চাগাতাই ভাষা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
চাগাতাই
অঞ্চল মধ্য এশিয়া, খোরাসান
বিলুপ্ত ১৯৯০-এর দশক
Altaic
ভাষা কোডসমূহ
আইএসও ৬৩৯-২ chg
আইএসও ৬৩৯-৩ chg
পারসিক-আরবি লিপিতে চাগাতাই ভাষাতে লেখা মোঘল সম্রাট বাবরের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ বাবরনামা-র পাণ্ডুলিপির একটি পৃষ্ঠা

চাগাতাই ভাষা একটি বিলুপ্ত তুর্কীয় ভাষা যা একসময় মধ্য এশিয়াতে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। ভাষাটি বিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্তও অঞ্চলটির একটি অন্যতম সাহিত্যিক ভাষা ছিল। এছাড়া ভারতবর্ষের মুঘল সম্রাটেরাও এই ভাষাতে কথা বলতেন।

নামকরণ[উৎস সম্পাদনা]

চাগাতাই শব্দটি চাগাতাই খানাতের সাথে সম্পর্কিত। চেঙ্গিজ খানের দ্বিতীয় পুত্র চাগাতাই খান মঙ্গোল সাম্রাজ্যের যে অংশটি উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেন, তার নাম ছিল চাগাতাই খানাত। অনেক চাগাতাই তুর্কিতাতার জাতের লোক দাবী করে তারা চাগাতাই খানের বংশধর; তারা চাগাতাই ভাষায় কথা বলত।

ইতিহাস[উৎস সম্পাদনা]

চাগাতাই ভাষা তুর্কীয় ভাষাসমূহের উইগুর শাখার অন্তর্গত। এটি মধ্য এশিয়ার সর্বত্র সার্বজনীন ভাষা হিসেবে প্রচলিত প্রাচীন উইগুর ভাষার একটি বিবর্তিত রূপ। ভাষাটিতে আরবিফার্সি শব্দ ও বাক্যবিন্যাসের ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মূলত একটি পরিশীলিত লিখিত, সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে চাগাতাই ভাষাটি উদ্ভাবন করা হয়েছিল। ভাষাটি পারসিক-আরবি লিপিতে লেখা হত।

চাগাতাই ভাষার ইতিহাসকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যায়:

  1. প্রাক-ধ্রুপদী চাগাতাই (১৪০০-১৪৬৫)
  2. ধ্রুপদী চাগাতাই (১৪৬৫-১৬০০)
  3. ধ্রুপদী-উত্তর চাগাতাই (১৬০০-১৯২১)

প্রথম পর্বটি মূলত একটি রূপান্তরশীল পর্ব, যাতে ভাষার প্রাচীন রূপগুলি সংরক্ষিত আছে। মির আলিশের নাভই-র প্রথম দিভান প্রকাশিত হবার মাধ্যমে দ্বিতীয় পর্বের সূচনা ঘটে; গ্রন্থটি চাগাতাই সাহিত্যের একটি অন্যতম নিদর্শন। চাগাতাই ভাষার বিবর্তনের ৩য় পর্বটি দ্বিমুখী। এসময় চাগাতাই সাহিত্যের একটি ধারায় কবি নাভই-র ধ্রুপদী চাগাতাই ভাষা যেমন রক্ষা করা হয়, অন্য একটি ধারায় স্থানীয় কথ্যভাষার প্রভাব ক্রমেই অধিকতর দৃশ্যমান হতে শুরু করে।

তিমুরীয় সাম্রাজ্য, তথা তৈমুর লং ও তার বংশধরদের শাসনামল, ছিল চাগাতাই ভাষার স্বর্ণযুগ। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সোভিয়েত সংস্কারের আগ পর্যন্ত চাগাতাই গোটা মধ্য এশিয়ার সার্বজনীন সাহিত্যিক ভাষা ছিল।

পরবর্তী তুর্কীয় ভাষাসমূহের উপর প্রভাব[উৎস সম্পাদনা]

আধুনিক ভাষাগুলির মধ্যে উজবেকউইগুর ভাষা চাগাতাই ভাষার সাথে সবচেয়ে বেশি সম্পর্কিত। উজবেক ভাষাভাষীরা চাগাতাই তাদের ভাষার উৎস হিসেবে গণ্য করে এবং চাগাতাই সাহিত্যকে উজবেক সাহিত্যের অংশ হিসেবে দাবী করে। উজবেকিস্তানে ১৯২১ সালে চাগাতাই ভাষার বদলে একটি স্থানীয় উজবেক উপভাষাতে সাহিত্য রচনা শুরু হয়। এছাড়া ১২শ শতকের বেরেনদেক নামের এক যাযাবর তুর্কি জাতি যে ভাষায় কথা বলত, তা শেষ পর্যন্ত চাগাতাই ভাষা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এথনোলগ আফগানিস্তানের ভাষাসমূহের বর্ণনায় তুর্কমেন ভাষার তেক্কে উপভাষাটিকে “চাগাতাই” হিসেবে বর্ণনা করেছে। ১৮শ শতক পর্যন্ত চাগাতাই কেবল তুর্কমেনিস্তান নয়, সমগ্র মধ্য এশিয়াতেই সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে প্রচলিত ছিল। তুর্কমেন ভাষার উপর চাগাতাই ভাষার কিছু প্রভাব পড়লেও আদতে এই দুইটি তুর্কি ভাষাপরিবারের দুইটি ভিন্ন শাখার অন্তর্গত।

সাহিত্য[উৎস সম্পাদনা]

চাগাতাই ভাষার সবচেয়ে বিখ্যাত কবি হলে মির আলি-শির নাভই। তিনি লিখেছিলেন মুহাকামাত আল-লোগাতাইন, যাতে চাগাতাই এবং পারসিক ভাষাগুলির মধ্যে বিস্তৃত তুলনা করা হয়েছে এবং চাগাতাই ভাষাকে উন্নততর বলা হয়েছে। তিনি এত বিখ্যাত যে চাগাতাই ভাষাকে অনেক সময় “নাভইয়ের ভাষা”-ও বলা হয়। চাগাতাই ভাষাতে লেখা গদ্যসাহিত্যের মধ্যে তৈমুর লঙের জীবনী এবং মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবরের আত্মজীবনী বাবরনামা উল্লেখযোগ্য।

বর্তমানে চাগাতাই সাহিত্য তুর্কি ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পরিগণিত হয় এবং আধুনিক তুরস্ক রাষ্ট্রে চাগাতাই সাহিত্য নিয়ে আজও গবেষণা করা হয়।

গ্রন্থপঞ্জি[উৎস সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[উৎস সম্পাদনা]