.
  • W. Montgomery Watt. Muhammad at Mecca. Oxford University Press, 1953.

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

সুন্নী:

অমুসলিম:

শ্রেণীবিহীন:

পূর্বসূরী:
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)
খলিফা
৬৩২৬৩৪
উত্তরসূরী:
উমর ইবনুল খাত্তাব