কেদার রায়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মহারাজা কেদারনাথ দেবরায়
বিক্রমপুরের মহারাজা
রাজত্ব১৫৬১-১৬০৩ খ্রি:
জন্ম১৫৬১ খ্রি:(১৫শ শতাব্দী)
বিক্রমপুর, বাংলা, ভারতীয় উপমহাদেশ (বর্তমান বাংলাদেশ)
মৃত্যুমার্চ ১৬০৩ খ্রি:
বিক্রমপুর, বাংলা, ভারতীয় উপমহাদেশ (বর্তমান বাংলাদেশ)
বংশধরচাঁদ রায় (পুত্র) স্বর্ণময়ী দেবী (কন্যা)
পিতাযাদব রায়
ধর্মশাক্ত হিন্দু

বাঙ্গালায় আগ্রাসী মুঘল আক্রমণ প্রতিহত করে স্বাধীন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাকারী শাসকদের মধ্যে বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম হলেন মহারাজ কেদারনাথ দেবরায় (১৫৬১-১৬০৩ খ্রি:) । সাম্রাজ্যবাদী মুঘল আক্রমন প্রতিরোধ এবং মুঘল-রাজপুত জোট সৈন্যশক্তিকে চারটি বিধ্বংসী যুদ্ধে পরাজিত করার জন্য তিনি বিখ্যাত । এছাড়াও উপকূলীয় অঞ্চলে পর্তুগিজ ও আরাকানি মগ জলদস্যুদের দমন করে তিনি বাঙ্গালীদের রক্ষা করেন । তিনি পূর্ববঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শাসন করেন, যার মধ্যে ঢাকা, বিক্রমপুর, কুমিল্লা, সিলেট, নোয়াখালী অন্যতম ।

বংশ[সম্পাদনা]

কুলীন না হওয়ার ফলে(তারা ‘দে’ উপাধিধারী ছিলেন)এই কায়স্থদ্বয়ের বিবরণ ‘ঘটককারিকা’ তে পাওয়া যায় না| একই কারণে এমন আরও অনেক বীর হয়তো ইতিহাসে স্থান পায় নি। শাসন ও বীরত্বের জন্য তাদের প্রভূত খ্যাতি ছিল| তিনি সম্ভবত পনেরো শতকের গোড়ার দিকে সেন আমলে বিক্রমপুরের আড়া ফুলবাড়িয়ায় বসতি স্থাপনকারী, রাজকর্মচারী নিম রায়ের বংশধর। নিম রায় ছিলেন দেববংশী বঙ্গজ কায়স্থ হিন্দু। সম্ভবত তিনিই ছিলেন এ বংশের প্রথম ভুঁইয়া এবং পুরুষানুক্রমে ভুঁইয়া উপাধি ধারণের সপক্ষে তৎকালীন শাসকের মঞ্জুরিও তিনি লাভ করেছিলেন। নিম রায়ের ষষ্ঠ পুরুষ যাদব দে রায়ের পুত্র কেদার তারই বংশোদ্ভূত|

রাজ্য[সম্পাদনা]

এই ভ্রাতৃদ্বয়ের রাজধানী ছিল ঢাকার শ্রীপুর বা বিক্রমপুর (বর্তমানে দক্ষিণ বিক্রমপুর তথা শরীয়তপুর জেলা| যা মুন্সিগঞ্জের দীঘিরপাড় ইউনিয়নের দক্ষিণে নদীতে বিলীন। যা ছিল কালীগঙ্গা নদীর তীরবর্তী।

কেদার রায় শাসন করতেন পদ্মার দুইপারের বিস্তীর্ণ জনপদ। শ্রীপুর ছিল তাদের রাজধানী। বিক্রমপুর, ইদ্রাকপুর, ইদিলপুর, কেদারপুর, চাঁদপুরের বৃহৎ অংশ জুড়ে ছিল তাদের রাজত্ব। এই ইদিলপুরই এখন বাংলাদেশের শরীয়তপুর জেলা। কিছুকাল আগেও এটি বৃহত্তর মাদারিপুরের অধীনে ছিল। কালীগঙ্গা নদীর বুক দিয়ে পদ্মানদী প্রবাহিত হওয়ার পরে কেদার রায়ের স্মৃতিবিজড়িত সিংহভাগই কীর্তিনাশা বা পদ্মা নদীতে ভেসে গেছে, কেদার রায়ের রাজধানী শ্রীপুরের শেষচিহ্ন ১৯২৩ সালে নদীতে বিলীন হয়। শ্রীপুরের দক্ষিণে চন্ডিপুর অঞ্চল এখানে ছিল কেদার রায়ের সবচেয়ে বড় যুদ্ধকুঠি, যা পর্যায়ক্রমে নদীতে বিলীন হয়ে যায়।মোগল বাহিনীর থেকে বিক্রমপুরের স্বাধীনতা বজায় রাখতে আরও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে শ্রীপুরে কয়েক মাইল দক্ষিণে কেদারপুরে তিনি প্রাসাদ নির্মাণ শুরু করেন , যা সমাপ্ত হওয়ার আগেই বর্তমান নড়িয়া উপজেলার ফতেহ্জঙ্গপুরে মোগলদের সাথে চতুর্থ যুদ্ধে কেদার রায় নিহত হন। তার স্মৃতিচিহ্নকে কেন্দ্র করেই ফতেহ্জঙ্গপুর ও কেদারপুর গ্রামের নামকরণ হয়।মুন্সিগঞ্জের টংগিবাড়ী উপজেলার দীঘিরপাড় ইউনিয়নটিও তার খনন করা কেশার মায়ের দীঘিকে কেন্দ্র করে পদ্মানদীর উত্তরপাড়ে টিকে আছে।

শরীয়তপুরের গ্রাম রায়পুর । কেদার রায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গ্রামটি। তাদের রায়বংশের নামে নাম হয়েছিল রায়পুর যা কয়েক শতাব্দী ধরে ছিল। সেই গ্রামের নাম এখন পুটিজুরি। আজ আর চাঁদ রায়, কেদার রায়দের কোন চিহ্নমাত্র নেই সেখানে। শুধু পাশের গ্রামে তাদের খনন করা দুটি বিশাল দীঘি রয়ে গেছে। এখনো দিগম্বরী দেবীর পূজা হয় সেখানে। তাই এই দিঘীগুলোর বর্তমান নাম দিগম্বরীর দীঘি। শুধু এই দীঘি দুটিই পদ্মার এপারে বারোভূঁইয়া কেদার রায়কে মনে রেখেছে। কেদার রায়ের খনন করা দিগম্বরীর দিঘির একটু দূরেই এখনও কিছু পোড়া ইট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা বাড়ি। সেখানে এখন অন্য লোকের বসতি। স্থানীয় লোকেরা বাড়িটাকে বলে ‘ভিয়া বাড়ি’। আসলে ‘ভুঁইয়া বাড়ি’ মানুষের মুখে মুখে অপভ্রংশ হতে হতে ‘ভিয়া বাড়ি’ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই বাড়ির লোকেরাও আজ জানে না কে বা কারা ছিল এই ভিয়া বা ভূঁইয়া। নিজের বাড়িতেই আজ বিস্মৃত কেদার রায়।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আক্ষেপ করে বলেছিলেন -

‘বাংলার বারোভুঁইয়ারা ইতিহাসে বঞ্চিত। বড় বড় ইতিহাস গ্রন্থগুলিতে শুধু মুঘল-পাঠানদের দ্বন্দ্বই স্থান পেয়েছে, বাংলার এইসব বীর যোদ্ধাদের কাহিনী উপেক্ষিত।’


বারো ভুঁইয়াদের সাথে সম্পর্ক[সম্পাদনা]

ঈসা খাঁয়ের সাথে তার পূর্বে শখ্যতা ছিল| মোগলবিরোধিতা ছিল তার একটা কারণ। কেদার রায় আর ঈশা খাঁ দুজনে ছিলেন ভাল বন্ধু। একসাথে যুদ্ধ করেছিলেন আরাকান রাজের বিরুদ্ধে। জয়ীও হয়েছিলেন। অল্পকাল ছিল তাদের বন্ধুত্ব। সেই অল্পকালেই এই মিলিত শক্তিকে ভয় পেত আরাকানের মগ বাহিনী। মানসিংহও অনেক ছক কষেছিলেন এই মিলিত বাহিনীর জন্য। ব্রিটিশ রানী এলিজাবেথ কর্তৃক সম্রাট আকবরের দরবারে প্রেরিত দূত রালফ ফিচ উল্লেখ করেছেন, তার শ্রীপুর সফরকালে (১৫৮৬) সেখানকার শাসক আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হন। কুতলু লোহানীর (উড়িষ্যার লোহানী রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা) সঙ্গে কেদার রায়ের শখ্যতা ছিল। তিনি খাজা সুলায়মান লোহানীর সহযোগিতায় মুঘল দুর্গাধিপতির নিকট থেকে ১৫৯৩ সালে ভূষণা দুর্গ দখল করেন এবং ১৫৯৬ সাল পর্যন্ত এ দুর্গ স্বীয় অধিকারে রাখেন। ওই বছরই দুর্জন সিংহের নেতৃত্বে মুঘল বাহিনী ভূষণা দুর্গ আক্রমণ করে। মুঘল অবরোধকালে দুর্গের অভ্যন্তরে কামানের গোলা বিস্ফোরণে সুলায়মান লোহানী নিহত হন এবং কেদার রায় আহত হয়ে সোনারগাঁওয়ে ঈসা খাঁর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেন।[১]

কেদার রায় বনাম ঈসা খা[সম্পাদনা]

পরবর্তী কালে কেদার রায় ও চাঁদ রায়ের সাথে ঈসার বন্ধুত্ব শত্রুতায় পরিণত হয়|কারণ ঈসা খা জোর করে কেদার রায়ের বিধবা কন্যা স্বর্ণময়ীকে বিয়ে করে ছিলেন| স্বর্ণময়ীর রূপ দেখে মোহিত হয়েছিলেন ঈসা খাঁ। বিয়ে করতে চায় বিধবা স্বর্ণময়ীকে।বাবা চাঁদ রায় ও ভাই কেদার রায় দুজনেই ভয়াবহ ক্ষেপে উঠলেন এতে। কেদার রায় আর ঈসা খাঁর বন্ধুত্ব সেখানেই শেষ। ঈসা খাঁ একদিন যাত্রা পথে আক্রমণ করে স্বর্ণময়ীকে তুলে নিয়ে যায়। তার নাম হল সোনাবিবি।কেদার রায়ের কুলগুরু শ্রীমন্ত খাঁ(ভট্টাচার্য) স্বর্ণমণিকে ছলপূর্বক ইসার হাতে তুলে দেয় | শ্রীমন্তের প্রতিহিংসাপরায়ণতার কারণ ছিল তার পরিবর্তে এক দেবল ব্রাহ্মণকে কেদার-চাঁদ ভ্রাতৃদ্বয়ের গুরু রূপে গ্রহণ করা| স্বর্ণময়ী বা সোনাবিবির নাম থেকে ঈসা খাঁর রাজধানীর নাম লোকমুখে সোনারগাঁ হয়েছে।এরপর এনায়ৎ খানকে দূতরূপে পাঠিয়েছিল চাঁদ রায়ের কাছে পত্র দিয়ে। এর ফলে ক্রুদ্ধ কেদার রায় ঈসা খানের কলাগাছিয়া দুর্গ আক্রমণ করে বিধ্বস্ত করেন| সেখান থেকে ঈসা পলায়ণ করে মেদিনীপুরে ত্রিবেণী দুর্গে চলে যায়|

কেদার রায় তীব্র যুদ্ধে ঈসা খাকে হারিয়ে একের পর এক অঞ্চল বিধ্বস্ত ও করায়ত্ত করতে থাকেন| এরপর এক ছিন্ন করে ঈশা খার রাজধানী আক্রমণ করেছিলেন।আরাকান রাজের সাথে যুদ্ধে ঈশা খাকে সাহায্য করলেন না|মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি ঈশা খাকে ক্রমাগত আক্রমণ করেছিলেন[২]

নৌবাহিনী[সম্পাদনা]

তিনি বিপুলসংখ্যক রণতরীর অধিকারী কেদার রায় একটি সুশিক্ষিত নৌবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন এবং কিছু ভাগ্যান্বেষী পর্তুগিজকে তার রণতরীর অধ্যক্ষ নিয়োগ করেছিলেন। তাদের মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন ডোমিনিঙ্গ কার্ভালো। মধ্যযুগের ভারতে হওয়া সবচেয়ে বিধ্বংসী নৌযুদ্ধে জয়ী হয়েছেন কেদার রায় ।

দস্যু দমন ও মোগলদের সাথে যুদ্ধ[সম্পাদনা]

সেই যুগে শুধু পাঠান-মোগল নয়, মগ ও ফিরিঙ্গিদের অত্যাচারেও বঙ্গবাসী অতীষ্ঠ ছিল| লবণের খনিরূপে বিখ্যাত সন্দ্বীপকে ঘিরে বাঙালি-মগ-পর্তুগীজ-মোগল দের মধ্যে বহু যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল| নাবিক পর্তুগীজদের সকলেই যে দস্যু ছিলেন তা নয় তবে অবশ্যই তাদের মধ্যে অনেক অত্যাচারী হার্মাদ ছিল| ফিরিঙ্গিদের পরাজিত করে কেদার রায় কৌশলে তাদের নিজ রাজত্বের অঙ্গীভূত করেন এবং কার্ভালিয়ান/কার্ভালিয়াস বা কার্ভালোকে করের বিনিময়ে সন্দ্বীপের রাজকার্য সামলে দেন| কার্ভালো কেদার রায়ের নৌবাহিনীর প্রধান হন| এই সময় মোগল সেনারা সন্দ্বীপ ঘিরে ফেললে কার্ভালোর সাহায্যার্থে কেদার সৈন্যপ্রেরণ করেন এবং যুদ্ধে পরাস্ত করে মোগলদের বিতাড়িত করেন|

অন্যদিকে আরাকানরাজ মেংরাজাগি বা সেলিমশার দৃষ্টি সর্বদাই সন্দ্বীপের উপর ছিল| তিনি ১৫০ রণতরী পাঠিয়ে সন্দ্বীপ হস্তগত করতে চাইলে কেদারের বাহিনীর সাথে তার যুদ্ধ হয় এবং মগরা পরাজিত হয়, সাথে ১৪০ টি তরী কেদার রায় হস্তগত করে ফেলেন| ক্রোধোন্মত্ত আরাকানসম্রাট পরের বার ১০০০ রণতরী ও বিপুল সৈন্য প্রেরণ করলে আরও ভীষণ যুদ্ধ হয় এবং এতেও মগরা পরাজিত হয়, ফলস্বরূপ প্রায় ২০০০ মগসৈন্য এতে নিহত হয়| অবিভক্ত বঙ্গের ইতিহাস অনুসারে, এমন ভীষণ নৌযুদ্ধ বাংলায় আর দেখা যায়নি| পরবর্তীতে কাভার্লো ক্ষতিগ্রস্ত তরীগুলো মেরামতের জন্য শ্রীপুরে যান| কেদার রায় ঐ সময় মোগলদের আক্রমণ প্রতিহত করতে ব্যতিব্যস্ত থাকায় আরাকানরাজ সন্দ্বীপ দখল করে ফেলে|

মান সিংহ দ্বিতীয়বার কেদারের সম্মুখীন হতে প্রস্তুত| তিনি মন্দা রায়ের নেতৃত্বে কেদারের বিরুদ্ধে অর্ধচন্দ্রযুক্ত পতাকাসহ মোগল নৌবাহিনী প্রেরণ করলে কালিন্দী নদীতে ভীষণ যুদ্ধ হয়| যুদ্ধে মন্দা রায় কেদার কর্তৃক পরাজিত ও নিহত হয়| এই যুদ্ধে অধিকাংশ মোগলসেনা নিহত হয় এবং অবশিষ্ট সেনা পলায়ণ করে| তাদের শোণিতধারায় কালিন্দীর জল রক্তিম হয়ে উঠে| কার্ভালো ছাড়া কেদারের যে কজন সেনাপতি ও অন্যতম যোদ্ধাদের নাম পাওয়া যায় তারা হলেন রঘুনন্দন রায়, রামরাজা সর্দ্দার, পর্তুগিজ ফ্রান্সিস, কালীদাস ঢালী, শেখ কালু|

পরের বার মান সিংহ সেনাপতি কিলমক খানকে সৈন্যসমেত প্রেরণ করলে সেও পরাজিত ও বন্দী হয়| ইউরোপীয় ভ্রমণকারীরা তাদের বর্ণনায় কেদার রায় ও মান সিংহ এর মধ্যে চারবার যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছেন|

চতুর্থ বার মান সিংহ বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিয়ে বিক্রমপুরের দিকে অগ্রসর হন| সুসঙ্গ রাজবংশের রাজা রঘুনাথ সিংহ মোঘল সম্রাট আকবরের সিংহাসনারোহনের পর তার সাথে এক চুক্তি করেন। এই চুক্তির অংশ হিসেবে রাজা রঘুনাথ সিংহকে মানসিংংহ এর পক্ষে বিক্রমপুরের চাঁদ রায়, কেদার রায় এর বিপক্ষে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে হয়। প্রায় নয় দিন ব্যাপী এই ভীষণ যুদ্ধ চলতে থাকে| পরিশেষে কেদার রায় পরাস্ত হলে রাজা রঘুনাথ সেখান থেকে অষ্ট ধাতুর এক দুর্গা প্রতিমা নিয়ে আসেন এবং রাজ মন্দিরে স্থাপন করেন যা আজো দশভূজা মন্দির নামে সুপরিচিত। তখন থেকেই সু-সঙ্গের সাথে দুর্গাপুর যোগ করে ঐ অঞ্চলের নামকরণ হয় সুসঙ্গ দুর্গাপুর। এবং বলা হয় যে তার কিছুকাল পরে আরও যুদ্ধ চললে বিদ্রোহ দমন করে কেদারের রাজ্য বিদ্রোহীদের তথা রঘুনন্দন, রামরাজা, শেখ কালু, ফ্রান্সিসদের মধ্যে বণ্টন করে মান সিংহ প্রত্যাবর্তন করেন|

মৃত্যু[সম্পাদনা]

এই বঙ্গবীরের ট্রাজেডি সম্পর্কে কিছু প্রবাদ ও তথ্য পাওয়া যায়|

  • নবম দিন বীরবিক্রমে লড়াই করার সময় সহসা এক কামানের গোলার আঘাতে কেদার রায় মূর্ছিত হন এবং বন্দী হওয়ার কিছু কাল পরে তার মৃত্যু হয়|[২]
  • নবম অথবা দশম দিন যুদ্ধ শুরুর আগে প্রথামত কেদার রায় ইষ্টদেবী ছিন্নমস্তার পূজা করতে গেলে ধ্যানস্থ অবস্থায় তাকে গুপ্তঘাতক দ্বারা মুন্ডচ্ছেদ করেন মান সিংহ|


তার মৃত্যুর পর তার রাজ্য লুণ্ঠন করে মুঘল সৈন্যরা। মাটিতে মিশে যায় তার রাজধানী শ্রীপুর। [২]মোগলদের বিরুদ্ধে বারো ভুঁইয়াদের একজোট করতে কেদার রায় বহু চেষ্টা করেন, কিয়ত্‍ সাফল্য লাভ করলেও তিনি এ কার্যে বিফল হন শেষ পর্যন্ত| তারা একজোট হলে হয়তো পরবর্তী ইতিহাস অন্যরকম হতো কিন্তু বারোভুঁইয়াদের মধ্যে রেষারেষি চরম স্তরের ছিল, এর সুবিধা মানসিং অবশ্যই পেয়েছিলেন| তবে কেদার রায়ের কৃতিত্ব দেশপ্রেমীদের কাছে অবশ্যই অক্ষয় অমর হয়ে থাকবে| বহু টোল, পাঠশালা, মন্দির, কারাগার ,কোষাগার, সেনা ছাউনী তিনি নির্মাণ করেছিলেন| তার প্রজাবাৎসল্য বহুচর্চিত ও বন্দিত ছিল| যদিও তার বহু কীর্তি পদ্মানদীর জলে ভেসে গিয়েছে| এর ফলে পদ্মা শ্রীপুর স্থানে ‘কীর্তিনাশা’ বলে পরিচিত|

পত্রযুদ্ধ[সম্পাদনা]

বিক্রমপুরের যুদ্ধের আগে মানসিং ও কেদার রায়ের মধ্যে পত্রযুদ্ধ হয়েছিল|মানসিং দূতের হাতে তার কাছে তরবারি ও শৃঙ্খল পাঠান এবং মিশ্র ভাষায় এক পত্র লেখেন,

“ত্রিপুর মগ বাঙ্গালী, কাক কুলি চাকালি
সকল পুরুষমেতৎ ভাগি যাও পলায়ী
হয়-গজ-নর-নৌকা কম্পিতা বঙ্গভূমি
বিষম সমর সিংহো মানসিংহশ্চয়াতি|”

অর্থাৎ কেদার রায় হয় পালিয়ে যান বা মুঘলদের অধীনত্ব স্বীকার করুন নয়ত বিক্রমপুর আক্রমণ করতে সিংহের মত মানসিংহ আসছে |

প্রত্যুত্তরে কেদার লিখে পাঠান –

“ভিনতি নিত্যং করিরাজ কুম্ভং
বিভর্তি বেগং পবনাতিরেকং
করোতি বাসং গিরিরাজ শৃঙ্গে
তথাপি সিংহঃ পশুরেব নান্যঃ||”

অর্থাত বায়ুর চেয়ে সিংহের বেশি গতি, নিয়ত হস্তীমুন্ড বিদারণ করে,সে পর্বতের চূড়াতে ও অবস্থান করে, তবুও সিংহ একটি পশুই| তিনি আরও বলেন-

"ভেবে দেখো এ শৃঙ্খল কার পায়ে সাজে তরবারি লইলাম লাগাইব কাজে|" 

তার চারিত্রিক তেজ ও বীরবিক্রম এই প্রত্যুত্তরের অক্ষরে অক্ষরে প্রকাশ পায়|

বিভিন্ন মাধ্যমে[সম্পাদনা]

  • কেদার রায় (ঐতিহাসিক পালা) - ব্রজেন্দ্রকুমার দে[৩]

কেদার রায়ের স্মৃতিবিজড়িত স্থান[সম্পাদনা]

  • বাংলাদেশের টংগিবাড়ীতে একটি প্রাচীন মন্দির আছে। যা রাজা কেদার রায় দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।
  • ফতেজঙ্গপুর দুর্গ – বাংলাদেশের নড়িয়া উপজেলা এর শরীয়তপুরে এই দুর্গ অবস্থিত। এই স্থানে মান সিংহের মোঘল বাহিনী ও রাজা কেদার রায়ের প্রতিরোধকারী বাহিনীর মধ্যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হয়।এই জায়গার প্রাচীন নাম শ্রীনগর। মুঘল সেনাপতি রাজমানসিংহ যখন বিক্রমপুর আক্রমণ করেন তখন তার সহযোগী যোদ্ধারা রাজা কেদার রায়ের কাছে পরাস্ত হয়ে শ্রীনগরে আশ্রয় নিয়েছিল। মানসিংহ তাদেরকে উদ্ধারের জন্য তার সেনাবাহিণী প্রেরণ করে। ফলে প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। মোগলদের জয়ের চিহ্ন স্বরুপ মানসিংহ শ্রীনগরের নাম পরিবর্তন করে ফতেজঙ্গপুর রাখেন। এখানে নাককাটা বাসুদেবের প্রস্থর মূর্তি আছে।
  • কেদারপুর -এটি ও বাংলাদেশের নড়িয়া উপজেলা এর শরীয়তপুরে। কেদার রায় এখানে বাসস্থান তৈরী করতে চেয়েছিলেন। কিছু কাজ শেষ হওয়ার আগে তারমৃত্যু হওয়ায় এটি পরিত্যক্ত হয়। বাড়ির চারদিকে যে পরিখা খনন করা হয়েছিল তার ভগ্নাবশেষ এখনও আছে। একে কেদার রায়ের বাড়ির বেড় (পরিখা) বলে।[৪]কেদারপুর নামক গ্রামে তার অনেক কীৰ্ত্তির নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। সৰ্ব্বপেক্ষ পদ্মার তীরস্থ রাজবাড়ী মঠ তাদের বিরাট কীৰ্ত্তির পরিচয় দিয়েছে। এই চতুশ্চূড়া শিবমন্দির নানা প্রকার খোদিতচিত্ৰ ইষ্টকে ভূষিত হয়ে বাঙ্গলায় প্রাচীন স্থাপত্যেরও সাক্ষ্য দিতেছে।[৫]
  • আরা ফুলবাড়িয়ায় কেদার রায়ের পরিবারের আদি বাসস্থল এখনো দেখা যায়। এখানে একটি উঁচু বিস্তৃত ভিটা আছে। যা ‘কেদার বাড়ি’ নামে পরিচিত। আরা ফুলবাড়িয়ায় কেদার রায়ের খননকৃত একটি দিঘি এখনো আছে। চাঁদ রায়ের সময়ে খনন করা অপর একটি দিঘিও টিকে আছে। চাঁদ রায়ের এক দাসীর নামে দিঘিটির নামকরণ হয় ‘কেশব মা কা দিঘি’। শ্রীপুর জমিদারদের নির্মিত সর্বাধিক সুবিদিত স্থাপত্য নিদর্শন সুউচ্চ রাজবাড়ির মঠ। একসময় পদ্মার তীরে যেখান থেকে শ্রীপুর শহর শুরু হয় তার অনতিদূরেই নির্মিত হয়েছিল মঠটি। এই সুউচ্চ মঠটি কয়েক মাইল দূর থেকেও দেখা যেত।
  • কেদার রায় অনেক মন্দির প্ৰতিষ্ঠা ও দীঘি খনন করেন।কেদার রায়ের প্রতিষ্ঠিত ভুবনেশ্বরী মূর্তি নদীয়া জেলায় কালীগঞ্জ থানার অধীন লাখুরিয়া গ্রামের চৌধুরীদের বাড়িতে এখনো আছে। তাহার পদোপরি কেদার রায়ের নাম খোদিত আছে।[৫]

বাড়তি পঠন[সম্পাদনা]

  • কেদার রায় (যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত),
  • বাংলার বীর (চন্দ্রকান্ত দত্ত),
  • বাংলার বীর সন্তান (উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য),
  • পুলিশ কাহিনী (ডঃ পঞ্চানন ঘোষাল),
  • প্রতাপাদিত্য (ডঃ নিখিল নাথ রায়),
  • গল্পে বারোভুঁইয়া (সতীশচন্দ্র গুহ শাস্ত্রী)।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "কেদার রায়"Bangladesher Khabor | Latest News, Breaking News, Sports, Entertainment, Politics, Business, Videos & Photos। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৩-০৪ 
  2. Kuddus, Rohon। "পদ্মায় ভেসে গেছে বারোভূঁইয়াদের রায়পুর :: সুজন দেবনাথ"ঐহিক বাংলা ওয়েব পত্রিকা (ইংরেজি ভাষায়)। ২০২১-০৪-১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৩-০৪ 
  3. Ray, অশোককুমার রায় Ashokekumar। বন্দে মাতরম প্রেরণা ও বিতর্ক Bande Mataram Prerana O Bitarka। Parul Prakashani Private Limited। আইএসবিএন 9789386708533 
  4. "অবহেলায় নিশ্চিহ্ন জনপদ"সমকাল (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৭-২০ 
  5. "পাতা:ঐতিহাসিক চিত্র (তৃতীয় বর্ষ) - নিখিলনাথ রায়.pdf/২২ - উইকিসংকলন একটি মুক্ত পাঠাগার"bn.wikisource.org। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৩-০৫ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]