শ্রীচন্দ্রপুর (ব্রহ্মপুর)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

শ্রীচন্দ্রপুর বাংলাদেশের সিলেট বিভাগে অবস্থিত একটি প্রাচীন ধর্ম ও সাধারণ শিক্ষা কেন্দ্র। শ্রীচন্দ্রপুরের অবস্থান সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য পাওয়া যায়না, তবে ধারণা করা হয় এটি প্রাচীন শ্রিহট্টমণ্ডলের গরলা, পোগার ও চন্দ্রপুর এই তিনটি বিষয়ে বিস্তৃত ছিল। খ্রিষ্টীয় দশম শতকে শ্রীচন্দ্রপুর ছিল একটি প্রসিদ্ধ হিন্দু ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষাকেন্দ্র। বিক্রমপুরের চন্দ্রবংশীয় রাজা ত্রৈলোক্যচন্দ্রের পুত্র মহারাজা শ্রীচন্দ্র শ্রীহট্ট জয় করে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রসারে এই ধর্মালয় ও শিক্ষাকেন্দ্রটি স্থাপন করেন।

ব্যুৎপত্তি[সম্পাদনা]

মহারাজা শ্রীচন্দ্রের নামানুসারে এই ব্রহ্মপুরের নামকরণ করা হয় শ্রীচন্দ্রপুর।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

শ্রীচন্দ্রের রাজত্বকালে শ্রীহট্ট পরিচিত ছিল শ্রীহট্টমণ্ডল নামে পুণ্ড্রবর্ধনের একটি মণ্ডল হিশেবে, আর আয়তনে বিস্তৃত ছিল বর্তমান সিলেট বিভাগ সহ ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ত্রিপুরা’র কিছু অংশ পর্যন্ত। মণ্ডলগুলো কয়েকটি খণ্ডলে বিভক্ত ছিল, কখনো কখনো খণ্ডলে বিভক্ত না হয়ে বিষয়ে বিভক্ত হতো। বঙ্গীয় রাজা শ্রীচন্দ্রের প্রভাব বিস্তারের মতোন ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রচলন শ্রীহট্টমণ্ডলে ত্যামন একটা ছিল না, তাই তিনি সেখানে হাজার হাজার ব্রাহ্মণ নিয়ে বিশাল এক উপনিবেশ স্থাপন করেন ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রসারের জন্য। এই ব্রহ্মপুরে অনেকগুলো মঠ স্থাপন করা হয়েছিল, যেখানে দেব-দেবীর পূজা-আরাধনার পাশাপাশী ব্রাহ্মণীকরণের ক্রিয়াকৌশল ও সাধারণ জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হতো।

আয়তন ও সীমারেখা[সম্পাদনা]

শ্রীহট্টের পশ্চিমভাগ গ্রাম থেকে উদ্ধারকৃত রাজা শ্রীচন্দ্রের পট্টোলী থেকে জানা যায় শ্রীহট্টমণ্ডলের গরলা, পোগার ও চন্দ্রপুর – এই তিন বিষয়ে রাজা শ্রীচন্দ্র প্রথম প্রস্থে ১২০ পাটক, দ্বিতীয় প্রস্থে ২৮০ পাটক ও তৃতীয় প্রস্থে ৬০০০ সপরিবার ব্রাহ্মণের বাসস্থান সমপরিমাণ ভূমি দান করেছিলেন। এক পাটক ভূমির আয়তন এইরকম- এক কুলা শস্যবীজ যতটুকু পরিমাণ ভূমিতে বপন করা যেত সেই পরিমাণ ভূমিকে বলা হত এক কুল্যবাপ। এক কুল্যবাপ ভূমি সমান আট দ্রোনবাপ ভূমি, আর চল্লিশ দ্রোনবাপ সমান এক পাটক ভূমি। অর্থাৎ সোজা হিশাবে পাঁচ কুল্যবাপ ভূমি সমান এক পাটক ভূমি। পাঁচ কুলা শস্যবীজ বপন করা যায় অ্যামন ভূমির পরিমাণ কম নয়। কাজেই রাজা শ্রীচন্দ্রের দান করা ভূমি যে বিশাল ছিল তা সহজেই অনুমেয়। এই তিনপ্রস্থ ভূমির উত্তরে ছিল কুশিয়ারা নদী, দক্ষিণে মনু নদী, পশ্চিমে জুজনৎছড়া ঝর্না ও খুঙ্খী নদী ও পূর্বে বৃহৎকোট নামক বাঁধ।

জনবল ও ভূমির বণ্টন[সম্পাদনা]

ভারতবর্ষের এই অ-ব্রাহ্মণ পূর্বাঞ্চলকে ব্রাহ্মণীকরণ এই প্রথম নয়, কামরূপ রাজবংশের রাজা ভাস্করবর্মা’র প্রপিতামহ ভূতিবর্মা ভিন্ন ভিন্ন বেদের ৫৬টি ভিন্ন গোত্রের প্রায় ২০৫ জন বৈদিক ব্রাহ্মণের বসতি স্থাপন করিয়েছিলেন শ্রীহট্ট ও রংপুর অঞ্চলে। আর শ্রীচন্দ্র কেবল শত নয়, ছয় হাজার ব্রাহ্মণের বসতি স্থাপন করেন শ্রীহট্টমণ্ডলের এই বিষয়গুলোতে। এদের মধ্যে ব্যকরণ সম্বন্ধীয় অধ্যাপক, স্থপতি থেকে শুরু করে চর্মকার পর্যন্ত ছিলেন। প্রথম প্রস্থের ১২০ পাটক ভূমি দেয়া হয়েছিল দেবতা ব্রহ্মা’র পূজাগৃহ ও মঠের জন্য। ব্যাপারটা কৌতূহলোদ্দীপক, কারণ ভারতবর্ষে ব্রহ্মার একক পূজা দ্যাখা যায় না, হয়তো ব্রাহ্মণীয় নিয়মের দ্রুত প্রসারের জন্য এটা করা হয়েছিল। মঠের বাইরে উপনিবেশের অধিবাসীদের মধ্যে ভূমির বণ্টন হয়েছিল এভাবে : চন্দ্রগোমিনের চান্দ্র ব্যকরণের প্রত্যেক অধ্যাপক এক পাটক করে, বিদ্যার্থী, অতিথি, মঠ নির্মাতা, গণক, মঠ-নট, সূত্রাধর, স্থপতি, কর্মকার ও দেবদাসীর প্রত্যেকে এক পাটক করে, হিশাব রক্ষক আড়াই পাটক, ফুলওয়ালা, শঙ্খবাদক, ঢাকবাদক, তৈলক, দ্রাগড় বাদক, কর্মকার ও চর্মকার প্রত্যেকে অর্ধ পাটক করে।

দ্বিতীয় প্রস্থের বণ্টন ছিল ঘোলাটে। দ্বিতীয় প্রস্থের ২৮০ পাটক ভূমি দুইভাগ করে প্রথম ভাগ দেয়া হয় বাঙালি ব্রাহ্মণদের আর বাকি অর্ধেক বিদেশীদের। প্রত্যেক ভাগে চারজন করে দেবতার মঠ স্থাপন করা হয়েছিল, এই চারজন দেবতা ছিলেন- বৈশ্বানর, যোগেশ্বর শিব, জৈমনি বা জৈমিনি এবং মহাকাল শিব। বিস্ময়কর ছিল জৈমিনি’র দেবত্বে উত্তরণ ও বাঙালি ও বিদেশীদের জন্য একই দেবতার আলাদা আলাদা মঠ স্থাপনের বিষয়টি। এই প্রস্থে চতুর্বেদ অধ্যাপকেরা প্রত্যেকে দশ পাটক করে, ৮ মঠের ৪০ ছাত্রের প্রত্যেকে এক পাটক করে, ফুলওয়ালা, নরসুন্দর, তৈলক, রজক, ভৃত্য, কর্মকার ও সেবিকার প্রত্যেকে অর্ধ পাটক করে, গণক, মহত্তর ব্রাহ্মণ প্রত্যেকে এক পাটক করে, আবেক্ষক দেড় পাটক করে, কায়স্থ প্রত্যেকে আড়াই পাটক করে এবং প্রত্যেক চিকিৎসক তিন পাটক করে পেতেন। তৃতীয় প্রস্থ ভূমি দান করা হয়েছিল ৬,০০০ সপরিবার ব্রাহ্মণকে, সমপরিমাণে।

গুরুত্ব[সম্পাদনা]

সময় বিবেচনায় এতো বড়ো পরিসরে ব্রাহ্মণ্যদর্শানুযায়ী একটি ঔপনিবেশিক ধর্মালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ছিল সত্যিই বিস্ময়কর ব্যাপার। এরচেয়েও বড়ো ব্যাপার ছিল প্রথার বাইরে গিয়ে ব্রহ্মা ও জৈমিনির মঠ স্থাপন ও পূজা শুরু করা, বাঙালি ও অবাঙালিদের জন্য আলাদা আলাদা মঠ স্থাপন, চন্দ্রগোমিনের চান্দ্র ব্যাকরণ ও চতুর্বেদের অধ্যায়ন ও অধ্যাপনা। প্রাচীন বাঙলায় শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে বড়ো মাইলফলক হিশেবে কাজ করেছে শ্রীচন্দ্রপুর নামক এই ব্রহ্মপুরটি।