মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো ? থেকে পুনর্নির্দেশিত)
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?
মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো বইয়ের প্রচ্ছদ.jpeg
বাংলা অনুবাদের প্রচ্ছদ
লেখকআবুল হাসান আলী নদভী
মূল শিরোনামআরবি: ماذا خسر العالم بانحطاط المسلمين‎, প্রতিবর্ণী. মা যা খাসিরাল আলামু বি ইনহিতাতিল মুসলিমিন
অনুবাদক
  • আবু সাইদ মুহাম্মদ ওমর আলী (বাংলা)
  • আবু তাহের মিসবাহ (বাংলা)
  • মুহাম্মদ ইউসুফ কাদওয়া (ইংরেজি)
প্রচ্ছদ শিল্পীসালসাবীল (বাংলা)
দেশভারত
ভাষাআরবি (মূল)
মুক্তির সংখ্যা
১ খণ্ড
বিষয়ইসলামের ইতিহাস
প্রকাশিত
  • ১৯৫০ (আরবি)
  • ২০০২ (বাংলা)
প্রকাশকলাজনাতুত তালিফ ওয়াত তারজামা ওয়ান্নাশর (আরবি), মুহাম্মদ ব্রাদার্স (বাংলা)
মিডিয়া ধরন
পৃষ্ঠাসংখ্যা৩৫৪ (বাংলা)
পুরস্কারবাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার
আইএসবিএন৯৭৮-১৮৭২৫৩১৩২৮
ওসিএলসি৬৪৭৩৯৮০৩
২৯৭.০৯
এলসি শ্রেণীবিপি৫৩ .এন৩১৩ ১৯৯৪
ওয়েবসাইটইশা ছাত্র আন্দোলন লাইব্রেরি
ইংরেজি সংস্করণ
উর্দু সংস্করণ
আরবি সংস্করণ

মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো? (আরবি: ماذا خسر العالم بانحطاط المسلمين‎, প্রতিবর্ণী. মা যা খাসিরাল আলামু বি ইনহিতাতিল মুসলিমিন‎) দেওবন্দি ইসলামি পণ্ডিত আবুল হাসান আলী নদভী কর্তৃক আরবি ভাষায় রচিত ইসলামের ইতিহাস বিষয়ক জনপ্রিয় একটি বই। তিনি ১৯৪৪ — ১৯৪৭ পর্যন্ত সময় নিয়ে এই বইটি লিখেছেন। ১৯৫০ সালে মিশর থেকে আরবি ভাষায় এটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে এই গ্রন্থটি বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রধান ভাষায় অনূদিত হয়েছে। প্রকাশের পর এই গ্রন্থটি আরব বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং লেখককে আরব বিশ্বে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। ১৯৮০ সালে তিনি মুসলিম বিশ্বের সর্বোচ্চ পুরস্কার বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন। লেখক এই গ্রন্থে এক নতুন দর্শন উপস্থাপন করেছেন। তিনি এই গ্রন্থে মুসলিমদের বিশ্ব নেতৃত্ব গ্রহণের আহবান করেছেন এবং তিনি প্রমাণের চেষ্টা করেছেন মুসলিম জাতির সৃষ্টিই হয়েছে বিশ্ব নেতৃত্বের জন্যে। এই গ্রন্থটি মুসলিম ব্রাদারহুড সহ অসংখ্য রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যবই হিসেবে স্বীকৃত এবং এই গ্রন্থের উপর অনেক পিএইচডি অভিসন্দর্ভ রচিত হয়েছে।

পটভূমি[সম্পাদনা]

মুসলমান বিশেষত আরবদের তাদের পূর্বের নেতৃত্ব ও পতনের কারণ সম্পর্কে বর্ণনা এবং ইসলামি পুনর্জাগরণই হল বইটি রচনার পটভূমি।[১][২] লেখক এই গ্রন্থে এক নতুন দর্শন উপস্থাপন করেছেন। এই গ্রন্থে তিনি মুসলিমদের বিশ্ব নেতৃত্ব গ্রহণের আহবান করেছেন এবং তিনি প্রমাণের চেষ্টা করেছেন মুসলিম উম্মাহর সৃষ্টিই হয়েছে বিশ্ব নেতৃত্বের জন্যে।[৩] বইটি অর্ধেক রচনার পর তিনি হেজাজ ভ্রমণে গিয়েছিলেন এবং তার রচনায় আরও দুটি অধ্যায় যুক্ত করেন, যা গ্রন্থের প্রথমে সন্নিবেশিত হয়েছে। অধ্যায়দ্বয় রচনার পটভূমি সম্পর্কে তিনি লিখেছেন,[৪]

“মুহাম্মদ (সঃ)-এর আবির্ভাবের সময় পৃথিবীর অবস্থা কি ছিল এবং কোন ধর্মীয়, নৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশের মধ্যে তিনি ইসলামের দাওয়াত পেশ করেছিলেন? ইসলামি বিপ্লবের শ্রেষ্ঠত্ব এবং তার বিস্ময়কর ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদান ততক্ষণ পর্যন্ত বােঝা যাবে না, যতক্ষণ না জাহিলিয়াত যুগের সমগ্র পরিবেশ ও তার চিত্র সামনে আসে। এ জন্যই প্রয়ােজন মনে করেছি জাহেলিয়াতের পরিপূর্ণ এ্যালবাম পেশ করার। এ সময় দেখতে পেলাম জাহিলী যুগ সম্পর্কে প্রয়ােজনীয় তথ্য-উপকরণ খুবই দুষ্প্রাপ্য। কিছু বিক্ষিপ্ত তথ্য পাওয়া যায় বটে, কিন্তু সেগুলাে বিভিন্ন পুস্তকের হাজারাে পৃষ্ঠার মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সে সব তথ্য-উপাত্ত একত্র করা এবং সব বিক্ষিপ্ত ও বিস্রস্ত অংশের সাহায্যে জাহেলিয়াতের পরিপূর্ণ এ্যালবাম তৈরি করা যাতে সে যুগের সমগ্র জীবনে সামনে এসে যায় - সীরাতুন নবীর একটি বিরাট বড় খেদমত। মক্কা মুআজ্জমায় অবস্থানকালে প্রাচীন ও আধুনিক কালের লিখিত গ্রন্থাবলির এমন এক ভাণ্ডার পেয়ে যাই, এই এ্যালবাম তৈরিতে যা বিরাট সাহায্য করেছে। হিন্দুস্তানেও অধ্যয়ন ও গবেষণার ধারা অব্যাহত থাকে এবং এই অধ্যায় পূর্ণতা পায় ও পুস্তকের অন্তর্ভুক্ত হয়। এতে করে পুস্তকটি আরও সমৃদ্ধ হয়। এরই সাথে সাথে এই ধারণাও সৃষ্টি হয় যে, মুহাম্মদ (স.)-এর আবির্ভাবের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া এবং ইসলামি দাওয়াতের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলােও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরি। সেই সাথে এই দাওয়াতের মেযাজ ও এর কর্মপন্থা আম্বিয়া (আ.) স্ব-স্ব যুগের বিগড়ে যাওয়া পৃথিবীর কিভাবে সংস্কার ও সংশােধন করতেন, তাঁদের দাওয়াত ও চেষ্টা - সাধনার ধরন অপরাপর সংস্কারক ও নেতৃবৃন্দের থেকে কতটা ভিন্ন, তাঁদের দাওয়াতের প্রতিক্রিয়াই কি হতাে কিংবা কিভাবেই বা লােকে একে অভ্যর্থনা জানাত, জাহেলিয়াত কিভাবে তার মুকাবিলায় এসে দাঁড়াত এবং এর মোকাবেলায় কি ও কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করত, আর আম্বিয়া (আ.) তাঁদের অনুসারীদের কি ভাবে প্রশিক্ষণ দান করতেন, তাদেরকে গড়ে তুলতেন, এরপর তাদের দাওয়াত কিভাবে বিজয় লাভ করত এবং কিভাবেই বা এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ও পরিণতি জাহির হতাে তাও খােলাখুলি তুলে ধরি।”

বিষয়বস্তু[সম্পাদনা]

গ্রন্থটি আরবের যুগে যুগে, অজ্ঞতার যুগ[ক] থেকে আধুনিক যুগের ইতিহাসের একটি নির্ভুল বিশ্লেষণ। প্রথমত, লেখক ইসলামের আগমনের আগে সমাজগুলির নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র, তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র উপস্থাপন করেছেন। মিশরের সাইয়েদ কুতুব তার ভূূমিকায় বলেছেন,[৬]

“ইসলামপূর্ব যুগে এই পৃথিবীর অবস্থা কেমন ছিল, তিনি তারও একটি চিত্র এঁকেছেন। সুসংহত চিত্র। কোথাও বাড়াবাড়ি নেই। কোথাও লুকোচুরি নেই। উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম সব দিকের চিত্রই রয়েছে এতে। হিন্দুস্তান থেকে চীন, চীন থেকে রােম ও রােম থেকে পারস্যসহ মােটামুটি সমগ্র দুনিয়ার সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক সে চিত্র। এই চিত্রে উন্মােচন করা হয়েছে ইহুদি ও খ্রিস্ট ধর্মের স্বরূপ। যদিও তারা আসমানি ধর্মের অনুসরণের দাবিদার। এই চিত্রে ছিল প্রতিমাপূজারী হিন্দু ও বৌদ্ধদের কথাও। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হলেও এই চিত্রে তাদেরও একটি পরিপূর্ণ অবস্থা বিবৃত হয়েছে। আর মূল গ্রন্থের সূচনা এখান থেকেই।”

অজ্ঞতার যুগের বৈশিষ্ট্য বর্ণনার পর, লেখক মানবতা পুনর্নির্মাণে ইসলামের ভূমিকা তুলে ধরেছেন যাতে মানব সমাজকে কুসংস্কার ও অবক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচাতে, কুসংস্কার ও বঞ্চনার হাত থেকে মানুষের আত্মাকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে, তাকে দাসত্ব ও অবক্ষয়ের কুফল থেকে মুক্তি দিতে এবং মানুষকে রাজাদের অত্যাচার ও আধিপত্য থেকে মুক্তি দিতে ইসলামের ভূমিকার বর্ণনা দেয়।[৬] এটি বিশ্বাসের জগৎ এবং কর্মের জগতের মধ্যে একটি সুরেলা ভারসাম্য সৃষ্টি করেছিল, তাই ইসলাম কখনই অগ্রগতি এবং বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে প্রমাণিত হয়নি। এটিই ইসলাম যা পূর্বের মুসলমানদেরকে মহান করে তুলেছিল তবে পরবর্তী প্রজন্ম ইসলামের শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিল।[৬]

লেখক মুসলমানদের মধ্যে বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক ক্ষয় হওয়ার কারণগুলো সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করেছেন এবং উল্লেখ করেছেন যে, মুসলমানদের যে ক্ষতি হয়েছে তার কারণ, তাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুতি এবং তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব থেকে দূরে সরে যাওয়া।[৬]

লেখকের মতে, মানবজাতির নেতৃত্বের যে মহান দায়িত্ব তাদের উপর অর্পণ করা হয়েছিল, তারা দক্ষতার সাথে তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়ার সাথে সাথে ইসলাম তার বিশ্ব নেতৃত্ব হারিয়ে পশ্চিমাদের নেতৃত্বের পথ প্রশস্ত করার পথ তৈরি করেছিল, যা নিছক বস্তুবাদী। তারপরে লেখক, মুসলিমদের কাছ থেকে পশ্চিমাদের কাছে বিশ্ব-নেতৃত্ব স্থানান্তরের নিষ্ঠুর ও বিপর্যয়মূলক পরিণতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন।[৬]

লেখকের এই রচনার লক্ষ্য, মানবিক অগ্রগতির গল্পে মুসলমানদের ইসলামের গৌরবময় ভূমিকার প্রশংসা করা এবং তাদের মধ্যে তা প্রচার করা, যাতে অনুসন্ধানের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে খোঁজ করে, তারা তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে কতটুকু দূরে?[৬]

এটি ইসলামকে একটি চিরন্তন বাস্তবতা এবং জীবনের একটি প্রোগ্রাম হিসেবে উপস্থাপন করে, যা কখনই অচল হয়ে উঠতে পারে না। লেখক এই রচনার মধ্য দিয়ে বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে ইসলামের পুনর্জাগরণের আশা পুনরায় জাগিয়ে তুলেছেন।[৬]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৯৪৬ সালে গ্রন্থটির অর্ধেক অংশ রচনার পর না জানি কবে আরবিতে প্রকাশিত হবে এ ভেবে নদভী তা উর্দুতে অনুবাদের ব্যবস্থা করেন। এ অনুবাদ গ্রন্থ ‘মুসলমানুকে তানাযযুল ছে দুনিয়া কো কিয়া নুকসান পহুঁচা ’ নামে প্রকাশিত হয়। প্রথম সংস্করণে বইটির অঙ্গসজ্জা, কাগজ ও ছাপা ইত্যাদি বইয়ের বিষয়বস্তু, গুরুত্ব ও মর্যাদার সাথে সংগতিপূর্ণ ছিল না। এরপর তিনি হেজাজ ভ্রমণে যান এবং গ্রন্থটির পরিপূর্ণ কাজ সমাপ্ত করেন। পাণ্ডুলিপি তৈরি হওয়ার পর তার নিকট ব্যক্তিগতভাবে এ গ্রন্থটি প্রকাশের কোন ব্যবস্থা ছিল না এবং কোন ব্যবসায়িক প্রকাশনা সংস্থাও এটি প্রকাশের আগ্রহ দেখায় নি। মক্কায় অবস্থানকালে তিনি তিনি সেখানকার বিভিন্ন প্রকাশনীর সাথে যোগাযোগ করেও ব্যর্থ হন। উপায়ন্তর না দেখে তিনি মসজিদ আল-হারামে চলে যান এবং দোয়া করেন। এ সম্পর্কে তার আত্মজীবনী কারওয়ানে জিন্দেগিতে তিনি লিখেছেন,[৪]

“এ অবস্থায় সােজা হেরেম শরীফে চলে যাই এবং মুলতাযিমে অন্তরের সকল আকুতি-মিনতি নিয়ে এ গ্রন্থখানির প্রকাশনার সকল ব্যবস্থাপনার তাওফীক রাব্বুল আলামীনের কাছে ভিক্ষা চাই। দোয়ার প্রতিক্রিয়া এই হয়েছিল যে, আল্লাহ পাক এ গ্রন্থখানি প্রকাশের সকল ব্যবস্থা উত্তম পদ্ধতি ও অদৃশ্য ব্যবস্থাপনায় করেছিলেন এবং আমার এ গ্রন্থখানির যে ব্যাপক গ্রহণযােগ্যতা হয়েছিল অন্য কোন গ্রন্থের বেলায় তা হয়নি।”

পরবর্তীতে মিশরের স্বনামধন্য প্রকাশনা সংস্থা “লাজনাতুত তালিফ ওয়াত তারজামা ওয়ান্নাশর” এ গ্রন্থটি প্রকাশের আগ্রহ প্রকাশ করে। প্রকাশনীর সভাপতি ড. আহমদ আমিনের একটি ভূমিকা সহ ১৯৫০ সালে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। আমিন ইসলামি চিন্তাবিদ হলেও ইসলামি জাগরণের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী ছিলেন না। ফলে জর্ডানের প্রথম আবদুল্লাহ সহ অনেক পাঠকের মন্তব্য করেন যে, আমিনের ভূমিকায় গ্রন্থটির মূল আবেদন বুঝাতে ব্যর্থ হয়েছে।[৬] দ্বিতীয় সংস্করণে মিশরের ইসলামি আন্দোলনের কিংবদন্তি সাইয়েদ কুতুবের ভূমিকা সহ গ্রন্থটি আবার প্রকাশিত হয়। এই ভূমিকায় কুতুব লিখেন,[৩]

“গ্রন্থটির পাঠক স্পষ্টতই বুঝতে পারবেন বর্তমান নেতৃত্ব পরিবর্তন আবশ্যক। মুসলমানরা নেতৃত্ব হারানোর দ্বারা সমগ্র মানবজাতি এক মহাবিপর্যয়ে নিপতিত হয়েছে। আর এই বিপর্যয়ে শুধু মুসলিম জাতিই নয় বরং সমগ্র বিশ্ব অন্তর্ভুক্ত।”

প্রকাশের দু-তিন মাসের মধ্যে এটি সমগ্র আরব বিশ্বে পৌঁছে গিয়েছিল। ইসলামি দলগুলোও তা আগ্রহের সাথে গ্রহণ করে। এটি মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রশিক্ষণী সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আদালতের বিতর্কে ও সংসদের বক্তৃতায়ও এই বই থেকে উদ্ধৃতি প্রদান করা হয়েছে। সাইয়েদ কুতুবের সাপ্তাহিক আলোচনা সভায় বইটি নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করা হত।[৪]

১৯৮২ সালে কুয়েতের দারুল কলম এই গ্রন্থটির ১ লক্ষ কপি ছাপানোর সাথে সাথে তার ৮০ হাজার কপি সৌদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ১২ হাজার কপি রিয়াদের মাকতাবাতুল হারাম কিনে নেয়। ২০০২ সালের আগ পর্যন্ত আরবিতে ৭০+ সংস্করণ, ভারতপাকিস্তানে উর্দুতে ২৪ টি সংস্করণ এবং ইংরেজিতে ৬টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল।[৭]

বইটির ইংরেজি সংস্করণের প্রকাশ উপলক্ষে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিভাগের সভাপতি ড. বাকিংহাম বলেন,[৭]

“এ শতাব্দীতে মুসলমানদের পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে যেসকল ভালাে ভালাে প্রচেষ্টা চালানাে হয়েছে এ গ্রন্থখানি তার নমুনা এবং ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার যােগ্য।”

গঠন[সম্পাদনা]

গ্রন্থটি ৮টি অধ্যায়ে বিভক্ত। শুরুতে সাইয়েদ কুতুবের একটি ভূমিকা আছে। বিভিন্ন সংস্করণে আবুল হাসান আলী নদভীর সংস্করণটি সম্পর্কে মুখবন্ধ যুক্ত করা হয়েছে। অধ্যায় সমূহ:[৪]

  1. রাসূল আকরাম (সা)-এর আবির্ভাবের পূর্বে
  2. রাসূল আকরাম (সা)-এর আবির্ভাবের পর
  3. মুসলমানদের নেতৃত্বের যুগ
  4. মুসলমানদের পতন যুগ
  5. বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে পাশ্চাত্য জগত ও তার ফলাফল
  6. পাশ্চাত্যের নেতৃত্ব থাকাকালে পৃথিবীর পারিভাষিক ক্ষয়ক্ষতি
  7. জীবনের ময়দানে মুসলিম বিশ্ব
  8. আরব বিশ্বের নেতৃত্ব

উৎস[সম্পাদনা]

সূত্রধর্মী এই গ্রন্থটি রচনায় লেখক ইসলামি উৎসের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্ম, সাময়িকী, বিশ্বকোষ ও ইতিহাস বিষয়ক বইয়ের সহায়তা নিয়েছেন। তার মধ্যে রয়েছে:[৪]

অনুবাদ[সম্পাদনা]

১৯৯৮ সালে নদভীর শিষ্য ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের অন্যতম পরিচালক আবু সাইদ মুহাম্মদ ওমর আলী লেখকের সান্নিধ্যে যান। নদভী তাকে বইটি বঙ্গানুবাদ করার ইঙ্গিত ও উৎসাহ প্রদান করেন। ওমর আলী ‘মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?’ শিরোনামে বইটি অনুবাদ করেন। নদভীর সকল বই প্রকাশের লিখিত অনুমতি প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান মজলিস নাশরিয়াত-ই ইসলামের অনুমতি নিয়ে ২০০২ সালে এই বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করে ঢাকার মুহাম্মদ ব্রাদার্স। গ্রন্থের শুরুতে রাবে হাসানী নদভীর একটি ভূমিকা সংযুক্ত করা হয়েছে এবং এই সংস্করণটি নদভীর দাপ্তরিক সাইটেও প্রকাশ করা হয়েছে।[৪] ‘মুসলমানদের পতনে বিশ্ব মানবতা কী হারালো ?’ শিরোনামেও অনুবাদ করেছেন আবদুল্লাহ আল ফারুক কাসেমি। প্রকাশ করেছে ঢাকার মাকতাবাতুল আযহার।[৮] ২০১৩ সালে ‘মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হল ?’ শিরোনামে আরেকটি বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করে দারুল কলম প্রকাশনী। অনুবাদক খ্যাতিমান বাংলা সাহিত্যিক আবু তাহের মিসবাহ[৯]

এই গ্রন্থটির একাধিক ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে ১৯৮৩ সালে লেবাননের হলি কুরআন পাবলিকেশন্স হাউস প্রকাশিত ‘Islam and the World: The Rise and Decline of the Muslims and Its Effect on Mankind’। অনুবাদক মুহাম্মদ আসিফ কিদওয়া। ২০০৩ সালে এটি ইউকে ইসলামি একাডেমি থেকেও এটি প্রকাশিত হয়েছে।[১০]

এছাড়াও উর্দুতে ‘ইনসানি দুনিয়া পার মুসলমানো কী উরজ ওয়া জাওয়াল কা আছার’ শিরোনামে, ইরানের কুম শহরের জলসাত ইলমী ইসলাম শেনাসী কর্তৃক প্রথম ফারসি অনুবাদ সহ বিশ্বের প্রতিটি প্রধান ভাষায় এর অনুবাদ সম্পন্ন হয়েছে।[১১][১২]

পুরস্কার[সম্পাদনা]

গ্রন্থটি রচনার জন্যে ১৯৮০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রিয়াদে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে নদভীকে বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রদান করা হয়। সৌদি আরবে এ সম্মানীর মূল্যমান ছিল দুই লক্ষ চল্লিশ হাজার রিয়াল। ভারতে যার মূল্যমান চব্বিশ লক্ষ রুপি। তিনি এই পুরস্কারের অর্ধেক অর্থ আফগান উদ্বাস্তুদের মাঝে এবং বাকি অর্ধেক মক্কার দুটি প্রতিষ্ঠান: এদারায়ে হিফযুল কুরআন ও মাদ্রাসায়ে সওলাতিয়াতে বণ্টন করে দেন।[৭][১৩][১৪]

উত্তরাধিকার[সম্পাদনা]

গ্রন্থটি মুসলিম ব্রাদারহুডসহ অসংখ্য রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যবই হিসেবে স্বীকৃত। ২০১১ সালে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধীনে ড. আসফাক আহমদের তত্ত্বাবধানে আরবি ভাষায় হযরত হাসানুজ্জামান কর্তৃক ‘মা যা খাসিরল আলামু বিইনহিতাতিল মুসলিমীনের বিশেষ উল্লেখ সহ আবুল হাসান আলী নদভীর রচনায় সামাজিক-ঐতিহাসিক দিকগুলি’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভ সহ এই গ্রন্থটির উপর অনেক পিএইচডি অভিসন্দর্ভ রচিত হয়েছে।[১৫]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. ইসলামের ইতিহাসের পরিভাষায় এ শব্দটি ইসলামের নবীর আবির্ভাবের পূর্বেকার আরবদের অবস্থার উপর ব্যবহার করা হয়।[৫]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. খান, জুবায়ের জাফর (২০১০)। "মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভীর ইসলামি চিন্তাভাবনার সমালোচনামূলক গবেষণা"আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় (ইংরেজি ভাষায়): ২৫১ — ২৬১। 
  2. আমিন, নুরুল (২০১৩)। "আবুল হাসান আলী নদভীর রচনায় দার্শনিক ও শিক্ষামূলক চিন্তাভাবনা"কান্নুর বিশ্ববিদ্যালয় (আরবি ভাষায়): ১৪৯—১৬০। 
  3. রবিউল হক, মুহাম্মদ (২ ডিসেম্বর ২০২০)। "মুসলিম উম্মাহর দরদী দাঈ সাইয়্যিদ আবুল হাসান আলী নদবী"যুগান্তর। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০১-০৮ 
  4. মুহাম্মদ ওমর আলী, আবু সাইদ (২০০২)। মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?। ঢাকা: মুহাম্মদ ব্রাদার্স। পৃষ্ঠা ১–২৪। আইএসবিএন 984-622-000-6 
  5. রহমান, মিরাজ (১৭ ডিসেম্বর ২০১৩)। "আইয়ামে জাহেলিয়া কি?"প্রিয়.কম। সংগ্রহের তারিখ ২৯ জানুয়ারি ২০২১ 
  6. ভাট, সামি উল্লাহ (২০১৭)। "তারীখে দাওয়াত ও আজীমাতের বিশেষ উল্লেখ সহ সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভীর ইসলামি ইতিহাসে অবদান"কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয় (ইংরেজি ভাষায়): ৬৮,৬৯,৭০। 
  7. মুহাম্মদ সালমান, মাওলানা (মে ২০০২)। আবুল হাসান আলী নদভীর জীবন ও কর্ম (PDF)। ঢাকা: আল ইরফান পাবলিকেশন্স। পৃষ্ঠা ৩২, ৩৩৪ — ৩৩৭। 
  8. কাসেমি, আবদুল্লাহ আল ফারুক (জানুয়ারি ২০০০)। মুসলমানদের পতনে বিশ্ব মানবতা কি হারালো?। ঢাকা: মাকতাবাতুল আযহার। পৃষ্ঠা ১,২। 
  9. মিসবাহ, আবু তাহের (আগস্ট ২০১৩)। মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হল?। কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা, ১২১১: দারুল কলম। পৃষ্ঠা ১,২। আইএসবিএন 978-984-90663-0-9 
  10. নদভী, আবুল হাসান আলী; কিদওয়া, মুহাম্মদ আসিফ; ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফেডারেশন অব স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন (১৯৮৩)। Islam and the world (ইংরেজি ভাষায়)। সলিমিয়া, কুয়েত; বৈরুত, লেবানন: আই.আই.এফ.এস.ও. ; হলি কুরআন পাবলিকেশন্স হাউস। ওসিএলসি 24390370 
  11. এম জাওয়াহির, এম নাফেল (২০০৮)। "আবুল হাসান আলি নদভীর রাজনৈতিক দর্শনের সাথে সমসাময়িক দুই স্কলারের একটি তুলনামূলক গবেষণা" (PDF)ওয়েল্স্ বিশ্ববিদ্যালয়: ১২। 
  12. ইনসানি দুনিয়া পার মুসলমানো কী উরজ ওয়া জাওয়াল কা আছার, উর্দু 
  13. "বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার" (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০১-০৯ 
  14. তাসনিম, উবায়দুল্লাহ। "আবুল হাসান আলী নদবি: ইতিহাসের কিংবদন্তি"আমাদের ইসলাম। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০১-১০ 
  15. হাসানুজ্জামান, হযরত (২০১১)। "মা যা খাসিরল আলামু বিইনহিতাতিল মুসলিমীনের বিশেষ উল্লেখ সহ আবুল হাসান আলী নদভীর রচনায় সামাজিক-ঐতিহাসিক দিকগুলি"আসাম বিশ্ববিদ্যালয় (আরবি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৯ জানুয়ারি ২০২১ 

গ্রন্থপঞ্জি[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]