চে গেভারা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
চে গেভারা
CheHigh.jpg
"গেরিলেরো হেরোইকো"
চে গেভারা লা কব্রে মেমোরিয়াল সার্ভিসে. প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী আলবের্তো কোর্দার তোলা ছবি ৫ মার্চ, ১৯৬০
জন্ম এর্নেস্তো গেভারা
(১৯২৮-০৬-১৪)জুন ১৪, ১৯২৮[১]
আর্জেন্টিনা রোসারিও, আর্জেন্টিনা
মৃত্যু অক্টোবর ৯, ১৯৬৭(১৯৬৭-১০-০৯) (৩৯ বছর) (execution)
বলিভিয়া লা হিগুয়েরা, বলিভিয়া
সমাধি Che Guevara Mausoleum
Santa Clara, Cuba
পেশা Physician, author, government official
প্রতিষ্ঠান ছাব্বিশে জুলাই আন্দোলন, ইউনাইটেড পার্টি অফ দ্য কিউবান সোশ্যালিস্ট রেভোলিউশন[২] ন্যাশানাল লিবারেশন আর্মি (বলিভিয়া)
ধর্ম নাস্তিক (Marxist humanist)[৩][৪][৫]
দম্পতি Hilda Gadea (1955–1959)
Aleida March (1959–1967, his death)
সন্তান হিলডা (1956–1995), Aleida (b. 1960), Camilo (b. 1962), Celia (b. 1963), Ernesto (b. 1965)
পিতা-মাতা Ernesto Guevara Lynch[৬]
Celia de la Serna[৬]
স্বাক্ষর CheGuevaraSignature.svg

এর্নেস্তো "'চে" গেভারা (স্পেনীয়: tʃe geˈβaɾa চে গেবারা) (১৪ জুন,[১] ১৯২৮৯ অক্টোবর, ১৯৬৭) ছিলেন একজন আর্জেন্টিনীয় মার্কসবাদী, বিপ্লবী, চিকিত্সক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, গেরিলা নেতা, কূটনীতিবিদ, সামরিক তত্ত্ববিদ এবং কিউবার বিপ্লবের প্রধান ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল এর্নেস্তো গেভারা দে লা সের্না (স্পেনীয়: Ernesto Guevara de la Serna)। তবে তিনি সারা বিশ্ব লা চে বা কেবলমাত্র চে নামেই পরিচিত। মৃত্যুর পর তাঁর শৈল্পিক মুখচিত্রটি একটি সর্বজনীন প্রতিসাংস্কৃতিক প্রতীক এবং এক জনপ্রিয় সংস্কৃতির বিশ্বপ্রতীকে পরিণত হয়।[৭]

তরুণ বয়সে ডাক্তারি ছাত্র হিসেবে চে সমগ্র লাতিন আমেরিকা ভ্রমণ করেছিলেন। এই সময় এই সব অঞ্চলের সর্বব্যাপী দারিদ্র্য তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে।[৮] এই ভ্রমণকালে তাঁর অর্জিত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে এই অঞ্চলে বদ্ধমূল অর্থনৈতিক বৈষম্যের স্বাভাবিক কারণ হল একচেটিয়া পুঁজিবাদ, নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদসাম্রাজ্যবাদ; এবং এর একমাত্র সমাধান হল বিশ্ব বিপ্লব[৯] এই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে চে রাষ্ট্রপতি জাকোবো আরবেনজ গুজমানের নেতৃত্বাধীন গুয়াতেমালার সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৪ সালে সিআইএ-এর ষড়যন্ত্রে গুজমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে চে-র বৈপ্লবিক আদর্শ চেতনা বদ্ধমূল হয়। পরবর্তীকালে মেক্সিকো সিটিতে বসবাসের সময় তাঁর সঙ্গে রাউলফিদেল কাস্ত্রোর আলাপ হয়। চে তাঁদের ছাব্বিশে জুলাই আন্দোলনে যোগ দেন। মার্কিন-মদতপুষ্ট কিউবান একনায়ক ফুলজেনসিও বাতিস্তাকে উৎখাত করার জন্য গ্রানমায় চড়ে সমুদ্রপথে কিউবায় প্রবেশ করেন।[১০] অনতিবিলম্বেই চে বিপ্লবী সংঘের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড পদে তাঁর পদোন্নতি হয় এবং বাতিস্তা সরকারকে উত্খাত করার লক্ষ্যে দুই বছর ধরে চলা গেরিলা সংগ্রামের সাফল্যের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।[১১]

কিউবার বিপ্লবের পর চে নতুন সরকারে একাধিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য, বিপ্লবী আদালতে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্তদের আপিল পুনর্বিবেচনা ও ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড প্রদান,[১২] শিল্পোদ্যোগ মন্ত্রী হিসেবে খামার সংস্কার আইন প্রবর্তন, কিউবার জাতীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনীর ইনস্ট্রাকশনাল ডিরেক্টরের ভূমিকা পালন, এবং কিউবান সমাজতন্ত্রের প্রচারে বিশ্বপর্যটন। এই পদাধিকারের কল্যাণে তিনি মিলিশিয়া বাহিনীকে প্রশিক্ষণ প্রদানের সুযোগ পান; ফলত এই বাহিনী পিগ উপসাগর আক্রমণ করে তা পুনর্দখলে সক্ষম হয়।[১৩] কিউবায় সোভিয়েত পরমাণু ব্যালিস্টিক মিসাইল আনার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।[১৪] চে ছিলেন এক বিশিষ্ট লেখক ও ডায়েরি-লেখক। গেরিলা যুদ্ধের উপর তিনি একটি প্রভাবশালী ম্যানুয়েল রচনা করেন। তরুণ বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকায় মোটরসাইকেলে ভ্রমণের স্মৃতিকথাটিও তাঁর অত্যন্ত জনপ্রিয় রচনা। বৃহত্তর বিপ্লবে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৬৫ সালে কিউবা ত্যাগ করেন। প্রথমে কঙ্গো-কিনসহাসায় তাঁর বিপ্লব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর তিনি বলিভিয়ায় বিপ্লবে অংশ নেন। এখানেই সিআইএ-মদতপুষ্ট বলিভিয়ান সেনার হাতে বন্দী ও নিহত হন চে।[১৫]

চে গেভারা একাধারে ইতিহাসের এক নন্দিত ও নিন্দিত চরিত্র। বিভিন্ন জীবনী, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ, তথ্যচিত্র, গান ও চলচ্চিত্রে তাঁর চরিত্রের নানা দিক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। টাইম পত্রিকার বিংশ শতাব্দীর সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী ১০০ জন ব্যক্তির তালিকায় তাঁর নাম প্রকাশিত হয়।[১৬] আবার গেরিলেরো হেরোইকো নামে আলবের্তো কোর্দার তোলা চে-র বিখ্যাত ফটোগ্রাফটিকে "বিশ্বের সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ ফটোগ্রাফ" হিসেবে ঘোষিত।[১৭]

জীবনের শুরু[সম্পাদনা]

সালে কিশোর বয়সে গুয়েভারা (বামে) তার পরিবারের সাথে। বাম থেকে ডানে: মা, বোন, রবার্তো, জাউন মার্টিন, বাবা এবং মারিয়া।

১৯২৮ সালের ১৪জুন এর্নেস্তো গেভারা রোসারিও, আর্জেন্টিনায় জন্ম গ্রহণ করেন।পরিবারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন জৈষ্ঠতম। ছোটবেলা থেকেই তার চরিত্রে অস্থির চপলতা দেখে তার বাবা বুঝতে পেরেছিলেন যে আইরিস বিদ্রোহের রক্ত তার এই ছেলের ধমনীতে বহমান।খুব শৈশব থেকেই সমাজের বঞ্চিত, অসহায়, দরিদ্রদের প্রতি এক ধরনের মমত্ববোধ তাঁর ভিতর তৈরি হতে থাকে। একটি সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারার পরিবারে বেড়ে ওঠার করনে খুব অল্প বয়সেই তিনি রাজনীতি সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান লাভ করেন। তার বাবা ছিলেন স্পেনের গৃহযুদ্ধে রিপাবলিকানদের একজন গোড়া সমর্থক, সেই সংঘর্ষের সৈনিকদের তিনি প্রায়ই বাড়িতে থাকতে দিতেন।

হাপানিতে সারা জীবন ভোগা সত্ত্বেও তিনি দারুন মল্যবিদ ছিলেন। তার খেলধুলার পছন্দ তালিকায় ছিল সাঁতার, ফুটবল,গলফ, শুটিং। চে গেভারা সাইক্লিংয়ের একজন অক্লান্ত খেলোয়ার ছিলেন। তিনি রাগবি ইউনিয়নের একজন অতি আগ্রহী সদস্য ছিলেন এবং বুয়েনস এয়ারস বিশ্ববিদ্যালয় রাগবি দলের হয়ে খেলেছেনও। রাগবি খেলার ক্ষিপ্রতার জন্য তাকে ফিউজার(fuser)নামে ডাকা হত। তার বিদ্যালয়ের সহপাঠীরা তাকে ডাকত চানচো(pig)বলে, কারণ তিনি অনিয়মিত স্নান করতেন এবং সপ্তাহে একবার মাত্র পোশাক পাল্টাতেন।

১২ বছর বয়সে দাবা খেলা শেখেন তার বাবার কাছে এবং স্থানীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন।

১৯৫১ সালে ২২ বছর বয়সী গেভারা

বয়সন্ধি থেকে শুরু করে সারাটা জীবন তিনি কবিতার প্রতি আসক্ত ছিলেন বিশেষ করে পাবলো নেরুদা, জন কিটস, এন্টনিও মারকাদো, ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা, গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল এবং ওয়াল্ট হুইটম্যান, তিনি ভালো কবিতা আবৃত্তি করতে পারতেন। তিঁনি স্মৃতি থেকে আবৃতি করতে পারতেন রুডিয়ার্ড কিপলিং এর "if-" এবং জোসে হার্নান্দেজ এর "Martin Fierro"। গুয়েভারা পরিবারে ছিল ৩০০০ এরও বেশি বই যা গুয়েভারাকে করে তোলে একজন জ্ঞান পিপাসু ও আক্লান্ত পাঠক। যার মধ্যে কার্ল মার্ক্স, উইলিয়াম ফকনার, এমিলিও সলগারির বই। পাশাপাশি জওহরলাল নেহেরু, আলবেয়র কামু, লেলিন, রবার্ট ফ্রস্ট এর বইও তিনি পড়তেন।

মোটর সাইকেল অভিযান[সম্পাদনা]

চে গেভারা ১৯৪৮ সালে বুয়েনস এয়ারস বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিত্সা বিষয়ে লেখাপড়ার জন্য ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে লেখাপড়ায় এক বছর বিরতি দিয়ে আলবার্টো গ্রানাডো নমক এক বন্ধুকে সাথে করে মোটর সাইকেলে দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমনে বেরিয়ে পড়েন যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পেরুর সান পেবলোর লেপার কলোনিতে (কুষ্ট রোগী দের জন্য বিশেষ কলোনি) স্বেচ্ছা সেবক হিসেবে কয়েক সপ্তাহ কাজ করা| মাচু পিচ্চুর যাওয়ার পথে তিনি প্রতন্ত অঞ্চলের দরিদ্র কৃষকদের চরম দারিদ্র দেখে মর্মাহত হন| এ কৃষকরা ধনি মহাজনদের অধিনে থেকে ছোট ছোট জমিতে কাজ করত| তাঁর ভ্রমণের পরবর্তি সময়ে তিনি লেপার কলোনিতে বসবাসকারী মানুষের মাঝের ভাতৃত্ব ও সহচার্য দেখে অভিভূত হন| এই অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর ডায়েরীতে(The Motorcycle Diaries,) তিনি লিখেছেন, ‘মানব সত্ত্বার ঐক্য ও সংহতির সর্বোচ্চ রুপটি এসকল একাকী ও বেপরোয়া মানুষদের মাঝে জেগে উঠেছে’। তার এই দিনলিপি নিউয়র্ক টাইমস এর বেস্ট সেলার এবং পরে একই নামে(The Motorcycle Diaries,)চলচিত্র বের হয় যা পুরস্কৃত হয়েছিল।

এই ভ্রমণ তাকে নিয়ে যায় আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা, পানামা ও মিয়ামির মধ্য দিয়ে বুয়েন্স আয়রেস এর দিকে| ভ্রমণের শেষ দিকে তিনি এই মত পোষণ করেন যে দক্ষিণ আমেরিকা আলাদা আলাদা দেশের সমষ্টি নয় বরং এক অভিন্ন অস্তিত্ব যার প্রয়জন মহাদেশ ব্যপী স্বাধীনতার জাগরণ ও স্বাধীনতার পরিকল্পনা| পরবর্তিতে তাঁর নানা বিপ্লবী কর্মকান্ডে এই একক, সীমানাবিহীন আমেরিকার চেতনা ফিরে আসে বার বার|

গুয়াতেমালা, আরবানিজ এবং ইউনাইটেড ফ্রুট[সম্পাদনা]

১৯৫৩ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে চে গেভারা আন্দোলন, যার মধ্যে ছিল গুয়াতেমালার উত্তরে ভ্রমন।

১৯৫৩ সালের ৭ই জুলাই, চে আবারও বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, পানামা, কোস্টারিকা, নিকারাগুয়া, হনডুরাস এবং সালভাডরের উদ্দ্যেশে বের হন।গুয়েতেমালা ছাড়ার আগে ১৯৫৩ সালের ১০ডিসেম্বর কোষ্টারিকা থেকে তার আন্টিকে সব কিছুর বৃত্তান্ত দিয়েছিলেন। চিঠিতে তিনি ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির বিভিন্ন প্রদেশে ভ্রমণের কথা লিখেছিলেন। তিনি এভাবে তার সংরক্ষনশীল আত্মীয়দের আতঙ্কিত করতে চেয়েছিলেন।

মেক্সিকো শহর ও প্রস্তুতি[সম্পাদনা]

চিচেন ইতজাতে হিল্ডা গাদেয়ার সাথে গেভারা,তাদের মধুচন্দ্রিমার পথে।

১৯৫৪ সালের শুরুর দিকে গেভারা মেক্সিকো শহরে পৌছান এবং সদর হাসপাতালে এলার্জি বিভাগে চাকুরি করেন।পাশাপাশি ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভির্সিটি অব মেক্সিকোতে মেডিসিন বিষয়ে প্রভাষক এবং লাতিনা সংবাদ সংস্থার চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন।১৯৫৫ সালের জুন মাসে তার বন্ধু নিকো লোপেজ রাউল কাস্ত্রোর সাথে তার পরিচয় করান এবং পরে তার বড় ভাই ফিদেল কাস্ত্রোর সাথে পরিচিত হন।কাস্ত্রোর সাথে তার প্রথম সাক্ষাতে দীর্ঘ আলাপচারিতা হয় এবং চে বলেন যে কিউবার সমস্যা নিয়ে তিনি চিন্তিত।তারপর তিনি ২৬শে জুলাই আন্দোলন দলের সদস্য হন।সেই সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদের ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং তিনি বিশ্বাস করতেন এই আগ্রাসি তত্পরতার আশু সমাপ্তি প্রয়োজন।

কিউবা বিপ্লব[সম্পাদনা]

গেভারা, কিউবা, নভেম্বর ১৯৫৮

বিপ্লবের পরিকল্পনায় কাস্ত্রের প্রথম পদক্ষেপ ছিল মেক্সিকো হতে কিউবায় আক্রমণ চালান। ১৯৫৬ সালের ২৫শে নভেম্বর তারা কিউবার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। পৌছানোর সাথে সাথেই বাতিস্তার সেনাবাহীনি কর্তৃক আক্রন্ত হন।তার ৮২ জন সহচরী মারা যান অথবা কারাবন্দী হয়, মাত্র ২২জন এ যাত্রায় বেঁচে যায়।গেভারা লিখেছিলেন সেটা ছিল সেই রক্তক্ষয়ী মুখামুখি সংঘর্ষের সময় যখন তিনি তার চিকিত্সা সামগ্রীর সাথে একজন কমরেডের ফেলে যাওয়া এক বাক্স গোলাবারুদ নিয়েছিলেন, যা তাকে পরিশেষে চিকিত্সক থেকে বিপ্লবীতে পরিনত করে।

সিয়েরা মস্ত্রা পর্বতমালায় বিদ্রোহীদের ছোট্ট একটা অংশ পুনরায় সংঘবদ্ধ হতে পেরেছিল। সেখানে তারা ২৬ শে জুলাই আন্দোলনের গেরিলা এবং স্থানীয় লোকজনদের সহযোগিতা লাভ করেছিলেন। সিয়েরা থেকে দল উঠেয়ে দেবার সময় কাস্ত্রোর একটি সাক্ষাতকার নিউয়র্ক টাইমসে প্রকাশ করা হয়। যার আগে ১৯৫৭ পর্যন্ত সারা পৃথিবীর মানুষ জানত না তিনি বেঁচে আছেন কি না! সেই নিবন্ধে কাস্ত্রো ও বিপ্লবীদের কাল্পনিক ছবি ছিল।গেভারা সেই সাক্ষাতকারে উপস্থিত ছিলেন না কিন্তু কিছু দিন পর তিনি তাদের এই বিপ্লবে প্রচার মাধ্যমের গুরুত্ব বুঝতে পারেন। আত্মবিশ্বাসের সাথে সাথে রসদ সরবরাহ কমে এসেছিল পাশাপাশি ছিল প্রচণ্ড মশার উত্পাত তাই গেভারা সেই সময়টাকে যুদ্ধের সবচেয়ে ব্যাথার সময় বলে অবহিত করেছিলেন।

যুদ্ধচলাকালীন চে বিদ্রোহী সেনাবাহিনীর অখন্ড অংশ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ফিদেল কাস্ত্রোকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, কূটনীতি এবং অধ্যবসায়ের কথা জানিয়ে ছিলেন। গেভারা গ্রেনেড তৈরির কারখানা, রুটি সেকানোর জন্য চুল্লি প্রস্তুত এবং নিরক্ষর সঙ্গীদের লেখাপড়ার জন্য পাঠশালা তৈরি করেন। তাছাড়াও তিনি একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, সামরিক প্রশিক্ষনের কর্মশালা আয়োজন এবং তথ্য সরবরাহের জন্য পত্রিকা প্রচার করতেন। বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন তিন বছর পর তাকে ’’কাস্ত্রোর মস্তিষ্ক’’’ বলে আখ্যায়িত করেছিল। তার পর তিনি বিদ্রোহী বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে পদোন্নতি পান। গেভারা শৃঙ্খলার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন, কর্তব্যে অবহেলাকারীদের তিনি নির্দ্বিধায় গুলি করতেন। তার এই প্রচন্ড মানসিকতা তাকে তার ইউনিটে সবার চেয়ে ভয়ংকর করে তুলেছিল। তাই গেরিলা অভিযানের সময় গুপ্তঘাতকদের মৃত্যুদন্ড দেবার দায়িত্ব ছিল তার উপর। চে এমন কঠিন প্রশাসক হওয়া সত্ত্বেও সৈন্যদের শিক্ষক হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং কাজের ফাঁকে তাদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থাও করতেন।

কিউবায় মন্ত্রীত্ব[সম্পাদনা]

১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত চে কিউবার শিল্প বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন। এসময় তিনি কিউবার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। এসময় কিউবান নোটগুলোতে তার স্বাক্ষরে শুধু "চে" লেখা থাকতো। ১৯৬৫ সালে আলজিয়ার্স সফরকালে সোভিয়েত সরকারকে সাম্রাজ্যবাদের দোসর আখ্যা দেয়ার ফলে দেশে ফেরার সাথে সাথে তার মন্ত্রীত্ব বাতিল হয়। এরপর তিনি বিপ্লবের পথে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান। [১৮]

তার ট্রেডমার্ক জলপাই-সবুজ রঙের সামরিক পোষাকে, ২ জুন ১৯৫৯।
সান্তা ক্লারা যুদ্ধের পরে, জানুয়ারি ১, ১৯৫৯।
(ডান থেকে বামে) বিদ্রোহী নেতা Camilo Cienfuegos, কিউবার রাষ্ট্রপতি মানুয়্যেল উরুতিয়া, এবং গেভারা (জানুয়ারি ১৯৫৯)

আন্তর্জাতিক কূটনীতি[সম্পাদনা]

১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে গেভারা বিশ্বের বিপ্লবীদের কূটনীতিক হিসেবে পরিচিতি পান। তাই তিনি কিউবার প্রতিনিধি হয়ে জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদান করার জন্য নিঊয়র্ক শহরে যান। ১১ ডিসেম্বার জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ১৯তম অধিবেশনে আবেগ অভিভূত বক্তৃতায় তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার জাতিগত বৈষম্যের কঠোরনীতি দমনে জাতিসংঘের দুর্বলতার কথা বলেন।এটাকে বন্ধ করার জন্য জাতিসংঘের কোন পদক্ষেপ আছে কি না জানতে চেয়ে প্রশ্ন তোলেন। গুয়েভারা তখন নিগ্র জনগনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কঠোর নিন্দা জ্ঞাপন করেন। ক্রোধান্বিত গুয়েভারা ‘সেকেন্ড ডিক্লেরেশন অব হাভানা’ নামক একটি আবেগপূর্ণ ঘোষণার উল্লেখ করে তার বক্তৃতা শেষ করেন।[১৯] তিনি বলেন যে তার এই ঘোষণার জন্ম হয়েছে ক্ষুধার্ত জনগন, ভূমিহীন কৃষক, বঞ্চিত শ্রমিক ও প্রগতিশীল মানুষের দ্বারা । বক্তব্যের শেষ করতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, সারা বিশ্বের শোষিত জনগোষ্ঠীর একমাত্র চিত্কার এখন,

হয় স্বদেশ অথবা মৃত্যু।

[১৯]

কঙ্গো[সম্পাদনা]

১৯৬৫ সালে গেভারা আফ্রিকায় যাবার সিদ্ধান্ত নেন এবং কঙ্গোয় চলমান যুদ্ধে তার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান কাজে লাগাবার প্রস্তাব দেন। আলজেরিয়ার রাষ্ট্রপতি আহমেদ বিন বেল্লার মতে, গুয়েভারা আফ্রিকাকে রাজতন্ত্রের দুর্বল ঘাটি ভেবেছিলেন। তাই সেখানে বিপ্লবের প্রচুর সম্ভনা তিনি দেখেছিলেন। মিশরের রাষ্ট্রপতি জামাল আব্দেল নাসের, ১৯৫৯ সালের সাক্ষাতের পর যার সাথে চে এর ভ্রাতৃত্বপুর্ণ সম্পর্ক ছিল। তিনি কঙ্গো আক্রমণের পরিকল্পনাকে বোকামি হিসেবে দেখেছিলেন। এই সতর্কতা সত্ত্বেও গেভারা মার্কসবাদীদের সহয়তায় আক্রমণ চালিয়ে যাবার জন্য তৈরি হন। ১৯৬৫ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি, তার সেকেন্ড কমান্ড ভিক্টর বার্ক এবং ১২ জন সহচরী নিয়ে কঙ্গোয় পৌছান।তার কিছু দিনের মধ্যে প্রায় ১০০ জন আফ্রো-কিউবান তাদের সাথে যোগ দেন।এখানে তিনি কঙ্গোর গৃহযুদ্ধে অংশ নেয়া লুমুম্বা ব্যাটেলিয়ন সংগঠনের দায়িত্ব নেন।[১৮]

বলিভিয়া[সম্পাদনা]

গেভারা অবস্থান সম্পর্কে তখন লোকজন জানত না।১৯৬৬ সালের শেষের দিকে অথবা ১৯৬৭ এর শুরুর দিকে জমবিক স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিনিধির সাথে ডার এস্ সালাম নামক স্থানে দেখা হয়। সেখানে গেভারা তাদের বিপ্লবী কর্মকান্ডে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালে হাভানায় আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে পদযাত্রায় এক মন্ত্রী বলেন যে চে লাতিন আমেরিকার কোন জায়গায় বিপ্লব চালিয়ে যাচ্ছেন। তার পর প্রমানিত হয় যে তিনি বলিভিয়ায় গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করছেন। কাস্ত্রোর আদেশে তিনি মন্টেন ড্রাই ফরেষ্ট নামক দুর্গম এলাকায় প্রশিক্ষন চালান যেখানে বলিভিয়ার স্থানীয় সমাজতান্ত্রিকরা তাকে সাহায্য করেছিল।

গ্রেফতার ও মৃত্যুদণ্ড[সম্পাদনা]

Meeting with French existentialist philosophers Jean-Paul Sartre and Simone de Beauvoir in March 1960. In addition to Spanish, Guevara was fluent in French.[২০]

বলিভিয়ার সেনাবাহিনীর ভাষ্যমতে তারা গুয়েভারাকে ৭ অক্টোবর গ্রেফতার করে এবং তার মৃত্যু হয় ৯ অক্টোবর ১৯৬৭ সাল বেলা ১.১০ টায়।মৃত্যুর এ সময়কাল এবং ধরণ নিয়ে মতভেদ এবং রহস্য এখনো আছে।[২১] ধারণা করা হয় ১৯৬৭ সালের এই দিনটিতে লা হিগুয়েরা নামক স্থানে নিরস্ত্র অবস্থায় নয়টি গুলি করে হত্যা করা হয় বন্দী চে গেভারা। পরে বলিভিয়ার সেনাবাহিনী ঘোষণা করে যে বন্দী অবস্থায় নয়টি গুলি চালিয়ে সেই আর্জেন্টাইন ‘সন্ত্রাসবাদী’কে মেরে ফেলতে পেরেছে এক মদ্যপ সৈনিক। তবে আরেকটি মতামত হচ্ছে এই দিন যুদ্ধে বন্দী হলেও তাকে এবং তার সহযোদ্ধাদের হত্যা করা হয় কিছুদিন পর। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে পরবর্তীতে এইসব দাবির সপক্ষে কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়।[২১]

এ সম্পর্কে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা সে সময় লিখেছিল,

‘একজন মানুষের সঙ্গে সঙ্গে একটি রূপকথাও চিরতরে বিশ্রামে চলে গেল।’

[২২]

পরে ১৯৯৭ সালে ভ্যালেগ্রান্দের একটি গণ-কবরে চে ও তাঁর সহযোদ্ধাদের দেহাবশেষ আবিষ্কৃত হয়।[২৩]

চে গেভারা লেখনী[সম্পাদনা]

চে গেভারা কিউবান ভাষায় লিখেছেন প্রায় ৭০টি নিবন্ধ, ধারণা করা হয় ছদ্মনামে কিংবা নামহীন অবস্থায় লিখেছেন ২৫টি। এছাড়া তিনি লিখে দিয়েছেন পাঁচটি বইয়ের ভূমিকা। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত ভাষণ আর সাক্ষাতকার দিয়েছেন প্রায় ২৫০-এর কাছাকাছি। বিভিন্ন ব্যক্তিত্বকে লেখা তার অসংখ্য চিঠির মধ্যে সংগৃহিত আছে ৭০টির মতো। তার লেখালেখি নিয়ে এখন পর্যন্ত বের হয়েছে নয় খণ্ড রচনাবলি।[২৪]

নির্মিত চলচ্চিত্র[সম্পাদনা]

২০০৮ সালের ৪ ডিসেম্বরে মায়ামি বিচে আর্ট ব্যাসল চলচ্চিত্র উত্সবে চে পার্ট ওয়ান চলচ্চিত্রের প্রথম প্রদর্শনী হয়। একই সঙ্গে জীবনী,নাটক, ইতিহাস এবং যুদ্ধনির্ভর এ চলচ্চচিত্র মুক্তি পায় ২৪ জানুয়ারি ২০০৯-এ আমেরিকাতে। স্টিভেন সোডারবার্গ পরিচালিত এ মুভিটিতে অভিনয় করেন চে এর ভূমিকায় ছিলেন বেনেসিও ডেল টরো। এ পর্যন্ত ছবিটি বিভিন্ন চলচ্চিত্র উত্সবে তিনটি পুরস্কার ও আটটি মনোনয়ন পেয়েছে। ২০০৯ এর ফেব্রুয়ারি তে চে চলচ্চিত্রের সিকুয়েল চে পার্ট টু মুক্তি পায়।[২৫]

ঘটনাপঞ্জি[সম্পাদনা]


পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ The date of birth recorded on his birth certificate was June 14, 1928, although one tertiary source, (Julia Constenla, quoted by Jon Lee Anderson), asserts that he was actually born on May 14 of that year. Constenla alleges that she was told by an unidentified astrologer that his mother, Celia de la Serna, was already pregnant when she and Ernesto Guevara Lynch were married and that the date on the birth certificate of their son was forged to make it appear that he was born a month later than the actual date to avoid scandal. (Anderson 1997, pp. 3, 769.)
  2. Partido Unido de la Revolución Socialista de Cuba, aka PURSC
  3. The Spark That Does Not Die by Michael Löwy, International Viewpoint, July 1997
  4. McLaren 2000, p. 78.
  5. Embodiment and Agency, by Sue Campbell & Letitia Meynell, Penn State Press, 2009, ISBN 0-271-03522-6, p. 243
  6. ৬.০ ৬.১ Unknown, Autor। "Guevara, Che"। Encyclopædia Britannica Online। সংগৃহীত 30 September 2001 
  7. Casey 2009, p. 128.
  8. On Revolutionary Medicine Speech by Che Guevara to the Cuban Militia on August 19, 1960
  9. At the Afro-Asian Conference in Algeria A speech by Che Guevara to the Second Economic Seminar of Afro-Asian Solidarity in Algiers, Algeria on February 24, 1965
  10. Beaubien, NPR Audio Report, 2009, 00:09-00:13
  11. "Castro's Brain" 1960.
  12. Taibo 1999, p. 267.
  13. Kellner 1989, p. 69-70.
  14. Anderson 1997, p. 526-530.
  15. Ryan 1998, p. 4
  16. Dorfman 1999.
  17. Maryland Institute of Art, referenced at BBC News May 26, 2001
  18. ১৮.০ ১৮.১ http://www.kirjasto.sci.fi/guevar.htm
  19. ১৯.০ ১৯.১ http://www.marxists.org/archive/guevara/1964/12/11.htm
  20. Dumur 1964 shows Che Guevara speaking French.
  21. ২১.০ ২১.১ http://www.gwu.edu/~nsarchiv/NSAEBB/NSAEBB5/
  22. http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2009-10-09/news/10872
  23. http://www.ukbengali.com/NewsMain/ArchiveNewsMain/MNews20071008.htm
  24. http://www.orangebdgroup.com/samakal/details.php?news=29&view=archiev&y=2009&m=10&d=9&action=main&menu_type=tabloid&option=single&news_id=22754&pub_no=124&type=
  25. http://www.sonalisakal.com/details.php?news_id=2290

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

টেমপ্লেট:Communism টেমপ্লেট:Cuba topics টেমপ্লেট:Good article