মার্গারেট থ্যাচার

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

পরলোকে মার্গারেট থ্যাচার। মার্গারেট থ্যাচার ব্রিটেনের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার মারা গেছেন।

মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে ৮ এপ্রিল ২০১৩ সকালে ৮৭ বছর বয়সে পরলোকগমণ করেন তিনি। মার্গারেট থ্যাচারের মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন তাঁর মুখপাত্র লর্ড বেল। সম্পর্কিত বিষয়আন্তর্জাতিক, যুক্তরাজ্যলর্ড বেল জানিয়েছেন, “অত্যন্ত দুঃখের সাথে মার্ক এবং ক্যারোল থ্যাচার জানিয়েছেন যে তাঁদের মা ব্যারোনেস থ্যাচার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে আজ সকালে মারা গেছেন”। ১৯৭৯-১৯৯০ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ব্যারোনেস থ্যাচার। সে সময়ে ব্রিটেনের রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তনের সূচনা হয়। ব্রিটেনের ইতিহাসে একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার কনজারভেটিভ পার্টি থেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ব্রিটেনের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হয়েও যে ভাবে শক্ত হাতে, বিভিন্ন বাধা অগ্রাহ্য করে তিনি ব্রিটেনের অর্থনীতিতে বৈপব্লিক সংস্কার এনেছিলেন, তার জন্য তিনি আয়রন লেডি হিসিবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। "আমি মনে করিনা আমার জীবদ্দশায় কোন মহিলা ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হবেন" ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ। এডওয়ার্ড হিথ যখন ব্রিটেনের কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী তখন মাগারেট থ্যাচার ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। এডওয়ার্ড হিথ কখনো ভাবেননি যে কোন মহিলা কখনো ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হবে। মিঃ হিথ বলেছিলেন, "আমি মনে করিনা আমার জীবদ্দশায় কোন মহিলা ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হবেন"। ১৯৭৫ সালে রক্ষণশীল দলের মধ্যে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথকে বিস্ময়করভাবে হারিয়ে দলের নেতৃত্বে উঠে আসেন মার্গারেট থ্যাচার। জেমস ক্যালাহানের সরকার বিদায় নেয়ার পরে মার্গারেট থ্যাচারই হলেন ব্রিটেনের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্ততেই ব্রিটেনের ইউনিয়নগুলোর জন্য আইন হয়, ধর্মঘট করতে হলে তার আগে সদস্যদের সম্মতি নিতে হবে ভোটের মাধ্যমে এই ব্যবস্থাটি তখন নেয়া হয়। এছাড়া, মার্গারেট থ্যাচার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে কাউন্সিলের বাড়ির ভাড়াটেদের বাড়ি কেনার সুযোগ আর রাষ্ট্রীয় বণ্ড প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণ করা হয়। নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল দৃঢ়তার জন্য বিখ্যাত ছিলেন মার্গারেট থ্যাচার। সেসময় ব্রিটেনের বেকারত্ব ৩০ লাখে দাড়ালেও থ্যাচার নীতি পরিবর্তন করেননি। তিনি একসময় ব্রিটেনের সবচেয়ে অজনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রীতে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু ফকল্যান্ডের যুদ্ধে বিজয়ের পর ১৯৮৩ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভরা আবার জিতলো। খনিশ্রমিকদের ধর্মঘট, ব্রাইটনে পার্টি কনফারেন্সে বোমা হামলা কোন কিছুই থ্যাচারকে টলাতে পারেনি। তৃতীয় নির্বাচনেও তিনি জয়ী হয়েছিলেন। একাধারে ১৯৭৯, ১৯৮৩ এবং ১৯৮৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হন মার্গারেট থ্যাচার। "রাজনীতি করলে আপনার পিঠে কেউ ছুরি মারবে এমন ঝুঁকি থাকবেই । কিন্তু এটা আমি কখনো ক্ষমা করবো না যে আমাকে পার্লামেন্টের মাধ্যমে বিদায় নিতে দেয়া হয় নি। এটা আমি ভুলবো না" মার্গারেট থ্যাচারের তিক্ত অনুভূতির কথা কিন্তু ইউরোপের ব্যাপারে তাঁর নীতি নিয়ে তাঁর দল ও মন্ত্রীসভায় অসন্তোষ দেখা দেয়। অবশেষে মাইকেল হেজেলটাইন নেতৃত্বের পদে থ্যাচারকে চ্যালেঞ্জ করলে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। অনেকদিন পর তিনি তার তিক্ত অনুভুতির কথা বলেছিলেন, "রাজনীতি করলে আপনার পিঠে কেউ ছুরি মারবে এমন ঝুঁকি থাকবেই । কিন্তু এটা আমি কখনো ক্ষমা করবো না যে আমাকে পার্লামেন্টের মাধ্যমে বিদায় নিতে দেয়া হয় নি। এটা আমি ভুলবো না"। তার সময়েই তেল, গ্যাস, ইস্পাত, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ, এবং পানি সরবরাহের মত বৃহদায়তন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি খাতের হাতে তুলে দেয়া হয়। এই কারণে শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে তাঁকে দীর্ঘদিন লড়াই করতে হয়। শ্রমিকদের ধর্মঘট, আন্দোলন তিনি কঠোর হাতে দমন করেন। ব্রিটেনে ধনী-গরীবের মধ্যে ব্যবধান বাড়ানোর জন্যও লোকে তাকেই প্রধানত দায়ী করে থাকেন। তার শাসনব্যবস্থা দেখেই তখনকার সোভিয়েত সংবাদপত্র প্রাভদা তার নামকরন করে আয়রন লেডি বা লৌহ মানবী। তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান তাঁর নাম দিয়েছিলেন 'দা বেস্ট মেন ইন ইংল্যান্ড' অর্থাৎ ইংল্যান্ডের সেরা পুরুষ। তাঁর শাসনামলের পুরো সময়টুকুর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় নামকরণ করা হয় 'থ্যাচারিজম'। মার্গারেট থ্যাচার ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি তাঁর সময়কে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। তিনি ছিলেন এমন একজন যার ব্যাপারে প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু বলার ছিল। ১৯২৫ সালের ১৩ই অক্টোবরে লিংকনশায়ারে জন্ম নেন মার্গারেট থ্যাচার। থ্যাচার ১৯৫৯ সালে উত্তর লন্ডন থেকে কনজারভেটিভ দলের এমপি হন । হাউজ অফ কমন্সে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মার্গারেট থ্যাচারের মৃত্যুতে ব্রিটেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছেন, তাঁর মৃত্যুতে দেশ একজন মহান নেতাকে হারালো। যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, লন্ডনের সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালে সামরিক মর্যাদায় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে থ্যাচারের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান পালন করা হবে। তবে তাঁর পরিবারের ইচ্ছানুযায়ী এ শেষকৃত্য পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় করা হবে না।

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]