শেরশাবাদিয়া ভাষা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

শেরশাবাদিয়া ভাষা হল পূর্ব ভারতের মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর ইত্যাদি জেলাসমূহের অন্যতম কথ্যভাষা ।[১] এটি বাংলার মধ্য অঞ্চলে অর্থাৎ গৌড়বঙ্গে প্রচলিত ।[২]

ভৌগোলিক বিস্তার[সম্পাদনা]

শেরশাবাদিয়া ভাষাভাষী মানুষ মূলত পশ্চিমবঙ্গ এবং বিহারের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে বসবাস করে। এই জেলাগুলি হল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তরদক্ষিণ দিনাজপুর এবং বিহার রাজ্যের পূর্ণিয়া, কাটিহারকিসানগঞ্জ। এছাড়া ঝাড়খণ্ড রাজ্যের পাকুড়সাহেবগঞ্জ জেলাতেও এই ভাষাটি প্রচলিত। এটি বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় প্রচলিত প্রধান ভাষা।[২]

বর্তমান স্থিতি[সম্পাদনা]

এই ভাষাটি বড়ো একটা ভৌগোলিক এলাকার মানুষের মুখের ভাষা। ইদানিং এই ভাষায় নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত যুবকগণের মধ্যে সাহিত্য চর্চা ও সামাজিক মাধ্যমে ভাষা চর্চা বাড়ছে, ফলে ভাষাটি ক্রমশ সক্রিয় হতে চলেছে।

নমুনা বাক্যসমূহ[সম্পাদনা]

শেরশাবাদিয়া মান্য বাংলা
তোমারঘে বাড়ি কুণ্ঠে জী? তোমাদের বাড়ি কোথায় (গো)?
হামারঘে/হাঁরঘে বাড়ি জঙ্গিপুর জী, কেনে শোধ্যাইছো? আমাদের বাড়ি জঙ্গিপুর (গো), কেন জিজ্ঞেস করছ?
তোমাকে কহনু বাটিখান লিয়্যাইসো। তোমাকে বললাম বাটিটা নিয়ে এসো।
হামরা/হাঁরা ছুটুব্যালায় কত্ত লুক্কাচুন্নি খেলতুং! আমরা ছোটবেলায় কত লুকোচুরি খেলতাম!
হামি গেল পরশুদিন কোলকাত্তা গেলছিনু। আমি গত পরশুদিন কলকাতা গিয়েছিলাম।
তোরা অ্যাত্তটি লেচু খ্যায়্যা লিয়্যাছিস! তোরা এতটা লিচু খেয়ে নিয়েছিস!
তুই ক্যাল পঁহাতে বাগান থ্যাক্যা আম লিয়াসবি। তুই কাল সকালে বাগান থেকে আম নিয়ে আসবি।
হামি লদ্দির দিকে গেলছিনু, বাজারে য্যাই নি খো। আমি নদীর দিকে গিয়েছিলাম, বাজারে যাই নি (কো)।
অ্যাজি, হামার/হাঁর ভ্যায়ের বিহাতে তোমারঘে জাফত রহিল। (ও গো,) আমার ভাইয়ের বিয়েতে তোমাদের নিমন্ত্রণ থাকল।
আপনারা ম্যাল্যাই পঢ়াশুনা মানুষ, ভ্যাব্যা দ্যাখেন। আপনারা অনেক শিক্ষিত মানুষ, ভেবে দেখেন।
হামি আগিই মাফ চাহাছি ছোট মুখে বড় কথা কহার ল্যাগ্যা। আমি আগেই মাফ চাইছি ছোট মুখে বড় কথা বলার জন্য।
অ্যাখন আর কেহু চুল্হাতে রান্ধে না, সভ্যাই গ্যাস লিছে। এখন আর কেউ উনুনে রান্না করে না, সবাই গ্যাস নিচ্ছে।
অর বহিন হেলতে জানে না, স্যাই ল্যাগ্যা গোঢ়্যাতে লাহে না। ওর বোন সাঁতার জানে না, তাই পুকুরে স্নান করে না।

সাহিত্য ও সংস্কৃতি[সম্পাদনা]

শেরশাবাদিয়া ভাষা হল বাংলার মধ্যযুগীয় রূপ যার একটা ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।। এই ভাষার একটা নিজস্বতা ও স্বকীয়তা রয়েছে। যার কারণে বাংলা থেকে বেশ আলাদা। কখনও কখনও তাদের ভাষা অন্যদের পক্ষে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে তাদের লোকসংস্কৃতির অংশ হিসাবে বিশেষ ধরনের গীদ ও ফস্টি প্রচলিত আছে, সেগুলি সংরক্ষিত হয়েছে।

• শেরশাবাদিয়া গীদ

বিয়ে উপলক্ষে গাওয়া বিশেষ ধরনের গান বা গীতি, যা মহিলারা কোরাস আকারে আবৃত্তি করেন। এসব গানের রচনাশৈলী খুবই অনন্য এবং আকর্ষণীয়। বৈবাহিক জীবনের নানা দিক এই সমস্ত গানের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়। উদাহরণ স্বরূপ:

কাঁখে কোলস কর্যা বেহুলা...

অ্যাঙনা ঝুম ঝুম জোড় কবিতর বাজে...

নওদাপাড়ার ছোড়াগ্যালা সভ্যাই কুকুর...

আইটে সহি খেলতে যাব কদম বাগানে...

হামার মনটা সরে না গে মা সসুরের সঙ্গে য্যাইতে...

• শেরশাবাদিয়া ফস্টি

জীবনের মূল্যবান নীতির উপর ভিত্তি করে প্রচলিত প্রবাদ বা প্রবচন, যা সাম্প্রতিক অতীতে সমাজের সব স্তরের মানুষের মধ্যে প্রচলিত ছিল। বয়স্ক লোকেরা এখনও স্থান কাল পাত্র বিবেচনা করে এগুলি ব্যবহার করে। উদাহরণ স্বরূপ:

প্যাইট, ফের আঁচার! (একে তো মজুর তার ওপর আবার আচারের বাসনা)

অ্যাঁড়্যার মরণ বাঁশতলায়।

চোরের মন পুলিশ পুলিশ।

তোমার বেলায় রস, হামার বেলায় তাড়ি।

লাজ নাই হায়ালিয়াকে, লাজ নাই যায়ালিয়াকে।

এমন জায়গায় বাঁধো ঘর, কেহু আপন কেহু পর।

কয়লার ইল্লত যায় না ধুইল্যা, মানুষের খাসলত যায় না মইল্যা।

আসরে ঘশর মশর মগ্রিবে ঢিল, এশারে খাওন দাওন ফজরে নিন।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

খোট্টা ভাষা

শেরশাবাদিয়া জনগোষ্ঠী

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. """West Bengal Commission for Backward Classes Report on Shershabadia""" (PDF)www.wbcbc.gov.in। সংগ্রহের তারিখ ২২ মে ২০২১ 
  2. "Sher Shah Abadi Community: A Study from Historical Perspective"www.ijhss.com। সংগ্রহের তারিখ ২২ মে ২০২১ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]