পারাপার (গল্পসংকলন)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পারাপার
পারাপার বইয়ের প্রচ্ছদ
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ
লেখকশহীদুল হক
দেশবাংলাদেশ
ভাষাবাংলা
ধরনগল্পসংকলন
প্রকাশিত১৯৮৫
প্রকাশকমাওলা ব্রাদার্স
মিডিয়া ধরনছাপা (শক্তমলাট)
পৃষ্ঠাসংখ্যা৬২ (প্রথম সংস্করণ)
আইএসবিএন৯৮৪৭০১৫৬০১৮০৫ আইএসবিএন বৈধ নয়
পরবর্তী বইডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প (১৯৯৯) 

পারাপার বাঙালি লেখক শহীদুল জহির রচিত বাংলা গল্পসংকলন। এটি ১৯৮৫ সালে মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত জহিরের অভিষেক বই। ২০১৪ সালে এর দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয়।

শহীদুল জহির নাম ধারণের পূর্বে শহীদুল হক নামে প্রকাশিত এট তার একমাত্র বই। ১৯৭৪ সালে রচিত "ভালবাসা" গল্পটি জহিরের প্রকাশিত প্রথম গল্প। যেটি অবমল্বনে পরবর্তীতে নির্মিত হয়েছে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

পটভূমি[সম্পাদনা]

জন্মনাম শহীদুল হক নামেই এই গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল, এবং পরবর্তীকালে নাম পরিবর্তন করেছিলেন তিনি। এ-প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, "দেখা গেল যে শহীদুল হক নামে লোকে আমাকে চিনতে পারছে না। আমার লেখা ছাপানোর পরও ভাবছে যে, আমি না – কারণ, তখন অন্য একজন শহীদুল হক ছিলেন। টাইমসের সম্পাদক। লেখালেখি করতেন অবশ্যই। আরেকজন আছেন শহীদুল হক খান। তাঁদের দুজনের নামের সঙ্গে আমাকে প্রায়ই গুলিয়ে ফেলা হচ্ছিল। তখন আমি বুঝলাম যে, এঁরা আমার সমস্যার জন্য নিশ্চয় তাঁদের নিজেদের নাম বদলাবেন না। আমি অখ্যাত। আমাকেই বদলাতে হবে অর্থাৎ আমার দাদার নাম ছিল জহিরউদ্দীন। হকের স্থলে সেই জহির গুঁজে দেওয়া"।[১]

সূচী[সম্পাদনা]

সংকলেন গল্পগুলো ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৬ সালে লেখা। সে সময়ে জহির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ঢাকা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন তিনি। "পারপার" (১৯৭৫) গল্পে যার প্রভাব প্রত্যক্ষ।[২]

ক্রম শিরোনাম রচনা কাল
"ভালবাসা" ১৯৭৪
"তোরাব শেখ" ১৯৭৫
"পারাপার" ১৯৭৫
"মাটি ও মানুষের রং" ১৯৭৬
"ঘেয়ো রোদের প্রার্থনা নিয়ে" ১৯৭৬

গল্পসমূহ[সম্পাদনা]

"ভালবাসা"[সম্পাদনা]

১৯৭৪ সালে রচিত "ভালবাসা" জহিরের প্রকাশিত প্রথম গল্প। যেখানে বাবুপুড়া বস্তির পটভূমিতে নিম্নবিত্ত মানুষের সাংসারিক জীবনের মধ্য দিয়ে ভিন্নধর্মী এক ভালোবাসার রূপ রয়েছে।[১] কেন্দ্রীয় চরিত্র গুলির মধ্যে রয়েছে হাফিজদ্দি, তার স্ত্রী আবেদা এবং তাদের একমাত্র মেয়ে তহুরা। হাফিজদ্দির কেুড়িয়ে পাওয়া একটি ঘরে নিয়ে আসা এবং এতে তার স্ত্রী আবেদার মনে হঠাৎ এক ধরনের ভালোবাসার জন্ম হওয়াকে কেন্দ্র করে এই মনস্তাত্ত্বিক গল্পের কাহিনী নির্মিত হয়েছে।[১]

"তোরাপ সেখ"[সম্পাদনা]

"তোরাপ সেখ" ১৯৭৫ সালে রচিত জহিরের একটি বিশ্লেষণ ও বর্ণনাধর্মী আঙ্গিকের শক্তিশালী গল্প।[১] পূর্বে গল্পহি সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত হয়েছিল।[৩] গল্পের চরিত্র তোরাপ সেখ একজন বয়স্ক মানুষ, যে সারাদিন ঝুপরিতে থাকে। তার স্ত্রী রহিমা, ছেলে জমির ও ছেলের বউ লতিফা, এবং মেয়ে লালবানু। সারাদিন ঝুপরিতে সময় কাটে না বলে ছেলে জসিরের নিষেধ স্বত্তেও সে কাজে যেতে চায়। একদিন লালবানুর বিয়ের বিষয়ে জমির তার বাবা তোরাব শেখকে জানায়। এবং মজিদ মিয়ার পাত্র জানতে পেরে তোরাব শেখ অমত ঘোষণা করে। তবে তোরাবের নির্দেশ লালবানু মানতে নারাজ বলে তিনদিন পরই সে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় সংসারে নিজের মূল্যহীনতা উপলব্ধি করতে পেরে তোরাপ সেখ নিজের মধ্যে সংকুচিত হতে-হতে একপর্যায়ে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে, এবং নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। হার না মানা চরিত্র তোরাপ সেখ, নিজামের সাথে বুড়ো বয়সে প্রায়শই ঠেলাগাড়ি নিয়ে চলে। সে অস্তিত্ব সংকটে ভোগে শুধুমাত্র অন্যান্য পারিবারিক সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল থাকার ভয়ে। বয়সের প্রভাবে আজ এই হাল। তবুও তোরাপ সেখ হার না মানা এক ব্যক্তিত্ব [১]

"পারাপার"[সম্পাদনা]

"পারাপার" গল্টির রচনাকাল ১৯৭৫ সাল। স্টিমারে যাত্রাকালীন ওলি নামের এক চাকরি সন্ধানি যুবকের সাথে ঘটনাক্রমে অল্পবয়সী দুই কুলি, আবুল আর বশিরের পরিচয় ঘটে। একসময় তারা বেডিং মাথায় করে স্টিমার থেকে ট্রেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য মজুরি দাবি করে, এবং ওলি তাতে রাজি হয়। কিন্তু এরপরই ওলি জানায় যে বেডিং দুটো তার নয়, তার কাছে জিম্মা রেখে অন্য এক জন। স্টিমার ঘাটে আসার পর যখন বশির ও আবুল বেডিং নামাতে আসে তখন প্রকৃত মালিক দুই টাকার বেশি মজুরি দেবেন না বলে জানিয়ে দেন। মাঝে দরদামের এই আলোচনায় ওলি কুলিদের পক্ষ নেয়। শেষে অতিরিক্ত ভারি বেডিং সামলাতে না পারায় নদীর পানিতে পড়ে যায় বেডিংটা। এতে বেডের মালিক ক্ষুদ্ধ হয় এবং দরদামে মধ্যস্ততা করায় ওলিকে সে সমান অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত করে। পরোক্ষভাবে এই গল্প মার্ক্সবাদের প্রভাব বহন করে।

"মাটি ও মানুষের রং"[সম্পাদনা]

১৯৭৪ সালের "মাটি ও মানুষের রং" গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত মনস্তাত্ত্বিক বর্গের গল্প। ধনী-গরিবের তারতাম্যের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এখানে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ এবং শ্রেণিহীন মানুষের ওপর যে অবিচার করা হয়, তা রূপকের মধ্য উঠে এসেছে।[১]

"ঘেয়ো রোদের প্রার্থনা নিয়ে"[সম্পাদনা]

সংকলনের সর্বশেষ গল্প "ঘেয়ো রোদের প্রার্থনা নিয়ে" রচিত হয় ১৯৭৬ সালে। এক ধরনের অনির্দিষ্টতার মধ্য দিয়ে গল্পের ইতি ঘটে এই বলে যে, 'হয়তোবা তারা খুব বেশি ভাল মানুষ ছিল, নয়তো তারা কেউই কাউকে বিশ্বাস করতে পারত না।'[৪]

সমালোচনা[সম্পাদনা]

শহীদুল জহিরের মতে সংকলনের অধিকাংশ গল্প ঐতিহ্যগত ছকে লেখা। যার প্রতিটি গল্পে স্বাতন্ত্র্য স্বর-বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়।[১] অন্যদিকে কাঠামোগত দিক বিচারে অনেকটা আবদুল মান্নান সৈয়দের ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত চলো যাই পরোক্ষে গল্পগ্রন্থের সঙ্গে মিল থাকলেও জহিরের একে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন।[১] তার প্রথম প্রকাশিত "ভালবাসা" (১৯৭৪) গল্পে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর প্রভাব স্পষ্ট।[৫]

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে[সম্পাদনা]

২০১৮ সালে "ভালবাসা" গল্প অবলম্বনে একই শিরনামে শুভ্রা গোস্বামী একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পরিচালিনা করেন, যেখানে অভিনয়ে ছিলেন দীপক সুমন ও মৌসুমী হামিদ[৬]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. আহ্মদ, আশরাফ উদ্দীন (২৪ জুন ২০১৪)। "শহীদুল জহির : পারাপারের বিষয়বৈচিত্র্য"। প্রবন্ধ। কালি ও কলম। ১ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১২ ডিসেম্বর ২০২০ 
  2. টিপু, মাহবুব। "শহীদুল জহির ও গভীরভাবে অচল মানুষের ভার"। রাইজিংবিডি.কম। সংগ্রহের তারিখ ১১ জানুয়ারি ২০২১ 
  3. জাহাঙ্গীর, কামরুজ্জামান (২৬ মার্চ ২০০৮)। "শহীদুল জহিরের সাথে কথপোকথন"arts.bdnews24.comবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। সংগ্রহের তারিখ ১৩ জানুয়ারি ২০২১ 
  4. হাসান, মাজুল (১ সেপ্টেম্বর ২০১২)। "শহীদুল জহিরের গল্পে জাদুআবহ ও কয়েনেজসমূহ"arts.bdnews24.comঢাকা: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। সংগ্রহের তারিখ ১৩ জানুয়ারি ২০২১ 
  5. হোসেন ২০১৭, পৃ. ১১৭।
  6. সাজু, শাহ আলম (৮ ডিসেম্বর ২০১৮)। "Moushumi Hamid in 'Bhalobasha'"দ্য ডেইলি স্টার (বাংলাদেশ)। সংগ্রহের তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২১ 
উৎস

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]