ঈসা খান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ঈশা খাঁ
মসনদ-এ- আলা
বাংলার বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম
রাজত্ব১৫৭৬–১৫৯৯
উত্তরসূরিমুসা খাঁ
জন্ম১৫২৯ খ্রিষ্টাব্দ
সরাইল, ভাটি অঞ্চল, শাহী বাংলা
মৃত্যুসেপ্টেম্বর, ১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দ (৭০ বছর বয়স)
ভাটি অঞ্চল, মুঘল সাম্রাজ্য
দাম্পত্য সঙ্গীফতেমা খান
সোনা বিবি
বংশধরমুসা খাঁ
প্রাসাদজঙ্গলবাড়ি দূর্গ
পিতাসুলাইমান খান
মাতাসৈয়দা মোমেনা খাঁতুন
ধর্মসুন্নি ইসলাম
বড় সরদার বাড়ি যা ঈশা খাঁর জমিদার বাড়ি নামে পরিচিত, সোনারগাঁও

ঈশা খাঁ বাংলার বারো ভুঁইয়া বা প্রতাপশালী বারোজন জমিদারদের অন্যতম।[১] ঈশা খাঁ এবং বারো জন জমিদার একসাথে বাংলায় স্বাধীনভাবে জমিদারী স্থাপন করে। ঈসা-খাঁর বাংলো বাড়ি কিশোরগঞ্জে অবস্থিত। তিনি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার সেইসময়ের জমিদার কুইচ রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করে বাংলো বাড়িটি র্নিমান করেন। ১৫৭৫ সালে সম্রাট আকবর বাংলা বিজয়ের পর বারো ভূঁইয়াদের ক্ষমতা কমে যায়। তখন সম্রাট আকবর বারো ভূঁইয়াদের দমন করতে অভিযান পরিচালনা করে সফল হননি। তখন সম্রাট আকবরের সেনাপতিকে পাঠান ঈসা-খাঁকে হত্যার জন্য কিন্তু বীর ঈসা-খাঁর সাথে সেনাপতি যুদ্ধে পরাস্ত হন। ঈসা-খাঁর অনেক নিদর্শন কিশোরগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে।

প্রারম্ভিক জীবন[সম্পাদনা]

ঈসা খানের দাদা ভগীরথ বাইস গোত্রের রাজপুত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি অযোধ্যা থেকে বাংলায় আসেন এবং বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ (রাজত্বকাল ১৫৩৩-১৫৩৮) এর অধীনে দেওয়ানের চাকরি গ্রহণ করেন। তাঁর পুত্র কালিদাস গজদানী তাঁর মৃত্যুর পরে এই পদটি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে সুফি দানিশমান্দের নির্দেশনায় গাজদানি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং সুলাইমান খান নামে নতুন নাম রাখেন।[২]

তিনি সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের (১৫৩৩-৩৮) মেয়ে সৈয়দা মোমেনা খাঁতুনকে বিয়ে করে ব্রাহ্মনবাড়িয়ার সরাইল পরগণা ও পূর্ব মোমেনশাহী অঞ্চলের জায়গীরদারী লাভ করেন।[৩]

১৫২৯ সালে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার সরাইল পরগণায় ঈসা খাঁর জন্ম। ১৫৪৫ সালে শের শাহের পুত্র ইসলাম শাহ দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করার পর সুলাইমান খাঁ দিল্লীর আনুগত্য অস্বীকার করলে কৌশলে তাঁকে হত্যা করে তাঁর দুই নাবালক পুত্র ঈসা খাঁ এবং ইসমাইল খাঁকে একদল তুরানী বণিকের নিকট বিক্রি করা হয়। ১৫৬৩ সালে ঈসা খাঁর চাচা কুতুব খাঁ রাজকার্যে নিযুক্তি লাভ করে বহু অনুসন্ধানের পর সুদূর তুরান দেশের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছ থেকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে ২ ভ্রাতুস্পুত্রকে উদ্ধার করেন। এ সময় ঈসা খাঁর বয়স মাত্র ২৭ বছর।

ক্ষমতায় আরোহণ[সম্পাদনা]

সুলতান তাজ খাঁ কররানী (১৫৬৪-৬৫) সিংহাসনে আরোহণ করেন ও ঈসা খাঁকে তাঁর পিতার জায়গীরদারী ফেরত দেন। বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান দাউদ খান কররানীর রাজত্বকালে (১৫৭২-৭৬) ঈসা খাঁ বিশেষ প্রতিপত্তি লাভ করেন অসাধারণ বীরত্বের জন্যে। ১৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দাউদ খান কাররানিকে ত্রিপুরার মহারাজা উদয় মানিক্যের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে অভিযানে সহায়তা করেন। তিনি ১৫৭৫ সালে সোনারগাঁও সংলগ্ন এলাকা থেকে মুঘলের নৌবাহিনীকে বিতাড়িত করতেও সহায়তা করেছিলেন। দাউদ খানের প্রতি ঈসার সেবা তাকে খিজিরপুরের মাসনাদ-ই-আলা উপাধি এনে দেয়।[৪] ১৫৭৫ সালের অক্টোবর মাসে বাংলার সুবাদার মুনিম খাঁর মৃত্যু হলে আফগান নেতা দাউদ খান কররানী স্বাধীনতা ঘোষণা করে নিজ নামে বাংলা ও বিহারে খুতবা পাঠ করান।

এরপর অনেক বীরত্বগাথাঁ রচিত হয়। সর্বশেষ ১৫৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বিক্রমপুর হতে ১২ মাইল দূরে ঈসা খাঁ, মাসুম খাঁ কাবুলীর সম্মিলিত বাহিনী দুর্জন সিংহকে (মানসিংহের ছেলে) বাধা দিলে দুর্জন সিংহ বহু মুঘল সৈন্যসহ নিহত হন। অনেকে বন্দী হন। কিন্তু সুচতুর ঈসা খাঁ মুঘলদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা উচিত বলে মনে করে আকবরের বশ্যতা স্বীকার করে নেন। তিনি বন্দীদের মুক্তি দেন এবং মানসিংহের সাথে আগ্রায় গিয়ে সম্রাট আকবরের সাথে সাক্ষাত করেন। সম্রাট এ বীর পুরুষকে দেওয়ান ও মসনদ-ই-আলা উপাধিতে ভূষিত করেন।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

ঈশা খাঁ কেদার রায়ের বিধবা কন্যা স্বর্ণময়ীকে অপহরণ করলে ক্রুদ্ধ কেদার রায় ঈশা খানের রাজধানী আক্রমণ করেন । কেদার রায়ের আক্রমণে ভীত ঈশা খাঁ প্রাণভয়ে মেদিনীপুরে পালিয়ে যান।[৫] কেদার রায় ঈশার প্রায় সম্পূর্ণ জমিদারির দখল নিয়ে নেন । ঈসা খান অজ্ঞাত রোগে তার স্ত্রী ফাতেমা খানের বাড়ি ফুলহরি (ফুলদি) জমিদার বাড়ি ১৫৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মারা যান। পরবর্তীতে তার শশুর জমিদার মুন্সী মুহাম্মদ নাসির খাঁর শাষনাধীন মৌজা বক্তিয়ারপুর (বক্তারপুর) বাজারের সন্নিকটে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। বাংলাদেশের গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত বক্তারপুর নামক গ্রামে তার সমাধি রয়েছে। সম্প্রতি ঈশা খাঁর সমাধিস্থলটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত উদ্যোগে নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. বাংলাপিডিয়া
  2. Hussainy Chisti, Syed Hasan Imam (১৯৯৯)। Sylhet : history and heritage। Sharif Uddin Ahmed (১ম সংস্করণ)। Dhaka: Bangladesh Itihas Samiti। পৃষ্ঠা ৬০০। আইএসবিএন 984-31-0478-1ওসিএলসি 43324874 
  3. AA Sheikh Md Asrarul Hoque Chisti। "Isa Khan"Banglapedia: The National Encyclopedia of BangladeshAsiatic Society of Bangladesh। ২৮ মার্চ ২০১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৫ মে ২০১৫ 
  4. Karim, Abdul (১৯৯২)। History of Bengal: From the fall of Daud Karrani, 1576 to the death of Jahangir, 1627 (ইংরেজি ভাষায়)। Institute of Bangladesh Studies, University of Rajshahi। 
  5. মেদিনীপুরের ইতিহাস, যোগেন্দ্রনাথ বসু