বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী
বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী.png
বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন ও বাস্তবায়ন সম্পর্কিত জাতীয় কমিটি দ্বারা প্রকাশিত লোগো
আনুষ্ঠানিক নামবাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী
পালনকারী বাংলাদেশ
ধরনজাতীয়
তাৎপর্যবাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বিজয় অর্জনের ৫০ বছর পূর্তি
শুরু২৬ মার্চ ২০২১
সমাপ্তি৩১ মার্চ ২০২২[১]
সম্পর্কিতবাংলাদেশের স্বাধীনতা

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী হলো ১৯৭১ সালে ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর নয়মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছরপূর্তি পালনের জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃৃক ঘোষিত একটি বার্ষিক পরিকল্পনা। সরকার ২৬ মার্চ ২০২১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের ঘোষণা দেয়।[২][৩][৪][৫][৬] পরবর্তীতে তা ৩১ মার্চ ২০২২ পর্যন্ত বাড়ানো হয়।[১]

আভিধানিক ভাষায়, "সুবর্ণজয়ন্তী" শব্দটি মূলত কোনো ঘটনার ৫০ বছরপূর্তিকে নির্দেশ করে।

প্রেক্ষাপট[সম্পাদনা]

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশে গণহত্যা চালায়। এই গণহত্যায় শুধুমাত্র ঢাকাতেই ৬ থেকে ৭ হাজার সাধারণ মানুষ সেই রাতে প্রাণ হারায়। বাংলাদেশে এই দিনটি জাতীয় গণহত্যা দিবস নামে পরিচিত।[৭] সেই দিন রাত ১২ টার পর (২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।[৮] ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করায় ১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশ ২৬শে মার্চ কে "স্বাধীনতা দিবস" হিসাবে পালন করে আসছে। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। এই দিনটি ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশ বিজয় দিবস হিসাবে পালন করছে। ২০২১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা ও যুদ্ধে বিজয় অর্জনের ৫০ বছর পূর্ণ হয়। তাই স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকীকে স্মরণীয় করে রাখতে ২০২১ সালকে "সুবর্ণজয়ন্তী" হিসাবে পালন করা হয়।[২][৯][১০]

২০০৮ সালের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইস্তেহারের মধ্যে ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে সামনে রেখে "রূপকল্প ২০২১" ঘোষণা করে, যেখানে ২০২১ সালের মধ্যেই বাংলাদেশকে একটি উন্নয়নশীল, ডিজিটাল ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রত্যয় দেয়া হয়।

প্রারম্ভিক উদযাপন[সম্পাদনা]

"স্বাধীনতার ৫০ বছর" – লিখা হয়েছে লাল ও সবুজ রঙে, যেটি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার রঙ

অভ্যন্তরীণ[সম্পাদনা]

আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর উদযাপন শুরু হয় ২০২১ সালের ২৬ মার্চ তারিখে। সুবর্ণজয়ন্তীর সঙ্গে বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে মুজিব বর্ষও পালিত হয়। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানগণ উদযাপিত অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ২০২১ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত মুজিব বর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর সম্মিলিত অনুষ্ঠান 'মুজিব চিরন্তন'-এ যোগ দিতে ১৭ মার্চ বাংলাদেশে আসেন মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ; ১৯ মার্চ বাংলাদেশ সফর করেন  শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী মহিন্দা রাজাপাকসে; ২২ মার্চ বাংলাদেশ সফর করেন নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভণ্ডারী; ২৪শে মার্চ বাংলাদেশ সফর করেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ড. লোটে শেরিং এবং স্বাধীনতা দিবসের দিন ২৬ মার্চ বাংলাদেশ সফর করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী[৫][৯][১১] এছাড়াও জো বাইডেন, শি চিনফিং, বরিস জনসন, ভ্লাদিমির পুতিন, জাস্টিন ট্রুডো, ইয়োশিহিদে সুগা, ইমরান খান, পোপ ফ্রান্সিস, আন্তোনিও গুতেরেস -এর মতো বৈশ্বিক নেতারা অভিনন্দন বার্তা পাঠান এবং বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করেন।[২][১০][১২]

২৬ মার্চ ভোরে পঞ্চাশবার তোপধ্বনির মাধ্যমে স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচির সূচনা করা হয়। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এই দিনে বাংলাদেশের সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তোলা হয় জাতীয় পতাকা।[২][১০][১১]

সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপগুলোকে সজ্জিত করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনায় স্বাধীনতা দিবসের কয়েক দিন আগে থেকেই চলে আলোকসজ্জা।[২][১০][১১]

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে এ দিন দেশের সকল ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা ও মুনাজাত করা হয়।[২][১০]

ইংরেজি পোস্টারে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

কোভিড-১৯[সম্পাদনা]

কোভিড-১৯ এর বৈশ্বিক মহামারীর কারণে সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে সীমিত দর্শক অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিল। আবার দর্শকহীন অনুষ্ঠানগুলোতেও নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।[১০]

আন্তর্জাতিক[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে যুক্তরাজ্যের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ, প্রিন্স অফ ওয়েলস চার্লস এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বিশেষ বাণীর মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন জানান। বরিস জনসন ব্রিটেনের আর্থ-সামাজিক খাতে ব্রিটিশ বাংলাদেশীদের অবদানের কথা উল্লেখ করে বলেন, “ছয় লক্ষ ব্রিটিশ-বাংলাদেশী দুইদেশের মধ্যে বন্ধনকে জিইয়ে রেখেছে”।[১৩]

বাংলাদেশের বাইরে নিউইয়র্কস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলে ২৬শে মার্চ ২০২১ তারিখে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হয়। বিশিষ্ট মার্কিন রাজনীতিবিদ, নিউইয়র্কে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত/কনসাল জেনারেল ও বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ বাংলাদেশী-আমেরিকান কমিউনিটির অংশগ্রহণে কনস্যুলেট ভার্চুয়াল সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠান পালিত হয়।[১৪]

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ২৬ মার্চ ২০২১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন বুর্জ খলিফায় ঘণ্টাব্যাপী বঙ্গবন্ধুর ছবি প্রদর্শন ও আলোকসজ্জার আয়োজন করা হয়।[৯]

সমাপনী উদযাপন[সম্পাদনা]

বিজয় দিবসে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কুজকাওয়াজ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বর্ষ জুড়ে চলা কর্মকাণ্ডের সমাপ্তি হয় ১৬ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী পালনের মাধ্যমে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারত-বাংলাদেশ যৌথবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে। এই দিনটি বাংলাদেশে বিজয় দিবস হিসাবে উদযাপিত হয়, যার ৫০ বছর পূর্ণ হয় ১৬ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে। এই দিনকে সামনে রেখে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

এই কর্মসূচীর অংশ হিসাবে ১৫ ডিসেম্বর তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকা আসেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ[১৫] ১৫ ডিসেম্বর তিনি জাতীয় স্মৃতিসৌধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

১৬ ও ১৭ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয় ‘মহাবিজয়ের মহানায়ক’ নামক অনুষ্ঠান। ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪:৩০ মিনিটে উক্ত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারাদেশের মানুষের সঙ্গে মিলে একটি ‘শপথ’ পাঠ করেন।[১৬]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "মুজিব বর্ষের সময়কাল ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাড়ল"প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-০৩-২৬ 
  2. "স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ"www.ittefaq.com.bd। ২৬ মার্চ ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১ 
  3. "স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী"। বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন। ৩ আগষ্ট ২০২১। 
  4. "স্বাধীনতার সুবর্ণ"। banglanews24.com। ২৬ মার্চ ২০২১। 
  5. "Bangladesh to celebrate 50th Independence Day, Mujibur Rahman's centenary"হিন্দুস্তান টাইমস। ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯। 
  6. "স্বাধীনতার ৫০ বছর: আগামী ৫০ বছরে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ কী হবে?"। বিবিসি বাংলা। ২৬ মার্চ ২০২১। 
  7. "২৫ মার্চ 'গণহত্যা দিবস' ঘোষণা"কালের কণ্ঠ। ১২ মার্চ ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ২৫ মার্চ ২০২১ 
  8. "সে রাতে যেভাবে মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠান" 
  9. "স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও বিস্ময়ের বাংলাদেশ"দৈনিক যুগান্তর। ২৬ মার্চ ২০২১। 
  10. "Bangladesh celebrates 50 years of independence" (ইংরেজি ভাষায়)। ঢাকা ট্রিবিউন। ২৫ মে ২০২১। 
  11. "সোনার বাংলার সোনালি ৫০"। bdnews24.com। ২৬ মার্চ ২০২১। 
  12. "Golden Jubilee Of Independence: Global focus on Bangladesh" (ইংরেজি ভাষায়)। দ্য ডেইলি স্টার। ৫ এপ্রিল ২০২১। 
  13. "বিলেতে সুবর্ণ জয়ন্তী: নয় মাসের যুদ্ধ, নয় মাসের উৎসব"। বিবিসি বাংলা। ২৬ মার্চ ২০২১। 
  14. "নিউইয়র্ক বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলে পরম শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসায় স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন"। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 
  15. "বিজয়ের ৫০ বছর: ১৫-১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সফর করবেন ভারতের রাষ্ট্রপতি"দ্য ডেইলি স্টার। সংগ্রহের তারিখ ডিসেম্বর ৬, ২০২১ 
  16. "দেশবাসীকে নিয়ে শপথবাক্য পাঠ করলেন প্রধানমন্ত্রী"দৈনিক ইত্তেফাক। সংগ্রহের তারিখ ৪ জানুয়ারি ২০২২