প্রাকৃতিক দুর্যোগ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

প্রাকৃতিক দুর্যোগ (Natural Disaster) হলো একপ্রকারের প্রাকৃতিক ঘটনা, যাতে মানুষের আর্থ-সামাজিক ক্ষতি হয়ে থাকে। যদিও তা স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবেই ঘটে থাকে, তবে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের কাজ-কর্মের প্রভাবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় এরকম ঘটনা ঘটে থাকে। সাধারণ ভাষ্যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলো স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যতিক্রম।

বিভিন্নরকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ[সম্পাদনা]

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মূলত স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মের মধ্যে ব্যতিক্রম ঘটনা বা ঘটনাবলী। সে হিসাবে, প্রাকৃতিক সাধারণ নিয়মের ব্যতয় যেকোনো ঘটনাই প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। তবে যুগ যুগ ধরে মানুষের কাছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত কতিপয় ঘটনা রয়েছে, যেমন:

ঝড়[সম্পাদনা]

কোনো স্থানের বায়ুমণ্ডলে কোনো কারণে বায়ু গরম হয়ে গেলে তা উপরে উঠে যায়, এবং সেই শূণ্যস্থান পূরণ করতে আশেপাশের বাতাস তীব্র বেগে ছুটতে শুরু করে। সাধারণত প্রচণ্ড গরমের সময় কোনো স্থানে এরকম ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। আর এরকম তীব্র বায়ুপ্রবাহকে ঝড় বলা হয় এবং এর ফলেই ক্ষতিগ্রস্থ হয় বিভিন্ন মানববসতি। সাধারণত এরকম ঝড়ের সাথে অনুষঙ্গ হিসেবে উপস্থিত হয় স্থলঘূর্ণিঝড় বা টর্নেডো, কিংবা বজ্রবিদ্যুৎ। উত্তর গোলার্ধের দেশ বাংলাদেশে সাধারণত বাংলা বৈশাখ মাসে প্রচণ্ড গরমের সময় হঠাৎ করেই এজাতীয় ঝড় হতে দেখা যায়, যার স্থানীয় নাম কালবৈশাখী

স্থল-ঘূর্ণিঝড় বা টর্নেডো[সম্পাদনা]

মূল নিবন্ধ: টর্নেডো

১৫৮৪ সালে ঘুর্ণিঝড়ে বাকেরগঞ্জ জেলায় ২ লাখ মানুষসহ অসংখ্য গবাদি পশু প্রাণ হরায়। ১৮২২ সালের ৬জুন সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস ও ঘুর্নিঝড়ে ১০হাজার ব্যক্তি প্রাণ হারায়। ১৮৬৯ সালের ১৬এপ্রিল ঘুর্ণিঝড়ে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৮৭২ সালে কক্সবাজারে ঘুর্ণিঝড়ে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৮৭৬ সালের ৩১ অক্টোবর আঘাত হানে ভোলা জেলায়। এই সময় পানির উচ্চতা ছিল ৩ থেকে ১৫ মিটার। এতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০হাজারের মত। ১৮৯৫ সালে অক্টোবর মাসে সুন্দরবন ও বাগেরহাট জেলায় জলোচ্ছ্বাসে ও ঘুর্ণিঝড়ে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৮৯৭ সালে ২৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের কতুবদিয়া দ্বীপে আঘাত আনে। প্রান হারায় অসংখ্য লোক। ১৮৯৮ সালে টেফনাফে ঘুর্ণিঝড়ে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৯০১ সালে সুন্দরবনের পশ্চিমাংশে ঘুর্ণিঝড়ে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৯০৯ সালের অক্টোবরে চট্টগ্রামে ও কক্সবাজারে ঘুর্ণিঝড়ে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৯৯৭ সালের মে মাসে সুন্দরবনে ঘুর্ণিঝড়ে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৯১৯ সালে বরিশালে জলোচ্ছ্বাসে ও ঘুর্ণিঝড়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০ হাজার। ১৯২৬ সালের মে মাসে বরিশালে ও নোয়াখাীরতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭ হাজার ৫ জনে মত। ১৯৫৮ সালের ২১ থেকে ২৪ অক্টোম্বর নোয়াখালি, ২০ নভেম্বর পটুয়াখালি ঘুর্ণিঝড়ে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৯৬০ সালে সুন্দরবনে আঘাত হানে। এখানে মৃতে সংখ্যা দাঁড়ায় তিন হাজার। ১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোম্বর আঘাত হানে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালি, উপকুলিয় এলাকায়। ১৯৬১ সালে বেশ কয়েকবার দেশের বিভিন্ন স্থানেজলোচ্ছ্বাসে বহুলোক প্রাণ হারায়। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার রাতে বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, বরগুনা ও ভোলাসহ দেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে যায় সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড় গোর্কি। গোর্কির আঘাতে বিরাণ ভূমিতে পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চল। দেড়শ’ মাইল বেগের গতিসম্পন্ন ঘূর্ণিঝড় ও ২০ থেকে ৩০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে গোটা উপকূলীয় এলাকা মৃতপুরীতে পরিণত হয়। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ৪ থেকে ৮ মিটার উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাসের ১৫ হাজার ব্যক্তি প্রাণ হারায়। ২০০৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরে হঠাৎ টর্ণেডোয় শত শত ট্রালার, জেলে মাঝি মাল্লা প্রাণ হারায়। ২০০৭ সালে সিডরে সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে। এ সময় মৃত গলিত লাশ ভাসতে দেখা গেছে। ২০০৯ সালের ২৫ মে। ঘন্টায় ১১০ কিলোমিটার বেগে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আইলা।লন্ডভন্ড করে দেয় এ অঞ্চলের হাজার হাজার বসত-ভিটা, আবাদিজমি। সরকারি হিসেবেই এতে প্রাণ যায় তিন শো ৩২ জনের। ২০১৩ সালের ১৬ মেবৃহস্পতিবার বঙ্গোপসাগরের ঘুর্ণিঝড় মহাসেন আঘাত হেনেছে বাংলাদেশের উপকূলস্থ অঞ্চলসমূহে।[১]

বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়-বৃষ্টি[সম্পাদনা]

কালবৈশাখী ঝড়[সম্পাদনা]

বাংলাদেশে সাধারণত বাংলা বৈশাখ মাসে (এপ্রিল-মে মাসে) প্রচণ্ড গরমের সময় হঠাৎ করেই এজাতীয় ঝড় হতে দেখা যায়, যার স্থানীয় নাম কালবৈশাখী। এই ঝড় শুরু হয়ে উত্তর-পশ্চিম দিকে বয়ে যায়। এই ঝড় সবসময়ই বজ্রপাত এবং বৃষ্টিসমেত সংঘটিত হয়ে থাকে। আর এই ঝড়ের সাথে শিলাবৃষ্টি ঘটে থাকে। বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে সাধারণত এই ঝড় শেষ বিকেলে হয়ে থাকে, কারণ সাধারণত ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপ বায়ুমণ্ডলে ঐসময় বেশি পরিমাণে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। একারণেই সন্ধ্যাকালে এই ঝড়ের প্রাদুর্ভাব বেশি লক্ষ্যণীয়। এই ঝড়ের গতিবেগ ঘন্টায় ৪০-৬০ কিলোমিটার হয়ে থাকে, তবে ব্যতিক্রম ক্ষেত্রে ঘন্টায় ১০০ কিলোমিটারও অতিক্রম করতে পারে।

জলোচ্ছাস[সম্পাদনা]

মূল নিবন্ধ: জলোচ্ছাস

সমুদ্রে অত্যধিক মাত্রায় বায়ুপ্রবাহের কারণে প্রচণ্ড ফুঁসে ওঠা পানি যখন নিকটবর্তি স্থলভাগে এসে আছড়ে পড়ে, তখন তাকে জলোচ্ছাস বলে। এছাড়াও সমুদ্রে সৃষ্টি হওয়া ঘূর্ণিঝড় তার সাথে নিয়ে আসে তীব্র জলস্রোত, যা উপকূলভাগে আছড়ে পড়ে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়। এরকম জলোচ্ছাস ১০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতেও দেখা গেছে।

বন্যা[সম্পাদনা]

মূল নিবন্ধ: বন্যা

কোনো অঞ্চলে প্রবল বৃষ্টি হলে নদ-নদী বা ড্রেনেজ ব্যবস্থা নাব্যতা হারিয়ে ফেললে অতিরিক্ত পানি সমুদ্রে গিয়ে নামার আগেই নদ-নদী কিংবা ড্রেন উপচে আশেপাশের স্থলভাগ প্লাবিত করে ফেললে তাকে বন্যা বলে। তবে বন্যা কোনো সাময়িক জলাবদ্ধতা নয়, বরং একটি দীর্ঘকালীন দুর্যোগ, যা কয়েক সপ্তাহ থেকে শুরু করে কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। উপকূলীয় দেশসমূহ নিজ দেশ ছাড়াও মহাদেশীয় অবস্থানের দেশগুলোর অতিবৃষ্টিপাতের কারণে নদ-নদীর জলস্থর বৃদ্ধির কারণেও বন্যায় প্লাবিত হতে পারে। বাংলাদেশ এরকমই একটি দেশ, যা ভারতের অতিবৃষ্টির প্রভাবেও বন্যায় প্লাবিত হয়।

ভূমিকম্প[সম্পাদনা]

মূল নিবন্ধ: ভূমিকম্প

ভূত্বকের নিচে টেকটনিক প্লেটের নড়াচড়ার ফলে ভূপৃষ্ঠে যে কম্পন অনুভূত হয়, তাকে ভূমিকম্প বলে। ভূমিকম্প মাপার ক্ষেত্রে সাধারণত বিশ্বব্যাপী রিখটার স্কেল ব্যবহৃত হয়, তবে সংশোধিত মার্কলি স্কেলও স্বীকৃত। রিখটার স্কেলে ১ মাত্রার ভূমিকম্প হলো সর্বনিম্ন মাত্রা, আর সর্বোচ্চ মাত্রা হলো ১০। পৃথিবীর ইতিহাসে মারাত্মক সব ভূমিকম্প নথিভুক্ত করা হয়েছে। টেকটনিক প্লেট ছাড়াও আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতেও ভূমিকম্প সংঘটিত হতে পারে। ভূমিকম্পের ফলে ভূত্বকের উপরে থাকা স্থাপনা কম্পন সহ্য করতে না পারলে ভেঙ্গে পড়ে। সমুদ্রে ভূকম্পন হলে পানিতে আলোড়ন সৃষ্টি করে, ফলে সংঘটিত হয় সুনামি[২]

সুনামি[সম্পাদনা]

মূল নিবন্ধ: সুনামি

কোনো বিশাল জলক্ষেত্রে, বিশেষ করে সমুদ্রে, ভূমিকম্প সংঘটিত হলে সেখানটায় ভুত্বকে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়, তার প্রভাবে উপরস্থিত জলক্ষেত্র ফুঁসে উঠে বিপুল ঢেউয়ের সৃষ্টি করে। এই ঢেউ প্রবল বিক্রমে স্থলভাগের দিকে এগিয়ে আসে এবং স্থলভাগে আছড়ে পড়ে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়। সাধারণত ভূমিকম্পের পরে সুনামি ঘটে থাকে। তবে ভূমিকম্পের পর যে সুনামি হবেই এমন নিশ্চয়তা দেয়া যায় না বলেই উপকূলীয় এলাকায় ভূমিকম্প সংঘটিত হলেই উপকূলীয় জনসাধারণ এব্যাপারে সর্বদা প্রস্তুত থাকতে পারে না। আর ভূমিকম্প সংঘটিত হলেই তারা নিজেদের আবাস ত্যাগ করতেও পারে না। ফলে উচ্চমাত্রার ভূকম্পনের পরে হওয়া সুনামিতে সাধারণত জনক্ষয় রোধ করা যায়, কিন্তু কোনো সুনামিতেই স্থলভাগের স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা যায় না।

ভূমিধ্বস[সম্পাদনা]

মূল নিবন্ধ: ভূমিধ্বস

পাহাড়কাটা, পাহাড়ের বৃক্ষনিধন এবং তার সাথে অতিবৃষ্টি যোগ হলে সাধারণত ভূমিধ্বস হতে পারে। তবে পাহাড় কাটা বা বনভূমি ধ্বংস না হলেও পাহাড়ের মাটি বৃষ্টির কারণে আলগা হয়েও যেকোনো সময় এমন ভূমিধ্বস সৃষ্টি করতে পারে। ভূমিধ্বসে সাধারণত উঁচু কোনো স্থান, যেমন পাহাড়, থেকে গাছপালা, স্থাপনাসহ বিপুল পরিমাণ মাটি কিংবা পাথর অকস্যাৎ হড়কে নিচের দিকে নেমে আসে। কখনও পাহাড়ের মাটি পানির সাথে মিশে ঘন মিশ্রণের সৃষ্টি করে, যা অনেক সময়ই জীবিতদের আটকে রাখার মতো আঠালো হয়ে থাকে এবং প্রাণঘাতি হয়। তাছাড়া অকস্যাৎ পাহাড়ধ্বসে পাহাড়ের পাদদেশে থাকা মনুষ্যবসতিতে বিপুল প্রাণনাশ হয়ে থাকে। সাধারণত বৃষ্টিপাতের কারণে ভূমিধ্বস হয়। বাংলাদেশে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, সিলেট, নেত্রকোণা ইত্যাদি জেলায় প্রায়ই ভূমিধ্বস হয়ে মানুষের প্রাণহানি ও বাড়িঘর নষ্ট হয়।

খরা[সম্পাদনা]

নদীভাঙন[সম্পাদনা]

মূল নিবন্ধ: নদীভাঙন

প্রতিবৎসর এদেশের লক্ষ লক্ষ অধিবাসী নদীভাঙনের শিকার হয়। মাঠের শস্য, ক্ষেত ও বসতভিটার ভূমি বিলীন হয়ে যায় নদীভাঙনের মাধ্যমে। হিসাবে দেখা যায় বাংলাদেশের সর্বমোট প্লাবনভূমির প্রায় ৫% ভূমি প্রত্যক্ষভাবে নদীভাঙনের কবলে পড়ছে। দেশের ৪৯৬টি উপজেলা বা থানার মধ্যে ৯৪টি উপজেলায় নদীভাঙনের ঘটনা ঘটেছে। ১৯৯৩ সালের জুন মাসে দেশের ১৬টি জেলার নদীভাঙনের ফলে ২৫.০০০ এর বেশি পরিবার গৃহহীন হয়। বর্ষা মৌসুমে তীর ছাপিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়া, তীরভাঙন এবং তীররেখার পরিবর্তন খুবই সাধারণ চিত্র। নদীসমূহের আচমকা পরিবর্তনমুখী আচরণ এবং আগ্রাসন কেবল গ্রামের প্লাবনভূমির অধিবাসীদেরকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, শহরাঞ্চলের বর্ধিষ্ণু জনপদ ও অবকাঠামোরও অনিষ্ট সাধন করে। HaturalHazardRiverErosion.jpg

বাংলাদেশের নদীভাঙনে অধিকমাত্রায় সমর্থ নদীগুলো হলো গঙ্গা, যমুনা, পদ্মা এবং লোয়ার মেঘনা। গঙ্গার ডান ও বাম তীর ধরে প্রতিবৎসর ভাঙনের হার যথাক্রমে ৫৬ মিটার এবং ২০ মিটার। ১৯৭৩ থেকে ২০০০ সাল সময়ের মধ্যে যমুনার প্রশস্তি ঘটার হার হলো ১২৮মি/বৎসর। এ সময়ে যমুনার গড় প্রশস্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে ৯.৭ থেকে ১১.২ কিমি। ১৯৮৪-৯২ সাল পর্যন্ত সময়ে বাম তীরাঞ্চল সর্বোচ্চ ভাঙনের শিকার হয়, আরিচা থেকে সামান্য উজানে এই ব্যাপক নদী ভাঙন দেখা দেয়।

২৮ বৎসর ধরে যমুনা নদীর প্রশস্তায়নের ফলে বাংলাদেশে প্রবহমান যমুনা নদীর ২২০ কিমি দীর্ঘ গতিপথে ৭০.০০০ হেক্টর প্লাবনভূমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

পদ্মা নদীর তীররেখা অতিমাত্রায় অস্থির এবং প্রশস্তায়নের হার ১৫৯ মিটার/বৎসর। লোয়ার মেঘনা তার উভয় তীরের ভূমি ক্ষয়ের ফলে মধ্যবর্তী গভীরতা হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৮৪-১৯৯৯ সাল পর্যন্ত সময়ে চাঁদপুরের ভাটির দিকের পশ্চিমপ্রান্তীয় তীরভূমি ব্যাপক ভাঙনের কবলে পড়ে এবং তীব্র ভাঙনের ফলে একটি বিশাল অঞ্চল নদীগর্ভে হারিয়ে যায়। এ সময়ে ভাঙনের হার ছিল অত্যন্ত অধিক ৮২৪ মিটার/বৎসর, এটি একই সময়ে যমুনার প্রশস্তায়নের হারের চেয়ে অনেক বেশি (১৮৪ মিটার/বৎসর)। নদী বক্ষে নতুন ভূমি জেগে উঠার পরিমাণের চেয়ে ভূমি হারানোর পরিমাণ অনেক বেশি। বাংলাদেশের নদীসমূহের গতিপথে এই ভূমিক্ষয় ভূবৃদ্ধির ঘটনা নদীর ভাঙ্গাগড়ার বৈশিষ্ট্যময় এক চিরকালীন চিত্র। নদী অঞ্চলের স্থানীয় রাজনীতিতে এ প্রক্রিয়া যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে।

উপকূলীয় ভাঙন দুইটি মূল ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চলের সংযুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বদ্বীপ সদৃশ উপকূলীয় রেখা গড়ে উঠেছে: নিষ্ক্রিয় বা পরিত্যক্ত গঙ্গা জোয়ারভাটা প্লাবনভূমি এবং সক্রিয় মেঘনা বদ্বীপ সমভূমি। গঙ্গা জোয়ারভাটা প্লাবনভূমি তুলনামূলকভাবে পুরাতন, মেঘনা ব-দ্বীপ সমভূমি সেক্ষেত্রে ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে নবীন। মেঘনা বদ্বীপ, সমভূমি চট্টগ্রাম উপকূলের পূর্ব থেকে পশ্চিমে তেঁতুলিয়া প্রণালী পর্যন্ত বিস্তৃত। ভূমিক্ষয়-ভূবৃদ্ধি প্রক্রিয়া এই অংশে অধিক ক্রিয়াশীল। বৃহত্তর মানচিত্রের তুলনামূলক বিচারে দেখা যায় গঙ্গা ব্রহ্মপুত্র নদীর বদ্বীপ সমুদ্র অভিমুখে গত দুই শতাব্দী ধরে তাৎপর্যপূর্ণভাবে বৃদ্ধি পায় নাই। পরিবর্তন গোচরীভূত হতে পারে সন্দ্বীপ এবং তৎসংলগ্ন দ্বীপসমূহে, হাতিয়া দ্বীপে, ভোলা দ্বীপে এবং নোয়াখালীর মূলভূমির উপকূলীয় রেখা বরাবর। গত ২০০ বৎসরের হিসাবে দেখা যায় সন্দ্বীপ দ্বীপের আকার হ্রাস পেয়েছে। সন্দ্বীপ প্রণালী নদীগুলির প্রধান ধারার নিকট থেকে ১৭৬৪-১৭৯৩ সালের দিকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। এসময়ে হাতিয়া দ্বীপ দক্ষিণ দিকে সম্প্রসারিত এবং লক্ষণীয়ভাবে স্থানান্তরিত হয়। ভোলা দ্বীপও উত্তর-দক্ষিণে সম্প্রসারিত হয়। দ্বীপসমূহ সাধারণভাবে ৫০ কিমি এর মত দক্ষিণ অভিমুখে সরে গিয়েছে।

উপকূলীয় ভাঙন[সম্পাদনা]

তুষারপাত[সম্পাদনা]

আর্সেনিক দূষণ[সম্পাদনা]

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে, গাঙ্গেয় পললভূমির ভূগর্ভস্থ জলস্তর জনগণের জন্য পানি সরবরাহে ব্যবহূত হচ্ছে। প্রাকৃতিকভাবে এ পানিতে আর্সেনিক দূষণ ঘটছে, যা লক্ষলক্ষ মানুষের স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশে আর্সেনিক দুষণীয় মাত্রায় পাওয়া গেছে এমন এলাকাসমূহ প্রধানত দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল (লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, চাঁদপুর) দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল (কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর) এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় অংশে (নবাবগঞ্জ) সীমাবদ্ধ, যা গঙ্গা ব-দ্বীপ সমভূমির অন্তর্ভুক্ত। ভূগর্ভস্থ জলস্তরের ১০০ মিটার উচ্চ স্তরের মধ্যে প্রধানত আর্সেনিকের কেন্দ্রীভবন ঘটে। ভূ-পৃষ্ঠের পানির স্রোতের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া শেষাবধি আর্সেনিক দূর করবে কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হতে হাজার হাজার অথবা দশ হাজার বৎসর সময়ের প্রয়োজন হবে। পশ্চিমবঙ্গেও একইরূপ ভূতাত্ত্বিক এবং জল ভূতাত্ত্বিক অবস্থায় আর্সেনিক দূষণ ঘটেছে। ভূ-পৃষ্ঠের পানিতে আর্সেনিক দূষণ মানবজাতির সম্মুখে নতুন কোন স্বাস্থ্যসমস্যা নয় এবং এটিকে সফলভাবে মোকাবেলা করা যেতে পারে। স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা যেমন আর্সেনিক পাওয়া গেছে এমন কূপ, নলকূপ চিহ্নিত করণ, দূষণমুক্ত ভূ-পৃষ্ঠের উপরের পানি ব্যবহার, বৃষ্টির পানি এবং বাড়িতে আর্সেনিক দূষণ মুক্তকরণ স্থাপনা নির্মাণের মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাদি যেমন দূষণহীন ভূগর্ভস্থ জলস্তরে কূপ স্থাপন, জনসমষ্টি ভিত্তিক আর্সেনিক দূষণ মুক্তকরণ স্থাপনা নির্মাণ এবং দূষণমুক্ত ভূ-পৃষ্ঠের উপরের পানির সরবরাহ প্রণালী গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচিত হতে পারে। এ সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার ক্ষেত্রে আর্সেনিক দূষণযুক্ত পানি দ্বারা সেচের বিষয়টি বিবেচ্য হওয়া উচিত। ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন নিম্নতম পর্যায়ে রাখতে হবে এবং সংযোজিত ব্যবস্থায় ভূ-পৃষ্ঠের উপরের পানির ব্যবহার এবং ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে ভবিষ্যত পানি উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করতে হবে। [৩]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. CEGIS কর্তৃক সম্পাদিত বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিষয়ক গবেষণা নিবন্ধসমূহ
  2. ঢাকা শহরে ভূমিকম্পের সম্ভাবনা শীর্ষক গবেষণা নিবন্ধ
  3. প্রাকৃতিক_দুর্যোগ-বাংলাপিডিয়া
  • প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সংকলিত, বাংলাপিডিয়া (সিডি ভার্ষণ) 2.0.0; বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। ২০০৬ সংস্করণ। পরিদর্শনের তারিখ: জুন ১৬, ২০১১ খ্রিস্টাব্দ।

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]