বিষয়বস্তুতে চলুন

ভাষাবিজ্ঞান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(মনোভাষাবিজ্ঞান থেকে পুনর্নির্দেশিত)
নিবন্ধ সহায়িকা: পরিভাষা তালিকাবিদেশী নামের তালিকা

ভাষাবিজ্ঞান একটি বৈজ্ঞানিক শাস্ত্র যেখানে মানুষের ভাষার প্রকাশ্য রূপ ও অন্তর্নিহিত প্রকৃতি, গাঠনিক কাঠামো ও মৌলিক ঔপাদানিক একক এবং দেশকালভেদে ভাষার বিবর্তন ও পরিবর্তন নিয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গবেষণা, বিশ্লেষণ ও আলোচনা করা হয়।[][] যেসব বিশেষজ্ঞ ভাষাবিজ্ঞান শাস্ত্রের অধীনে ভাষার তত্ত্ব ও প্রায়োগিক দিক নিয়ে উচ্চশিক্ষায়তনিক গবেষণা সম্পাদন করেন, তাঁদেরকে ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ভাষাবিজ্ঞানীরা বস্তুনিষ্ঠ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভাষাকে বিশ্লেষণ করেন ও ভাষার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি বর্ণনা করেন। ভাষার শুদ্ধাশুদ্ধি বিচার করা কিংবা ভাষার ব্যবহারের কঠোর নিয়ম বা বিধিবিধান প্রণয়ন করা তাঁদের মৌলিক উদ্দেশ্য নয়।

ভাষাবিজ্ঞানীরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বহুবিধ ভাষার মধ্যে তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে সেগুলির সাধারণ বৈশিষ্ট্য এবং অন্তর্নিহিত প্রাকৃতিক সূত্রগুলি নিরূপণের চেষ্টা করেন। তাঁদের লক্ষ্য হল ভাষাকে ব্যাখ্যার করার জন্য এমন একটি সুসঙ্গত ও সার্বজনীন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নির্মাণ করা, যে কাঠামোটি পৃথিবীর সমস্ত ভাষার স্বরূপ উন্মোচন করতে সক্ষম। ফলে ভাষাবিজ্ঞান কোনও ভাষায় ভবিষ্যতে কোন্‌ ধরনের পরিবর্তন ঘটার সম্ভাবনা আছে বা নেই, সে ব্যাপারেও যৌক্তিক ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে।

ভাষাসমূহের বস্তুনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক বিবরণ প্রদানের পাশাপাশি এগুলির উৎপত্তি ও বিবর্তনের ইতিহাসও ভাষাবিজ্ঞানের অন্যতম অনুষঙ্গ। শিশুরা ঠিক কোন্‌ প্রক্রিয়ায় সহজাতভাবে ভাষা অর্জন করে এবং প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা তাঁদের মাতৃভাষার গণ্ডি পেরিয়ে কীভাবে সম্পূর্ণ নতুন কোনো ভাষা আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়, সেগুলিও এই শাস্ত্রে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়। আবার বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং সময়ের প্রবাহে এগুলির রূপান্তরের ধারা নিয়ে এই শাস্ত্রে গভীরভাবে অধ্যয়ন করা হয়।

কোনও কোনও ভাষাবিজ্ঞানী ভাষাকে নিছক যোগাযোগের মৌখিক ও লেখ্য মাধ্যম নয়, বরং একটি জটিল মানসিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করেন এবং ভাষা উৎপাদন ও সেটি উপলব্ধি করার যে বিশ্বজনীন মানবীয় ক্ষমতা, সেটির একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস নেন। আবার অন্যান্য বহু ভাষাবিজ্ঞানী ভাষাকে একটি অপেক্ষাকৃত গভীর সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে অবলোকন করেন: তাঁরা মানুষের দৈনন্দিন কথা বলার ভঙ্গি সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং বোঝার চেষ্টা করেন যে মানুষ কীভাবে পরিবেশ ও পরিস্থিতি ভেদে (যেমন কর্মস্থলে, বন্ধুদের আড্ডায় কিংবা পরিবারের সদস্যদের সাথে) একই ভাষার ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক রূপ ও বৈচিত্র্য যথাযথভাবে প্রয়োগ করে।

যদিও ভাষা নিয়ে গবেষণা বা চর্চার ইতিহাস অতি প্রাচীন, তথাপিও কেবল খ্রিস্টীয় উনিশ শতাব্দীতে এসেই এটি একটি স্বতন্ত্র এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ভাষাবিজ্ঞান নামের আধুনিক একটি শাস্ত্রের রূপ লাভ করে। ভাষাবিজ্ঞানের প্রধানত দুটি দিক পরিলক্ষিত হয়: তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক। তাত্ত্বিক ভাষাবিজ্ঞানে মূলত ভাষার ধ্বনিগত বিন্যাস বা ধ্বনিসম্ভার (ধ্বনিতত্ত্বধ্বনিবিজ্ঞান), গাঠনিক কাঠামো বা ব্যাকরণ (বাক্যতত্ত্বরূপমূলতত্ত্ব) এবং শব্দের অর্থের গভীর ব্যঞ্জনা বা শব্দার্থ (অর্থবিজ্ঞান) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। অন্যদিকে ব্যবহারিক ভাষাবিজ্ঞানে তাত্ত্বিক জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে অনুবাদ, ভাষা শিক্ষাদান পদ্ধতি, বাক-প্রত্যঙ্গজনিত রোগ নির্ণয় ও প্রাসঙ্গিক বাক-চিকিৎসা, ইত্যাদি বিষয় আলোচিত হয়। এগুলি ছাড়াও ভাষাবিজ্ঞান জ্ঞানের অন্যান্য শাখার সাথে সমন্বিত হয়ে সমাজভাষাবিজ্ঞান, মনোভাষাবিজ্ঞান, এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পরিগণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান ইত্যাদি নতুন ও বৈচিত্র্যময় আন্তঃশাস্ত্রীয় শাখার জন্ম দিয়েছে।

ভাষাবিজ্ঞানের শাখা

[সম্পাদনা]

ভাষাবিজ্ঞানীরা মূলত দুইটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে ভাষাকে বিশ্লেষণ করেন। প্রথমত, কোনও নির্দিষ্ট সময়ের একটি নির্দিষ্ট ভাষার অভ্যন্তরীণ রূপ নিয়ে গবেষণা করা; একে বলা হয় এককালিক, সমকালীন, বা কালকেন্দ্রিক ভাষাবিজ্ঞান। দ্বিতীয়ত, সময়ের আবর্তে কোনো একটি ভাষার ঐতিহাসিক বিবর্তন, ক্রমবিকাশ ও রূপান্তরের ধারা নিয়ে গবেষণা করা; যাকে বলা হয় কালানুক্রমিক, বিবর্তনমূলক, বা ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান

তাত্ত্বিক ভাষাবিজ্ঞানে মূলত ভাষার বিমূর্ত ও অভ্যন্তরীণ গাঠনিক কাঠামোর একটি সার্বজনীন তত্ত্ব প্রদানের চেষ্টা করা হয়। অন্যদিকে, ব্যবহারিক ভাষাবিজ্ঞানে অর্জিত ভাষিক ধারণাগুলি বাস্তব জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ও ভাষা শিক্ষার কাজে লাগানো হয়। তাত্ত্বিক ভাষাবিজ্ঞান যেহেতু ভাষার মৌলিক ও অভ্যন্তরীণ কাঠামো নিয়ে কাজ করে, তাই এর প্রকৃতি মূলত এককালিক বা সমকালীন। সাধারণত তাত্ত্বিক ভাষাবিজ্ঞানের মূল ধারায় ভাষার সামাজিক, নৃতাত্ত্বিক বা মনস্তাত্ত্বিক অনুষঙ্গ নিয়ে সরাসরি আলোচনা করা হয় না। এই বিশেষায়িত ক্ষেত্রগুলি গবেষণা করার জন্য ব্যবহারিক ভাষাবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা, যেমন— সমাজভাষাবিজ্ঞান, মনোভাষাবিজ্ঞান কিংবা নৃতাত্ত্বিক ভাষাবিজ্ঞান, ইত্যাদি স্বতন্ত্র ক্ষেত্র গড়ে উঠেছে।

ভাষার কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের ওপর ভিত্তি করে ভাষাবিজ্ঞানের শাখাগুলি

ভাষার গাঠনিক কাঠামোর বিভিন্ন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্তর ও বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে ভাষাবিজ্ঞানকে প্রধানত নিচের শাখাগুলিতে বিভক্ত করা যায়:

  • ধ্বনিবিজ্ঞান: মানুষের উচ্চারিত ভাষার ধ্বনির ভৌত প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য এখানে আলোচনা করা হয়। এতে ধ্বনিসমূহ উচ্চারণের সময় মানবদেহের কোন কোন প্রত্যঙ্গ সক্রিয় হয় এবং উৎপাদিত ধ্বনিতরঙ্গের ভৌত রূপ কী রকম, তা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা হয়।
  • ধ্বনিতত্ত্ব: কোনও নির্দিষ্ট ভাষাতে ধ্বনির সুশৃঙ্খল বিন্যাস ও ব্যবহারিক নিয়ম। এখানে ধ্বনিমূল, সহধ্বনি ও যুগ্মধ্বনির পারস্পরিক অবস্থান নিয়ে গবেষণা করা হয়।
  • রূপমূলতত্ত্ব: একে রূপতত্ত্ব বা শব্দতত্ত্বও বলা হয়। এটি মূলত শব্দের ক্ষুদ্রতম অর্থপূর্ণ একক বা রূপমূল এবং শব্দের অভ্যন্তরীণ গঠন নিয়ে আলোচনা করে।
  • বাক্যতত্ত্ব: ভাষায় ব্যবহৃত শব্দ ও শব্দগুচ্ছের মতো ক্ষুদ্রতর এককগুলি ব্যাকরণিক নিয়মে সংযুক্ত হয়ে কীভাবে পূর্ণাঙ্গ বাক্য গঠন করে, এটি তার প্রধান আলোচ্য বিষয়।
  • বাগর্থবিজ্ঞান: একে শব্দার্থতত্ত্ব বা অর্থবিজ্ঞান-ও বলা হয়। এটি শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ এবং বাক্যের সামগ্রিক ভাব গঠনে শব্দের অর্থের ভূমিকা বিশ্লেষণ করে।
  • প্রয়োগার্থবিজ্ঞান: ভাষার প্রকৃত প্রয়োগে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং বক্তা-শ্রোতার সম্পর্কের প্রভাব নিয়ে এখানে গবেষণা করা হয়।
এককালিক তাত্ত্বিক ভাষাবিজ্ঞানের শাখাগুলির সম্পর্ক; সময়ের সাথে সাথে এগুলির প্রতিটিই পরিবর্তিত হয়।

ভাষা বিষয়ক গবেষণার সামগ্রিক প্রকৃতি, উদ্দেশ্য এবং স্থানকালিক বিস্তৃতি অনুসারে ভাষাবিজ্ঞানকে নিম্নোক্ত শাখাগুলিতে ভাগ করা সম্ভব:

  • তাত্ত্বিক ভাষাবিজ্ঞান: বিভিন্ন ভাষা ঠিক কীভাবে কাজ করে এবং তাদের গাঠনিক মূলসূত্রগুলি কী, তা নিরূপণ করা।
  • ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান: ভাষাগুলি ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে কীভাবে বর্তমান অবস্থায় এল এবং তাদের আদি উৎস অনুসন্ধান করা।
  • উপভাষাতত্ত্ব: ভৌগোলিক অবস্থানভেদে একই ভাষার আঞ্চলিক বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা বিষয়ক গবেষণা।
  • ভাষাতাত্ত্বিক শ্রেণীকরণবিদ্যা: বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাকে তাদের বাহ্যিক ও গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্যের ওপর ভিত্তি করে শ্রেণীকরণ করা।

আবার ভাষাবিজ্ঞান যখন জ্ঞানের অন্যান্য শাখার সাথে সমন্বিত হয়, তখন বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃশাস্ত্রীয় শাখার উদ্ভব ঘটে:

  • সমাজভাষাবিজ্ঞান: ভাষা এবং সামাজিক কাঠামোর মধ্যকার গভীর ও পারস্পরিক সম্পর্কের বৈজ্ঞানিক গবেষণা।
  • মনোভাষাবিজ্ঞান: মানুষের মনের বা মস্তিষ্কের ভেতর ভাষা কীভাবে রূপলাভ করে এবং প্রক্রিয়াগত হয়, সেই সম্পর্কিত আলোচনা।
  • ফলিত ভাষাবিজ্ঞান: ভাষা শিক্ষাদান, অনুবাদ প্রক্রিয়া এবং নীতিনির্ধারণের মতো ব্যাবহারিক ক্ষেত্রগুলিতে ভাষাতাত্ত্বিক তত্ত্বের সরাসরি প্রয়োগ।
  • গাণিতিকপরিগণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান: ভাষার গাণিতিক ও পরিসাংখ্যিক প্রকৃতি বিশ্লেষণ এবং পরিগণক যন্ত্র তথা কম্পিউটারের মাধ্যমে মানুষের স্বাভাবিক ভাষা প্রক্রিয়াজাতকরণের পদ্ধতির গবেষণা।
  • শৈলীবিজ্ঞান: সাহিত্যকর্মের ভাষা বিশ্লেষণ এবং নান্দনিকতা বিচারে ভাষাতাত্ত্বিক তত্ত্বের প্রয়োগ।
  • নৃ-ভাষাবিজ্ঞান: বিভিন্ন সংস্কৃতি ও পরিবেশভেদে ভাষার প্রকৃতি ও ব্যবহারের বৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা।
  • ভাষার দর্শন: মানুষের ভাষা এবং তার যৌক্তিক চিন্তাধারার মধ্যকার মৌলিক সম্পর্ক অনুসন্ধান।
  • চিকিৎসা ভাষাবিজ্ঞান: মানুষের বাক-প্রত্যঙ্গজনিত রোগ নির্ণয় ও তার বৈজ্ঞানিক চিকিৎসায় ভাষাবিজ্ঞানের প্রায়োগিক দিক।

এসবের বাইরেও অনেক ভাষাবিজ্ঞানী ইশারার মাধ্যমে যোগাযোগ বা ইশারা ভাষা, সংকেত নির্ভর অব্যক্ত যোগাযোগ, এবং জীবজগতে প্রাণীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ—যা প্রথাগত মুখের ভাষার অন্তর্ভুক্ত নয়—সেগুলি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা পরিচালনা করেন।

উল্লেখ্য যে, কীভাবে শুদ্ধভাবে লিখতে বা পড়তে হয়, ভাষাবিজ্ঞান মূলত সেই সংক্রান্ত কোনো অনুশাসনমূলক শাস্ত্র নয়। ভাষাবিজ্ঞান কদাচ "বিধানমূলক" নয়, বরং এটি "বর্ণনামূলক"। ভাষাবিজ্ঞানীরা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্ত উপস্থাপন করেন, যা সাধারণ মানুষকে ভাষাবিষয়ক কোনো যৌক্তিক সিদ্ধান্ত বা মূল্যায়নে সহায়তা করে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, এই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা সামাজিক মূল্যায়নগুলি সরাসরি ভাষিক বিজ্ঞানের অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়।

ভাষাবিজ্ঞানের উৎস

[সম্পাদনা]

পাশ্চাত্যে ভাষাচর্চার ইতিহাস বেশ প্রাচীন, যার সূত্রপাত ঘটেছিল খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে। তৎকালীন গ্রিক দার্শনিকরা প্রথম ভাষার তাত্ত্বিক দিকগুলো নিয়ে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। মূলত ভাষার আদি উৎস এবং গ্রিক ভাষার ব্যাকরণগত কাঠামোর বিন্যাস ছিল তাঁদের বিতর্কের প্রধান বিষয়। এই ধারায় প্রখ্যাত দার্শনিক প্লেটোএরিস্টটল ভাষার বৈজ্ঞানিক অধ্যয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ধারণা করা হয়, প্লেটো-ই সর্বপ্রথম বাক্যের মধ্যে বিশেষ্য ও ক্রিয়ার মৌলিক পার্থক্য নিরূপণ করেন। পরবর্তীতে খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতাব্দীতে দিয়োনিসিয়ুস থ্রাক্স প্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রিক ব্যাকরণ রচনা করেন। এই প্রভাবশালী ব্যাকরণটিকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেই পরবর্তীকালে রোমান বা লাতিন ব্যাকরণবিদরা তাঁদের শাস্ত্রীয় কাজ সম্পন্ন করেন। তাঁদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা মধ্যযুগ ও রেনেসাঁসের সময়কালীন ইউরোপীয় ব্যাকরণচর্চাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। সেই যুগে ইউরোপের ব্যাকরণবিদরা গ্রিক ও লাতিন ব্যাকরণকে আদর্শ ও "শুদ্ধ" হিসেবে গণ্য করতেন এবং সেই ছাঁচেই নিজেদের স্থানীয় ভাষার জন্য বিভিন্ন বিধানমূলক ব্যাকরণ রচনা করতেন। রেনেসাঁস পরবর্তী সময়ে পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদদের মধ্যে বিশ্বের অন্যান্য বিচিত্র ভাষার ব্যাকরণ ও গঠন প্রকৃতি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়।

পাশ্চাত্যের সমান্তরালে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তারও আগে, ভারতীয় উপমহাদেশে ভাষাবিষয়ক গবেষণার একটি স্বতন্ত্র ও সমৃদ্ধ ধারা বিদ্যমান ছিল। প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃত ব্যাকরণবিদেরা বাক্যের উদ্দেশ্য ও বিধেয়ের মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য করতে জানতেন। গ্রিকদের মতো তাঁরাও বিশেষ্য ও ক্রিয়াপদ শনাক্ত করেছিলেন; তবে তাঁদের বিশেষত্ব ছিল অনুসর্গ ও অব্যয় নামে আরও দুটি পদের উদ্ভাবন। ভারতীয় ব্যাকরণবিদদের মধ্যে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে বিখ্যাত হলেন পাণিনি (খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দী), যদিও পাণিনির জন্মের কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই ভারতে পদ্ধতিগত ব্যাকরণচর্চা শুরু হয়েছিল। পাণিনি-পূর্ব ব্যাকরণবিদদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন যাস্ক (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৮ম শতাব্দী)। যাস্ক তাঁর রচিত ব্যাকরণে বিশেষ্য, ক্রিয়া, উপসর্গ ও নিপাতের (অব্যয়) নিখুঁত উল্লেখ করেছিলেন। তবে পাণিনির ব্যাকরণেই পূর্ববর্তী সমস্ত ভাষাতাত্ত্বিক চিন্তাধারা পূর্ণতা পায় এবং এটি ভবিষ্যতের সমস্ত ভারতীয় ব্যাকরণ তত্ত্বের জন্য ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করে। তাঁর ব্যাকরণকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে কমপক্ষে ১২টি ভিন্ন ব্যাকরণ-তত্ত্বের ধারা এবং সহস্রাধিক টীকা-ভাষ্য সম্বলিত ব্যাকরণ রচিত হয়েছে।

আধুনিক ভাষাবিদদের মতে ভারতীয় ভাষা গবেষণার কাজ ধ্বনিতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং শব্দের অন্তর্সংগঠন উভয় দিক থেকেই সমকালীন পাশ্চাত্যের ব্যাকরণের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ও বৈজ্ঞানিক ছিল। পাণিনীয় সংস্কৃত ব্যাকরণ সম্বন্ধে বলা হয়ে থাকে যে, আজও পৃথিবীর ইতিহাসের অন্য কোনো ভাষার ব্যাকরণে এরকম পুঙ্খানুপুঙ্খতা, অভ্যন্তরীণ সঙ্গতি ও ধারণার সংক্ষিপ্ততা বা সাশ্রয় পরিলক্ষিত হয়নি। প্রখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ব্লুমফিল্ডের মতে, পাণিনির অষ্ট্যাধ্যায়ী হলো "one of the greatest monuments of human intelligence" অর্থাৎ "মানব বুদ্ধিমত্তার অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন"।[] এই ব্যাকরণটি প্রায় চার হাজার সূত্র বা সূত্রের সমন্বয়ে গঠিত। ১৮শ শতকের শেষার্ধে এসে পাশ্চাত্যের ভাষাতাত্ত্বিকেরা যখন প্রথম ভারতীয় ব্যাকরণের এই ধারার সাথে পরিচিত হন, তখন থেকেই আধুনিক তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

১৯শ শতক ও তুলনামূলক ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান

[সম্পাদনা]

আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে অনেকেই ১৭৮৬ সালকে এই শাস্ত্রের আনুষ্ঠানিক জন্মবছর হিসেবে গণ্য করে থাকেন। ঐ বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর তারিখে ভারতে কর্মরত ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ ও আইনবিদ স্যার উইলিয়াম জোন্স কলকাতার রয়াল এশিয়াটিক সোসাইটির এক বিশেষ সভায় একটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্র পাঠ করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে, সংস্কৃত, গ্রিক, লাতিন, কেল্টীয় এবং জার্মানীয় ভাষাগুলোর মধ্যে এমন কিছু গাঠনিক ও ব্যাকরণগত সাদৃশ্য রয়েছে যা কোনো আকস্মিক ঘটনা হতে পারে না। তিনি প্রস্তাব করেন যে, এই সমৃদ্ধ ভাষাগুলো সবই সম্ভবত কোনো একটি অভিন্ন আদি উৎস বা মূল ভাষা থেকে উদ্ভূত হয়েছে।

জোন্সের এই আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করে সমগ্র ১৯শ শতক জুড়ে ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানীরা একটি তুলনামূলক ও কালানুক্রমিক পদ্ধতি অনুসরণ করেন। তাঁরা বিভিন্ন ভাষার ব্যাকরণিক কাঠামো, শব্দভাণ্ডার এবং ধ্বনিসম্ভারের মধ্যে তুলনা করার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, প্রকৃতপক্ষেই লাতিন, গ্রিক ও সংস্কৃত ভাষাগুলো পরস্পর নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। তাঁদের এই নিরলস গবেষণার ফলশ্রুতিতে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় যে, ইউরোপ ও এশিয়ার বেশির ভাগ ভাষার মধ্যে একটি গভীর বংশগত সম্পর্ক বিদ্যমান এবং এগুলো সবই একটি সাধারণ আদি ভাষা প্রত্ন-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা থেকে বিবর্তিত হয়েছে। এই ধারায় রাস্‌মুস রাস্ক, ফ্রান্ৎস বপ, এবং ইয়াকপ গ্রিম-এর মতো ইউরোপীয় ভাষাবিজ্ঞানীরা তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণালব্ধ ফলাফল প্রকাশ করতে শুরু করেন। ১৯শ শতকের শেষ চতুর্থাংশে জার্মানির লাইপ্‌ৎসিশ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক একদল ভাষাবিজ্ঞানী, যাঁরা "নব্যব্যাকরণবিদ" নামে পরিচিত ছিলেন, ভাষাবিজ্ঞানে নতুন মাত্রা যোগ করেন। কার্ল ব্রুগ্‌মান, হের্মান অস্ট্‌হফ এবং হের্মান পাউল প্রমুখ পণ্ডিতেরা দেখান যে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আদি ভাষাগুলোর উচ্চারণের মধ্যে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং নিয়মাবদ্ধ পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই আজকের আধুনিক ভাষাগুলির উদ্ভব হয়েছে। তাঁদের মতে ধ্বনি পরিবর্তনের এই নিয়মগুলি বিজ্ঞানের অমোঘ সূত্রের সাথে তুলনীয়।

একই সময়ে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভাষাবিজ্ঞানের আরেকটি স্বতন্ত্র ধারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বিকশিত হচ্ছিল। মার্কিন নৃতাত্ত্বিক ভাষাবিজ্ঞানীরা মূলত আমেরিকার আদিবাসীদের ভাষাগুলির ওপর গবেষণা শুরু করেন। এই ভাষাগুলির অধিকাংশই ছিল তখন বিলুপ্তির পথে এবং এগুলির কোনও লিখিত ইতিহাস বা প্রাচীন দলিল সংরক্ষিত ছিল না। ফলে ইউরোপীয় গবেষকদের মতো ঐতিহাসিক নথিপত্রের তুলনা করে নয়, বরং মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানীরা সরাসরি মাঠ পর্যায়ে গিয়ে উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভাষা বর্ণনার নতুন এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি গড়ে তোলেন। এই ধারাটি পরবর্তীতে বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করতে সাহায্য করে।

২০শ শতাব্দী, সোস্যুর, এককালিক ভাষাবিজ্ঞান ও সংগঠনবাদ

[সম্পাদনা]
সুইজারল্যান্ডীয় ভাষাবিজ্ঞানী ফের্দিনঁ দ্য সোস্যুর-কে আধুনিক সাংগঠনিক ভাষাবিজ্ঞানের রূপকার হিসেবে গণ্য করা হয়।

১৯শ শতকের ঐতিহাসিক ও বিবর্তনমূলক ভাষা গবেষণার প্রচলিত ধারায় আমূল পরিবর্তন আনেন সুইজারল্যান্ডীয় ভাষাবিজ্ঞানী ফের্দিনঁ দ্য সোস্যুর। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তাঁর তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ভাষাবিজ্ঞানের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। সোস্যুর-ই প্রথম অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এককালিক ও কালানুক্রমিক ভাষাবিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করেন। তাঁর এই বিভাজনের ফলে ভাষাবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ভাষার তুলনামূলক ঐতিহাসিক বিচারের দীর্ঘ প্রথা থেকে বেরিয়ে এসে যেকোনো একটি নির্দিষ্ট ভাষার একটি নির্দিষ্ট সময়ের অভ্যন্তরীণ গাঠনিক বিবরণের ওপর গভীরভাবে দৃষ্টিনিক্ষেপ করার সুযোগ পান।

সোস্যুর আরও একটি বৈপ্লবিক প্রস্তাব করেন যে, ভাষা (langue বা লঁগ) এবং উক্তি (parole বা পারোল) দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সত্তা। তাঁর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, 'লঁগ' হলো ভাষার সেই অদৃশ্য ও বিমূর্ত অভ্যন্তরীণ কাঠামো বা নিয়মাবলি যা একটি নির্দিষ্ট ভাষাগোষ্ঠীর সকলের মনে সমানভাবে বিদ্যমান; অন্যদিকে 'পারোল' হলো সেই কাঠামোর বাস্তব ও ব্যক্তিগত বহিঃপ্রকাশ বা মানুষের মুখে উচ্চারিত তাৎক্ষণিক বাক্য। সোস্যুর এই মত দেন যে একটি ভাষা বিভিন্ন আন্তঃসম্পর্কিত এবং পরস্পরনির্ভর অনেকগুলি উপাদানে তৈরি একটি সুশৃঙ্খল কাঠামো বা সংগঠন। তাঁর এই মৌলিক ধারণার ওপর ভিত্তি করেই বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সাংগঠনিক ভাষাবিজ্ঞানের সূত্রপাত ঘটে।

বিখ্যাত মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড স্যাপিরলিওনার্ড ব্লুমফিল্ড ছিলেন এই ভাষাবৈজ্ঞানিক সংগঠনবাদের প্রধান পুরোধা। তাঁরা ভাষার গবেষণায় কেবল বিমূর্ত তত্ত্ব নয়, বরং উপাত্তভিত্তিক প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যপ্রমাণের ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেন। তাঁদের মতে, ভাষাবিজ্ঞানের মূল কাজ হলো কোনও ভাষা ঠিক কীভাবে কাজ করে তা সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ করা। ভাষা কী রকম হওয়া উচিত—এমন কোনও বিধানমূলক নির্দেশ প্রদান করা ভাষাবিজ্ঞানের কাজ নয়। ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশককে পাশ্চাত্যের ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে "ব্লুমফিল্ডীয় যুগ" হিসেবে অভিহিত করা হয়।

এই সময়ে ব্লুমফিল্ড-প্রদত্ত কঠোর নিয়মতান্ত্রিক ও আচরণবাদী বিশ্লেষণী পদ্ধতি অনুসরণ করে বিশ্বের বহু ভাষার বিস্তারিত বিবরণমূলক ব্যাকরণ রচিত হয়। এই ধারার ভাষাবিজ্ঞানীরা প্রধানত কোনো ভাষার একজন বা একাধিক মাতৃভাষী ব্যক্তির কাছ থেকে বিভিন্ন উক্তি বা তথ্যের নমুনা (ভাষাংশ Corpus) সংগ্রহ করতেন। এরপর সেই সংগৃহীত উপাত্তের ওপর পুঙ্খানুপুঙ্খ ও গাণিতিক নিয়মতান্ত্রিক বিশ্লেষণ প্রয়োগ করে ভাষার অভ্যন্তরীণ ধ্বনিতাত্ত্বিক বিন্যাস, রূপমূলতাত্ত্বিক গঠন এবং বাক্যতাত্ত্বিক সূত্রগুলো আবিষ্কারের চেষ্টা করতেন। তাঁদের এই কার্যপ্রণালী ভাষাবিজ্ঞানকে একটি স্বতন্ত্র ও বস্তুনিষ্ঠ বিজ্ঞানের মর্যাদা দিতে সাহায্য করে।

চম্‌স্কি ও আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান

[সম্পাদনা]
চম্প্‌স্কীয় পদ্ধতিতে বৃক্ষচিত্রের (Tree Diagram) মাধ্যমে একটি বাক্যের গভীর গঠন বর্ণনা

১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে একদল তরুণ ভাষাবিজ্ঞানী তৎকালীন প্রচলিত সংগঠনবাদের কিছু তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা চিহ্নিত করেন। তাঁদের মতে, সংগঠনবাদীরা কেবলমাত্র ভাষার বাহ্যিক রূপ ও দৃশ্যমান উপাত্ত বিশ্লেষণের ওপর অতিমাত্রায় গুরুত্বারোপ করেছিলেন। এর ফলে ভাষাবিজ্ঞান কেবল উপাত্ত সংগ্রহ ও শ্রেণীকরণের একটি ক্ষুদ্র সীমায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল এবং ভাষার অদৃশ্য অভ্যন্তরীণ সংগঠন ও বিভিন্ন ভাষার মধ্যকার অন্তর্নিহিত বিশ্বজনীন ধর্মগুলো দীর্ঘকাল উপেক্ষিত ছিল। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানী নোম চম্‌স্কি সংগঠনবাদের প্রথাগত ধারণার বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেন। তিনি প্রস্তাব করেন যে ভাষা মূলত একটি জটিল মানসিক প্রক্রিয়া এবং পৃথিবীর সকল ভাষা কিছু মৌলিক ও সার্বজনীন বিন্যাস অনুসরণ করে গড়ে ওঠে। চম্‌স্কির এই বৈপ্লবিক চিন্তাধারা ভাষাবিজ্ঞানের গতিপথকে আমূল পরিবর্তিত করে দেয়।

চম্‌স্কি বিশ্বাস করেন যে কোনও ব্যক্তির অচেতন ও অব্যক্ত ভাষাবোধ (কম্পিটেন্স Competence) এবং তার বাস্তব ভাষাপ্রয়োগ (পারফর্মেন্স Performance) দুটি ভিন্ন দিক। তাঁর মতে একজন ভাষাবিজ্ঞানীর প্রধান কাজ হলো মানুষের সেই সহজাত ভাষাবোধের পেছনে কাজ করা অন্তর্নিহিত মানসিক সূত্রগুলো আবিষ্কার করা। এই প্রস্তাবের সমর্থনে ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ সিনট্যাকটিক স্ট্রাকচার্স-এ) (Syntactic Structures) চম্‌স্কি "রূপান্তরমূলক সৃষ্টিশীল ব্যাকরণ" নামক একটি তাত্ত্বিক ধারণা উপস্থাপন করেন। চম্‌স্কি দাবি করেন যে এই ব্যাকরণের গাণিতিক ও যৌক্তিক সূত্রগুলি ব্যবহার করে কোনও একটি ভাষার সমস্ত সম্ভাব্য এবং "বৈধ" বাক্যের গঠন ও উৎপত্তি ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

চম্‌স্কি আরও দাবি করেন যে মানবশিশু ভাষা বিষয়ক কিছু সহজাত ও সার্বজনীন ধারণা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, যেগুলির সমষ্টিগত নাম তিনি দেন "বিশ্বজনীন ব্যাকরণ"। এই বিশ্বজনীন ব্যাকরণের সীমানা ও নিয়মাবলী উদ্ঘাটন করাও আধুনিক চমস্কিপন্থী ভাষাবিজ্ঞানীদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়। উল্লেখ্য যে, চম্‌স্কীয় ধারায় "ব্যাকরণ" বলতে প্রথাগত কোনো অনুশাসনমূলক গ্রন্থ বা বিদ্যালয়ে পড়ানো ভাষা-প্রয়োগের নিয়মকানুনের সমাহারকে বোঝানো হয় না; বরং এটি মানবমনের সেই বিমূর্ত ভাষাবোধকে নির্দেশ করে, যা মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলতে, অন্যের কথা বুঝতে কিংবা অতি দ্রুত নতুন কোনও ভাষা শিখতে সাহায্য করে।

নোম চম্‌স্কি (১৯৭৭)

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান মূলত চম্‌স্কি প্রস্তাবিত রূপান্তরমূলক ব্যাকরণের ওপর ভিত্তি করেই বিকশিত হয়েছে। চম্‌স্কি বাক্যতত্ত্বকে ভাষাবিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় বা মূল ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে প্রাথমিক প্রকাশের পর থেকে চম্‌স্কির নিজস্ব তত্ত্বের বেশ কয়েকবার বিবর্তন ঘটেছে। তাঁর এই নিরন্তর গবেষণার ফলে "মান তত্ত্ব" (Standard Theory) থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে "সম্প্রসারিত মান তত্ত্ব", "শাসন ও বন্ধন তত্ত্ব", "নীতি ও প্রচল", এবং সর্বশেষ "ন্যূনতমবাদী প্রকল্প"-র মতো উন্নততর তাত্ত্বিক প্রতিমানগুলি উদ্ভাবিত হয়েছে।

এছাড়া চম্‌স্কীয় তত্ত্বের মূল দর্শন ও স্বতঃসিদ্ধগুলি মেনে নিয়ে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভাষাতাত্ত্বিক ধারা গড়ে উঠেছে। এদের মধ্যে "কারক ব্যাকরণ", "সাধারণীকৃত পদ সংগঠন ব্যাকরণ", "সৃষ্টিশীল অর্থবিজ্ঞান", "মস্তক-চালিত পদ সংগঠন ব্যাকরণ", "আভিধানিক কার্যমূলক ব্যাকরণ", "সম্পর্কমূলক ব্যাকরণ" এবং "কাম্যতমতা তত্ত্ব" বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে চম্‌স্কীয় মূলধারার বাইরে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে শ্রেণীকরণবাদী একটি শক্তিশালী ধারা বিদ্যমান, যেখানে ভাষাবিজ্ঞানীরা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাকে তাদের গাঠনিক সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে সুবিন্যস্তভাবে শ্রেণীকরণের চেষ্টা করেন।

একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে এসে ভাষাবিজ্ঞান কেবলমাত্র ভাষার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে মানবমনের বিভিন্ন জটিল প্রক্রিয়া সংক্রান্ত সংজ্ঞানাত্মক বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান ও অপরিহার্য শাখা হিসেবে নিজের স্থান সুপ্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছে। বর্তমানে ভাষাবিজ্ঞানের গবেষণায় পরিগণক যন্ত্র (কম্পিউটার) ও পরিগণক বিজ্ঞানের (কম্পিউটার বিজ্ঞান) উন্নত সব তত্ত্ব ও কলনবিধির (অ্যালগরিদম) প্রয়োগ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানুষের মুখের স্বাভাবিক ভাষা প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]

গ্রন্থপঞ্জি অনুচ্ছেদের গ্রন্থসমূহ, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা (১৫শ সংস্করণ)।

  1. Halliday, Michael A.K.; Jonathan Webster (২০০৬)। On Language and Linguistics। Continuum International Publishing Group। পৃ. vii। আইএসবিএন ০-৮২৬৪-৮৮২৪-২
  2. Martinet, André (১৯৬০)। Elements of General Linguistics। Tr. Elisabeth Palmer Rubbert (Studies in General Linguistics, vol. i.)। London: Faber। পৃ. ১৫।
  3. Leonard Bloomfield. Language. ১৯৩৩

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]

প্রাথমিক পাঠ

[সম্পাদনা]

সামগ্রিক ধারণা

[সম্পাদনা]
  • Robins, Robert Henry (১৯৬৭), A Short History of Linguistics, London: Longmans
  • Robins, Robert Henry (১৯৮০), General Linguistics: An Introductory Survey, London: Longmans
  • Sampson, Geoffrey (১৯৮০), Schools of Linguistics, Stanford, CA: Stanfod University Press {{citation}}: |link=-এ বহিঃসংযোগ (সাহায্য); অজানা প্যারামিটার |link= উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)

গবেষণা পত্রিকা

[সম্পাদনা]

জনপ্রিয় গ্রন্থ ও রচনা

[সম্পাদনা]

কোষগ্রন্থসমূহ

[সম্পাদনা]

পরিশিষ্ট

[সম্পাদনা]

পরিভাষা

  • ভাষাবিজ্ঞান - Linguistics
  • সংশ্রয় - System
  • এককালিক, সমকালীন, বা কালকেন্দ্রিক ভাষাবিজ্ঞান – Synchronic linguistics
  • কালানুক্রমিক, বিবর্তনমূলক, বা ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান – Diachronic, evolutionary or historical linguistics
  • তাত্ত্বিক ভাষাবিজ্ঞান – Theoretical linguistics
  • ব্যাবহারিক ভাষাবিজ্ঞান – Applied linguistics
  • ভাষার অর্জন – Language acquisition
  • সমাজভাষাবিজ্ঞান – Sociolingusitics
  • মনোভাষাবিজ্ঞান – Psycholinguistics
  • নৃতাত্ত্বিক ভাষাবিজ্ঞান – Anthropological linguistics,
  • কাঠামো – structure
  • স্তর – level
  • ধ্বনিবিজ্ঞান – Phonetics
  • ধ্বনিতত্ত্ব – Phonology
  • রূপমূলতত্ত্ব বা রূপতত্ত্ব বা শব্দতত্ত্ব – Morphology
  • বাক্যতত্ত্ব – Syntax
  • শব্দার্থতত্ত্ব বা অর্থবিজ্ঞান – Semantics
  • প্রায়োগিক ভাষাতত্ত্ব/প্রয়োগতত্ত্ব – Pragmatics
  • অভিধান বিজ্ঞান – Lexicography
  • প্রকৃতি – nature
  • বিস্তার – scope
  • ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান – Historical linguistics
  • ফলিত ভাষাবিজ্ঞান – Applied linguistics
  • গণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান – Computational linguistics
  • প্রতীকী ভাষা – sign language
  • অব্যক্ত যোগাযোগ – non-verbal communication
  • প্রাণী-যোগাযোগ – animal communication
  • বিধানমূলক – prescriptive
  • বর্ণনামূলক – descriptive
  • শব্দভাণ্ডার – vocabulary
  • নব্যব্যাকরণবিদ – Jung-grammatiker
  • রূপান্তরমূলক সৃষ্টিশীল ব্যাকরণ – Transformational Generative Grammar
  • বিশ্বজনীন ব্যাকরণ – Universal Grammar
  • ভাষাপ্রয়োগ – linguistic performance
  • ভাষাবোধ – linguistic competence
  • মান তত্ত্ব - Standard theory
  • সম্প্রসারিত মান তত্ত্ব - Extended standard theory
  • শাসন ও বন্ধন তত্ত্ব - Government and binding theory
  • নীতি ও প্রচলসমূহ - Principles and parameters
  • ন্যূনতমবাদী প্রকল্প - Minimalist program
  • কারক ব্যাকরণ - Case grammar
  • সাধারণীকৃত পদ সংগঠন ব্যাকরণ Generalized phrase structure grammar
  • সৃষ্টিশীল অর্থবিজ্ঞান - Generative Semantics
  • মস্তক-চালিত পদ সংগঠন ব্যাকরণ - Head-driven phrase structure grammar
  • আভিধানিক কার্যমূলক ব্যাকরণ - Lexical functional grammar
  • সম্পর্কমূলক ব্যাকরণ - Relational grammar
  • কাম্যতমতা তত্ত্ব – Optimality theory
  • সংজ্ঞানাত্মক বিজ্ঞান – Cognitive science

বিদেশী নাম