কলকাতার কিংবদন্তির ব্যক্তিত্ব

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

গৌরী সেন, হরি ঘোষ, বনমালী সরকার, গোবিন্দরাম মিত্র, ঊমিচাঁদ এবং হুজুরীমল—এঁরা হলেন বাংলার কয়েকজন কিংবদন্তির মানুষ, যাঁদের বাংলার জনসমাজ আজও মনে রেখেছে—জনপ্রিয় ছড়া বা প্রবাদ/প্রবচনের মাধ্যামে ভারত আর বাংলাদেশের বাংলাভাষী মানুষের কাছে এঁরা আজও পরিচিত। এরকম একটি ছড়ার উদাহরণ—"বনমালী সরকারের বাড়ি, গোবিন্দরাম মিত্রের ছড়ি, ঊমিচাঁদের পেন, হুজুরীমলের কড়ি, কে না জানে?"[১] এঁদের কয়েকজন কলকাতার বাসিন্দা ছিলেন, আর বাকিরা ছিলেন শহরতলীর আবাসিক।

গৌরী সেন[সম্পাদনা]

গৌরী সেন সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতাব্দীর লোক। তাঁর আদিনিবাস সম্পর্কে দুটি ভিন্ন মত আছে। অধিক গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী তিনি হুগলী জেলার বালী শহরের মানুষ। (আজকের দিনে বালী শহর হাওড়া জেলার অন্তর্গত।) অন্যমত অনুযায়ী তিনি ছিলেন মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরের মানুষ। সুবর্ণবণিক সম্প্রদায়ের এক ব্যবসায়ী পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পিতার নাম ছিল নন্দরাম সেন। আমদানি–রপ্তানির পারিবারিক ব্যবসায় গৌরী সেন অনেক টাকা উপার্জন করেন আর বণিকসমাজে প্রসিদ্ধ হন। দুহাতে টাকা বিলিয়ে অনেক লোককে তিনি ঋণমুক্ত করেন অথবা বকেয়া রাজকর মেটাতে সাহায্য করেন। এর থেকেই এক বাংলা প্রবাদের জন্ম হয়—"লাগে টাকা, দেবে গৌরী সেন"। অনেকে মনে করেন যে হুগলীর গৌরীশঙ্কর শিবমন্দির তাঁরই নির্মাণ করা।[২]

হরি ঘোষ[সম্পাদনা]

হরি ঘোষ (?–১৮০৬) ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর মুঙ্গের দুর্গের দেওয়ান। বাংলা, ফার্সি আর ইংরেজি ভাষায় তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। অবসরজীবনে তিনি কলকাতায় বসবাস করতেন। জনহিতকারী কাজে তিনি অনেক টাকা দান করতেন। শহরে পড়াশুনা করতে আসা অনেক গরিব ছাত্রকে তিনি তাঁর উত্তর কলকাতার বাড়িতে আশ্রয় দিতেন আর তাদের বিনামূল্যে থাকাখাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তাঁর বৈঠকখানায় গল্পগুজব করতে অনেক লোক আসত আর সেসব লোকের রাতের খাওয়াদাওয়ারও ব্যবস্থা থাকত সেখানে। এর থেকেই বাংলা প্রবচন "হরি ঘোষের গোয়াল"-এর উৎপত্তি।[৩]

বনমালী সরকার[সম্পাদনা]

বনমালী সরকার পাটনার প্রথম দেওয়ান ছিলেন এবং পরে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর 'ডেপুটি ট্রেডার' পদে আসীন হন।[৪] ১৭৪০ থেকে ১৭৫০-এর মধ্যে কলকাতার কুমারটুলী এলাকায় তিনি একটি বিশাল বাসস্থান নির্মাণ করান।[৫]

গোবিন্দরাম মিত্র[সম্পাদনা]

গোবিন্দরাম মিত্র ছিলেন ব্রিটিশ শাসনকালে নিযুক্ত প্রথম ভারতীয় অধিকারীদের মধ্যে একজন, আর তাঁর দাপট, অর্থবল এবং আতিশয্য সুবিদিত ছিল।[৬]

ঊমিচাঁদ[সম্পাদনা]

ঊমিচাঁদ (আমিনচাঁদ বা আমীরচাঁদ নামেও পরিচিত) ছিলেন শিখ সম্প্রদায়ের একজন ব্যবসায়ী। ব্রিটিশরা যখন এদেশে আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেছে, সেই সময় নাগাদ তিনি অমৃতসর থেকে কলকাতায় চলে আসেন। ব্রিটিশদের এদেশে প্রতিষ্ঠা অর্জনের পেছনে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সাথে ব্যবসা করে তিনি অনেক অর্থ উপার্জন করেন আর মৃত্যুকালে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি ধর্মীয় কাজের উদ্দেশ্যে দান করে যান।[৭][৮] তাঁকে অনেকসময়ে 'তাঁর সময়ের রথ্‌স্‌চাইল্ড' বলা হয়—আর বাংলা তথা ভারতবর্ষের ইতিহাসে তাঁর নাম রয়ে যাবে রবার্ট ক্লাইভের হাতে আত্মসমর্পণকারী হিসাবে।[৯]

হুজুরীমল[সম্পাদনা]

হুজুরীমল ছিলেন শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ আর ঊমিচাঁদের বন্ধু। তিনিও অনেক টাকা উপার্জন করেছিলেন আর জনহিতকর কাজের জন্য তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁর টাকায় বৈঠকখানা এলাকার ট্যাঙ্ক, হাওড়া ব্রিজের কাছে স্নানঘাট (এখন যার নাম আর্মেনিয়ান ঘাট), আর্মেনিয়ান চার্চের চূড়া এবং কালীঘাটের কালী মন্দিরের কাছে একটি ঘাট নির্মাণ হয়েছিল।[১০]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

সূত্র[সম্পাদনা]

  1. Cotton, H.E.A., Calcutta Old and New, 1909/1980, p298, General Printers and Publishers Pvt. Ltd.
  2. সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বোস (সম্পাদনা) (১৯৭৬/১৯৯৮), "সংসদ বাঙ্গালী চরিতাভিধান", প্রথম খন্ড, ১৪৮ পৃষ্ঠা, ISBN 81-85626-65-0
  3. Sengupta, Subodh Chandra and Bose, Anjali, pp613-614
  4. Cotton, H.E.A., p 298.
  5. Nair, P. Thankappan in The Growth and Development of Old Calcutta in Calcutta, the Living City, Vol I, edited by Sukanta Chaudhuri, p16, Oxford University Press, ISBN 0-19-563696-1.
  6. সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বোস (সম্পাদনা) (১৯৭৬/১৯৯৮), "সংসদ বাঙ্গালী চরিতাভিধান", প্রথম খন্ড, ১৪৪ পৃষ্ঠা, ISBN 81-85626-65-0
  7. Sengupta, Subodh Chandra and Bose, Anjali, p 70.
  8. Cotton, H.E.A., pp58-59.
  9. Cotton, H.E.A., p 222.
  10. Cotton, H.E.A., p298.