হিমধস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
হিমালয় পর্বতমালাতে এভারেস্ট পর্বতের কাছে একটি গুঁড়াতুষার জাতীয় হিমধস

যখন তুষারাবৃত উঁচু পর্বতের কোনও দুর্বল তুষারস্তরের উপর বসে থাকা একটি সুসংবদ্ধ তুষারস্তুপ (snow pack) বা তুষারাবরণ (snow cover) ভেঙে খাড়া ঢাল বেয়ে দ্রুত পিছলে নেমে আসে, তখন সেই ঘটনাকে হিমধস (ইংরেজি: Avalanche বা Snowslide) বলে। হিমধসের সমার্থক কিছু পরিভাষা হল হিমানীসম্পাত, হিমানীসম্প্রপাত, হিমস্খলন, ইত্যাদি। একবার শুরু হবার পরে সাধারণত হিমধসের বেগ দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এর ভর ও আয়তন বৃদ্ধি পেতে থাকে।[১]

হিমধস সাধারণত একই পার্বত্য এলাকায় একই পথে বারংবার ঘটে, যাকে হিমধস পথ (Avalanche path) বলা হয়। গড়ে যতটুকু সময় পরপর একই পথে হিমধস ঘটে, তাকে পুনরাগমন বিরতি (Return interval) বলে। হিমধস পথটি তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত -- নিষ্ক্রান্তি অঞ্চল (Release zone), পথ (track) এবং অবক্ষেপণ অঞ্চল (Deposition zone)।[১]

হিমধস সাধারণত পার্বত্য অঞ্চলে শীতকালে বা বসন্তকালে হয়ে থাকলেও হিমবাহের চলনের কারণে বছরের যেকোনও সময়েই এটি ঘটতে পারে। মূলত মাধ্যাকর্ষণের কারণে হিমধসের সৃষ্টি হলেও এর পেছনে আরও কারণ থাকতে পারে। পর্বতে তুষারপাতের কারণে উপরের তুষারস্তরের ওজন বৃদ্ধি, কিংবা কোনও বিশেষ কাঠামোগত কারণে তুষারের ভেতরের ভারবহন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া, ইত্যাদি হিমধসের পেছনের মূল কারণ হতে পারে। সাধারণত কোনও তুষারঝড়ে ১ ফুট বা তার বেশি পুরু তুষারপাত হলে তার ঠিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হিমধসের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তুষারের দ্রুত স্তুপীভবনের ফলে তার নিচের জমাট হিমখণ্ডের উপর চাপ অতিরিক্ত বৃদ্ধি পায় এবং এর ফলে হিমখণ্ডের নিচের একটি দুর্বল স্তরে ফাটল ধরে। হিমখণ্ডের স্তরগুলি সারা শীতকাল ধরে একের পর এক সৃষ্টি হয়; একটি স্তর আরেকটি স্তরের সাথে কীভাবে আবদ্ধ থাকে, সেটিই নির্ধারণ করে কোন্‌ স্তরটি দুর্বল হবে ও ভেঙে যাবে।[২]

পার্বত্য অঞ্চলে হিমধস একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে গণ্য হয় কেননা এতে বিপুল পরিমাণ ভরবিশিষ্ট তুষার অত্যন্ত দ্রুতবেগে ধাবিত হয় এবং এর পথের উপরে পড়ে এমন সবকিছু ধ্বংস করে দিতে পারে। সেইসাথে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী বরফের নিচে চাপা পড়ে ও আটকা পড়ে মারা যেতে পারে। হিমধসে আটকা পড়ে গেলে হিমখণ্ড বা হিমস্তুপ থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরে যেতে হয়। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটি সম্ভব হয় না। তাই স্কিকারী বা স্নোবোর্ডকারীরা সরাসরি নিচের দিকে দ্রুত ধাবিত হয়ে পরে ডানে বা বামে সরে যেতে পারে। স্নোমোবিল চালকেরা মোটরের গতি বাড়িয়ে বিপদ থেকে রক্ষা পেতে পারে। যদি এর পরেও মুক্তি না পাওয়া যায়, তাহলে কোন শক্ত গাছকে আকড়ে ধরতে হয়। গাছ না থাকলে জোরে সাঁতার কাটতে হয়, কেননা মানুষের শরীর হিমধসের চেয়ে তিন গুণ ভারী এবং খুব সহজেই ডুবে যেতে পারে। হিমধস একবার থেমে গেলে এটি কংক্রিটের মতো শক্ত হয়ে জমাট বেঁধে যায়, তাই একবার হিমধসের ভেতরে আটকা পড়ে গেলে আর বের হবার উপায় নেই। যদি ১৫ মিনিটের মধ্যে খুঁড়ে বের করা হয়, তাহলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় ৯৩%। কিন্তু ৪৫ মিনিটের পরে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুব কম, মাত্র ২০ থেকে ৩০%। ২ ঘণ্টা পরে খুবই কম লোক বেঁচে থাকে।[২]

ইউরোপে ও উত্তর আমেরিকাতে হিমধসের বিপদ বা ঝুঁকি নির্দেশকারী স্কেল বা মাপনী আছে, যেগুলি পর্বতারোহীদেরকে সতর্ক করতে সাহায্য করে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Sue A. Ferguson; Edward R. LaChapelle (২০০৩), The ABCs of Avalanche Safety, The Mountaineers Book, পৃষ্ঠা 8–10 
  2. Avalanches, National Geographic, সংগ্রহের তারিখ জুলাই ৭, ২০১৯ 

আরও দেখুন[সম্পাদনা]