আগারগাঁও কলোনিতে নয়নতারা ফুল কেন নেই

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
"আগারগাঁও কলোনিতে নয়নতারা ফুল কেন নেই"
লেখকশহীদুল জহির
দেশবাংলাদেশ
ভাষাবাংলা
বর্গগল্প
প্রকাশিত হয়ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প (১৯৯৯)
প্রকাশনার ধরনসংকলন
প্রকাশকশিল্পতরু প্রকাশনী
মাধ্যমছাপা (শক্তমলাট)
প্রকাশনার তারিখ১৯৯৯
পূর্ববর্তী রচনা"ঘেয়ো রোদের প্রার্থনা নিয়ে"
পরবর্তী রচনা"কাঠুরে ও দাঁড়কাক"

"আগারগাঁও কলোনিতে নয়নতারা ফুল কেন নেই" বাঙালি লেখক শহীদুল জহির রচিত ছোট গল্প। ১৯৯১ সালে রচিত গল্পটি ১৯৯৯ সালে ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প শিরোনামে জহিরের দ্বিতীয় গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়।

গল্পের প্রেক্ষাপট উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক জীবনের অবরুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে আগারগাঁও নামক সরকারি কলোনিতে বসবাসরত মানুষের বৃত্তান্ত উপস্থাপিত হয়েছে। আগারগাঁও মূলত বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আবাসনের জন্য সৃষ্ট কলোনি, যেখানে সামাজিক মর্যাদা ও আধিপত্যের মানদণ্ডে বসবাসরত কেরানিদের অবস্থান তলদেশে। এধরনের একজন মধ্যবয়সী কেরানি আবদুস সাত্তার গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। এক ভূমিকম্পের ঘটনায় তার মৃত্যুর পরে কলোনির সব নয়নতারাগাছ শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে এবং প্রতিবাদে আত্মহত্যা করে। এই ইতিবৃত্ত রূপায়ণে ব্যবহৃত হয়েছে জাদুবাস্তবতার বিবিধ প্রকৌশল।[১]

এই গল্প অবল্মনে টেলিভিশন নাটক নির্মাণ করেছেন জাহিন জামাল।

চরিত্রসমূহ[সম্পাদনা]

  • আবদুস সাত্তার - সরকারি কেরানি
  • শিরিন বানু - আবদুস সাত্তারের স্ত্রী
  • অধ্যাপক
  • আগারগাঁও কলোনির নয়নতারা গাছ

কাহিনীসংক্ষেপ[সম্পাদনা]

বাংলাদেশে দেখা যায় এমন "Vinca" প্রজাতির নয়নতারা উদ্ভিদ "আগারগাঁও কলোনিতে নয়নতারা ফুল কেন নেই" গল্পের বিশেষ চরিত্র।

গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র আগারগাঁও কলোনিতে বসবাসরত আবদুস সাত্তারের। তিনি একজন শীর্ণ ও মধ্যবয়সী লোক এবং পেশায় সরকারি কেরানি। সংসারের গণ্ডিতে আবদুস সাত্তারের উপস্থিতি এতটাই নীরব ও নিষ্ক্রিয় যে, সে বর্ষাস্নাত এক অপরাহ্ণে কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে গিয়ে আকস্মিকভাবে অসতর্কতাবশত পা পিছলে পড়ে ডাবার ঘটনায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়। পরে যাবার পর তিনি স্ত্রীকে 'পইড়া গেলাম কেদোর মইধ্যে' বলার আগ পর্যন্ত কেউ বিষয়টি খেয়াল করে নি। স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে তাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়লে সময় অতিবাহিত করার তাড়নায় আবদুস সাত্তারের অবলম্বন হয়ে ওঠে কলোনির ছোট বারান্দা। একসময় কেরানি চাকরিতে সে ক্লান্তি বোধ করতে থাকে। অন্যদিকে তার স্ত্রী শিরিন বানুর বৃক্ষপ্রীতির গুণে কলোনিবাসির সাথে পারস্পরিক দূরত্ব কমতে থাকে তখনও সেসব কিছু আবদুস সাত্তারের নিস্পৃহ চেতনালোকে আলোড়িত করেতে পারে না। এরপর কলোনিবাসীদের যৌথ উদ্যোগ ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় কলোনিটি প্রকৃতির বর্ণাঢ্যতায় শোভিত হলে আবির্ভাব ঘটে হলুদ রঙের প্রজাপতিকুলের। লালচে বেগুনি রঙের নয়নতারা ফুলে আচ্ছাদিত এই কলোনির প্রতি প্রজাপতিদের মোহমুগ্ধ আকর্ষণের ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সংবাদপত্রে এ খবর সচিত্র প্রতিবেদনসহ প্রকাশের পর উৎসুক মানুষ চিত্তবিনোদনের উদ্দেশ্যে তাদের সম্মুখবর্তী রাস্তায় উপস্থিত হয়। বৈচিত্র্যসন্ধানী মানুষের নিকট কিছুদিনের ব্যবধানেই এ ঘটনা একঘেয়েমিপূর্ণ বিবেচিত হওয়ায় তারা প্রজাপতিদের লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়তে থাকে। অন্যদিকে সমবেত মানুষের ভিড় উদ্দেশ্য করে ভ্রাম্যমাণ খাদ্য বিক্রেতাদের ভিড় জমে। ফলে অকস্মাৎ সৃষ্ট এ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি এড়াতে নগরে শান্তি-শৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে অস্থায়ী পুলিশি প্রহরার ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের অধীনে প্রজাপতিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার তাগিদে সংবিধিবদ্ধ সতর্কবাণী জারি করা হয়।[১]

কলোনিতে প্রজাপতিদের আবির্ভাবের পর এক বছর অতিক্রান্ত হয়। প্রজাপতির উপস্থিতিতে বিমুগ্ধ দর্শকদের ঢিল নিক্ষেপের ঘটনায় বিরক্ত হয়ে আবদুস সাত্তার একবার ব্যালকনি পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও নতুন সামরিক সরকারের উদ্যোগে মিরপুর চিড়িয়াখানার আধুনিকায়নের পর চিত্তবিনোদনের তাগিদে নগরবাসীর কলোনির পরিবর্তে সেখানে বেড়াতে যাওয়ায়, তার এ ভাবনার পরিবর্তন ঘটে। এ পর্যায়ে তার প্রতি স্ত্রীর পরকীয়া প্রণয়গত অভিযোগ ওঠে। এভাবে আবদুস সাত্তারের।গতানুগতিক জীবনের পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে। শেষে আকস্মিক এক ভূমিকম্পের সময় বারান্দার রেলিঙে দড়িবাঁধা নয়নতারা ফুলের দুটি টবকে রক্ষার প্রচেষ্টায় পড়ে মারা যান। ভূমিকম্পের ঘটনায় আগারগাঁও কলোনির একমাত্র নিহত ব্যক্তি আবদুস সাত্তারের পাশাপাশি সকল নয়নতারা গাছের উন্মূলিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এরপর কলোনিবাসী পুনরায় নয়নতারার চারা নতুনভাবে রোপণের প্রচেষ্টা চালানো সত্ত্বেও সেগুলোর অকালমৃত্যু ঘটতে থাকে। এতে তারা বিস্মিত হয় এবং তাদের উদ্যোগে কৃষি কলেজের জনৈক অধ্যাপকের গাছগুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্য এক মাসের কঠোর পরিশ্রম শুরু করে। তিনিও এতে ব্যর্থ হন। কৃষিবিদের অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয় যে, আবদুস সাত্তারের মস্তিষ্কের গলিত মগজ কলোনির যে স্থানে পতিত হয়েছিল, শুধু সে স্থানেই নতুন চারটি নয়নতারা গাছ জন্মেছে। এমনকি সেগুলোর কোনটিকে অন্যত্র সরানোর প্রচেষ্টা চালাতেই সেটি মুমূর্ষু হয়ে পড়ছে এবং পূর্বের স্থানে ফিরিয়ে আনলে পুনরায় সেটি প্রাণবন্ত রূপ নিচ্ছে। কৃষিবিদের মতে, গাছগুলো আত্মহত্যা করেছে। তার বক্তব্য হল, 'আত্মহত্যার এই ইচ্ছে প্রথমে এক গাছ থেকে অন্য গাছে ছড়ায় গাছগুলোর নৈকট্যের কারণে এবং প্রজাপতি সম্ভবত এই প্রক্রিয়ায় মেসেঞ্জারের কাজ করেছে; পরে, আমার সন্দেহ হয়, মাটিরও কোন এক ধরনের ভূমিকা থাকতে পারে। আমি পলিথিনের ব্যাগের ভেতর একটি চারাকে এভাবে বাঁচাতে পেরেছিলাম। তবে, এভাবে এক্সপেরিমেন্ট করা যায়, বাগান করা যায় না।' পরবর্তীতে নতুন রাস্তা নির্মাণ ও জঞ্জাল নির্মূলের অংশ হিসেবে গণপূর্ত বিভাগের অবশিষ্ট গাছগুলো কাটায় আগারগাঁও কলোনি নয়নতারা গাছশূন্য হয়ে পড়ে।[১]

সমালোচনা[সম্পাদনা]

কথাসাহিত্যিক হামীম কামরুল হকের মতে এই গল্পে জহির প্রকৃতি ও প্রেমের দারুণ উপমায় বাংলাদেশের একটি কঠিন সময়ের পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন।[২] অন্যদিকে ২০১৬ সালে জনকণ্ঠের এক আলোচনায় তাশরিক-ই-হাবিব এই গল্পের একাধিক ঘটনায় জাদুবাস্তবতার প্রভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। গল্পে নয়নতারা ফুলের প্রতি প্রজাপতিদের আকৃষ্ট হবার বিষয় উল্লেখ করে বলেন, "অন্য কোন ফুল এবং ভিন্ন রঙের প্রজাপতির পরিবর্তে শুধু হলুদ প্রজাপতির একমাত্র নয়নতারা ফুলের প্রতি সম্মোহিত হওয়ার প্রসঙ্গটি গল্পভাষ্য নির্মাণের জন্য জরুরী হলেও তেমন বাস্তবসম্মত নয়"।[১] এছাড়াও তিনি নয়নতারা গাছগুলোর স্বেচ্ছামৃত্যু পরোক্ষ অর্থে কলোনিতে অবরুদ্ধ সংবেদনশীল মানুষের অন্যের দ্বারা প্রতিপালিত হয়ে কোনমতে বেঁচে থাকার সুযোগকে উপেক্ষাপূর্বক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদী অবস্থান গ্রহণেরই প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেন।[১] লেখক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, একে সামাজিক দায়বদ্ধতার দলিল হিসেবে মন্তব্য করেছেন।[৩]

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে[সম্পাদনা]

এই গল্প অবলম্বনে জাহিন জামাল ২০১২ সালে একটি টেলিভিশন নাটক নির্মাণ করেছেন, যেটি চ্যানেল নাইনে প্রচারিত হয়েছিল।[৪][৫] নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ে ছিলেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, ওয়াহিদা মল্লিক জলি, আজাদ আবুল কালাম, নাজনীন হাসান চুমকি প্রমূখ।[৬]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. হাবিব, তাশরিক-ই- (২ সেপ্টেম্বর ২০১৬)। "জাদুবাস্তবতা অথবা নয়নতারা ফুলের কথামালা"জনকণ্ঠ। ১২ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১২ জানুয়ারি ২০২১ 
  2. মারুফ, মোহাম্মদ (১৫ অক্টোবর ২০১৭)। "শহীদুল জহিরকে নিয়ে গাঁথার আয়োজন"ঢাকা: বাংলা ট্রিবিউন। ১২ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১২ জানুয়ারি ২০২১ 
  3. জাহাঙ্গীর, কামরুজ্জামান (২৯ আগস্ট ২০১৫)। "শহীদুল জহির: তার গল্পের পতনশীল মানুষেরা"। amarbarta24। ৩০ নভেম্বর ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১২ জানুয়ারি ২০২১ 
  4. মজিদ, পিয়াস (২৮ জুলাই ২০১৪)। "একজন অন্যবিধরোদে পোড়াশহীদুল জহির"ঢাকা: ইত্তেফাক। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১২ জানুয়ারি ২০২১ 
  5. "শহীদুল জহিরের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সেমিনার অনুষ্ঠিত"ঢাকা: যুগান্তর। ৩০ মার্চ ২০১৪। ১২ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১২ জানুয়ারি ২০২১ 
  6. "শহীদুল জহিরের গল্প নিয়ে নাটক"বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম। ২৬ ডিসেম্বর ২০১২। ১২ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১২ জানুয়ারি ২০২১ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]