মাদারীপুর জেলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(মাদারিপুর থেকে পুনর্নির্দেশিত)
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
মাদারিপুর
জেলা
বাংলাদেশে মাদারীপুর জেলার অবস্থান
বাংলাদেশে মাদারীপুর জেলার অবস্থান
স্থানাঙ্ক: ২৩°১০′১২″ উত্তর ৯০°৬′০″ পূর্ব / ২৩.১৭০০০° উত্তর ৯০.১০০০০° পূর্ব / 23.17000; 90.10000স্থানাঙ্ক: ২৩°১০′১২″ উত্তর ৯০°৬′০″ পূর্ব / ২৩.১৭০০০° উত্তর ৯০.১০০০০° পূর্ব / 23.17000; 90.10000 উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
দেশ বাংলাদেশ
বিভাগঢাকা বিভাগ
প্রতিষ্ঠা১৮৫৪
আয়তন
 • মোট১১৪৪.৯৬ কিমি (৪৪২.০৭ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা (২০১১)[১]
 • মোট১২,১২,১৯৮
 • জনঘনত্ব১১০০/কিমি (২৭০০/বর্গমাইল)
সাক্ষরতার হার
 • মোট৪৮%
সময় অঞ্চলবিএসটি (ইউটিসি+৬)
পোস্ট কোড৭৯০০ উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
প্রশাসনিক
বিভাগের কোড
৩০ ৫৪
ওয়েবসাইটপ্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট Edit this at Wikidata

মাদারিপুর জেলা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের ঢাকা বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। জেলার আয়তন ১,১৪৪.৯৬ বর্গকিলোমিটার।

ভৌগোলিক সীমানা[সম্পাদনা]

২৩° ০০' উত্তর অক্ষাংশ থেকে ২৩° ৩০' উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯° ৫৬' পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে ৯০° ২১' পূর্ব দ্রাঘিমাংশ পর্যন্ত এই জেলার বিস্তার।[২] জেলার উত্তরে ফরিদপুর জেলামুন্সিগঞ্জ জেলা, পূর্বে শরিয়তপুর জেলা, পশ্চিমে ফরিদপুর জেলাগোপালগঞ্জ জেলা, এবং দক্ষিণে গোপালগঞ্জ জেলাবরিশাল জেলা

নামকরনের ইতিহাস[সম্পাদনা]

প্রখ্যাত সুফি সাধক কুতুব-ই-জাহান হযরত বদিউদ্দীন আহমেদ জিন্দা শাহ মাদার (রঃ) এর নাম অনুসারে মাদারিপুর জেলার নামকরণ করা হয়। শাহ মাদার (র) ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে সিরিয়া হতে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের শাসনকালে (১৩৫১-১৩৮৮খ্রি:) ভারতে পরে বঙ্গের নানা স্থানে ভ্ররণ করেন। মাদার্শা, মাদারবাড়ী, মাদারি খাল, মাদারিপুর, মাদারঠেক, শামান্দারের ঘাট তাঁর শুভাগমনের স্থানীয় স্মৃতি রক্ষা করছে। ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পরে যে সকল সুফী সাধারন্যে অসাধারন প্রভাব বিস্তার করেন তাঁদের মধ্যে শাহ মাদার অন্যতম।[৩] চতুর্দশ শতাব্দীর কোনো এক সময়ে বঙ্গের বিভিন্ন স্থান ভ্রমনের এক পর্যায়ে তৎকালিন চন্দ্রদ্বীপের উত্তর সিমান্তে গভীর অরন্যের যে স্থানটিতে তিনি ক্ষণিকের অতিথি হয়ে সহযাত্রীদের নিয়ে যাত্রা বিরতি বা বিশ্রাম গ্রহণ করেছিলেন সে স্থানটিতে তার নামানুসারে হযরত শাহ মাদার (র) এর দরগাহ শরীফ নামকরণ করে স্মৃতি স্তম্ভ নির্মীত হয়েছে। সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিক্রমপুরের জমিদার ভূমিহীন প্রজাদের পূনর্বাসনের লক্ষে চন্দ্রদ্বীপের স্মৃতিবিজড়িত ঐ স্থানটিকে কেন্দ্র করে সরকার মাদারণ বা মাদারণ অঞ্চল নামে আখ্যায়িত করে ফসলি জমি ও আবাসন গড়ে তুলেন। যা পরবর্তীতে নগরায়নে রুপ নিতে থাকে, নাম হয় মাদারণ গ্রাম-উনিয়ন। পর্যায়ক্রমে নগর সভ্যতার বিবর্তনের ফলে মাদারণ নাম থেকে মাদারিপুর থানা-সাব ডিভিশন এবং আজকের মাদারিপুর জেলা।[৪]

প্রশাসনিক এলাকাসমূহ[সম্পাদনা]

মাদারিপুর জেলায় ৩ টি সংসদীয় আসন , ৪ টি উপজেলা , ৫ টি থানা , ৪ টি পৌরসভা, ৫৯ টি ইউনিয়ন পরিষদ , ১০৬২ টি গ্রাম, ৪৭৯ টি মৌজা রয়েছে ।

সংসদীয় আসনসমূহ[সম্পাদনা]

  1. মাদারীপুর-১
  2. মাদারীপুর-২
  3. মাদারীপুর-৩

উপজেলা ও থানাসমূহ[সম্পাদনা]

  1. মাদারিপুর সদর
  2. শিবচর
  3. কালকিনি
  4. রাজৈর
  5. ডাসার(থানা)

পৌরসভাসমূহ[সম্পাদনা]

ইউনিয়নসমূহ[সম্পাদনা]

শিরখাড়া, বাহাদুরপুর, কুনিয়া, পেয়ারপুর, ধুরাইল, রাস্তি, পাচখোলা, খোয়াজপুর, ঝাউদি ঘটমাঝি, কেন্দুয়া, মস্তফাপুর, কালিকাপুর, ছিলারচর, দুধখালী;

শিবচর, দ্বিতীয়খন্ড, নিলখি, বন্দরখোলা, চরজানাজাত, মাদবরেরচর, পাঁচচর, সন্যাসিরচর, কাঁঠালবাড়ী, কুতুবপুর, কাদিরপুর, ভান্ডারীকান্দি, বহেরাতলা দক্ষিণ, বহেরাতলা উত্তর, বাঁশকান্দি, উমেদপুর, ভদ্রাসন, শিরুয়াইল, দত্তপাড়া;

গোপালপুর, কাজীবাকাই, বালীগ্রাম, ডাসার, নবগ্রাম, আলিনগর, এনায়েতনগর, শিকারমঙ্গল, সাহেবরামপুর, রমজানপুর, কয়ারিয়া, বাশঁগাড়ী, লাক্ষীপুর, চরদৌলতখান;

পাইকপাড়া, হোসেনপুর, কবিরাজপুর, হরিদাসদী-মহেন্দ্রদী, ইশিবপুর, বদরপাশা, খালিয়া, রাজৈর, আমগ্রাম, বাজিতপুর, কদমবাড়ী।

জনসংখ্যা[সম্পাদনা]

মোট জনসংখ্যাঃ ১২,১২,১৯৮ জন (আদমশুমারী ও গৃহায়ন - ২০১১)
  • পুরুষঃ ৫০.২৯%
  • মহিলাঃ ৪৯.৭১%

প্রধান শস্য[সম্পাদনা]

রপ্তানী পণ্য

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

এ জেলায় শিল্প ও কলকারখানা তেমনভাবে গড়ে উঠেনি। যে কয়টি শিল্প ও কলকারখানা রয়েছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- (১) মাদারিপুর স্পীনিং মিলস, (২) আলহাজ্জ আমিনউদ্দিন জুট মিলস, (৩) চরমুগরিয়া জুট মিলস, (৪) এ.আর. হাওলাদার জুট মিলস (পরিত্যাক্ত)। এগুলোর মধ্যে শিল্পখাতে মাদারিপুর স্পিনিং মিলস এর অবদান সবচেয়ে বেশি। এ মিলটি ১৯৮৬ সালে ২৯.১৬ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। এর জনবল ২০০০ জন। এ মিলে বার্ষিক ৫০০০ মে. টন সূতা উৎপাদিত হয় যার আর্থিক মূল্য ৬০ কোটি টাকা। এ ছাড়া এ জেলায় ৬০০০ মে. টন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি কোল্ড স্টোরেজ সহ বেশ কিছু সংখ্যক কাপড়ের কল, ধানকল, তেলকল, বরফকল, বিস্কুট ফ্যাক্টরি ও করাতকল রয়েছে। এছাড়া এ জেলায় একটি ক্ষুদ্র শিল্পনগরী এবং ছোটবড় মিলিয়ে ১১৩টি হাট বাজার রয়েছে।

জলবায়ু[সম্পাদনা]

উষ্ণ ও আর্দ্র৷

বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতঃ ২১০৫ মিলিমিটার৷

সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ৩৫·৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১২·৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস।

নদীসমূহ[সম্পাদনা]

মাদারিপুর জেলায় প্রায় ১০টি নদী আছে। সেগুলো হচ্ছে -

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ[সম্পাদনা]

মাদারিপুর জেলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখা সব মিলিয়ে ২১৩টি। শিক্ষার হার - ৪৮ %

  • কলেজ : ২১ টি (৩টি সরকারি সহ)
  • মাধ্যমিক বিদ্যালয়: ১৩৮ টি
  • প্রাথমিক বিদ্যালয়: ৬৭৭ টি
  • মাদ্রাসা : ৬৯ টি

কৃতী ব্যক্তিত্ব[সম্পাদনা]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

মাদারিপুর একটি ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ। পঞ্চদশ শতাব্দীর সুফি সাধক হযরত বদিউদ্দীন আহমেদ জিন্দা শাহ মাদার (রঃ) এর নামানুসারে এই জেলার নামকরণ করা হয়। প্রাচীনকাল থেকে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বয়ে এসেছে আজকের এই মাদারিপুরের ইতিহাস।

প্রাচীন কাল থেকে ব্রিটিশ আমলের পূর্ব পর্যন্ত‌ঃ

অতি প্রাচীনকালে মাদারিপুরের পূর্বাংশ ইদিলপুর এবং পশ্চিম অংশ কোটালীপাড়া নামে পরিচিত ছিল। ইদিলপুর চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের একটি উন্নত জনপদ ছিল। একসময় এ অঞ্চলের প্রশাসনিক নাম ছিল নাব্যমন্ডল। কোটালীপাড়া ছিল বাংলার সভ্যতার অন্যতম কেন্দ্র। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে ইদিলপুর ও কোটালীপাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। নন্দবংশের প্রতিষ্ঠাতা মহাপদ্মনন্দ আদতে ছিলেন গঙ্গারিডিদের রাজা, সেখান থেকেই পাটলিপুত্রে গিয়ে সাম্রাজ্যস্থাপন করেছিলেন, এমনটা মনে করেন অনেক ঐতিহাসিক। গঙ্গারিডি আর প্রাচ্য রাষ্ট্র ছিল Agrammes/Xandrames বা ঔগ্রসৈন্য (উগ্রসেনের পুত্র) নামক রাজার অধীনে। গ্রিকবীর আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময় ৩২৭ খ্রিস্টপূর্বে কোটালীপাড়া অঞ্চলে গঙ্গারিডাই জাতি স্বাধীনভাবে রাজত্ব করত। তারপর এ অঞ্চল (৩২০-৪৯৬ খ্রিঃ) গুপ্ত সম্রাটদের অধীনে ছিল। ৫০৭-৮ খ্রীষ্টাব্দের কিছু আগে রাজত্ব করেছেন দ্বাদশাদিত্য - মহারাজাধিরাজ বৈন্যগুপ্ত নামক এক রাজা। কোটালীপাড়া অঞ্চলের পাঁচটি আর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান অঞ্চলে প্রাপ্ত একটি, সর্বমোট ছয়খানা পট্টোলীতে তিনজন মহারাজাধিরাজের তথ্য পাওয়া যায়। গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য এবং নরেন্দ্রাদিত্য সমাচারদেব। এরা ৫৪০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করছেন।[৬] বাংলার স্বাধীন শাসক শশাঙ্কের মৃত্যুর পর একশত বছর(৬৫০-৭৫০ খ্রিঃ) বাংলার ইতিহাস ‘‘মাৎস্যন্যায়’’ নামে খ্যাত, তবে ঐ সময়ে খড়গ বংশ ও দেব রাজবংশ এ অঞ্চল শাসন করে। ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে গোপালকে রাজা নির্বাচিত করা হয়। পাল বংশ ৭৫০-১১৬২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা শাসন করে, তবে রাজা দ্বিতীয় বিগ্রহপালের রাজত্বকালে (৯৬৯–৯৯৫ খ্রিঃ) পাল সাম্রাজ্য গৌড়, রাঢ়, অঙ্গ ও বঙ্গ প্রভৃতি ছোটো ছোটো রাজ্য বিভাজিত হয়ে যায়। হরিকেলের (পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলা) কান্তিদেব ‘মহারাধিরাজ’ উপাধি গ্রহণ করেন এবং এবং একটি পৃথক রাজ্য স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে চন্দ্র রাজবংশ এই রাজ্যটি শাসন করেছিল।[৭]

চন্দ্রবংশ দশম ও এগার শতকে স্বাধীনভাবে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গ রাজত্ব করে। চন্দ্র বংশের শ্রীচন্দ্রের তাম্রশাসন রামপাল ইদিলপুর ও কেদারপুরে পাওয়া যায়। মাদারিপুর-শরিয়তপুর চন্দ্ররাজার অধীনে ছিল। সেন রাজবংশ ১০৯৮ হতে ১২৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পূর্ব বাংলা শাসন করে। কোটালীপাড়া ও মদনপাড়ায় বিশ্বরূপ সেন এবং ইদিলপুরে কেশব সেনের তাম্রলিপি পাওয়া যায়। সেন রাজাদের পতনের পর চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বরিশাল বিভাগ, মাদারিপুর, শরিয়তপুর, গোপালগঞ্জবাগেরহাট জেলা চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের অধীনে ছিল।[৮]

চতুর্দশ শতকে ফরিদপুর সুলতানদের শাসনাধীনে চলে যায়। যদিও ১২০৩ থেকে ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সুলতানগণ বাংলা শাসন করে, তবে পূর্ববঙ্গে সেন রাজত্ব চলে। সুলতান জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহ (১৪৮১-১৪৮৫ খ্রিঃ) ফরিদপুর ও চন্দ্রদ্বীপের একাংশ দখল করে ফতেহাবাদ পরগনা গঠন করেন। ফরিদপুর মাদারিপুরের প্রথম ঐতিহাসিক নাম ফতেহাবাদ। সুলতান হুসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিঃ) ফতেহাবাদের জনপ্রিয় শাসক ছিল। ১৫৩৮ হতে ১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শেরশাহ ও তার বংশধরগণ বাংলা শাসন করেন। ১৫৬৪ সাল হতে ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কররানি বংশ বাংলার রাজত্ব করে তারপর ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৬১১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বারোভূঁইয়ার অধীনে ছিল বাংলা। বারোভূঁইয়াদের অন্যতম ছিল বিক্রমপুরের চাঁদ রায়, কেদার রায় এবং বাকলার কন্দর্প রায়, রামচন্দ্র রায়। মুঘল সাম্রাজ্যনবাবী শাসন চলে ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। তারপর বাংলা ব্রিটিশদের দখলে চলে যায়।[৮]

ব্রিটিশ আমলঃ

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাহর পতনের মধ্যদিয়ে এদেশে ব্রিটিশ শাসনের সূত্রপাত ঘটে। মূলত ১৭৬৫ থেকে ১৯৪৭ খ্রিঃ পর্যন্ত প্রায় দু’শ বছর ব্রিটিশরা বাংলা শাসন করে। ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মাদারিপুর স্থানীয় নাম ছিল। ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে মহকুমা ও থানা সৃষ্টি হলে "মাদারিপুর" নাম প্রশাসনিক স্বীকৃতি লাভ করে। তখন বর্তমান মাদারিপুর জেলা, শরিয়তপুর জেলা, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলাকোটালীপাড়া উপজেলা মাদারিপুর মহকুমাধীন ছিল। ব্রিটিশ আমলে মাদারিপুর অনেক আন্দোলন সংগ্রামের তীর্থভূমি ছিল। বিখ্যাত ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা হাজী শরিয়ত উল্লাহ’র (১৭৮১-১৮৪০) জন্ম মাদারিপুরের শিবচর উপজেলার বাহাদুরপুরে। তিনি ১৮২০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ধর্মীয় কুসংস্কার, নীলকর ও জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। শরিয়ত উল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁরই সুযোগ্য পুত্র দুদু মিয়া (১৮১৯-১৯৬২) ফরায়েজি আন্দোনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

ব্রিটিশ আমলে উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে মাদারিপুরের বিপ্লবীরা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। এ জেলার কৃতী সন্তান পূর্ণচন্দ্র দাস ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ শাসন বিরোধী গুপ্ত সংগঠন মাদারিপুর সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। সমিতির অন্যতম সদস্য চিত্তপ্রিয় রায় চৌধুরী ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে বালেশ্বর যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে সম্মুখ সমরে মৃত্যুবরণ করেন এবং বালেশ্বর যুদ্ধে নীরেন্দ্র নাথ দাশগুপ্তমনোরঞ্চন সেনগুপ্ত বন্দী হন। বালেশ্বর জেলে তাদের ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়। ১৯৩৬খ্রিস্টাব্দে শেখ মুজিবুর রহমান মাদারিপুর আবস্থানকালে পূর্ণ দাসের সভায় নিয়োমিত যাতায়াত করতেন এবং সেখান থেকেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হয়; ইংরেজদের এদেশে থাকার অধিকার নেই, স্বাধীনতা আনতে হবে।‌[৯] এ জেলার অগ্নিপুরুষ অম্বিকাচরণ মজুমদার নিখিল ভারত কংগ্রেস-এর সভাপতি ছিলেন। তিনি আধুনিক ফরিদপুরের রূপকারও বটে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলা বিভক্ত হয়ে পূর্ববাংলা নামে পাকিস্তানের একটি প্রদেশে পরিণত হয়।[৮]

পাকিস্তান আমলঃ

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পূর্ব বাংলার জনগণের আশা আকাঙক্ষা ও স্বপ্ন ধীরে ধীরে ভাঙ্গতে শুরু করে। পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার জনগণকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে নিজেদের ক্ষমতা সংহত করার চেষ্টা চালায়। এদশের জনগণ সমস্ত শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং উনসত্তরের গণঅভ্যূত্থান এবং সর্বোপরি ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা যুদ্ধসহ সকল আন্দোলন সংগ্রামে মাদারিপুরের কৃতী সমত্মানরা বলিষ্ট ভূমিকা পালন করে। সম্ভবত বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণ শুধুমাত্র মাদারিপুরেই হয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর অন্যান্য জায়গায় পাকিবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে মিত্রবাহিনীর হাতে। তবে ১০ ডিসেম্বর মাদারিপুরে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে মুক্ত হয়। হানাদারমুক্ত হবার আগে শত্রুর বাংকারে গ্রেনেড হামলা করতে গিয়ে পাকবাহিনীর গুলিতে শহীদ হন সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা ১৪ বছর বয়সী সরোয়ার হোসেন বাচ্চু।[১০]

স্বাধীন বাংলাদেশঃ

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহিদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ পেয়েছি। স্বাধীনতার পর থেকে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে আজ আমরা এখানে এসে পৌছেছি। মাদারীপুর ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে মহকুমা হিসেবে ঘোষিত হওয়ার দীর্ঘদিন পর ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে জেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। মূলত: মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের শুরু এখান থেকেই। মাদারীপুর জেলা প্রশাসন বলতে গেলে এখন শৈশব ছেড়ে যৌবনে পদার্পন করেছে মাত্র। বয়সে নবীন হলেও অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে মাদারীপুর জেলা প্রশাসন তাঁর সমস্ত শক্তি, সম্পদ ও সম্ভাবনা নিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর।[৮]

চিত্তাকর্ষক স্থান[সম্পাদনা]

আনুষঙ্গিক নিবন্ধ[সম্পাদনা]

বাড়তি পঠন[সম্পাদনা]

  • আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস (সংগ্রহ ও সম্পাদনা: ড. তপন বাগচী), গতিধারা প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৭।
  • আনম আবদুস সোবহান, বৃহত্তর ফরিদপুরের ইতিহাস, সূর্যমুখী প্রকাশনী, ফরিদপুর, ১৯৯৬।
  • মু. মতিয়ার রহমান, অপ্রভ্রষ্ট অপভ্রংশ শামান্দার : মাদারীপুর জেলার ইতিকথা, গতিধারা প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১০।
  • বাশার মাহমুদ, শাহমান্দারের ঘাট, গাংচীল প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১০।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (জুন, ২০১৪)। "এক নজরে মাদারিপুর"। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। ১৭ এপ্রিল ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৬ জুন ২০১৪  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)
  2. "মাদারীপুর জেলা - বাংলাপিডিয়া"bn.banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৭-২২ 
  3. "উত্তর মাদার্শা ইউনিয়ন" |ইউআরএল= এর মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য)http (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৭-২২ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  4. বাশার মাহমুদ (২১ জুলাই ২০১৯)। "যাঁর নামে মাদারিপুর"। দৈনিক সুবর্ণগ্রাম (প্রকাশিত হয় ৭ ডিসেম্বর ২০১৭)। 
  5. ড. অশোক বিশ্বাস, বাংলাদেশের নদীকোষ, গতিধারা, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা ৩৯৭, আইএসবিএন ৯৭৮-৯৮৪-৮৯৪৫-১৭-৯
  6. "বাঙালির সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক ইতিহাস – পর্ব ৫ – অন্যদেশ"। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৮-১৯ 
  7. Sailendra Nath Sen (১৯৯৯)। Ancient Indian History and Civilization। New Age International। পৃষ্ঠা 277–287। আইএসবিএন 978-81-224-1198-0 
  8. "মাদারীপুর জেলা" |ইউআরএল= এর মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য)http (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৬-২৪ 
  9. রহমান, শেখ মুজিবুর (২০১২)। অসমাপ্ত আত্মজীবনী। ঢাকা: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড। পৃষ্ঠা ৯। আইএসবিএন 978-984-506-059-2 
  10. webdesk@somoynews.tv। "১০ ডিসেম্বর মাদারীপুর মুক্ত দিবস"somoynews.tv (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৮-১৯ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]